পুরোনোকে ফেলে মানুষ নতুনকে অতিথি করেছে যুগে যুগে। কাঠের লাঙলের জায়গায় এসেছে ট্রাক্টর; নৌকায় যুক্ত হয়েছে ইঞ্জিন; হাতপাখার জায়গা দখল করেছে বৈদ্যুতিক পাখা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের এ পর্যায়ে মানুষ অনেকটাই সরে গেছে প্রকৃতির কাছ থেকে। এতে ক্ষতি হচ্ছে মানুষেরই। প্রকৃতি বিরূপ আচরণ শুরু করেছে। এ কারণে যন্ত্র ও যান্ত্রিকতা থেকে বের হয়ে আবার প্রকৃতিবান্ধব পথে হাঁটতে চাচ্ছে মানুষ। জ্বালানির ব্যবহার কমাতে উদ্যোগী হচ্ছে অনেক দেশ। ইউরোপে বাড়ছে বাইসাইকেলের ব্যবহার। শীতাতপ যন্ত্রের বদলে অনেক দেশ ভবনে ৪০০ বছরের পুরোনো জালির ব্যবহার শুরু করছে।
মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধিতে নির্মাণ করেন তাজমহল। বিশ্বের অনন্য এ স্থাপত্যকীর্তি সপ্তদশ শতকে নির্মিত হয়। তাজমহলের নির্মাণশৈলী বিস্ময়কর। মার্বেল পাথর দিয়ে নির্মিত এ স্থাপনার দেয়ালে রয়েছে জালির ব্যবহার। এর ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। তার পরও তাজমহলে প্রবেশ করলে কেউ গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন না।

'জালি'র সবচেয়ে কাছের শব্দ 'জাল'। ভবনের দেয়ালে জালি ছড়িয়ে থাকে জালের মতোই। কিন্তু এটি তৈরি হয় পাথর বা সিমেন্ট দিয়ে। অনেক সময় লোহার জালিও দেখা যায়। ভবনের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস ও আলো যাতে সহজেই প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য আগেকার মানুষ এ পদ্ধতি বের করেছিলেন। এটা প্রাকৃতিক উপায়ে ভবন শীতলীকরণ ব্যবস্থা। এতে যন্ত্রের ব্যবহার নেই। তাজমহলের চারপাশে এ জালি দেওয়া। এগুলো দামি পাথর কেটে বিশেষ নকশায় নির্মিত। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় নির্মিত অনেক ভবনে এসব জালির ব্যবহার দেখা যায়। ১৭৯৯ সালে রাজপুতদের নির্মিত ভারতের জয়পুরের 'হাওয়া ভবন'ও একই ধরনের স্থাপত্যকীর্তি। এতে রয়েছে ৯৫৩টি জালির জানালা, যা হিমেল বাতাসকে ভবনের ভেতরে টেনে আনে। প্রয়োজন পড়ে না শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের।

মানুষ এখন কেন সেই জালির কাছে ফিরছে? এর প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তনে শীতাতপ যন্ত্রের প্রভাব। ভবনের ভেতর ঠান্ডা করতে গিয়ে এ যন্ত্র বাইরের বাতাসকে গরম করে। এ ছাড়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ ঘটায়। এক হিসেবে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ হওয়া মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৩৮ শতাংশই বের হচ্ছে শীতাতপ যন্ত্র ব্যবহার করা এসব ভবন থেকে। এ ভবনগুলোয় অনেক বিদ্যুৎশক্তিও খরচ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ এ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে তিন গুণ হবে।

চলমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী তাপপ্রবাহও বেড়েছে। গত মে মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এরই মধ্যে দেশটির সরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সাশ্রয়ী শীতলকরণের উপায় বের করতে উদ্যোগী হয়েছে। ২০১৯ সালে ভারত সরকার এক ভিন্নরকম পরিকল্পনা চালু করে- ইন্ডিয়া কুলিং অ্যাকশন প্ল্যান। এটি সেই জালি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা। এর মূল উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ খরচ না করে ভবন শীতল রাখা। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিজ্ঞানী জে শ্রীনিবাসন বলেন, ভারত ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহের হুমকিতে। আগামী দিনগুলোয় এটা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক প্রকৌশলী অতীতের দিকে তাকাচ্ছেন; তাঁরা ঐতিহ্যবাহী জালি থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মত, জালির ব্যবহার ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে।


ভারত, চীন, ফ্রান্স, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে অনেক ভবনে এরই মধ্যে জালির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। চীনের ফোসান শহরের টাইমস আইসিটি কমপ্লেক্স, ফ্রান্সের ক্যাপ ডি অ্যাজের নাকারা হোটেল, স্পেনের কর্ডোবা হাসপাতাল, আবুধাবির আল-বাহর টাওয়ারে ব্যবহার করা হয়েছে জালি। যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আয়শা বাতুল বলেন, ভবনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। তিনি বলেন, জালির কারণে ভবনের বাসিন্দারা শীতল ও আরাম অনুভব করেন।

আধুনিক স্থাপনা ভারতের গুরুগ্রামে সেইন্ট এন্ড্রু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের ছাত্রাবাসে জালির অসাধারণ ব্যবহার দেখা গেছে। স্পেনের মাদ্রিদে হিসপাসাত স্যাটেলাইট কন্ট্রোল সেন্টারেও ব্যবহার করা হয়েছে জালি। এভাবে আধুনিক শীতাতপ যন্ত্রের যুগে আবার ফিরে আসছে ৪০০ বছর আগের সেই জালি। সূত্র :বিবিসি।