বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদরদপ্তর। ইইউ নেতারা ব্রাসেলসের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে তাঁদের মঞ্চ বানিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সৃষ্টি করা পশ্চিমা যুদ্ধের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁরা 'শান্তি'র নামে বিশ্বকে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছেন অথচ ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ এমনটি সমর্থন করে না। নেতাদের ইচ্ছার বিপরীতে সাধারণ ইউরোপীয়রা মনে করে, ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনে কিছু ত্যাগ করে শান্তি ফেরানো উচিত। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক উদ্দীপিত এই সংঘাতে আর যাই হোক, ইউক্রেনের মানুষ কোনোভাবেই উপকৃত হচ্ছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ নাগরিকদের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়। নিত্যদিনের সংগ্রামের বিপরীতে মূল্যবোধের সবক তাদের কোনো কাজে আসছে না। তাদের নেতারা খরচ করে যাচ্ছেন বটে কিন্তু তাতে নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। যদিও তাদেরই পকেট খালি হচ্ছে। এ বিষয়টিই ইউক্রেনে অন্তহীন সংঘাতের কারণ। দেশ হিসেবে ইউক্রেন কুখ্যাতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত।
এই সপ্তাহে জাতিসংঘে বক্তৃতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরে অবস্থানরত দেশগুলোর জন্য বলেছেন, আজ যারা নীরবতা পালন করছে তারা নতুন সাম্রাজ্যবাদের কারণেই হয়তো নীরব রয়েছে। মাখোঁ এর পর অন্যায়ের অনুভূতি নিয়ে যেন বলেছেন, যারা খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার নির্বিশেষে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ার কারণে মাশুল দিচ্ছে তাদের এ পরিণতি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তবে বার্তা স্পষ্ট- সাধারণ নাগরিকদের ওপর পশ্চিমা অভিজাতদের দ্বারা চাপানো এ বিষয়টিকে একটি সত্যের মোড়কে আবৃত করা হয়েছে এবং নৈতিকতার বয়ানে চালানো হয়েছে। নাগরিকরা এসব আগে থেকেই শুনে আসছে করোনার কারণে বিধিনিষেধ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আইনের মাধ্যমে। কিন্তু এখন তার পূর্ণাঙ্গ রূপ বাস্তবায়িত হচ্ছে 'ইউক্রেন'-এর নামে।
এখানে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ সামান্যই যে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মূলত 'গ্লোবাল সাউথ' বা লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যারা মূলত রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের বাইরে রয়েছে। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ মূলত তাদের নাগরিকদের কল্যাণেই কাজ করছে। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত নয়। 'গ্লোবাল সাউথ' অঞ্চলের মানুষদের চিন্তাধারা হলো, নিজেদের দেশ ও মানুষের আরও সমৃদ্ধি আনয়ন। একেই ইউরোপীয়রা দেখছে নিজেদের ঝুঁকি হিসেবে! কারণ ইউরোপীয়দের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় করের হার বাড়ছে। তাই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং তাঁর সহকর্মী ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা সবাই এখন ডুবন্ত নৌকায় রয়েছেন। ইউক্রেন যদি এখন বিশ্বের জন্য সমস্যা হয়ে থাকে, সেটি শুধু পশ্চিমা বিশ্বের কারণে।


ইউক্রেনে হামলা চালানোর কথা বলে ইতোমধ্যে রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেইন। তিনি বলেন, আমি এটি স্পষ্ট করে দিতে চাই- এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এই সময়টা আমাদের সংকল্প দেখানোর; সন্তুষ্টি দেখানোর নয়। অধিবেশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান জানান, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করতে কিয়েভ যাবেন। এ সপ্তাহে মেক্সিকো সিটিতে সফরে গেছেন জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিষয়ে অস্বীকার করার কারণে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। এটি জার্মানির জন্য খারাপ বিষয় যে, মেক্সিকো তাদের শিকারের বাইরে চলে যাচ্ছে। অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন রয়েছে বলেই তারা জার্মানিকে গ্যাস সহযোগিতা চুক্তির কথা বলেছে। যদিও আগামী কয়েক বছরেও গ্যাসের এ চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা নেই। গ্যাস সংকটের কারণে জার্মানিতে বিশিল্পায়ন হচ্ছে। সেখানে রেশনিং করতে হচ্ছে। এবং দেশটি তার গ্যাস কোম্পানি ইউনিপারকে জাতীয়করণ করতে বাধ্য হয়েছে।
ইতোমধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলজ তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কারণ, ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক পশ্চিমাদের এড়িয়ে রাশিয়া-চীন নেতৃত্বাধীন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এসসিওতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। সেটা হলে দেশটি পশ্চিমাদের বাইরেও তার স্বার্থ আরও সম্প্রসারিত করে এবং তার ওপর যে কোনো চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবে। শুলজ বলছিলেন, এ বিষয়টিতে তিনি একেবারেই বিরক্ত। তবে তিনি এটাও বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি যে, স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সফল হবে বলে মনে হয় না। অন্য কথায় তিনি বলেছেন, আমি বিষয়টি পছন্দ করি না। তবে যতক্ষণ না আপনি পশ্চিমা আদর্শের জাহাজকে ডোবানোর বিষয় থেকে সরে না আসছেন ততক্ষণ তা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে জার্মান চ্যান্সেলরের উচিত ছিল সাধারণ জার্মানদের কথা চিন্তা করা। সাধারণ জার্মানরা এটা নিয়ে বিরক্ত যে, চ্যান্সেলর তাদের দেশের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি অধিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধে অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও এই সপ্তাহে জাতিসংঘের অধিবেশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন জ্বালানিকে ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বাস্তবে এরা হলো ইউরোপীয় অভিজাত শ্রেণি, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যাদের নীতি নাগরিকদের নানা সমস্যায় ফেলছে, যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানুষ এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়- সংকট আসলে পুতিনের হাতেই তৈরি। তবে সেখানে সাম্প্রতিক নির্বাচনের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান অবস্থানের বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিচ্ছে। যদি মানুষের ইচ্ছা এভাবে অগ্রাহ্য করে তবে তাদের জানা উচিত, এটি তাদের রাজনৈতিক সত্তাকেই ধ্বংস করবে।
রাচেল মার্সদেন: প্যারিসভিত্তিক কানাডিয়ান রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক; আরটি ডটকম থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক