প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতন্ত্র ছাড়া ক্ষমতায় আসার অন্য কোনো উপায় নেই। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীর 'নিয়ম ও প্রবিধান লঙ্ঘন' করে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পদে থেকে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে সব নিয়মকানুন বদলে দেন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। জিয়া নিহত হওয়ার পর এরশাদও একইভাবে ক্ষমতায় আসেন। সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসার এখন আর কোনো সুযোগ নেই। আমরা গণতন্ত্র সুরক্ষায় কঠোর আইন করেছি।

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার ভয়েস অব আমেরিকার ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচন ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা দখল করেন। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডে যে গোষ্ঠী জড়িত ছিল, তারা জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান বানিয়েছে। সেনাপ্রধানের পদে থেকে জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানও ঘোষণা করেছেন। এর পর এরশাদও সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় এসেছেন। এখন আর সে সুযোগ নেই। আমরা গণতন্ত্র সুরক্ষায় কঠোর আইন করেছি।
তিনি বলেন, কেউ যদি হত্যাযজ্ঞ, ক্যু বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চায়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। প্রয়োজনে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে। গণতন্ত্র ব্যতীত ক্ষমতায় আসার অন্য কোনো উপায় নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচনের পর থেকে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এ লেখা আছে- প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। আমরা সেখানে আরেকটা ধারা যুক্ত করেছি- ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত কাউকে হটিয়ে যদি কেউ হত্যাযজ্ঞ, ক্যু বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চায়, তবে তার শাস্তি হবে।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরে এক কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা এ কষ্ট উপলব্ধি করি। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে আমরাও তাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশ ঘনবসতিপূর্ণ। নানা সংকটও রয়েছে। রোহিঙ্গারা যখন এসেছে তখন তাদের ৪০ হাজার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আমরা তাদের চিকিৎসা ও সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করেছি। এতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। করোনার সময় আমরা রোহিঙ্গাদের ভ্যাকসিনও দিয়েছি। কিন্তু দিনশেষে আমাদেরও তো সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, বনভূমি উজাড় করে তাদের বাসস্থান তৈরি করতে গিয়ে পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ চাপ সামলানো আমাদের জন্য এক প্রকার বোঝা। তাই আমরা বলেছি, রোহিঙ্গাদের এখন নিজ দেশে ফিরতে হবে।
মানবাধিকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার শুধু মানবাধিকার রক্ষা করেনি; মানবাধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তা সংরক্ষণও করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি মানবাধিকার কমিশন রয়েছে এবং তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করে থাকে।
নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) যাতে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে পারে, তার জন্য তাঁর সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি বলেন, তাঁরা নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করেছেন এবং আইন অনুযায়ী কমিশন গঠিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দল আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। তখন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারে না। সরকারপ্রধান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় কারসাজি করেছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিজেদের লোক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স ২ বছর বাড়িয়ে সংশ্নিষ্ট আইন সংশোধন করেছিলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সংগ্রামের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে বলে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে তাঁরা কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেবেন না।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন আমি ক্ষমতায় আসি তখন দেশে একটি টেলিভিশন, একটি রেডিও ও সামান্য কয়েকটি পত্রিকা ছিল। আমরা গণমাধ্যমে বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্তি উন্মুক্ত করে দিলাম। এখন দেশে ৪৪টি টেলিভিশনের অনুমোদন আছে এবং ৩২টি চালু আছে। এসব চ্যানেলের টকশোতে বক্তারা সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা করছেন। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে নানা কথা বলছেন তাঁরা। সব কথা বলার পর কেউ যদি বলেন- আমাকে কথা বলতে দিল না, তার কী জবাব আছে?
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে ১৯ বার ক্যু হয়েছে। আরও কয়েকবার ক্যু-এর চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ কথা বলতে পারত না। মতপ্রকাশের অধিকার ছিল না। এখন মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে।