রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণের চারটি অঞ্চলের গণভোট নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কিয়েভ। তারা এ গণভোটকে 'মূল্যহীন' বলে মন্তব্য করেছে। বুধবার কিয়েভ জানায়, তারা ওই চার অঞ্চল পুনরুদ্ধারে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। একইসঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায় তারা। ইউরোপ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, মস্কোকে পরিণতি ভোগ করতে হবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা দেবে ইউরোপ। অপরদিকে রাশিয়া বলছে, তারা পুরো দোনেৎস্ক দখলে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির প্রশ্নে পাঁচ দিনব্যাপী এ গণভোট মঙ্গলবার শেষ হয়। এতে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্ক, লুহানস্ক এবং দক্ষিণ অঞ্চলের খারসন ও জাপোরিঝিয়ার ৪০ লাখ মানুষ ভোটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এ জনসংখ্যার সিংহভাগই রুশ ভাষাভাষী। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে ভোটে বিজয়ের ঘোষণা আসতে পারে। এতে অঞ্চলগুলো রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হবে। একই প্রক্রিয়ায় ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

গণভোট নিয়ে মস্কোর কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে তিনি বলেন, এ ভোটের পর মস্কোর সঙ্গে কিয়েভের আর আলোচনার আগ্রহ নেই। জেলেনস্কি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই প্রহসনের এ গণভোটের প্রতি রাশিয়ার স্বীকৃতি তথাকথিত ক্রিমিয়া পরিস্থিতির বাস্তবায়ন। এটি ইউক্রেনের ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্তির আরেকটি চেষ্টা। এ বিষয়ে রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্টের (পুতিন) সঙ্গে আলোচনায় বসে লাভ নেই। প্রহসনের নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নিতে সেখানে ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয় বলেও জানান জেলেনস্কি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বন্দুকের নলের মুখে ওই অঞ্চলগুলোর লোকজনকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো এ 'মূল্যহীন' ভোটের নিন্দা জানায়। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে কিয়েভ আরও অস্ত্র সরবরাহের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে রুশ হুমকির মুখে ইউক্রেন আবারও পশ্চিমাদের কাছে অস্ত্র চাইলো।

ইউক্রেনের সাধারণ মানুষও মনে করেন, রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত চার অঞ্চলের ওই গণভোটের বৈধতা নেই। দেশটির রেলকর্মী ডেনিস কচকভ বলেন, এ ভোট 'অবৈধ'। সশস্ত্র বাহিনীর ওপর তাদের আস্থা আছে। শেষ পর্যন্ত তারা জিতবেন। আলজাজিরা জানায়, এ গণভোটের প্রেক্ষাপটে নতুন করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। আর যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তারা 'লজ্জাজনক' এ গণভোটের নিন্দা জানাবে।

গণভোটে রাশিয়ার বিজয়ের বিষয়ে খারসনের রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের প্রশাসক ভদ্মাদিমির সালদো বলেন, ওই অঞ্চলের লোকজন 'রাশিয়ায় যোগ দিতে ভোট দিয়েছেন'। বুধবার ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, দোনেৎস্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে 'সশস্ত্র অভিযান' অব্যাহত রাখবে রাশিয়া। রুশ বাহিনীর দাবি, তারা দোনেৎস্কের লিম্যান শহরে ইউক্রেনীয়দের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছেন। এতে কিয়েভের অন্তত ৭০ সেনা নিহত হন। তবে এ নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে যাওয়া রাশিয়ার প্রধান দুটো পাইপলাইনে ছিদ্র হওয়ার ঘটনাকে 'নাশকতা' বলে মন্তব্য করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে এজন্য তারা রাশিয়াকে দায়ী করেনি। নর্ড স্ট্রিম-১ পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করে রাশিয়া। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডের লেয়ন বলেন, গ্যাস সরবরাহে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিঘ্ন ঘটানোর 'সম্ভাব্য কড়া জবাব' দেওয়া হবে। তবে ইউক্রেন এটাকে 'সন্ত্রাসী আক্রমণ' হিসেবে উল্লেখ করে রাশিয়াকে দায়ী করেছে। এরইমধ্যে রাশিয়াও এ ঘটনাকে 'নাশকতা' বলেছে।

ওয়াশিংটনের চাপের মুখে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেন কমিয়েছে তুরস্ক। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের শুরুর পর থেকে ন্যাটো সদস্য তুরস্ককে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে ব্যাংকিং লেনদেন কমাতে চাপ দিয়ে আসছে।