ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব মারা গেছেন। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি দীর্ঘ ৫৫ বছরের বেশি সময় ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসে তিনি শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে উত্তরপ্রদেশের মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি হন। গত জুলাইয়ে স্ত্রীকে হারান তিনি। এরপর থেকেই উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ‍মুলায়স সিংয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। গত দেড় মাস ধরে ওই হাসপাতালের প্রাইভেট ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন তিনি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি তাঁর মূ্ত্রনালীতে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। ধারাবাহিক চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। গত রোববার হঠাৎ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নেওয়ার পরও ধারাবাহিকভাবে তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে আজ সকালে তার মৃত্যু হয়। 

তাঁর মৃত্যুর খবর জানিয়ে সমাজবাদী পার্টির সভাপতি ও তার ছেলে অখিলেশ যাদব বলেছেন, ‘আমার শ্রদ্ধেয় বাবা এবং সকলের নেতা আর নেই।’বর্তমানে পুরো যাদব পরিবার মেদান্ত হাসপাতালে রয়েছেন।

যাদব ওরফে উত্তরপ্রদেশের জনসাধারণের নেতাজি ১৯৩৯ সালের ২২ নভেম্বর ইটাওয়া জেলার সাইফাইতে জন্মগ্রহণ করেন। শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়েই তাঁর তিন-তিনটি ডিগ্রি রয়েছে। তারপর রাজনীতিতে আসেন এবং তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। ১৯৮৯, ১৯৯৩ ও ২০০৩ সালে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন মুলায়ম।

এর আগে তিনি ১৯৬৭ সালে উত্তরপ্রদেশের যশবন্ত নগর থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে প্রথমবারের মতো বিধানসভায় পা রাখেন। তারপর থেকে তিনি তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বার বার বিভিন্ন কারণে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় এসেছেন। তিনি আটবার বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং সাতবার নির্বাচিত হয়ে লোকসভা সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে যুক্তফ্রন্ট জোট সরকারেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পান। শেষ লোকসভা ভোট অর্থাৎ ২০১৯ সালেও মইনপুরী থেকে সংসদ সদস্য হন তিনি। ভারতের সবথেকে বৃহৎ এবং জনবহুল রাজ্যের এই নেতার আচমকা নেওয়া একাধিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বার বার বদলে দিয়েছে ভারতের রাজনৈতিক গতিপথ। 

১৯৭৭ সালে তিনি জনতা পার্টি থেকে প্রথমবারের মতো উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী হন। এরপর ১৯৮৯ সালে তিনি প্রথমবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৯২ সালে তিনি সমাজবাদী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৯৩ সালে বিএসপির সঙ্গে সরকার গঠন করেন। এরপর ১৯৯৩ এবং তারপর ২০০৩ সালে তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর আগে ছেলে অখিলেশ যাদবের হাতে ছেড়ে যান দলের দায়িত্ব। 

মুলায়ম সিং যাদবের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বহুজন সমাজ পার্টির সুপ্রিমো মায়াবতী তাঁর শোকবার্তায় জানান, ‘সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী মুলায়ম সিং যাদব জি’র মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক খবর। তার পরিবার এবং সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। প্রকৃতি যেন তাদের এই দুঃখ সহ্য করার শক্তি দেয়।’

প্রবীণ নেতার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তার মৃত্যুর পরে এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করে বলেন, ‘আমরা যখন আমাদের নিজ নিজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি তখন মুলায়ম সিং যাদব জি’র সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘনিষ্ঠ মেলামেশা অব্যাহত ছিল এবং আমি সবসময় তাঁর মতামত শোনার জন্য উন্মুখ থাকতাম। তাঁর মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করেছে। তাঁর পরিবার ও লক্ষ লক্ষ সমর্থকের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। ওম শান্তি।’

সমাজবাদী পার্টি সূত্রে খবর, গুরুগ্রামের হাসপাতাল থেকে লখনউতে নিয়ে যাওয়া হবে মুলায়মের মরদেহ৷ সমাজবাদী পার্টির সদর দপ্তরেও তাঁর মরদেহ রাখা হবে৷ ধারণা করা হচ্ছে, মুলায়মের পৈতৃক গ্রামেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে৷

তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু থেকে রাজনাথ সিং, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।