প্রেষণে এসে অর্থ আত্মসাতে শাস্তি পেয়েছেন। এরপর ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মূল প্রতিষ্ঠানে ফেরত পাঠানো হয়। ফের প্রেষণে এসে অপরাধের তথ্য লুকিয়ে চাকরিতে আত্তীকরণে সফল হন। পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন। এতেই থেমে থাকেনি অনিয়ম। অপরাধ ঢাকতে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিয়েছেন। এভাবে আর্থিক অনিয়ম ও অফিস শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ বারবার করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও রাজস্ব) স্বপন কুমার বিশ্বাস।

তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কাজে বাধা, কমিটির সদস্য ও সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া এবং হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলেও স্বপন কুমারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না এসজিসিএল কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদন আবার যাচাই-বাছাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। স্বপনের আগের কর্মস্থল ছিল গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এবং সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে  এসব তথ্য জানা গেছে।

গত জানুয়ারিতে স্বপন কুমারের নামে অর্থ আত্মসাৎসহ আটটি অভিযোগ পেট্রোবাংলায় জমা পড়ে। সুন্দরবন গ্যাস দেখভালের দায়িত্বে থাকা পেট্রোবাংলার সদ্য সাবেক পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ অভিযোগ তদন্ত করার নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী গত ২৭ জানুয়ারি কমিটি গঠন করে এসজিসিএল কর্তৃপক্ষ। গত আগস্ট মাসে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং প্রতিবেদনটি আরও যাচাই-বাছাই করতে গত ২০ অক্টোবর তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, স্বপন কুমারের অপরাধ ধামাচাপা দিয়ে পদোন্নতির সুযোগ দিতেই কালক্ষেপণের জন্য আবার কমিটি করা হয়েছে।

এর আগে আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ সমকালকে বলেছিলেন, সংশ্নিষ্টদের প্রতিবেদন অনুসারে স্বপন কুমারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। প্রথম তদন্ত কমটির আহ্বায়ক তৌহিদুর রহমান বলেন, তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে দেওয়া আছে। এসজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল আহমেদকে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল করে এবং এসএমএস দিয়েও সাড়া মেলেনি। মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নাজমুল হাসান জানান, বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। নতুন কমিটির আহ্বায়ক প্রদীপ রঞ্জন কুণ্ডু বলেন, তাঁরা নির্দেশনা অনুসারে কাজ করছেন। তবে স্বপন কুমার তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সেটি অফিশিয়াল বিষয় বলে এ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।

অর্থ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণ: সূত্র জানায়, স্বপন কুমার জিটিসিএল থেকে ২০১৫ সালে প্রেষণে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিতে ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন। সে বছরই ভোলায় কর্মরত থাকা অবস্থায় আর্থিক অনিয়ম ও অফিস শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজে জড়িয়ে পড়েন। ভ্রমণের তারিখ ও টাকার অঙ্ক পরিবর্তন, বিল ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিবেদন ছিঁড়ে ফেলা এবং এক দিন ভাড়া গাড়ি ব্যবহার করে দুই দিনের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এক সদস্যবিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন এসজিসিএলের তৎকালীন কর্মকর্তা এমএম রেজাউল ইসলাম। ওই প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুসারে স্বপন কুমারের দুটি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করে মূল কোম্পানি জিটিসিএল। পরে তিনি আপিল করলে লঘু শাস্তি হিসেবে তাঁকে তিরস্কার করা হয়। পরের বছরই তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। আউটসোর্সিংয়ের ঠিকাদার মেসার্স জেরিন সিকিউরিটি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির হোসেনের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ২০১৬ সালের নভেম্বরে জমা দেওয়া হয়। কোম্পানির এমডিসহ কর্মকর্তাদের হেনস্তার অভিযোগেরও সত্যতা পায় কমিটি। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন এসজিসিএলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড মার্কেটিং) প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা। এই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। অনিয়মের কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে মূল প্রতিষ্ঠান জিটিসিএলে ফেরত পাঠানো হয়।

তথ্য গোপন করে আত্তীকরণ: সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে তদবির করে সুন্দরবন গ্যাসে ফেরত আসেন স্বপন কুমার। এ সময় আগের শাস্তি ও মূল কোম্পানিতে ফেরত যাওয়ার তথ্য গোপন করেন তিনি। তথ্য গোপন করে এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই এসজিসিএলে তাঁর আত্তীকরণ সম্পন্ন হয়। এরপর তিনি উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান। এই আত্তীকরণ ও পদোন্নতিতে অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বপন কুমার উপমহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও রাজস্ব) পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ভোলায় অনুষ্ঠিত রেভিনিউ সফটওয়্যার-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের কোর্স পরিচালক ছিলেন। প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত বুয়েটের সিনিয়র প্রোগ্রামার ফজলে রাব্বির সম্মানী হিসেবে উত্তোলন করা ৭২ হাজার টাকার মধ্যে ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেন স্বপন কুমার। এ নিয়ে অভিযোগ উঠলে দীর্ঘদিন পর প্রশিক্ষককে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণ চলাকালে স্বপন কুমার পাঁচ দিনের সম্মানী নিয়েছেন। তবে সম্মানী প্রাপ্তির রসিদ ও অফিসের হাজিরা খাতার তারিখের মধ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। এদিকে প্রশিক্ষকের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে কোনো অর্থ দেওয়ার কথা ছিল না। কর্ণফুলী গ্যাসে বুয়েট কর্তৃপক্ষ কোনো ফি ছাড়াই এ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাই এসজিসিএলের তহবিল থেকে প্রশিক্ষককে দেওয়া ৮০ হাজার টাকা অনর্থক খরচ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে কমিটি।

সাক্ষ্যদাতাদের হুমকি: তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বপন কুমার তদন্ত কমিটিকে কোনো সহযোগিতা করেননি। উল্টো তদন্ত চলাকালে অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়া কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়েছেন। তদন্ত কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে আপত্তিজনক অভিযোগ করেছেন।

অন্যের ই-নথিতে অনুপ্রবেশ করে বিল উত্তোলন: স্বপন কুমার তাঁর অধীন সহকারী হিসাব কর্মকর্তা জাকিয়ার হোসেনের ই-নথিতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে আউটসোর্সিং কর্মী এনামুল হকের মাধ্যমে ইফতার বাবদ দুই হাজার টাকার নথি উত্থাপন করেন। নিজে (স্বপন) সেই নথি অনুমোদন করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে টাকা তুলে তা আত্মসাৎ করেন। আরেক কর্মকর্তা সহকারী ব্যবস্থাপক তাওহীদুল ইসলামকে দিয়ে ২০২১ সালের ১৩ জুলাই অর্থ শাখার কর্মকর্তাদের নামে অ্যাপায়নের ভুয়া বিল দেখিয়ে ৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন।

বিষয় : সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড এসজিসিএল গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড

মন্তব্য করুন