ইউক্রেনের আঞ্চলিক বাণিজ্যিক নগরী খেরসন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে পিছু হটলেও ওই অঞ্চলটিতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ জীবনযাপনের সব ধরনের সুবিধা ধ্বংস করে গেছে রুশ বাহিনী। শুধু ওই এলাকা নয়, গত কয়েক সপ্তাহের টানা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাই ধ্বংস করে ফেলেছে মস্কো। ফলে এই শীত মৌসুমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় সেসব এলাকায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে। যে কারণে অন্তত ৩০ লাখ বাসিন্দাকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরই মধ্যে খেরসন থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল এলাকায় সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে কিয়েভ। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়- এমন এলাকাগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে ইউক্রেনের সরকার। গত সোমবার রাতে খেরসন থেকে বাসিন্দাদের ট্রেনে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে রাজধানী কিয়েভে। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশচুক টেলিগ্রামে বলেছেন, মাইকোলাইভ শহর থেকেও বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ সময় তিনি বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের সরকারের বিনামূল্যের পরিবহন এবং আশ্রয় সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা ধারণা করছেন, এখনও খেরসনে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ রয়েছে। যুদ্ধের আগে ওই অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দা ছিল।

ইউরোপে নিযুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হ্যান্স ক্লুজ আগামী কয়েক মাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এখন এক কোটি ইউক্রেনীয় বিদ্যুৎহীন। দেশের অর্ধেক বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রবল শীতে অনেকের মৃত্যুও হতে পারে। এই কর্মকর্তার ধারণা, শীতে গরম ও নিরাপত্তার খোঁজে ২০ থেকে ৩০ লাখ ইউক্রেনীয় বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে মানুষের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে। গত ফেব্রুয়ারিতে হামলা শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৭৮ লাখের বেশি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ইউক্রেন থেকে অন্যত্র চলে গেছে। এ ছাড়া আরও কয়েখ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে, তবে তারা দেশ ছেড়ে যায়নি। গত সোমবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনি দিনের আলো কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ক্লুজ আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ ঘাটতি বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। মানুষকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিতে অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া শীতে করোনাভাইরাস ও মৌসুমি ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত শুধু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত স্থাপনায় অন্তত ৭০০ হামলা চালানো হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে খেরসন থেকে পিছু হটার সময় হাসপাতাল ও ফার্মেসির পাশাপাশি মুদি দোকানগুলোও ধ্বংস করে গেছে রুশ সেনারা। তারা অনেক বাসিন্দাকে খাবার এবং ওষুধ পর্যন্ত দেয়নি।

এদিকে খেরসনে হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণ করে রুশ সেনা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে এক সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে ওই অঞ্চলে চারটি রুশ নির্যাতন কেন্দ্র শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণের পর বেশ কয়েকজন সেনাকে হত্যার অভিযোগ তুলেছে মস্কো।

অন্যদিকে গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় কিয়েভের একটি ঐতিহাসিক রুশ গির্জায় অভিযান চালিয়েছে ইউক্রেন। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ক্রেমলিন।