পাকিস্তানের বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া দাবি করেছেন, পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) স্বাধীন হওয়া সামরিক বিফলতা ছিল না। এটা ছিল রাজনৈতিক ব্যর্থতা।

বুধবার রাওয়ালপিন্ডিতে সামরিক বাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। বাজওয়া এ দাবি করলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি এবং যুদ্ধ চলাকালে সামরিক স্বৈরশাসকরা পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন। বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ক্ষমতাসীন ছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

আলজাজিরা ও ডনের খবরে বলা হয়, আগামী মঙ্গলবার অবসরে যাচ্ছেন জেনারেল বাজওয়া। দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে সেনাপ্রধান হিসেবে সম্ভবত এটিই ছিল জনসমক্ষে তাঁর শেষ বক্তৃতা। ভাষণে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে পাকিস্তান সেনাপ্রধান বলেন, তিনি এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান, যা পাকিস্তানের মানুষ সাধারণত এড়িয়ে যান। আর বিষয়টি হলো, ১৯৭১ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে সেনাদের (পশ্চিম পাকিস্তানের) আত্মসমর্পণ।

জেনারেল বাজওয়া বলেন, 'আমি একটা তথ্য সংশোধন করে দিতে চাই। প্রথমত, পূর্ব  পাকিস্তান (বাংলাদেশ) হাতছাড়া হওয়া সামরিক নয়, ছিল রাজনৈতিক ব্যর্থতা। লড়াইরত সেনার সংখ্যা ৯২ হাজার ছিল না, বরং এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪ হাজার। বাকিরা ছিলেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন।'

বাজওয়া বলেন, এই ৩৪ হাজার সেনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর আড়াই লাখ সেনা এবং মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষিত ২ লাখ যোদ্ধার বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁরা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন এবং নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। পাকিস্তান সেনাপ্রধান বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে লড়াই করা সেনাদের এ ত্যাগ দেশে স্বীকৃতি পায়নি, যা ছিল মহা অন্যায়।

অনুষ্ঠানে জেনারেল বাজওয়া গত সাত দশকে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়টি স্বীকার করেন। এ হস্তক্ষেপকে তিনি 'অসাংবিধানিক' বলেও মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ভুল করা ও দাম্ভিক আচরণের জন্য রাজনীতিকদেরও সমালোচনা করেন বিদায়ী সেনাপ্রধান।

সেনাপ্রধান বলেন, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ গত বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর পর সামরিক বাহিনী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে এবং রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। জেনারেল বাজওয়া বলেন, 'আমি আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা এ সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে মেনে চলছি এবং তা অব্যাহত রাখব।'

তবে বিশ্নেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জেনারেল বাজওয়াই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করেছেন। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছেন।

ভাষণে বাজওয়া বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ভুলের কারণে দেশ সমস্যার মধ্যে পড়েছে। এসব ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা জরুরি। ৬২ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০১৬ সাল থেকে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ ৬ লাখ সদস্যের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন। ২০১৯ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর মেয়াদ তিন বছর বৃদ্ধি করেন।

বাজওয়া স্বীকার করেন, রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণের সেনাবাহিনীর সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অমার্জিত শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করে দেন তিনি।

নতুন সেনাপ্রধান আসিম মুনির :পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনিরকে বেছে নিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ব্যাপক জল্পনা ও গুজবের অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার দেশটির সাবেক সামরিক গোয়েন্দাপ্রধানকে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী পদে নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এ নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে দেশটির সেনাবাহিনী। মুনিরের নিয়োগ পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও অর্থনীতি, প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের পাশাপাশি চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, মুনিরের নাম প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার। প্রেসিডেন্ট আলভি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের মনোনয়নে নির্বাচিত। তিনি এ নিয়োগ অনুমোদন করবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়।