বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জুলিয়েটা ভ্যালস নয়েস। বাংলাদেশ সফরকালে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনসহ পুনর্বাসন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করবেন জুলিয়েটা। বলা হচ্ছে, জুলিয়েটার এই সফর বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। 

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে মিয়ানমারে নৃশংস সামরিক দমন-পীড়নের কারণে পালিয়ে আসা ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকট এড়াতে সাহায্য করেছে। এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সহজ কাজ ছিল না। তবুও আমরা উদারভাবে আমাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছি। আমরা আর্থিকভাবে, পরিবেশগত দিক থেকে এবং নিরাপত্তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো কপবাজারের শরণার্থী শিবিরে যেন নিরাপদ জীবন পেতে পারে সেজন্য সরকার কঠোর পরিশ্রম করছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন চুক্তি সই করার পর ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য কিছু করেনি এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাও দুঃখজনক। আবার ২০১৮ সালে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এখনও সেটি নিশ্চিত করতে পারেনি। 

কপবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি, মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সংঘর্ষ, সেইসঙ্গে কপবাজার শরণার্থী শিবির এলাকায় পরিবেশগত অবক্ষয় মোকাবিলা করতে সরকার রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা তৈরি করেছে। কিন্তু তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা হতাশাজনক। এমন পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের রোহিঙ্গা পুনর্বাসন করার ঘোষণা আশাবাদ জাগাবে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা দেখাবে এবং বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে প্রত্যাশা করা যায়। 

সমকালে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র পরিবারভিত্তিক অর্ধশত রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছে। শুরুতে পাইলট ভিত্তিতে কিছু রোহিঙ্গা নিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত এর উদ্দেশ্য প্রক্রিয়াটি সহজ করা। একবার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও চাহিদা আসবে। এর আগে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমারের গণহত্যার পঞ্চম বছরপূর্তি উপলক্ষে এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত পারিবারিক পুনর্মিলনের আওতায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোহিঙ্গা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে কানাডাও প্রস্তাব দিয়েছে। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটে ১৯০ কোটি ডলারের বেশি সহযোগিতা করেছে দেশটি। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে ৬০০ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের আওতায় নেওয়া সংখ্যাগত দিক থেকে বড় কিছু না হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। 

এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাতে যথাশিগগির নিরাপদে তাদের নিজ ভিটায় ফিরে যায়, তেমন কূটনীতিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য কমিটি গঠন এবং এর আগে সম্পাদিত চুক্তির আন্তরিক বাস্তবায়ন দেখতে উন্মুখ। একদিকে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর রোহিঙ্গা নীতিতে মৌলিক মানবিক পরিবর্তনের কোনো বিশ্বাসযোগ্য ইঙ্গিত এখনও আমরা পাইনি। অন্যদিকে দেশটির জনগণকে বিপদে না ফেলে শাসকগোষ্ঠীর বিবেকহীন অপরাধী অংশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ বা চাপ সৃষ্টি করার কোনো লক্ষণও নেই। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্রোত এখনও চলমান রয়েছে। এ কারণে এই প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক যে, বাংলাদেশের সঙ্গে শরণার্থী প্রত্যাবাসন চুক্তি কি তাদের কৌশলগত উদ্যোগ? অথবা আদৌ কি তারা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে আন্তরিক?

চলতি বছরে সেপ্টেম্বরে টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধীরে ধীরে মিয়ানমারের নতুন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে বিশ্ববাসীর সামনে রোহিঙ্গা সমস্যার গভীরতা আবার নতুনভাবে হাজির হবে। রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বাস্তব পদক্ষেপ ও প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার। এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে কার্যকর আলোচনা করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমস্যা নয়- এটি মানবিক এবং বৈশ্বিক এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।