ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পাকিস্তানে নির্বাচন

ইমরান খান কীভাবে চমক দেখালেন

ইমরান খান কীভাবে চমক দেখালেন

ছবি- এপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২২:৫১

পাকিস্তানের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দেশটির জাতীয় নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাতে লাহোরে তাঁর দলের প্রধান কার্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়ান। এ সময় আতশবাজি ফুটিয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে থাকেন প্রায় দেড় হাজার সমর্থক। তখন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) সমর্থকদের তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা কি আমাকে ভালোবাসেন?’ সঙ্গে সঙ্গে সবাই জবাব দেয়– ‘আমরা আপনাকে ভালোবাসি!’ কিন্তু এই যে সমর্থন, এর অনেকটা বিপরীত চিত্র দেখা গেছে নির্বাচনের ফলে।

ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে পিএমএলএনের বিজয় সুনিশ্চিত বলে উল্লেখ করেছিলেন বিশ্লেষকরা। তারা বলেছিলেন, ৭৪ বছর বয়সী নওয়াজকে দেশ শাসনে আরেকবার সুযোগ দেবে জনগণ। এর আগে সেনাবাহিনীর রোষানলে পড়লেও এবারের নির্বাচনে তাঁর পক্ষে জেনারেলদের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়।

নওয়াজ ও পিএমএলএন– নিজেদের জয়ের ব্যাপারে প্রবল আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এর প্রমাণও পাওয়া যায় তাদের কর্মকাণ্ডে। কারণ, ভোট শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় নওয়াজের একটি বিজয়ী ভাষণ রেকর্ড করে ফেলে তাঁর সমর্থকরা। তাদের এই বক্তৃতা রেকর্ডিংয়ের পর যখন ফল প্রকাশ হতে শুরু করে, তখন ভিন্ন চিত্র দেখতে পান সমর্থকরা। এতে হাতাশা বাড়তে থাকে তাদের মাঝে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মজিদ নিজামী বলেন, ‘ফল প্রকাশ শুরুর পরপরই চরম হতবাক ও বিস্মিত হয়েছে দলটির নেতাকর্মীরা। তারা হিসাব মেলাতে পারছিল না। যে কারণে পরবর্তী প্রায় ১২ ঘণ্টা সম্পূর্ণ নীরব ছিল পিএমএলএন। নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি কোনো উল্লাস করতেও।

শুক্রবার নওয়াজ সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নিজের বিজয় দাবি করেছিলেন। কিন্তু এও স্বীকার করেন, তাঁর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য সরকার গঠনে অন্য দলের সঙ্গে জোট করতে হবে। 

লাহোরের বিশ্লেষক নিজামী বলেন, দলটি যে রকম ফল আশা করেছিল, তা হয়নি। তারা ভেবেছিল, পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে ৮৫ শতাংশের বেশি আসন পাবে। কিন্তু ফলে দেখা গেছে– অর্ধেক আসনই হাতছাড়া হয়ে গেছে নওয়াজের দলের। 

পিএমএল-এনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পাঞ্জাবের বাকি আসনগুলোর প্রায় সব ক’টিই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত প্রার্থীদের হাতে চলে যায়। অথচ এই দলটিকে নিঃশেষ করতে নানা রকম কূটজাল ফেলা হয়েছিল।

ভোটের আগে গণমাধ্যম থেকে ইমরান ও তাঁর দলকে মুছে ফেলে পাকিস্তান সরকার। ফলে পিটিআই টিকটকসহ অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালায়। সমাবেশে বাধা দিলে অনলাইনে ভার্চুয়াল সমাবেশের আয়োজন করে তারা। এতে যোগ দেয় বিপুল সংখ্যক সমর্থক। এর পর যখন ইমরানকে কারাগারে পাঠানো হলো– তখন তাঁর সমর্থকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাঁর কণ্ঠস্বর অনুকরণে বক্তৃতা তৈরি করে তা ব্যাপকভাবে প্রচার চালায়, যা পৌঁছে যায় দেশে লাখ লাখ মানুষের কাছে। এতে অভূতপূর্ব সাড়া দেয় যুবসমাজ। এর সুফল উঠে আসে ব্যালটে।

আসলে কী ভুল ছিল নওয়াজ ও তাঁর দলের? ফল ঘোষণা শুরুর তিন দিনের মাথায় প্রাপ্ত ফলে পিএমএলএন জাতীয় পরিষদে ৭৫টি আসন পায়। যেখনে ইমরানের পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ১০১টি আসনে।  

অবশ্য পিটিআই নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করেছে। দলটির দাবি, তাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠেকানেরা জন্য নওয়াজ ও পিএমএলএনকে সুবিধা দিতেই ভোট ‘চুরি’ করা হয়েছে।

এই যখন নির্বাচনী ফল, তখন একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ২০২২ সালের প্রথম দিকে পিটিআইর চেয়ে জনপ্রিয়তায় জনমত জরিপে এগিয়ে ছিল পিএমএলএন। কিন্তু এখন কেন এমন দশা? 

লাহোরভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক বদর আলম বলেন, নির্বাচনে পিএমএল-এনের হতাশাজনক পরিস্থিতির শরুটা আরও দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালে। যখন ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

এর পর নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর থেকেই মূলত চিত্র পাল্টাতে থাকে। নওয়াজ একাধিক দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে নিজেই নির্বাসনে ছিলেন। ইমরান সরকারের পতনের জন্য তাঁর দল দেশটির অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পিডিএম নামে জোট গঠন করে। এতে তারা সফলও হয়েছে। 

বদর আলম আরও বলেন, ‘নওয়াজের ভাই শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার কষ্টের দিকে মনোযোগ না দিয়ে ভাইকে দেশে ফেরানো এবং তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার দিকে মনোযোগ দেন।’ 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান ঘানি বলেন, ‘শাহবাজ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দেশে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, যা তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকসহ সব মানুষকেই কষ্টে ফেলে।’ 

শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, নওয়াজ ও শাহবাজদের পারিবারিক শাসনে হতাশ হয় মানুষ।

নির্বাচনের তিন মাস আগে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন নওয়াজ। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার হয়েছে সেনাবাহিনীর ইচ্ছায়। অন্যদিকে ইমরানকে দুই শতাধিক মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। কারাবন্দি অবস্থায়ই তাঁর দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দমন-পীড়নের মাঝেও জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়েছে।

বিশ্লেষক ঘানি আরও বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি নির্যাতিত হয়, তখন তাদের সমর্থন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পিএমএল-এন এটা বুঝতে পারেনি। এদিকে, দেশটিতে যে যুবসমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে– তা এই নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

সূত্র: আলজাজিরা ও নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন

×