সাক্ষাৎকার: বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি

সহজে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করব

 প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 শেখ আবদুল্লাহ

রফতানি আয় বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পায়নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ জন্য উদ্যোক্তারা যাতে সহজে নতুন শিল্প স্থাপন করতে পারেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সে বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। রফতানির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি ও নতুন পণ্যের উদ্ভাবনেও এগিয়ে আসবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি তার এসব ভাবনা তুলে ধরেন। তিনবারের এই সংসদ সদস্য এবারই প্রথম মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন। এর আগে তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান। রাজনীতির পাশাপাশি টিপু মুনশি স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে তার।

তিনি বলেন, রাতারাতি সবকিছু হয়ে যাবে, তা নয়। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো যাতে সহজে ও সময়মতো অর্জন হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সে কাজ করবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা অবশ্যই থাকবে। তবে সবার আগে সহজে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও বিনিয়োগ করার পরিবেশ সৃষ্টিতে জোর দেওয়া হবে। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র সৃষ্টি করাও সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, সহজে ব্যবসা করার সূচকে (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখন দেখছে, কেন বাংলাদেশ পিছিয়ে এবং কোথায় কী কাজ করলে এর উন্নতি হবে। এ সূচকের উন্নয়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সেবা আরও দ্রুত ও সহজে পাবেন গ্রাহকরা। পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে যাতে সহজে সেবা পাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার বিনিয়োগ ও রফতানি আয় বাড়াতে চায়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। সরকারের এ লক্ষ্য অর্জনে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই বাণিজ্য বাড়ানো হবে। এখন বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে রফতানি বহুমুখীকরণে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও যাতে রফতানি আয় বৃদ্ধি পায়, সে চেষ্টা করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'আমি যখন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলাম, তখনও তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় চাইতাম। এখনও চাই। কারণ, তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের রফতানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসে। এ শিল্পের কাজের জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে যেতে হয়। একটা আলাদা মন্ত্রণালয় হলে পোশাক খাতের জন্য কাজ করা সহজ হবে।' প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শনের সময় এ বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী কবে নাগাদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করবেন, তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। আগে সময় নির্ধারণ হোক। তার আগে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। উদ্যোক্তারা সবাই চাইলে এ প্রস্তাব করতে পারি।'

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিতে অগ্রাধিকার সুবিধা (জিএসপি) ফিরে পেতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিএসপি না পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিতে সমস্যা হচ্ছে না। জিএসপি স্থগিত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। তারপরও এ সুবিধা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যেসব শর্ত দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করাসহ অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে জিএসপি ফিরে পেতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই চেষ্টা চলছে। প্রয়োজন হলে লবিস্ট নিয়োগের বিষয়টি ভাবা হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও জিএসপি সুবিধা থাকবে না। তখনকার জন্য মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নিচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু মুনশি বলেন, ইউরোপ বাংলাদেশের বড় বাজার। এখন পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। তবে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য পথে যেতে হবে। সরকার জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্য যা করা দরকার, সেগুলো করবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে সহজে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। ইইউর উদ্যোক্তারা যাতে সহজে ব্যবসা করতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রফতানি বাড়ানোর জন্য সব ধরনের উদ্যোগ থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। সরকার রফতানি আয়ের যে লক্ষ্য নিয়েছে, তা অর্জনের জন্য খাতভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নতুন বাজার সৃষ্টি, নতুন পণ্য রফতানি, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। যেসব খাতে প্রণোদনা দরকার, সেখানে প্রণোদনা দেওয়া হবে। আবার যারা প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার করতে পারছে না, তাদের বিষয়েও ভাবা হবে। মোদ্দাকথা, ছোট ছোট খাত এগিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে। পাশাপাশি রফতানি বাড়ানোর জন্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। যে দেশের সঙ্গে যে ধরনের চুক্তি করলে সুবিধা হবে, সেটাই করা হবে।

তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মূল ফোকাস শিল্পায়ন করা। যাতে কর্মসংস্থান হয় এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। সরকারের লক্ষ্য দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করা। এ লক্ষ্য অর্জনে শিল্পায়নে সবচেয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান যাতে সহজে কাজ শুরু করতে পারে, সে ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে। দেশেই শিল্পের যন্ত্রপাতি তৈরিতে উৎসাহিত করা হবে। ওষুধ, চামড়া, প্লাস্টিক, সিরামিকসহ দেশে বেশ কিছু খাত রয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।