আসছে বাজেট: সাক্ষাৎকার

বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে

 প্রকাশ : ২০ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান মনে করেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো, দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটি। কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ বাড়াতে সহজে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য পুঁজিবাজার বিশেষত বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। গত শনিবার সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মতামত দেন। আসন্ন বাজেট, বিনিয়োগ উন্নয়ন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, রফতানি খাত, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সালমান এফ রহমান বলেন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সাধারণত ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে হয়ে থাকে। উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপন ও পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দরকার হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলোর স্বল্প মেয়াদে নেওয়া আমানতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করতে গেলে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, উদ্যোক্তার ঋণ দরকার ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য অথচ তিনি ঋণ পাচ্ছেন ৫ বছর মেয়াদি। এর মানে, বিসমিল্লাহতেই গলদ থেকে যাচ্ছে। এই কাঠামোগত ত্রুটি খেলাপি ঋণ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। মূল কথা হলো, বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য যথাযথ অর্থায়নের ব্যবস্থা নেই। আগে শিল্পে বিনিয়োগের জন্য শিল্প ঋণ সংস্থা ও শিল্প ব্যাংক ছিল। দুটিকে একসঙ্গে করে বিডিবিএল বানানো হয়েছে, কিন্তু শক্তিশালী করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য দরকার কার্যকর বন্ড মার্কেট ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার। কিন্তু বন্ড মার্কেট এখনও অনেক দুর্বল। এখানে উদ্যোগ নিতে হবে।

অর্থায়নের বাইরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আর কি কি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইর সাবেক এই সভাপতি বলেন, অবকাঠামোর ঘাটতিকে অন্যতম কারণ মনে করা হয়। তবে বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটা দূর হয়েছে। এলএনজি আমদানি শুরুর পর গ্যাসের অবস্থাও ভালো। অন্যান্য অবকাঠামোরও উন্নতি হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের অবকাঠামো-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা কমে আসছে।

তিনি বলেন, অর্থায়নের যে সংকট রয়েছে তার সমাধান করলে প্রচুর বিনিয়োগ আসবে। লোকজন বসে আছে বিনিয়োগের জন্য। এক সময় উদ্যোক্তাদের কাছে পুঁজি ছিল না। প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা পুরোটাই ব্যাংকনির্ভর ছিলেন। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। উদ্যোক্তাদের হাতে ইক্যুইটি হিসেবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা থাকে। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদে পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। আসলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নই বিনিয়োগের অন্যতম বাধা। এ সমস্যার সমাধানে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে। অবকাঠামো অর্থায়নের জন্য ইডকল করা হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগের জন্য ইডকলের মতো কিছু করতে হবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে সালমান এফ রহমান বলেন, বাজেট অবশ্যই বেসরকারি খাতবান্ধব হবে। বর্তমান সরকার বেসরকারি খাতের সহায়ক হিসেবে কাজ করে আসছে। এবারের বাজেটেও বেসরকারি খাতের জন্য অনেক সুবিধা থাকবে। করপোরেট করহার বাড়বে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতদূর তিনি জানেন, কোনো করহার বাড়বে না। করের আওতা বাড়বে। ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন জিনিস হলে যা হয়, ভ্যাট আইনেও তাই হয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রথমে দ্বিধান্বিত ছিলেন। নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে কী হবে এবং কীভাবে আদায় হবে এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কৌতূহল রয়েছে। ব্যবসায়ীরা আগামী অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছেন। আর এনবিআর বাজেটের আগে গোপনীয় কিছু বিষয় প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। তবে এনবিআর বলেছে, কাউকেই আগের চেয়ে বেশি হারে ভ্যাট দিতে হবে না। আবার ভ্যাট দেওয়ার ক্ষেত্রে টার্নওভারের সীমা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, গত দু-তিন বছর ব্যবসায়ীদের সমস্যার জন্য এই আইন বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে এখন বাস্তবায়ন না করে উপায় নেই। নতুন আইন বাস্তবায়নে সমস্যা হলে আলোচনা করে সমাধান করা হবে।

রফতানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক যে সুবিধা পায়, একই সুবিধা অন্যান্য সব রফতানি খাতে দেওয়া হবে। বন্ড সুবিধা, রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা সবাই পাবে। আসবাবপত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, বাইসাইকেল, ওষুধ এবং প্লাস্টিকসহ অনেক খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে পাশে থাকবে।

খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে নতুন নীতিমালা প্রসঙ্গে সালমান রহমান বলেন, মোট হিসাবে ৯৩ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা স্থগিত সুদ হিসাবে (সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট) আছে। পুনঃতফসিলের সময় এই অ্যাকাউন্টে থাকা সুদ মওকুফ হয়। ব্যাংক মামলা করলে সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে থাকা সুদকে আয় খাতে নিতে পারে না। ব্যাংক মামলা করে আসল অর্থ আদায়ের জন্য। মামলায় যদি ব্যাংক ডিক্রিও পায়, তা আসল টাকার পায়। অন্যদিকে আর ৩৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন আছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে নিট খেলাপি ঋণ হচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের দুই শতাংশের একটু বেশি। তবে সব জায়গায় মোট বা গ্রস খেলাপি ঋণকেই বেঞ্চমার্ক ধরা হয়। তিনি বলেন, আইনে আছে একজন গ্রাহক ১০ টাকা নিলে তার কাছ থেকে ৩০ টাকার বেশি আদায় করা যাবে না। কিন্তু দেখা যায়, কেউ ১০ টাকা নিয়েছে, সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে যৌগিক হিসাব বাড়তে বাড়তে তা ১৫০ টাকা হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী তিনগুণের বেশি অর্থ পাওয়া যাবে না, অথচ সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট শুধু শুধু স্ম্ফীত করা হচ্ছে।

সালমান রহমান বলেন, যারা ব্যবসায়িক বা অন্য কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছে, তাদের সুদহারে কিছুটা ছাড় দিলে এবং সময় দিলে অনেকেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই উদ্দেশ্যেই নতুন নীতিমালা করেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়বে। যারা এর সমালোচনা করছেন, তারা অনেক ক্ষেত্রে না বুঝে করছেন। আদালতে খেলাপি ঋণের মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে হাইকোর্টে রিট করে। এতে ব্যাংক যেমন টাকা আদায় করতে পারে না, আবার ওই গ্রাহকও নিজ উদ্যোগে ঋণ পরিশোধ করেন না। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ব্যবসা সহজ করা সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের সূচকে উন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই তাকে বলেছেন, ব্যবসা সহজ করার সূচকে উন্নতি করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ সূচকে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের পেছনে। এটা হতেই পারে না। তিনি আইএফসি ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। দেখা গেছে, এ সূচকে এমসিকিউ জাতীয় যেসব প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে নম্বর ধরা হয়, সেখানে বাংলাদেশের নিজেকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সংস্কার অনেক হলেও উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য ভুলত্রুটির কারণে ভালো নম্বর পাচ্ছে না বাংলাদেশ। উদাহরণস্বরূপ হাতিটি দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করা হয়েছে, কিন্তু লেজটা ধরা রয়েছে। শুধু এই লেজের কারণে বলা হচ্ছে, হাতি ঘরেই রয়েছে। দেখা গেল, কোনো ক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে কিন্তু কোনো নম্বর পায়নি বাংলাদেশ। কেন নম্বর পায়নি জানতে চাইলে আইএফসি বলেছে, ওয়েবসাইটে তো এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। যাই হোক, এসব সীমাবদ্ধতার সমাধান করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ওয়ানস্টপ সেবাসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ পুরোদমে ওয়ানস্টপ সেবা পুরোপুরি চালু হবে। কোম্পানি নিবন্ধন, রাজউকের নিবন্ধন বা অনুমোদনসহ অনেক ক্ষেত্রে সময় ও প্রক্রিয়া কমিয়ে আনা হয়েছে। বিডা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অনেক কাজ করেছে। এখন এসব সংস্কার থেকে নম্বর নিয়ে কীভাবে স্কোর উন্নত করা যায় সেই চেষ্টা চলছে।