শিক্ষক সংগঠনের হালচাল

শিক্ষার মান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে হবে

 প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 সাব্বির নেওয়াজ

'অনেকেই মনে করেন, শিক্ষক সংগঠনগুলো পেশাগত দাবি আদায় নিয়েই ব্যস্ত থাকে; শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন বা মান বৃদ্ধি নিয়ে এসব সংগঠনের খুব একটা ভূমিকা নেই। সরকারের সাক্ষরতাসহ শিক্ষাউন্নয়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচিতেও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার খুব একটা উদ্যোগ দেখা যায় না। কিন্তু শুধু পেশাগত দাবি-দাওয়া নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নেও এসব সংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে এবং তাদের সেই দায়িত্বও পালন করতে হবে।'

সমকালের সঙ্গে কথোপকথনে এসব কথা বলেন প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ। পঁচাত্তর বছরেরও বেশি বয়সী এই নেতা প্রায় অর্ধশতক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষক আন্দোলনের পুরোভাগে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) এই শীর্ষ নেতা রাজধানীর শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। সদস্য ছিলেন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০১০)। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কমিটিতেও তিনি ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবেও।

নিজের সুদীর্ঘ শিক্ষক আন্দোলনের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন কাজী ফারুক সমকালের কাছে। বলেছেন শিক্ষা নিয়ে তার ভাবনার কথা। তার মতে, বর্তমানে শিক্ষকদের অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটছে। শিক্ষক সংগঠনগুলোও শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ।

সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে এই প্রবীণ শিক্ষক নেতা বলেন, শিক্ষক সংগঠন ও আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততা ১৯৭২ সাল থেকে। তার সংগঠনের নাম বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, সংক্ষেপে বাকশিস। এর প্রতিষ্ঠাকাল ২১ ডিসেম্বর ১৯৫৪ কুমিল্লায়। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষক ও বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রিন্সিপাল ইবরাহিম খাঁ, ব্যারিস্টার আলীম আল রাজী প্রমুখ। বাংলাদেশে সংগঠনটিকে সক্রিয় করেন অধ্যাপক এম. শরীফুল ইসলাম। বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থা ও জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কো-আইএলওর শিক্ষক সনদের সঙ্গে পরিচিত করান অধ্যক্ষ এ কে এম শহীদুল্লাহ। কলেজ শিক্ষকদের প্রাচীনতম এ সংগঠন কালের বিবর্তনে ইতিহাসের নানা বাঁক অতিক্রম করে নিজের অবস্থানকে শুধু শক্তিশালীই করেনি, গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিবেচনায় নানা মাত্রিক হয়ে উঠেছে।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, বাকশিসের সহকারী সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সর্বশেষ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন, কেন্দ্রীয় শিক্ষক সংগ্রাম লিয়াজোঁ কমিটি, বাংলাদেশ শিক্ষক সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি, জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের পেশাগত প্রত্যাশা তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছি। তবে বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সাংগঠনিক কাজে আগের মতো সক্রিয় থাকা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও শিক্ষক কর্মচারী সমিতি ফেডারেশন, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পর্যায়ের শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা ও মতবিনিময় নিয়েই এখন সময় বেশি কাটছে।

কাজী ফারুক বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষক সংগঠনের সংখ্যা কম নয়। তবে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকার যে সব শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে, সেগুলোর সংখ্যা খুব বেশি নয়। এ চিত্র আবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পালটায়। মোটা দাগে বলতে গেলে, মূলধারার কয়েকটি সংগঠনই শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রত্যাশা ও পেশাগত সমস্যা নিরসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করে থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষক সংগঠনের কর্মসূচিতেও নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।

অধ্যক্ষ ফারুক বলেন, সাধারণভাবে এ দেশে শিক্ষকদের একটা অংশের মধ্যে এমন ধারণা আছে যে, অন্যান্য দেশে এ পেশার মানুষরা অনেক ভালো অবস্থায় আছেন। আসলে একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের মিল-অমিল খোঁজার কাজটি খুব সহজ নয়। তবে এ কথা বলা সরলীকৃত হবে না যে, অধিকাংশ দেশেই শিক্ষকদের পেশাগত অসন্তোষ বা ক্ষোভ রয়েছে।

শিক্ষকতা পেশার দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরে প্রবীণ এই শিক্ষক নেতা বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশায় সমস্যা অন্তহীন। বেতন-ভাতা ও পদোন্নতিতে মোটামুটি সরকারি খাতের অগ্রাধিকার রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে। তবে স্পষ্ট করেই বলা যায়, বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে, সেখানে বৈষম্য বা বিমাতাসুলভ আচরণ প্রত্যাশিত নয়। মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরে চলে যাচ্ছেন। এসব শূন্যস্থান যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে না। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুকের মতে, মোবাইল ফোন ও ফেসবুক ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ মনে হলেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই স্বচ্ছন্দ বা অভ্যস্ত নয়। বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকের সংখ্যা লাখ দশেক। তাদের একটি ক্ষুদ্রাংশের, যারা মোট শিক্ষকের এক শতাংশের ধারেকাছেও নয়, তাদের অশিক্ষকসুলভ ও গর্হিত অনৈতিক আচরণ পুরো শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষের নয়, শিক্ষক সংগঠনগুলোরও এ ক্ষেত্রে করণীয় আছে। কিন্তু তারা এ দায়িত্ব কতটুকু পালন করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

শিক্ষকদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিন্ন প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে- শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বতন্ত্র কমিশন গঠন এবং সর্বস্তরের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রবর্তন; ১৯৯১-এর পরিবর্তে বর্তমান জাতীয় স্কেলে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা ও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেওয়া; ১০০ টাকা বাড়িভাড়ার পরিবর্তে সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অনুরূপ বাড়িভাড়া অথবা আবাসন সুবিধা প্রবর্তন; প্রচলিত খন্ডিত ভাতা-পেনশনের বদলে সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মতোই পূর্ণ উৎসব ভাতা ও পূর্ণ পেনশন, পদোন্নতি, টাইম স্কেল চালু করা। তিনি বলেন, যোগ্যতার সব শর্ত পূরণ করেও বছরের পর বছর এমপিওবঞ্চিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন এমপিও, অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানকারী বেসরকারি কলেজ ও ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকদের জন্য এমপিও এখন সবার অভিন্ন প্রত্যাশা। প্রতিষ্ঠানের স্তর পরিবর্তন-সংক্রান্ত কোড সংশোধন না হওয়ার অজুহাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বন্ধ হওয়া বেতন দ্রুত চালু হবে, এটাও শিক্ষকদের সবার প্রত্যাশা।

কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ অবস্থান ইতিবাচক ও যুগান্তকারী। তিনি বলেন, বরাদ্দ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার কোথায় কোন খাতে কতটুকু অপচয় হচ্ছে, তা নিরূপণ ও চিহ্নিত করা দরকার।

তিনি মনে করেন, সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করতে হবে, শিক্ষার মান উন্নয়ন অথবা এসডিজির ৪ নম্বর লক্ষ্য রূপায়ণ, শিক্ষানীতি-২০১০-এর বাস্তবায়ন- এসবের কোনোটাই দক্ষ, প্রশিক্ষিত, যুগোপযোগী শিক্ষকের সৃজনধর্মী ফলপ্রসূ ভূমিকা ছাড়া সহজ নয়। আর সহজে শিক্ষকদের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর মাধ্যম হতে পারে শিক্ষক সংগঠন।