শিক্ষক সংগঠনের হালচাল

অবসরপ্রাপ্তদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন

 প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 সাব্বির নেওয়াজ

'দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষকদের বৈষম্য দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এ বৈষম্য দূর করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ ও অবসর বোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ হস্তক্ষেপে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় সংকট অনেকটা নিরসন হয়েছে। তবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।' সমকালের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু। স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক তিনি। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিব হিসেবে।

নিজের সংগঠন সম্পর্কে তিনি জানান, তার শিক্ষক সংগঠন অন্যগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি তথা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সকল স্তরের শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ। এই সংগঠনের মূলনীতি হলো 'শিক্ষা-শান্তি-প্রযুক্তি-প্রগতি'। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী, কেবল তারাই এর সদস্য হতে পারেন। ২০১১ সালে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ গঠিত হয়।

শিক্ষক সমাজের দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরে এই শিক্ষক নেতা বলেন, দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে। নানা ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকায় শিক্ষকদের সমস্যাও বিভিন্ন রকমের। যেমন- কওমি সাধারণত আরবি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা। যদিও বর্তমানে কওমি ধারার শিক্ষায়ও সাধারণ বিষয়ের শিক্ষা সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারাদেশে বিপুল সংখ্যক কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের নির্ধারিত কোনো বেতন স্কেল নেই। পাস করা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সার্টিফিকেট কর্মক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ছিল না। সম্প্রতি সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের মর্যাদা দিয়েছে। ইংরেজি ধারার শিক্ষায় কারিকুলাম 'ও' লেভেল, 'এ' লেভেল। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। দেশে প্রায় ৯৭% শিক্ষা কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। মাত্র ৩% শিক্ষা কার্যক্রম সরকারি ব্যবস্থায়। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের ফলে শিক্ষকরা জাতীয় স্কেলে বেতনসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তার পরও কিছু ক্ষেত্রে মর্যাদা ও অন্যান্য বৈষম্য বিদ্যমান। সরকারি স্কুলের বাইরেও বিপুল সংখ্যক কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, যেখানে শিক্ষকরা নামমাত্র বেতন পেয়ে থাকেন।

শাহজাহান আলম সাজু বলেন, দেশে এমপিওভুক্ত প্রায় ৩০ হাজার হাইস্কুল, কলেজ, মাদ্রসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। এমপিওভুক্ত এসব শিক্ষক জাতীয় স্কেলে মূল বেতন পেলেও বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, অবসরকালীন সুবিধার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। এ ছাড়াও বিপুল সংখ্যক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওর বাইরে রয়েছে। প্রায় এক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী যুগ যুগ ধরে বিনা বেতনে কাজ করে যাচ্ছেন। নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে এমপিওর আওতায় আনা উচিত।

এই শিক্ষক নেতা বলেন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের জন্য স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্নিষ্টদের অংশগ্রহণে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল বৈঠক, আলোচনা সভা, মতবিনিময় সভা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। স্বাশিপের যথোপযুক্ত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত, বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল ভাতা বৃদ্ধি, ৫% ইনক্রিমেন্ট, ২০% বৈশাখী ভাতা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এক হাজার ৬০৭ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ আদায় করা সম্ভব হয়েছে। পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

শাহজাহান আলম সাজুর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার বৈকণ্ঠপুর বড়তলা গ্রামে। আশুগঞ্জে বঙ্গবন্ধু কারিগরি ও বাণিজ্যিক মহাবিদ্যালয়, জাহানারা কুদ্দুছ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, প্রিন্সিপাল শাহজাহান ফাউন্ডেশন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক এবং আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, এদেশে শিক্ষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯২০ সালের আগে এ দেশে শিক্ষকদের কোনো বেতন ব্যবস্থা ছিল না। ১৯২০ সালে শিক্ষকদের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা বেতন প্রবর্তন করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকার ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের জন্য মাসিক ৭৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের জন্য ১০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করে। এখন বেসরকারি শিক্ষকরাও জাতীয় পে-স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। একসময় বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরকালীন সময়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হতো। কিন্তু এখন তারা কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর বোর্ড থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে শিক্ষক নেতাদের অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে।

এই শিক্ষক নেতা বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি, ৫% ইনক্রিমেন্ট, বৈশাখী ভাতা, কল্যাণ ও অবসর বোর্ডের জন্য বিশেষ বরাদ্দের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা ঝোলাতে হয়নি। সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এসব দাবি আদায় করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস- শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণসহ অন্যান্য দাবিও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হবে।

শিক্ষা খাত ও শিক্ষকদের উন্নয়নে নিজের ভাবনা তুলে ধরে অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু বলেন, দেশের উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিশ্বমানে নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূরীকরণ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের জন্য অধিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সর্বোপরি শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের উদ্যোগ নিতে হবে।