সাক্ষাৎকার

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সামনে প্রতিকূলতা থাকবেই: প্রিয়াঙ্কা দুবে

 প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 .

প্রিয়াঙ্কা দুবে ভারতের একজন সাংবাদিক। ভারতে গণধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভিত্তিক গ্রন্থ 'নো নেশন ফর উইমেন' তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে। প্রিয়াঙ্কা দুবে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসেছেন ঢাকা লিট ফেস্টে আমন্ত্রিত হয়ে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী

সমকাল: প্রিয়াঙ্কা, এই প্রথম ঢাকায় এলেন?

প্রিয়াঙ্কা: জি, এটাই আমার প্রথম ঢাকা সফর। এর আগে আসার কথা ভেবেছি; কিন্তু আসা হয়নি। এ বছর ঢাকা লিট ফেস্ট থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে বেশ একটা পণ করে ফেলেছিলাম, এবার যাবই। সত্যি, ঢাকায় এসে খুব ভালো লাগছে। ঢাকার মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ, খুব ভালো।

সমকাল: তার মানে ঢাকায় এসে কোনো কিছুই অসহ্য ঠেকেনি?

প্রিয়াঙ্কা: (হেসে) না, কোনো কিছু তো অসহ্য মনে হচ্ছে না। তবে ঢাকার রাস্তায় যানজটটা বেশ প্রকট। না, এটা বলছি না যে দিলিল্গতে যানজট নেই, সেখানেও অসহ্য ট্রাফিক জ্যাম আছে। কিন্তু ঢাকায় প্রতিবার ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিশ্চয় তোমরা ঘড়ির কাঁটায় রাস্তার দূরত্বের সঙ্গে যানজটের সময়টা হিসাব করে বের হও! (হাসি)

সমকাল: তো  প্রথম যাত্রায় ঢাকায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোনো এজেন্ডা আছে কি?

প্রিয়াঙ্কা: না, না- এসেছিই দু'দিনের জন্য। একেবারেই দু'দিনের বেশি তিন দিন থাকার সুযোগ নেই। আর ঢাকায় তো তোমরা আছ। আমার দরকার আছে বলে মনে করি না। তবে শিল্পী-সাহিত্যিকের মতো সাংবাদিকদেরও মগজে, চিন্তায় দেশ-কালের সীমারেখাটা তুলে দিয়ে ভাবতে হয়। অতএব, ভবিষ্যতের কথাটা কিন্তু এখনই বলতে পারছি না।

সমকাল: না। ঠিকই বলেছেন, সময় একটা বড় বিষয়। আপনি দীর্ঘ সময় নিয়ে অনুসন্ধান করেন, যেমন প্রায় ছয় বছরের অনুসন্ধানের ফসল 'নো নেশন ফর উইমেন'।

প্রিয়াঙ্কা: দাঁড়াও, এখানে একটু কথা আছে। দীর্ঘ সময়ের বিষয়টাতেই বলতে চাই। যতটা বুঝি, কমপ্লিট সাংবাদিকতা হচ্ছে রিপোর্টিং, রিপোর্টেজ এবং অ্যানালাইসিসের সমন্বয়। এই তিনটি সাংবাদিকতার একেকটা পার্টস। তুমি যখন দিনের ঘটনা নিয়ে রিপোর্টিং করো, সেটা টেলিফোনে কাউকে দিলেও সে লিখে নিতে পারে, এখানে তোমাকে রিপোর্টেজ নিয়ে না ভাবলেও চলে, এখানে রিপোর্টিংটাই মুখ্য। কিন্তু তুমি যখন একটা ঘটনার ওপর অনুসন্ধান করে লিখছ তখন কিন্তু রিপোর্টেজটা মুখ্য হয়ে ওঠে। আর রিপোর্টেজটা কিন্তু এক ধরনের সাহিত্য। এখানে উপস্থাপনের দক্ষতা ও মুনশিয়ানার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। তুমি কীভাবে রিপোর্টটা উপস্থাপন করবে, কীভাবে তোমার গেটকিপারকে এবং পাঠককে প্রভাবিত করতে চাও, সেটা গভীরভাবে তোমাকেই ভাবতে হয়। আর একটি রিপোর্টেজ তখনই ইফেক্টিভ হয়, যখন সেখানে তোমার অ্যানালাইসিস থাকে। আর এটাই পারফেক্ট সাংবাদিকতা। আমার কথা হচ্ছে, রিপোর্টিংটা সাংবাদিকতার মৌলিক অংশ। কিন্তু রিপোর্টটা উপস্থাপনের মুনশিয়ানা, যুক্তি দিয়ে এর যথার্থতা প্রমাণ করা এবং অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে কোন দিকে গেলে আলোর রেখাটা পাওয়া যাবে, বিশ্নেষণের মাধ্যমে সেটা সামনে নিয়ে আসাটাই হচ্ছে পরিপূর্ণ সাংবাদিকতা।

সমকাল: খুব ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবার বলুন, ভারতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কতটা তেতো আর কতটা স্বাভাবিক?

প্রিয়াঙ্কা: তেতো আর স্বাভাবিকের পার্থক্যের কথা বলেছ- মধুর বলোনি- সেটাই ভালো। তা ঢাকায় তোমার অভিজ্ঞতা কেমন? যা হোক, আমাকে আগে প্রশ্ন করেছ, আমিই আগে বলি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সব রাষ্ট্রে সব সময়ই সরকারের লোকজনের কাছে উপাদেয় নয়। বিশেষ করে ভারতে কিংবা বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধকতার চিত্রগুলো একই রকম। আবার পশ্চিমা উন্নত দেশেও কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ মসৃণ নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সামনে প্রতিকূলতা থাকবেই। তোমাকে প্রতিকূলতা জয় করতেই হবে। আইনের বাধা, প্রশাসনের বাধা কোনো না কোনোভাবে থাকবেই। এই বাধা ডিঙিয়েই তোমার অনুসন্ধানটা শেষ করতে হবে। এবার বলো, ঢাকার অভিজ্ঞতা বলো।

সমকাল: আপনি তো একটা ইউনির্ভাসাল বক্তব্য দিয়েছেন। অতএব এর মধ্যে ঢাকা, দিল্লি সব আছে। এরপর আর নতুন করে যোগ করার কিছু নেই। এবার 'নো নেশন ফর উইমেন' সম্পর্কে বলুন। এর উপজীব্যটা বাংলাদেশের পাঠকের সামনে যদি তুলে ধরেন-

প্রিয়াঙ্কা: খুব সংক্ষেপে বললে দিল্লিসহ কয়েকটা রাজ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ নিয়ে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তারই রিপোর্টেজ বুক 'নো নেশন ফর উইমেন'। এখানে আমি অনুসন্ধান করে শুধু ঘটনাটা বলিনি। পাশাপাশি সমাজের ভেতরে খুবই শক্তিশালী ধর্ষণের মনস্তত্ত্বকে লালন করার বিষয়টিও তথ্য দিয়ে, বিশ্নেষণ করে তুলে ধরেছি। আমার কথা হচ্ছে সমাজের ভেতরে, আর একটু জোর দিয়ে বললে সিংহভাগ পরিবারের ভেতরেই ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব যুগ যুগ ধরে যত্ন করে পেলেপুষে রাখা হচ্ছে। এ কারণেই এ সমাজে ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। যেমন ধরো, পরিবারের সবাই মিলে নিজেদের পছন্দের ছেলের সঙ্গে একটা মেয়েকে তার অমতে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে- এটা কিন্তু গণধর্ষণের একটা আয়োজনের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সমাজের প্রচলিত মনস্তত্ত্ব এটাকেই লালন করছে এবং প্রশ্রয় দিচ্ছে। বরং তুমি এর বিরুদ্ধে বললে সমালোচনার মুখে পড়বে। 'নো নেশন ফর উইমেন' বইটাতে আমি অনেক আলোচিত ঘটনার আরও গভীর অনুসন্ধান করে আমাদের সমাজব্যবস্থার ভেতরে ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করার যেসব উপাদান আছে, সেটাকেই তুলে আনার চেষ্টা করেছি।

সমকাল: এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বই তো একটাই। প্রিয়াঙ্কা পেশাজীবী সাংবাদিকই থাকছেন, না ভবিষ্যতে পেশাদার লেখক হয়ে উঠবেন?

প্রিয়াঙ্কা: (হেসে) আমার প্রধান পরিচয় সাংবাদিক হিসেবেই। ভবিষ্যতে আরও নতুন অনুসন্ধান নিয়ে আরও বই লেখার ইচ্ছা আছে। আর যদি ফিকশন রাইটার হতে বলো, সেটাও সময়ই বলে দেবে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো পেশাজীবী সাংবাদিক থেকে পেশাদার কথাসাহিত্যিক হওয়ার উদাহরণ তো চোখের সামনে আছেই।

সমকাল: আরও লম্বা ইন্টারভিউ করতে পারলে ভালো লাগত; কিন্তু আপাতত তো সে উপায় নেই। অতএব, আজ এখানেই শেষ করাটা ভালো। সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

প্রিয়াঙ্কা: ডেফিনেটলি। বাংলাদেশের সাংবাদিক সহকর্মী, লেখক, সাহিত্যিকসহ সব মানুষের জন্য আমার শুভেচ্ছা। এখন থেকে সুযোগ পেলে ঢাকায় আসব, আড্ডা দেব, সেই ইচ্ছাটা জানিয়ে যাচ্ছি। আর শেষ কথা হচ্ছে- একটার পর একটা ট্রিকি কোশ্চেন করার জন্য তোমাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ।