সাক্ষাৎকার : মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ

বিএনপির গুরুত্ব কমেছে নিজেদের কর্মকাণ্ডেই

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

লোটন একরাম

নিজেদের কর্মকাণ্ডের কারণে জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম। তিনি বলেছেন, এ জন্য আওয়ামী লীগও মনে করে না যে, বিএনপির কাছ থেকে কোনো চাপ আসতে পারে বা কোনো আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপিকে সামনের পথ চলতে হবে। সব বিরোধী দলের সঙ্গে বিএনপিকে এক ছাতার নিচে আসতে হবে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বনানীর বাসভবনে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাফিজউদ্দিন আহমেদ এসব কথা বলেন। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি। বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনও হয়নি। সময় হলে সব বিষয়েই কথা বলবেন বলে জানান বিএনপির প্রবীণ এই নেতা।
অনেক দিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে 'নিষ্ফ্ক্রিয়' রয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ। অবশ্য এই 'নিষ্ফ্ক্রিয়তা'র কারণ তার মতে, করোনাজনিত পরিস্থিতি। এর মধ্যেই হঠাৎ গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, 'বিএনপি যখন নির্বাচনে যাওয়া উচিত, তখন যায় না; আবার যখন নির্বাচনে যাওয়া উচিত নয় তখন যায়।' একই সময় তিনি বলেন, 'যেই সংসদে যাওয়া উচিত নয়, সেই সংসদে গিয়ে আমরা বসে থাকি।' প্রকাশ্যে এমন ভিন্নমত প্রকাশ করায় তার এসব বক্তব্য দলের ভেতর-বাইরে বেশ আলোচিত হয়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে তিনি কি আর বিএনপি রাজনীতিতে থাকছেন না? ভাইস চেয়ারম্যান পদে থেকে এমন বক্তব্যের 'তাৎপর্য' কী?
প্রকাশ্যে নিজের দলের সমালোচনার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে মেজর (অব.) হাফিজের মুখোমুখি হয়েছিল সমকাল। রাজপথের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি দেশ ও জনগণের কল্যাণে কতটুকু ভূমিকা বা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমাহীন কারচুপির পর এ সংসদে যাওয়া উচিত হয়নি। একসময় দল থেকে বলা হয়েছিল, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিএনপি আর কোনো নির্বাচনে যাবে না। তারপরও যে কোনো কারণে আমরা নির্বাচনে গেছি। এখন মনে করি, এই সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল। বিএনপি নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে এবং আওয়ামী লীগও এ দলকে নিয়ে কোনো শঙ্কায় নেই। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনগুলোতে অংশ না নিলে কঠোর কর্মসূচি দিয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা বিএনপির জন্য সুবিধাজনক হতো।
'আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারা কি নেতৃত্বের ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?' - এমন প্রশ্নের জবাবে হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না সরকারের দমন-পীড়নের কারণে। বিএনপিকে যত মিথ্যা মামলায় হয়রানি হতে হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমন আর কখনও ঘটেনি। পুলিশ বাহিনী নিত্যনৈমিত্তিক অপরাধ দমন কার্যক্রম বাদ দিয়ে শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের হেনস্তা করার কাজে নিয়োজিত। একের পর এক আঘাতে ও নির্যাতনে বিএনপি নেতাকর্মীরা দিশাহারা।'
অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমানে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গুলশানের বাসায় আছেন। সক্রিয় রাজনীতিতে তার অনুপস্থিতির শূন্যতা দলের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব পূরণ করতে পারছেন কিনা, জানতে চাইলে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, বিএনপির অনেক নেতিবাচক দিকের মধ্যে একমাত্র ইতিবাচক ফ্যাক্টর খালেদা জিয়া। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। নেতাকর্মীদের অগাধ আনুগত্যও রয়েছে। তার অনুপস্থিতির কারণেই বিএনপি কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ হলে বিএনপিও এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে বলে আশা করি।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমন্বিত সিদ্ধান্তে দল পরিচালনার বর্তমান প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, 'আশা করি, বর্তমান নেতৃত্ব কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবেন। বিএনপিকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবেন।' জ্যেষ্ঠ নেতা কেউ কেউ দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন, কেউবা অবসর নেওয়ার চিন্তা করছেন- এমন গুঞ্জন ও গণমাধ্যমের খবর সম্পর্কে এই নেতা জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তা ছাড়া করোনার কারণে বর্তমানে রাজনীতি থেকে তিনি কিছুটা বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়েছেন। একই কারণে দলের সভা-সমাবেশও হচ্ছে না।
'বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল চলছে এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যা দলের ভেতর ওপেন-সিক্রেট'- এমন আলোচনা সম্পর্কে দলের এই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, 'এ ধরনের কোনো খবর আমার জানা নেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয় আমার কাছে। তবে বড় দলে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। যদিও বিএনপি এখন সরকারের দমনপীড়নের কারণে এতই ব্যতিব্যস্ত যে, এ ধরনের গ্রুপিং করার সময় নেই।'
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কোনো কারণে দলের নেতৃত্বে না থাকলে তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান অথবা মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বিএনপির কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন- রাজনৈতিক অঙ্গনের এমন আলোচনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, এ ধরনের কোনো খবর তার জানা নেই। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পারিবারিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তাই এরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ভবিষ্যতে ইসলামী দলগুলোর উত্থান ঘটার বিষয়ে সম্প্রতি তিনি যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, 'বর্তমানে যারা উদার রাজনীতি করছেন তারা খুন-গুম ও নির্যাতনের শিকার। এর ফলে যদি ইসলামী দলগুলোর উত্থান ঘটে, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা যদি বিঘ্নিত হয়, তাহলে সরকারই দায়ী থাকবে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঠেকাতে চাইলে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়া প্রয়োজন। গণতন্ত্রই এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষাকবচ। এ দেশ আফগানিস্তান হোক- তা কখনও কামনা করি না।'
দেশে কভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার মূল্যায়ন করতে গিয়ে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, করোনা নিয়ে সরকার চাইছে ব্যবসা করতে। গণস্বাস্থ্যের একজন চিকিৎসক সস্তায় বাজারে বিক্রয়যোগ্য কিট আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু সরকার সেটির অনুমোদন দেয়নি। আমরা চাই, দলীয় লোককে লাভবান করতে গিয়ে জনগণকে যেন কোনো মাশুল দিতে না হয়।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাবেক এ সেনা কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র নেই। রাজনীতি নেই। আইনের শাসন নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মী ও আমলারা লুটপাটে নিমজ্জিত। খুন-গুম-ধর্ষণ ও লুটপাটের রাজত্ব চলছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে। আইয়ুব খান ও এরশাদের পতন ঘটানোর মতো গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশল সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক এই পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, 'রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশ বন্ধুহীন রাষ্ট্র। প্রভাবশালী কোনো রাষ্ট্রই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে নেই।'