শিল্পপতি এম. আনিস উদ দৌলা তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ অক্সিজেন কোম্পানিতে চাকরির মাধ্যমে। ব্রিটিশ অক্সিজেনের হয়ে তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। দেশে ফিরে তিনি যোগদান করেন ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (আইসিআই) নামে আরেক ব্রিটিশ কোম্পানিতে। পরে আইসিআই রূপান্তরিত হয় অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) নামে; এর সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় মালিকানার। এম. আনিস উদ দৌলা হয়ে ওঠেন এসিআইর কর্ণধার। এর বাইরে তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের শীর্ষ পদে নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন একাধিকবার।
এম. আনিস উদ দৌলা কীভাবে ব্রিটিশ অক্সিজেন কোম্পানিতে চাকরি শুরু করলেন, তার ছেলেবেলা কী রকম ছিল, কীভাবে তিনি এসিআইর কর্ণধার হলেন, এ ছাড়া দেশের শিল্প খাতের নানা দিক নিয়ে প্রবীণ এ শিল্পপতি কথা বলেছেন প্রেরণার কথার তৃতীয় পর্বে।
এম. আনিস উদ দৌলা বড় হয়েছেন একটা কঠোর অনুশাসনে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'প্রতি সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাসায় ফিরতে হতো সময় মেনে, যাতে বাবার সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারি। বাবা আমাদের ইংরেজিতে কথা বলা আর বিবিসির খবর শুনতে অনুপ্রেরণা দিতেন, যাতে আমরা ভবিষ্যতে যে কোনো সোসাইটিতে মিশতে পারি।'
প্রবীণ এ শিল্প উদ্যোক্তার জীবনের বাঁক বদলে দিয়েছিল এশিয়া ফাউন্ডেশনের একটি বৃত্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে লোকপ্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে চলে গিয়েছিলেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়া শেষ করে তিনি চাকরিজীবন শুরু করেন ব্রিটিশ অক্সিজেন গ্রুপে সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসেবে, চট্টগ্রামে। দেশে-বিদেশে প্রায় ২৭ বছর সুনামের সঙ্গে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে ব্রিটিশ অক্সিজেন গ্রুপে কাজ করেন এবং তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অক্সিজেন গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে যোগদান করেন ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ মহাব্যবস্থাপক হিসেবে।
প্রেরণার কথা অনুষ্ঠানের আলাপচারিতায় উঠে আসে কীভাবে তিনি আইসিআইর শীর্ষ শেয়ারহোল্ডার হলেন। তিনি যখন আইসিআইতে যোগদান করেছিলেন, সে সময় কোম্পানির লোকসান হচ্ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ছোট ছোট ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশের অপারেশন অপেক্ষাকৃত ছোট ছিল, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আইসিআই এই অপারেশনটি স্থানীয় কারও কাছে বিক্রি করে দেবে। এম. আনিস উদ দৌলা এ প্রসঙ্গে বলেন, 'ভেবেছিলাম আমার চাকরিটা ছেড়ে দিতে হবে; কারণ স্থানীয় মালিকানায় চলে যাবে কোম্পানি, সে ক্ষেত্রে হয়তো কাজ করতে পারব না। তখন আইসিআই আমাকে বলে, আমি কেন কোম্পানির মালিকানা নিই না? বললাম, আমার তো এত টাকা নেই। তারা বললেন, এ বিষয়টি দেখবেন। শুধু দুটি শর্ত মানতে হবে- প্রথম হচ্ছে, আইসিআইর সুনাম বজায় রাখতে হবে আর দ্বিতীয়ত, যে সাড়ে তিনশ কর্মচারী আছে, তাদের দেখভাল করতে হবে। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি হয়ে গেলাম।' আইসিআইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া শর্ত তিনি পালন করেছেন এবং বর্তমানে এসিআইতে প্রায় ১৫ হাজার লোক কাজ করছেন। আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল দীর্ঘ কর্মজীবনে এবং ব্যবসায় কোন বিষয়গুলোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। একটি বিষয়ের কারিগরি দিক বুঝতেন এবং তিনি চেষ্টা করতেন, যে বিষয় নিয়ে কাজ করবেন সে বিষয়ে যেন তার জ্ঞান অন্যদের মাঝে ছাড়িয়ে যায়, যা ব্রিটিশ অক্সিজেন গ্রুপে চাকরির সময় খুব কাজে লেগেছিল। তিনি যেখানেই যখন কাজ করেছেন, কাজটাকে ভালোবেসেছেন। তিনি চাকরিকে চাকরি হিসেবে না দেখে বরং 'ওনারশিপ' বোধ করেছেন, যা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। তিনি কাজটাকে একজন উদ্যোক্তার দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, তাই তিনি নিজেকে সব সময় একজন উদ্যোক্তা দাবি করেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাজার ও সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়। গুণী এ শিল্পবিদ মনে করেন, ষোলো কোটির বেশি মানুষ বাংলাদেশের একটা বিরাট সম্পদ। জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্রয়ের ক্ষমতা বাড়বে, তাই স্থানীয় চাহিদা পূরণে কাজ করতে পারলেই একটা বিশাল অর্জন হবে। এখন আমাদের দরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুণগত মান বজায় রাখা, যাতে আমাদের পণ্যের চাহিদা থাকে সব জায়গায়।
তরুণদের জন্য এম. আনিস উদ দৌলা বলেন, 'প্রত্যেকের একটা বিশেষ জায়গা থাকে, ভালো লাগার জায়গা থাকে, সামর্থ্যের জায়গা থাকে, সেই জায়গাটি চিহ্নিত করে এগিয়ে যেতে হবে। একটা স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হবে। স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য কঠোর অধ্যবসায়, ত্যাগ এবং কষ্ট করতে হবে।' তিনি বাংলাদেশের তরুণদের মেধা নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কথা বলেন। এই খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার আলো দেখামাত্র তরুণ উদ্যোক্তারা ঝুঁকে পড়েছিল এবং তার ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তার প্রজন্ম বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে আবির্ভাবের যে স্বপ্ন দেখেছিল, তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে সে স্বপ্ন আজ বাস্তবায়নের পথে বলে উল্লেখ করেন এম. আনিস উদ দৌলা।
কাজ করলে ব্যর্থতা আসবেই, সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতাকে মেনে নিতে হবে এবং সেখান থেকে উত্তরণের যে পথ তার মধ্য দিয়েই অভিজ্ঞতা আসবে। নিজেকে সব সময় একটা অবিরাম 'ফিডব্যাক' এবং গঠনমূলক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া জরুরি। সর্বোপরি এম. আনিস উদ দৌলা মনে করেন, বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ, এ দেশের প্রত্যেকটি মানুষ একটি বিশাল সম্পদ, তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই এ দেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। ব্যবসায় গুণগত মান ধরে রাখতে হবে, সফলতা আসবেই।
প্রেরণা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ প্রেরণার কথার অংশ হিসেবে এসিআইর চেয়ারম্যান এম. আনিস উদ দৌলার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর সহযোগী অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন
সাক্ষাৎকারটির দেখা যাবে প্রেরণা ফাউন্ডেশনের ইউটিউব চ্যানেলে

মন্তব্য করুন