বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা শামসুজ্জামান খান বিভিন্ন সময় মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ, ঢাকার জগন্নাথ কলেজ, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারও লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান ১৯৪০ সালে মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।

সমকাল: আপনি সম্প্রতি প্রেস ক্লাবে এক সেমিনারে বলেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি জানিয়েছিলেন। বিষয়টি বিস্তারিত বলবেন?

শামসুজ্জামান খান: হ্যাঁ, আমি গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাব আয়োজিত 'ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু' শীর্ষক সেমিনারে বিষয়টি বলেছি। আমি তথ্যটি পেয়েছি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা থেকে। ৭ জুলাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'কয়েক দিন পরই পাকিস্তান প্রতিভাত হবে। শুনতে পাচ্ছি, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। যদি তাহাই হয় তাহলে ১৯৪০ সনের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে আমাদের পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে ফিরিয়া যাইতে হইবে।' বঙ্গবন্ধু উপর্যুক্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন তার মাত্র ২৭ বছর বয়সে। অর্থাৎ তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় বাঙালি জাতিসত্তা ও তার মৌল উপাদান বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য পূর্ব বাংলায় স্বাধীন স্টেট করার কথা ভেবেছিলেন। বাস্তবেও অবস্থা যখন তেমনি গড়াল, তখন পাকিস্তানি সামন্ততান্ত্রিক দুঃশাসন ও স্বৈরাচার থেকে মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতার দাবি তুলতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারই ফলে আমরা একাত্তর সালে পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি।

সমকাল: এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে। ভাষার মাস শুরু হলেও বাংলা একাডেমির বইমেলা হচ্ছে না। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

শামসুজ্জামান খান: এবারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা না হওয়ার বিষয়টি ভালোভাবেই নিচ্ছি। করোনা দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখেই এবারের সময়ের পরিবর্তন। বলা প্রয়োজন, করোনার বিরুদ্ধে আমরা সাফল্যের সঙ্গেই লড়াই করতে পেরেছি বলে ভাবা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যখন এ দুর্যোগে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর সংখ্যা সহনীয় বলে আমরা মনে করি। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে আমাদের অবস্থান ভালো। যা হোক, ফেব্রুয়ারিতে না হলেও বইমেলা ১৮ মার্চ উদ্বোধন হচ্ছে।

সমকাল: প্রতি বছর বইমেলায় অনেক বই প্রকাশ হয়, কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?

শামসুজ্জামান খান: বইয়ের মানের প্রশ্নটি অস্বীকার করা যাবে না। অনেক বই-ই যে মানসম্পন্ন নয়, তারও কারণ রয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে বিষয়টি বুঝতে হবে। পশ্চিমবাংলায় প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমনস্ক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়। তারা কেবল লাভের জন্যই বই প্রকাশ করেননি। তারা জাতির বুদ্ধিবৃত্তির মনন উন্নয়নের শক্তিশালী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে বই প্রকাশ করতেন। তাৎক্ষণিক ব্যবসা কিংবা লাভানুগ্রহের জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেননি। প্রকাশনাকে তারা জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার দায়িত্ব বলে মনে করেছেন।

সমকাল: আর আমাদের প্রকাশকরা...

শামসুজ্জামান খান: বাংলাদেশে যারা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের অনেকেই শিক্ষা-দীক্ষায় উচ্চস্থানীয়। কেউ নোট বই প্রকাশ করে, আবার কেউ বিসিএসের গাইড বুকের মাধ্যমে চটজলদি পয়সা অর্জন করে প্রকাশক হয়েছেন। অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের উন্নত প্রকাশনা শিল্পের পূর্বশর্ত দক্ষ সম্পাদক নেই। ভালো প্রুফ রিডার নেই বলে ভুলে ভরা নিম্নমানের বই তারা প্রকাশ করছেন। এভাবে ভালো প্রকাশনা শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

সমকাল: বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃৃতির উন্নয়ন, লালন ও প্রসার বাংলা একাডেমির অন্যতম কাজ। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন করবেন কীভাবে?

শামসুজ্জামান খান: বাংলা একাডেমি তো কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে লেখাপড়ার বিস্তার ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে গভীরতা কম। বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব এবং গবেষণায় তাদের ঝোঁক কম। সে কারণেই বাংলা একাডেমি থেকে উন্নতমানের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে উদ্যমী ও পরিশ্রমী গবেষক খুব একটা পাওয়া যায় না। আমি মনে করি, কেবল বাংলা একাডেমি নয়; সর্বত্রই এ ধরনের কাজ প্রয়োজন। কিন্তু সব জায়গায়ই দক্ষ লোকের অভাব।

সমকাল: তাহলে ভাষার দুর্দশা নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও কি তরুণ প্রজন্মের উদাসীনতা?

শামসুজ্জামান খান: ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাষাজ্ঞান থাকতে হয়। ভাষা পরিশ্রম করে আয়ত্ত করতে হয়। এ জন্য বাংলা সাহিত্য নিষ্ঠা ও মননের সঙ্গে পড়তে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রকাশকরা যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে ভালো বই প্রকাশ করতে পারছেন না এবং আমাদের পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, সে জন্য বলা চলে, তরুণরা ভাষার দুর্বলতায় ভুগছে। তরুণদের জন্য অভিধান জরুরি। সেই সঙ্গে ব্যাকরণ সম্পর্কে ধারণা তাদের ভাষার ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের ভাষা ব্যবহারের দুর্দশার দায় পুরোটা তাদের নয়।

সমকাল: তাহলে ভাষার দুর্দশা কীভাবে নিরসন হতে পারে?

শামসুজ্জামান খান: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য আগের মতো শিক্ষক, যারা বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণ জানেন, তাদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যেন বাংলা চর্চা করেন সে বিষয়টিও তদারকি করতে হবে।

সমকাল: সর্বস্তরে সেভাবে কি বাংলা চালু হয়েছে?

শামসুজ্জামান খান: বাংলার ব্যাপারে আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে। সরকারি অফিস-আদালতে বাংলায় আমরা কাজ করছি। আদালতে আগে ইংরেজিতে রায় হতো; সেখানেও বাংলা চালু হচ্ছে।

সমকাল: বাংলা একাডেমির কথায় আসি। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন সর্বশেষ আপনার হাত ধরেই হয়েছে। যেটা সবাই দেখছেন। কিন্তু ভেতরের কাজ যেমন- গবেষণা, সংকলন ইত্যাদি কতটা হয়েছে?

শামসুজ্জামান খান: বাংলা একাডেমির যেমন অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে, তেমনি দেশজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সমকালীন শিল্প ও সাহিত্য সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে জাতির মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের কাজও থেমে নেই। বাংলা একাডেমির গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ; অনুবাদ, পাঠ্যপুস্তক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ; জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ; বিক্রয়, বিপণন ও পুনর্মুদ্রণ; সংস্কৃতি, পত্রিকা ও মিলনায়তন; গ্রন্থাগার; ফোকলোর, জাদুঘর ও মহাফেজখানা এবং প্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা- এই আটটি বিভাগে কাজ চলছে।

সমকাল: বাংলা একাডেমির উল্লেখযোগ্য কাজের কথা যদি বলেন...

শামসুজ্জামান খান: বাংলা একাডেমি অনেক বিষয়েই কাজ করেছে এবং করছে। অভিধান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাজ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান, তিন খণ্ডে বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান, পাঁচ খণ্ডে রবীন্দ্রজীবন; এর পাশাপাশি প্রকাশ করেছে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ঐতিহাসিক অভিধান, সংগীতসাধক অভিধান, বিজ্ঞান বিশ্বকোষ, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণসহ প্রকাশ করেছে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস। কাজ আরও চলছে। নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে সব সময় একই ধারায় কাজ হবে, এটা বলা যায় না। যখন যে বিষয়ে জোর পড়ে, সে বিষয়ে বেশি কাজ হয়। বাংলা একাডেমি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এটি আমাদের সবার। আমাদের আশা-উদ্দীপনা এবং শ্রমে এই প্রতিষ্ঠান নিরন্তর বিকশিত হবে- এটাই বাস্তবতা।

সমকাল: মুজিববর্ষ চলছে। আপনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন- তিনটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয় ও সমাদৃত বই সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপনার অনুভূতি কী?

শামসুজ্জামান খান: আমি বলব, এটি আমার জীবনের সব থেকে গৌরবময় অর্জন। এমন সৌভাগ্য কতজনের হয়! প্রধানমন্ত্রী যে আমাকে আস্থায় নিয়ে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা- এ দুটো বইয়েরই ভূমিকা অংশে আমার কথা বিশেষভাবে লিখেছেন। এর পর আমরা বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় বইটিরও সম্পাদনা সম্পন্ন করেছি। সেটি 'আমার দেখা নয়াচীন'।

সমকাল: বঙ্গবন্ধু নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন। এখন যেসব বই প্রকাশ হচ্ছে, সেগুলো কীভাবে দেখছেন?

শামসুজ্জামান খান: মুজিববর্ষে যেসব বই প্রকাশ হচ্ছে, তার বেশিরভাগই 'কপি অ্যান্ড পেস্ট'। অনেকেই মামুলি কথাবার্তা লিখেছেন; কোনো আধুনিক দৃষ্টিকোণ নেই; গবেষণামূলক প্রবণতারও পরিচয় পাওয়া যায় না। এর অনেক বই-ই প্রকাশ না হলে কোনো ক্ষতি হতো না। তবে এ উপলক্ষে কিছু ভালো বই প্রকাশ হয়েছে, তাও অস্বীকার করা যাবে না। যারা পরিশ্রম, দক্ষতা ও উদ্ভাবনমূলক বিজ্ঞান চেতনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও তার রাজনীতি নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের সংখ্যা সীমিত হলেও, তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি।

সমকাল: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর কী কাজ হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

শামসুজ্জামান খান: এখনও বঙ্গবন্ধুর একটি প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। এটি করার জন্য দক্ষ গবেষক প্রয়োজন। এমন একটি কমিটির সমবেত প্রয়াসে তা সম্ভব হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ এখন সত্যিই জরুরি। তার মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর হয়ে যাচ্ছে, অথচ এমন একটি গ্রন্থ প্রকাশ করতে না পারা আমাদের ব্যর্থতারই পরিচায়ক।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

শামসুজ্জামান খান: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভ কামনা।

বিষয় : অমর একুশে

মন্তব্য করুন