লেখক, গবেষক, আমলা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ১৯৭১ সালে ছিলেন তৎকালীন হবিগঞ্জ মহুকুমা প্রশাসক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুজিবনগর সরকারে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি অর্থ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। মুজিবনগর সরকারের আমলাতন্ত্র নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ রোকন
সমকাল: আপনি ১৯৬৭ সালে সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সমকালেই প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, পাঞ্জাবি ও বাঙালি সিএসপিদের তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকত।
আকবর আলি খান: সেটা আসলে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময়।
সমকাল: প্রশিক্ষণকালেই তো দুই পাকিস্তানে বিমানঘাঁটির সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন?
আকবর আলি খান: প্রশিক্ষণের সময় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সারগোদায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে। প্রশ্ন রেখেছিলাম, পশ্চিম পাকিস্তানে এত বিমানঘাঁটি, পূর্ব পাকিস্তানে নেই কেন? পশ্চিম পাকিস্তানি এক পদস্থ অফিসারের উত্তর ছিল- আমরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতের ওপর বোমা ফেলতে ফেলতে পূর্ব পাকিস্তান যাব এবং বোমা ফেলতে ফেলতে ফিরে আসব। তাই এই যুক্তির অসারতায় আমরা হো হো করে হেসে ফেলি। ফলে এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সমকাল: আপনি তো সত্তরের নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
আকবর আলি খান: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমি জাতীয় পরিষদের তিনটি ও প্রাদেশিক পরিষদের পাঁচটি আসনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। নির্বাচন হয়েছিল সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। পাকিস্তানিরা ওই ফল মেনে নিলে ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু পাকিস্তানি জেনারেলরা গায়ের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলে বাঙালিরা রাস্তায় নেমে আসে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর কার্যত পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটে।
সমকাল: ঢাকায় অসহযোগ আন্দোলনের চিত্র আমরা জানি। জেলা বা মহুকুমা পর্যায়ে কেমন ছিল?
আকবর আলি খান: আমাদের কাছে তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাই ছিল আইন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মহুকুমার প্রশাসন চলত।
সমকাল: ২৫ মার্চ আপনি কোথায় ছিলেন?
আকবর আলি খান: তখন সিলেট জেলা প্রশাসক ছিলেন আবদুস সামাদ। ২৫ মার্চ তিনি আমাকে সিলেটে যেতে বলেন জরুরি বার্তা দিয়ে। আমি খুব ভোরে হবিগঞ্জ থেকে রওনা দেই। তখন সিলেট যাওয়ার একটাই রাস্তা ছিল মৌলভীবাজারের ওপর দিয়ে। কিন্তু শেরপুর ফেরিঘাটের কাছে স্থানীয় জনতা আমাদের গাড়ি থামিয়ে বলে সামনে যাবেন না, পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে।
সমকাল: মানে কুশিয়ারা ফেরি ঘাটে?
আকবর আলি খান: হ্যাঁ, কুশিয়ারা নদীর পাশে। ততক্ষণে খবর আসে, মৌলভীবাজারেও পাকিস্তানি বাহিনী ঢুকে পড়েছে। সেখান দিয়ে হবিগঞ্জে ফেরার পথ বন্ধ। তখন অনেক ঘোরাপথে নবীগঞ্জ হয়ে হবিগঞ্জে ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত পার হয়ে যায়। আমার বাসভবনের সামনে জনতার ভিড়। শুনতে পাই, বঙ্গবন্ধুর টেলিগ্রাম এসেছে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে। রাতেই সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।
সমকাল: ২৬ মার্চের পর থেকে প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হতো?
আকবর আলি খান: বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষ থেকেই আমরা বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারি করতে থাকি। আগে আমি ইংরেজিতে স্বাক্ষর দিতাম। তখন বাংলায় স্বাক্ষর দিতে থাকি। কিন্তু বিভিন্ন এলাকা ধীরে ধীরে পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে যেতে থাকে, তখন আমরা আর হবিগঞ্জে থাকা নিরাপদ মনে করিনি।
সমকাল: ১৭ এপ্রিলের পর মুজিবনগর সরকার থেকে আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছিল?
আকবর আলি খান: না, আমি নিজেই মুজিবনগর সরকারের পক্ষে স্বতঃস্ম্ফূর্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম।
সমকাল: ভারতে গেলেন কীভাবে?
আকবর আলি খান: আমার সঙ্গে ছিলেন সত্তরের নির্বাচনে হবিগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। তিনি পরবর্তীকালে সমাজকল্যাণমন্ত্রী হয়েছিলেন। এ ছাড়া তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহুকুমা প্রশাসক ছিলেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তিনি পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। দুটি জিপ নিয়ে এপ্রিলের শেষ দিকে আমরা সীমান্ত এলাকার আমল চা বাগানে চলে যাই। সেখানে পাহারাদারের চৌকিতে রাত কাটিয়ে পরদিন আগরতলা চলে যাই।
সমকাল: পক্ষ ত্যাগের জন্য পাকিস্তান সরকার তো আপনাকে শাস্তি দিয়েছিল?
আকবর আলি খান: তারা গেজেট নোটিফিকেশন করে আমাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়। পরে আমার অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালতে ১৪ বছর কারাদণ্ড দেয়।
সমকাল: আপনার পরিবার কোথায় ছিল?
আকবর আলি খান: আমি তখনও বিয়ে করিনি। বাবা-মা থাকতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তারা পরে আরও গ্রামের দিকে মামার বাড়িতে চলে যান।
সমকাল: মুজিবনগর আমলাতন্ত্রে যোগ দিলেন কীভাবে?
আকবর আলি খান: আগরতলায় মাস তিনেক ছিলাম। সেখানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও আমলারা একত্র হয়েছিলেন। সেখানেই আমরা বাংলাদেশ প্রশাসন গড়ে তুলি। সেখানে হোসেন তৌফিক ইমাম ছিলেন সচিব, আমরা তিনজন ছিলাম উপসচিব। তারপর কলকাতায় গিয়ে মুজিবনগর সরকারের কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে যোগ দিই।
সমকাল: সচিবালয় মানে, ৮ নম্বর থিয়েটার রোড?
আকবর আলি খান: হ্যাঁ, ওই বাড়ি থেকেই মুজিবনগর সরকারের সব কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
সমকাল: সচিবালয়ের কাঠামো কী ছিল? আপনি কী হিসেবে যোগ দিলেন?
আকবর আলি খান: প্রথমে উপসচিব হিসেবে যোগ দিই, তারপর সচিব। একটি দুটি করে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। যেমন ২০ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনে ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নাম ঘোষণা করা হয়। নামগুলো বলব?
সমকাল: জি, বলুন। মুজিবনগর আমলাতন্ত্রের ইতিহাসের সব অধ্যায় জানা প্রয়োজন।
আকবর আলি খান: মন্ত্রণালয়গুলো হলো- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সাধারণ প্রশাসন বিভাগ, স্বাস্থ্যকল্যাণ বিভাগ, তথ্য ও বেতার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ, সংসদবিষয়ক বিভাগ, কৃষি বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ। এর বাইরে আরও কয়েকটি সংস্থা ছিল।
সমকাল: সেগুলোও বলুন।
আকবর আলি খান: পরিকল্পনা কমিশন, শিল্প ও বাণিজ্য বোর্ড, নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যুব অভ্যর্থনা শিবির বোর্ড, শরণার্থী কল্যাণ বোর্ড ইত্যাদি। এগুলোর সমর্থনে আরও ১৪টি সংস্থা ছিল। যেমন বাংলাদেশ হাসপাতাল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, জয় বাংলা পত্রিকা, বাংলাদেশ বুলেটিন, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, স্বাধীনতা ফুটবল দল, বাংলাদেশ সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী পরিষদ ইত্যাদি।
সমকাল: আপনার দায়িত্ব কী ছিল?
আকবর আলি খান: আগরতলায় থাকতে ছিলাম তথ্যবিষয়ক উপসচিব। কলকাতায় গিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রথম উপসচিব হই। অনেক পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত হলে আমাকে এর সচিব করা হয়।
সমকাল: অফিসে ঠিক কী কাজ করতেন?
আকবর আলি খান: পদ যাই হোক, দায়িত্ব ততটা সংঘবদ্ধ ছিল না। যখন যে কাজ সামনে আসে আমরা করতাম। যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কম্বল কিনতে হবে। অর্থ নিয়ে আমরা নিজেরা গিয়ে বাজারদর অনুযায়ী ক্রয় করে পাঠিয়ে দিতাম। কোনো টেন্ডারের বিষয় নেই। এ ছাড়া নতুন কোনো মুক্তাঞ্চল তৈরি হলে সেখানে ডেপুটি কমিশনার হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। যেমন আমাকে একবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, স্বাধীনতার পর শরণার্থীরা দেশে ফিরে গেলে হূত সম্পত্তি কীভাবে উদ্ধার হবে- এ ব্যাপারে আইনি কাঠামো তৈরি করা।
সমকাল: বেতন-ভাতা পেতেন?
আকবর আলি খান: পেতাম। নিয়ম করা হয়েছিল, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা বেতনের ৭৫ শতাংশ পাবেন। তবে সেটা ৫০০ রুপির বেশি হওয়া চলবে না। ফলে সবাই আমরা ৫০০ রুপিই পেতাম।
সমকাল: মুজিবনগর সরকারের এই যে অপারেশনাল ব্যয়, পুরোটা কোথা থেকে আসত?
আকবর আলি খান: খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জেনে খুশি হবেন, মুজিবনগর সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য আমাদের অন্যের কাছে হাত পাততে হয়নি। মার্চ ও এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে থাকা পাকিস্তানি রুপি নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বিদ্রোহী আমলারা সীমান্ত পার করে মুজিবনগর সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছিল। সেখান থেকে আমরা কাবুলিওয়ালাদের কাছে সেগুলো দিয়ে ভারতীয় রুপিতে কনভার্ট করেছিলাম। ১০০ পাকিস্তানি রুপি দিলে তারা ৫০-৬০ ভারতীয় রুপি দিত। সেগুলো কাবুলে নিয়ে যেত। নভেম্বরের দিকে পাকিস্তান ডিমনিটাইজ করে নতুন নোট চালু করলে খানিকটা অসুবিধা হয়। কারণ তখন পাকিস্তানি নোট ভাঙিয়ে খুব সামান্য অর্থ পাওয়া যেত।
সমকাল: ভারত সরকার কোনো অর্থ সহায়তা করেনি?
আকবর আলি খান: শেষ দিকে ভারত সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল, তাও সরাসরি নয়। সীমান্তবর্তী রাজ্য সরকারগুলোর মাধ্যমে সেখানকার বাংলাদেশ প্রশাসনকে এক-দুই কোটি টাকা করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ওই অর্থ ছাড় হতে হতে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।
সমকাল: বেতন হিসেবে পাওয়া অর্থ দিয়ে কী করতেন?
আকবর আলি খান: বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ায় চলে যেত। আমরা তখন সবাই কৃচ্ছ্র সাধন করেছি। বেতন-ভাতা উপলক্ষ মাত্র। মূল কাজ স্বাধীনতার জন্য দিনরাত কাজ করা। কাজ করার জন্য অতি প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস ছিল না। অনেক সময় টেবিল-চেয়ারও পেতাম না।
সমকাল: মুজিবনগর সরকারের আমলাতন্ত্রের সেই স্পিরিট স্বাধীন বাংলাদেশে ধরে রাখা গেল না কেন?
আকবর আলি খান: না পারার অনেক কারণ আছে। খুব কমসংখ্যক বাঙালি আমলাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। ৮০ শতাংশ আমলা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের যখন আত্তীকরণ করা হলো, তারা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করত না। এর ওপর ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারা।