বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বীমা বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান। সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম মাধ্যমিক স্তরের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং পাঠ্যবইয়ের লেখক। এ ছাড়াও তিনি স্নাতকস্তরের জন্য ই-ব্যাংকিং এবং ই-কমার্স ও ইন্স্যুরেন্সের ফান্ডামেন্টালস নামে দুটি বই লিখেছেন। তার জন্ম ১৯৬৮ সালে ঢাকার ধামরাইয়ে।
সমকাল: আপনার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা ফিরেছে। এটাকে কি সাফল্য হিসেবে দেখছেন?
শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম: এটা সাফল্য বা ব্যর্থতার বিষয় নয়। এমনটা হওয়ারই কথা ছিল এবং হচ্ছে। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর কেবল বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা রাতদিন খাটছেন। এটা তাদের প্রচেষ্টার ফল। শেয়ারবাজার মূলত এগিয়ে নিয়েছে দেশের অর্থনীতির আকার এবং মাথাপিছু জাতীয় আয়। তবে আমাদের শেয়ারবাজার অনেক ছোট; জিডিপির তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ, যা ধনী-গরিব যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক ছোট। দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেছিলাম, দেশের শেয়ারবাজারের আকার, দৈনিক লেনদেনের পরিমাণসহ সব ধরনের পরিমাপক সূচকগুলোর উন্নতি হওয়া উচিত। আশার কথা, শেয়ারবাজার এখন বড় হওয়ার পথে হাঁটছে। যদিও করোনা মহামারির কারণে গত এক বছরে বাজারের যতটা উন্নতি হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি। সবকিছু ঠিক থাকলে বাজারের উন্নতি হতে থাকবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখলাম, অনেক সমস্যা। মাথা ঘোরানোর মতো অবস্থা। কিন্তু তাই বলে দমে যাইনি। সমস্যা নয়, কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ফলে সব কাজ সহজ হয়েছে। যা করতে চেয়েছি, গত এক বছরে তার সামান্যই করতে পেরেছি। আরও অনেক কিছু করার আছে। উন্নত দেশের উন্নত শেয়ারবাজার বলতে যা বোঝায়, সেই ধরনের বাজার গড়তে কাজ করছি।
সমকাল:  শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট অনেকে মনে করেন, যে পরিবর্তনের সূচনা এক দশক আগে হওয়ার সুযোগ ছিল, তা এখন শুরু হলো। আপনি কী মনে করেন?
শিবলী রুবাইয়াত: আগে কী হয়েছে বা না হয়েছে তা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। বাজার ক্রমে উন্নতি করছে। আগের কমিশন বাজারে একটা ভালো অবকাঠামো ও অনেক আইন করেছিল। বর্তমান কমিশন সেগুলো কার্যকর করার চেষ্টা করছে। সবাই যাতে নিয়ম-কানুন মেনে শেয়ারে বিনিয়োগ ও সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, সেই চেষ্টা চালাচ্ছি। কমিশনের অঙ্গীকার হলো- আবারও যাতে এ বাজার কারও হাতে জিম্মি না হয়ে পড়ে।
সমকাল: অভিযোগ আছে, কিছু আইন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছিল। কারসাজি রুখতে যেভাবে আইনের সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা উপেক্ষা করা হয়েছে। আইন ও নীতি বদলিয়ে আইপিও এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারবাণিজ্য হয়েছে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আপনি কি সতর্ক?
শিবলী রুবাইয়াত: অবশ্যই। দায়িত্ব গ্রহণের আগে শেয়ারবাজার কোন অবস্থায় ছিল, তা সবাই জানেন। জরুরিভিত্তিতে যে কাজ করা দরকার ছিল, সেগুলো এখন করছি। বর্তমানে এমন তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানি আছে, যারা কখনোই বিনিয়োগকারীদের নগদ লভ্যাংশ দেয় না। বছর বছর শুধু বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে মূলধন বাড়িয়েই যাচ্ছে। একসময় ওই বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে। দেখা গেছে, অতীতে এমন কোম্পানিগুলো একসময় 'জেড' ক্যাটাগরিতে, পরে ওটিসিতে চলে গেছে এবং বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানি থেকে কিছু পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছে। এ রকমের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রুখতে কিছু আইন করছি। কিছু কোম্পানি টাকা তুলে নিয়ে বিনিয়োগকারীদের খবর রাখেনি। আইন-কানুন কিছুই মানছে না। তাদের জন্য আইন করতে হয়েছে। এমন ব্যবস্থা করেছি, এখন আইপিও আসলে ভালো ভালো কোম্পানির আইপিওই আসবে। আগের মতো দুর্বল বা মন্দ কোম্পানির বাজারে আসার সুযোগ শেষ।
সমকাল: বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানি দেড় লাখের ওপর, সেখানে তালিকাভুক্ত মাত্র ৩২৫টি। এসব শেয়ারের বাজারমূল্য বেড়ে বাজারের আকার বড় হলে তো আবারও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে, তাতে কি দেশ ও অর্থনীতির লাভ হবে?
শিবলী রুবাইয়াত: বর্তমান কমিশন আইপিওবিরোধী নয়। ভালো কোম্পানির আবেদন এলে সঙ্গে সঙ্গেই অনুমোদন করে দিচ্ছি। যেসব কোম্পানি যথেষ্ট বড় নয় বা অতটা শক্তিশালী নয়, সেগুলোকেও মূলধন সংগ্রহের সুযোগ করে নিতে 'স্মল ক্যাপ' বা এসএমই বোর্ড করেছি। ছোট কোম্পানি বাজারে এসে বড় হলে আরও মূলধন সংগ্রহের সুযোগ করে দেব। তারা তখন মূল শেয়ারবাজারে যুক্ত হওয়ারও সুযোগ পাবে। নতুন ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানিগুলোর যেগুলো তালিকাভুক্ত নয়, আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে সেগুলোও বাজারে আসবে। আইপিও বাজার চলমান আছে এবং এটা থাকবে। বন্ড বাজার হচ্ছে। ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনাবেচা হবে। এভাবে বাজার অনেক বড় হবে।
সমকাল: বড় যেসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসার কথা বলছে, সেগুলো কি স্বেচ্ছায়, নাকি আপনাদের বিশেষ কোনো প্রচেষ্টায় আসছে?
শিবলী রুবাইয়াত: কমিশনের চেষ্টার কারণে কিছু কোম্পানি আসছে। এখন হয়তো কমিশন নিজে পদক্ষেপ নিয়ে কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। এটা করতে পারলে বাকিগুলো নিজে থেকে আসবে। সে রকম পরিবেশ তৈরির কাজ করছি। এখানে এলে কোম্পানিগুলোরই লাভ হবে। সবাইকে যে তালিকাভুক্ত হতেই আসতে হবে, তা নয়। চাইলে বন্ড বিক্রি করেও পুঁজি তুলতে পারবে। ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
সমকাল: বর্তমানে শেয়ারবাজারের মূল বোর্ডে ছোট কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ নেই। তাদের জন্য এসএমই বোর্ড হয়েছে। কিন্তু আগের মতো মূল বোর্ডে পাঁচ কোটি টাকার কম মূলধনের কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে, আবার ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধনের শেয়ারও আছে। এই বৈপরীত্যের অবসানের চিন্তা আছে কি?
শিবলী রুবাইয়াত: অতি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প বা ছোট ও মাঝারি শিল্প বা কোম্পানি মূল শেয়ারবাজারে আনা ঠিক নয়। এ জন্যই পৃথক বাজার সৃষ্টি করা হয়েছে। বড় কোম্পানির জন্য মূল বোর্ড এবং ছোটগুলোর জন্য এসএমই। এর বাইরে অলটারনেটিভ বোর্ডও হচ্ছে, যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিগুলো, যাদের মূল বোর্ড তো বটেই বা এসএমই বোর্ডের যুক্ত হওয়ার যোগ্যতা থাকবে না, চাইলে তারা এ বাজারে শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবে। ছোট কোম্পানিগুলো ক্রমে বড় হলে মূল বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। এক্ষেত্রে এও বলে রাখি, যেসব কোম্পানি সত্যিকার অর্থে শেয়ারবাজারের কোনো পর্যায়েই থাকার যোগ্যতা রাখে না, কোনো উদ্যোক্তার যদি মনে হয়, সে এ বাজারের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে পারছে না, তার জন্য বের হওয়ার পথ উন্মুক্ত। তাদের জন্য 'এক্সিট প্ল্যান' অর্থাৎ পাবলিকের টাকা ফেরত নিয়ে তালিকাচ্যুত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি। তাদের স্পষ্ট করে বলেছি, যারা আইন মানবে না, বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেবে না, তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কিনে নিয়ে শেয়ারবাজার থেকে বের হয়ে যাক। এ সুযোগ যারা নেবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা ভালো করবে, তাদের মূল বাজারে ফেরার সুযোগ দেব।
সমকাল: অভিযোগ আছে, বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী ধারার নেপথ্যের মূলে আছে কারসাজি। কারা কোথা থেকে কার টাকায় কারসাজি করছে, তা সবাই জানে। কিন্তু কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?
শিবলী রুবাইয়াত: কমিশন যে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা নয়। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে যা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, তা প্রকাশ্যে নিয়েছি, সবাইকে জানিয়েছি। কিন্তু তাতে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, বাজার খারাপ দিকে চলে গিয়েছিল। কমিশনের সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারে যেসব সার্কুলার বা ইনসাইডার ট্রেড ধরা পড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে জড়িতদের কমিশনে ডেকে পাঠাই। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিই। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিই। তবে এটা ঠিক, কারসাজির অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। কোনো শেয়ারদর অস্বাভাবিক বাড়লে তা খতিয়ে দেখি। কিন্তু আইন অনুযায়ী তা প্রমাণ করা যায় না বলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
সমকাল: দায়িত্বের বাকি তিন বছরে লক্ষ্য কি ঠিক করেছেন?
শিবলী রুবাইয়াত: সুষ্ঠু, কার্যকর এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত বিশ্বের আদলে পুঁজি সংগ্রহের বড় বাজার গড়তে বর্তমান কমিশন প্রথম থেকে কাজ করছে। এ কাজটিই করে যাব। এ জন্য সরকারের সহায়তা দরকার। ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারমুখী করতে ভালো কর প্রণোদনা দরকার। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সহায়তা চেয়েছি। রাতারাতি সবকিছু হবে না। শুরুটা হয়েছে, আশা করছি আগামীতে ভালোই হবে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
শিবলী রুবাইয়াত: ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।