সিআরবিকে চট্টগ্রামের 'ফুসফুস' হিসেবে আখ্যায়িত করে যে কোনো মূল্যে এর প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. অনুপম সেন। সিআরবি রক্ষা আন্দোলনে গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের চেয়ারম্যানও তিনি। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে অসাধারণ সুন্দর জায়গা সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের এত বড় ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে এখানে হাসপাতাল নির্মাণ হবে অত্যন্ত দুঃখজনক, চরম গ্লানিকর।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সিআরবির বিষয়টি তাকে বিশদভাবে অবহিত করা হবে উল্লেখ করে ড. সেন বলেন, চট্টগ্রামবাসীর প্রতি প্রকৃতির দান সিআরবি আমাদের কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ফুসফুস ধ্বংস করে এখানে কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সামনাসামনি বলার সুযোগ থাকার পরও সেই সুযোগ নিচ্ছেন না কেন জানতে চাইলে অনুপম সেন বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। প্রয়োজনে আমি নিজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সিআরবি বিষয়ে বিশদ জানানোর চেষ্টা করব।

প্রায় দুই মাস ধরে আন্দোলন চলার পরও হাসপাতাল নির্মাণে অনড় অবস্থানে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে। শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে কী হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, চলমান কর্মসূচিকে আমরা আন্দোলন বলছি না। এটা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টামাত্র। তবে রেলওয়ে সিআরবি থেকে হাসপাতাল প্রকল্প সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলতে থাকবে। পাশাপাশি আরও কী করা যায়, সেটাও চিন্তা করব।

চট্টগ্রামবাসীর মতামত উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা হাসপাতাল প্রকল্পের পক্ষাবলম্বন বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অনুপম সেন বলেন, দু-একজন ব্যক্তি এমন কথাবার্তা বললেও চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ এই হাসপাতাল চায় না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে গাছগাছালিতে ভরা অসাধারণ সুন্দর একটি জায়গা সিআরবি। নিষ্প্রাণ ইটের শহরে এটি এক টুকরো স্বর্গসম। এখানে কিশোর-তরুণরা খেলাধুলা করে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ হাঁটাচলা করে, নির্মল শ্বাস নেয়। এরই মধ্যে খেলাধুলার অনেক মাঠ, উন্মুক্ত পরিসর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সিআরবিও যদি না থাকে, তাহলে চট্টগ্রামে আর থাকল কী?

বিশিষ্ট এ সমাজবিজ্ঞানী আরও বলেন, সিআরবিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে, যেখানে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে সেখানে খ্যাতিমান বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুর রবসহ সাত-আটজন মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে। শতবর্ষীসহ অনেক গাছ-গাছালি রয়েছে। হাসপাতাল হলে এগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সিআরবি এলাকায় লাভের আশায় যে হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সেটি ধনীদের জন্য। এখানে গরিব, খেটে-খাওয়া মানুষের চিকিৎসা হবে না।

হাসপাতাল হলে সিআরবিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে- এই প্রশ্নের জবাবে ড. সেন বলেন, সিআরবি এলাকায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, একশ সিটের মেডিকেল কলেজ ও ৫০ সিটের নার্সিং ইনস্টিটিউট করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অনেক স্থ্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। হাসপাতাল হলে গাড়ি চলাচল করবে, দোকানপাট গড়ে উঠবে। মানুষের আনাগোনা বাড়বে। এ ছাড়া মেডিকেল বর্জ্য তো থাকবেই। সব মিলিয়ে সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে এখানকার অসাধারণ সুন্দর যে প্রাকৃতিক পরিবেশ, সেটা আর থাকবে না। আবার সিআরবির উন্মুক্ত পরিসরে পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে মাইকের ব্যবহার হয়। হাসপাতাল করা হলে মাইক কি ব্যবহার করা যাবে। আর ব্যবহার হলে রোগীদের কী অবস্থা হবে, সেসবও ভাবতে হবে আমাদের।