ইলিশ নিয়ে হতাশার কোনো কারণ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে কিছু কিছু নদীতে এ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কিছু জায়গায় আবার ব্যাপক পরিমাণে ধরা পড়ছে। তার মানে ইলিশ শেষ হয়ে যায়নি, আবাসস্থল পরিবর্তন করেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সম্প্রতি সমকালকে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। এ সময় তিনি ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ রক্ষায় সরকারের কার্যক্রমের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
এ বছর দেশের নদীতে ইলিশ কি কম ধরা পড়ছে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমে খবর আসছে, প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। রাতেও মাইকিং করে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশ নেই- এ কথাটা হলো অন্ধের হাতি দেখার মতো। ইলিশ প্রচুর ধরা পড়বে, কোনো ঘাটতি হবে না। অনেকেই জুলাই-আগস্ট মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম বলেন। আগস্ট থেকে ইলিশ ধরা শুরু হলেও মূলত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বেশি পাওয়া যায়। এবার আগস্টেও কক্সবাজার অঞ্চলে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ইলিশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। কোনো কোনো জায়গায় নদীর খনন বা নদীর ভাঙনে স্রোতের গতিপ্রকৃতি এতটাই পরিবর্তিত হয় যে এ মাছ সেখানে কমফোর্ট ফিল (স্বস্তি অনুভব) করে না। ড্রেজিং, নদীভাঙনসহ রাসায়নিক ব্যবহারের ফলেও অনেক সময় তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করে। উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো ইলিশ তিন-চার লাখ ডিম দেয়। ওই ডিম যেখানে গিয়ে আটকে
থাকে, সেখানে কোনো লঞ্চ থেকে পোড়া মবিলের একটা ফোঁটা পড়লে কয়েক লাখ ডিম মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়। কাজেই নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ইলিশ খুবই সম্পৃক্ত। খরস্রোতা জায়গা বা তার জন্য উপযুক্ত জায়গা না পেলে মাছটি স্থান পরিবর্তন করে।
কিছু নদীতে ইলিশ না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে জানিয়ে শ ম রেজাউল করিম বলেন, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা করে দেখবে কী কারণে এ মাছ স্থান পরিবর্তন করছে। গবেষণায় বোঝা যাবে, নদী খনন অথবা অভয়াশ্রমে বিঘ্ন হলো কিনা। অথবা অন্য কোনো কারণ আছে কিনা। তবে তিনি চান, মিষ্টি পানিতে ইলিশ ফিরে আসুক।
ইলিশ রপ্তানি হবে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, 'মাছটি বিভিন্ন উৎসবের সময় রপ্তানি হয়। তবে ব্যাপক হারে রপ্তানি সুখকর হবে না। ইলিশ হচ্ছে বাঙালির নিজস্ব শ্রেষ্ঠ স্বাদের মাছ। আমি চাই, প্রতিটি গ্রামের প্রত্যেক মানুষ এর স্বাদ পাক। সে জন্য আমরা নীতিগতভাবে খুব বেশি রপ্তানির পক্ষে না।'
ইলিশ বহুমুখীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এ মাছের চিপস ও ফিশবল তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। প্রযুক্তিটি মৎস্য অধিদপ্তরে হস্তান্তরের পর বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হবে। ইলিশসম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য চাঁদপুর কেন্দ্রে গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব গবেষণা শেষ হলে ইলিশের আহরণ মাত্রা, সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন এবং অকাল ডিম্বাশয়ের পরিপকস্ফতার কারণ নির্ণয় করা যাবে। এটা ভবিষ্যতে ইলিশ ব্যবস্থাপনা, কৌশলনীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সাগর ও নদীতে অধিক আহরণের কারণে মৎস্যসম্পদ কমে যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, মৎস্য আহরণের জন্য নতুন করে আর ট্রলারের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। ট্রলারে ত্রুটি পাওয়া গেলে লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। গভীর সমুদ্রে মৎস্যসম্পদের ঘাটতি এখনও তৈরি হয়নি। আমরা চাই, পরিমাণমতো ধরা হোক। এ বিষয়ে জোরালো মনিটরিং চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৎস্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গত ২৪ আগস্ট আরেকটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতে একই সময়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা যায় কিনা- এ বিষয়ে গত বছরের নভেম্বরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য পঞ্চম সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৬ হাজার ৫৯১ টনের বেশি মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ চার হাজার ৮৮ কোটি টাকা আয় করেছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়, বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং গত ১০ বছরে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়ান্স ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে অষ্টম ও ১২তম স্থান অধিকার করেছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ।