বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, সম্প্রতি সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। গোষ্ঠীস্বার্থ ও জনস্বার্থ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। দাম বাড়ানোর প্রভাবে সামাজিক নিরাপত্তায় যে ঘাটতি তৈরি হবে, সরকার তা বিবেচনায় নেয়নি। সরকারের এ সিদ্ধান্তে সামাজিক ন্যায়বিচার পেছনে পড়ে গেছে। সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মতামত দেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা বলেন, জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এ ধরনের নীতি সিদ্ধান্তে সামাজিক ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। করোনার কারণে সার্বিকভাবে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেই ঝুঁকির ভার শুধু জনসাধারণের ওপর চাপানো ঠিক হয়নি। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ই আর্থিক ব্যবস্থাপনার একমাত্র বিষয় নয়। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। এখানে আর্থিক ব্যবস্থাপনার চেয়ে বিপিসির দাবিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মতে, সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের লোকজন গোলাপি চশমা পরার মতো দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলছেন। অন্যদিকে জনগণ টিকে থাকার লড়াই করছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দারিদ্র্য পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে সমকালের প্রশ্নের উত্তর দেন।

সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো:

সমকাল: জ্বালানি তেল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে বলে মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। প্রত্যক্ষ প্রভাব হচ্ছে, পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যেই যা বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ যেভাবে নির্ধারণ হলো, তা যৌক্তিক অনুপাতে হয়নি। তেলের দামের তুলনায় পরিবহন খরচ বেড়েছে বেশি। পরিবর্তিত নীতি বাস্তবায়নে সুশাসনের অভাব এবং গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ায় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত আসছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে এটা সত্য। সেই বাড়তি দামের বোঝা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিতে পারত।

বিপিসি তা না নিয়ে সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়েছে। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বোঝা ভোক্তার ওপরই চেপেছে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠী সরকারের এ সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়েছে। এমন সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো যখন করোনা মোকাবিলার দ্বিতীয় লকডাউনের ধাক্কায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

তেলের দাম বাড়ানোর পরোক্ষ প্রভাবে পণ্য ও সেবামূল্য বাড়বে, যার বোঝাও নিতে হবে জনগণকে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় শুধু ভোক্তা সম্পৃক্ত নয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন খাত জড়িত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় কতটুকু হিসাব করা হয়েছে তা দেখার বিষয়। আমার মনে হয় নীতিনির্ধারকদের মনোযোগে এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে অনেক গোষ্ঠীস্বার্থ গেড়ে বসেছে। এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ক্ষমতা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। মনে হচ্ছে গোষ্ঠীস্বার্থ ও জনস্বার্থ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে।

সমকাল: সরকার বলছে ভর্তুকির চাপ কমানো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এমন সময়ে এ পদক্ষেপ নিল যখন করোনার প্রভাবে মানুষের আয় কমেছে। মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ল। মানুষকে চাপে না ফেলে সরকারের কাছে কী কোনো বিকল্প ছিল বলে মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ই আর্থিক ব্যবস্থাপনার একমাত্র বিষয় নয়। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। এখানে আর্থিক ব্যবস্থাপনার চেয়ে বিপিসির দাবিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে খণ্ডিতভাবে দেখলে হবে না। সার্বিকভাবে দেখতে হবে। একটি পক্ষের স্বার্থ দেখতে দাম বাড়ানো হলো। দাম বাড়ানোর প্রভাবে মানুষের অবস্থার অবনতি হলে সে ক্ষেত্রে যে সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি হবে, তার কী হবে? এটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। আর্থিক বাস্তবতা আছে, কিন্তু তা শেষ কথা নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দরকার, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা দরকার। সব মিলিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। খণ্ডিতভাবে করলে হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে বলেই দেশেও বাড়ানো একটি অংশের আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে মূলত গত এক বছরে বিশ্বে জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে। কভিডকালীন চাহিদা কম ছিল বলে এ খাতে বিনিয়োগ কম হয়। হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরবরাহ নেই। আগামীতে বিনিয়োগ হলে সরবরাহ বাড়বে। তখন দাম কমে আসবে। কিন্তু আমাদের দেশে দাম কমার ইতিহাস বিশেষ নেই। জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এ ধরনের নীতি সিদ্ধান্তে সামাজিক ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। করোনার কারণে সার্বিকভাবে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেই ঝুঁকির ভার কি শুধু জনসাধারণের? এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত ও জনসাধারণ সবারই অংশ রয়েছে। বিপিসির ব্যবস্থাপনাতো রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার খুবই সামান্য অংশ। এক্ষেত্রে সামাজিক ন্যায়বিচার পেছনে পড়ে গেছে। গোষ্ঠীস্বার্থের প্রাধান্যের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে। সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের লোকজন গোলাপি চশমা পরার মতো দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলছেন। অন্যদিকে জনগণ টিকে থাকার লড়াই করছে। আমরা অনেকদিন ধরেই দেশের উন্নয়নের ধারাকে 'টিকে থাকার ক্ষমতা' দিয়ে বিশ্নেষণে অভ্যস্ত হচ্ছিলাম। এটাকে আমরা সেলিব্রেট করেছি। দেশের মানুষ অনেক বিপদ, ঝুঁকি ও সংকট মোকাবিলায় শক্তি দেখিয়েছে। কিন্তু করোনাকালে তার নিদারুণ ভার্সন দেখা গেছে। টিকে থাকার বোঝা জনগণের ওপরই দাঁড়িয়েছে। মানুষের ঋণ বেড়েছে। কেউ যে অলস বসে থাকছেন বা থাকতে চাচ্ছেন তা নয়। বরং বাড়তি শ্রম দিচ্ছেন, শিশুদের কাজে নামাচ্ছেন। পুষ্টি চিন্তা বাদ দিচ্ছেন। এ অবস্থায় বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হলো।

সমকাল: ডিজেল, কেরোসিনের দাম বাড়ানোর পরপরই পরিবহন ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তেলের দাম বাড়ার তুলনায় ভাড়া বেড়েছে বেশি। যেসব পরিবহন সিএনজিতে চলে তারা বেশি ভাড়া নিচ্ছে। ধর্মঘটে ক্ষতি হয়েছে বেশ। সরকার কোন পদক্ষেপ নিলে সামগ্রিক বিষয়টি ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করা যেত?

হোসেন জিল্লুর রহমান: নীতিসিদ্ধান্তই সমাধান নয়। এজন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। দেশের সার্বিক নীতি কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতা অনুপস্থিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলছে। নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা থাকলে এমন বলার সুযোগ থাকত না। সুশাসনের ঘাটতির কঠিন চিত্র হচ্ছে ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থা। এই পরিবহন ব্যবসা যারা করছে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয়ে রয়েছে। ফলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। সড়ক হচ্ছে, উড়াল সেতু হচ্ছে কিন্তু মানুষের চলাচলে সময় লাগছে বেশি। পরিবহন যাত্রীবান্ধব নয়। আর খরচতো বাড়ছেই। নাগরিকরা সিটি করপোরেশনকে পৌরকর দিচ্ছে। কিন্তু বাসাবাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আলাদা করে ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নেই। নীতি জবাবদিহিতারও একই অবস্থা। ডিজেল, কেরোসিনের দাম বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তের আগে জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি।

সমকাল: আমদানি বাড়ছে। ডলারের দামও ঊর্ধ্বমুখী। মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ছে। কমছে রেমিট্যান্স। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকগুলোর এই পরিস্থিতির পরিণতি কী হতে পারে? এ অবস্থায় আপনার পরামর্শ কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান: এটা বৃহত্তর বিষয়। এটা শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির সীমারেখার মধ্যে হচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সংকটের ফলে হয়েছে। এজন্য সরকারকে যে নতুন কিছু করতে হবে তা নয়। দেশে আগে থেকে অনেক নীতি রয়েছে। সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা হলেই চলবে। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমরা সব কিছুই করছি। সেটা হচ্ছে ২৫ শতাংশ দক্ষতায়। আমাদের দক্ষতা এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে।

সমকাল: পিপিআরসির এক জরিপে দেখা গেছে, নতুন দরিদ্র বেড়েছে। সেখানে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত তথ্য ছিল। এখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এতে কি নতুন দারিদ্র্য আরও বাড়বে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: নানান কারণেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কাও রয়েছে। ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে সংক্রমণ বাড়ছে। আমাদের দেশে সংক্রমণ বাড়লে এবং আগামীতে লকডাউন দেওয়া হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বিত করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর জন্য দক্ষতার মাত্রা বাড়াতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের গোলাপি চশমা পরা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসতে হবে। জনগণ নিজেই দুর্যোগে টিকে থাকে যেভাবে, সেভাবে থাকুক- এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। নতুবা দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।