আসাদুর রহমান কিরণ। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আজ রোববার সকাল ১১টায় প্যানেল মেয়র-১ হিসেবে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের কর্মকাণ্ডে ভাবমূর্তি সংকটের মধ্যেই তাকে সিটি করপোরেশনের চালকের আসনে বসতে হচ্ছে। ফলে তার সামনে আছে অনেক চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে গতকাল শনিবার সমকালের সঙ্গে কথা হয় তার।

তিনি বলেছেন,'দুর্নীতি নির্মূল করাই হবে আমার প্রথম কাজ।' চলমান উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নাগরিক সেবার দুয়ার উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে টঙ্গী পৌরসভার কমিশনার পদে একাধিকবার নির্বাচিত হন কিরণ। জনগণের জন্য নিবেদিত এই জনপ্রতিনিধি নিজ ওয়ার্ডের অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপকার হয়ে ওঠেন। কাজ ও ব্যবহার দিয়ে জয় করেন মানুষের মন।

২০১৩ সালের ৬ জুলাই নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন কিরণ। তার তিন মাস পর কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে প্যানেল মেয়র-১ নির্বাচিত হন। পরে তৎকালীন মেয়র বিএনপি নেতা এম এ মান্নানকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বরখাস্ত করা হলে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।

২০১৫ সালের ৮ মার্চ নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। তখন সবার সহযোগিতায় গাজীপুরকে আদর্শ সিটি গড়ার উন্নয়নের রূপরেখাও তৈরি করেন। ইতিবাচক কাজের অনেক নজির গড়েছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করায় সদ্য সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে গত ১৯ নভেম্বর গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হয়।

হারিয়েছেন দলের প্রাথমিক সদস্যপদ। পরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় তাকে। গঠন করা হয় মেয়র প্যানেল। এ প্রেক্ষাপটে আজ আবারও সিটি মেয়রের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন কিরণ।

সমকাল: রোববার প্যানেল মেয়র-১ হিসেবে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এটি আপনার জন্য দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। কোন কাজটি দিয়ে এবার শুরু করবেন?

কিরণ: বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদৌলতে আমি এই পদের দায়িত্ব পেয়েছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করব। এবার আমার প্রথম কাজ হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে সব রকমের দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা। এর সঙ্গে সঙ্গে সিটি করপোরশনের চলমান সব উন্নয়নকাজ চালিয়ে নেওয়া ও উন্নত নাগরিক সেবা দিতে যা করা প্রয়োজন, সবই করব। এই দায়িত্ব পালনে আমি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সর্বাত্মক সহযোগিতা চাই।

সমকাল: দুর্নীতি নির্মূলের কথা বলছেন। কী কী দুর্নীতি এখানে হয়েছে বা হচ্ছে?

কিরণ: স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতেই কী কী দুর্নীতি হয়েছে, তা বলা আছে। এসব বিষয়ে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। তারা শিগগিরই তদন্তে আসবেন। আমাদের কাজ হবে, সিটি করপোরেশন থেকে দুর্নীতির তদন্তে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া। আমরা তা দেব।

বিনা ক্ষতিপূরণে উন্নয়নের নামে জায়গা দখল, ঠিকাদারিতে অনিয়ম, বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনকে কেন্দ্র করে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি, হাটবাজার থেকে ইজারা তুলে তা যথাযথভাবে রাজস্ব খাতে জমা না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। কমিটি তদন্ত করে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

সমকাল: শিল্প এলাকা গাজীপুরে অনেক সমস্যা, সমাধানে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?

কিরণ: দায়িত্ব নিয়ে আমি পরিষদ, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বৈঠকে বসব। সেখানেই করণীয়গুলো চিহ্নিত করব। তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেব।

আপনি ঠিকই বলেছেন গাজীপুর ও টঙ্গী শিল্প এলাকা। এই এলাকায় সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও শিল্পপতি- সব শ্রেণির মানুষেরই অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। এই এলাকায় ভারী ও মাঝারি কলকারখানার সংখ্যাই বেশি। অথচ সে তুলনায় রাস্তাঘাট খুবই অপ্রশস্ত। আগে তো ড্রেনেজ ব্যবস্থা এতটাই বেহাল ছিল যে, অল্প বৃষ্টিতেও সড়কে হাঁটুপানি জমে যেত। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে আগের মেয়াদে প্যানেল মেয়রের দায়িত্ব পেয়ে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছিলাম। গাজীপুরের কোনাবাড়ি কলকারখানাবহুল এলাকা। সেখানকার সড়ক প্রশস্ত করা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পাশাপাশি গাজীপুরবাসীর মূল দুর্ভোগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নেও গুরুত্ব দিয়েছি। আমার উদ্যোগেই ময়লা ফেলার জন্য বড় পরিসরে জায়গা নির্ধারণ করা হয়। যার সুফল আজও ভোগ করছে গাজীপুরের মানুষ।

এবারও নির্বাচিত সব জনপ্রতিনিধি, থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গাজীপুর সিটির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী সমাধানের রূপরেখা তৈরি করব। বিশেষ করে রাস্তাঘাটসহ অকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু সমাধান গড়তে কাজ করব। পাশাপাশি গাজীপুর সিটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রতিও আমরা বিশেষ নজর দেব।

সমকাল: দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আপনার আহ্বান কী?

কিরণ: দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বলব- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে আমরা। উন্নয়নের কাজে সবার অকুণ্ঠ সহযোগিতা চাই। এমন কোনো কিছু আমরা করব না, যাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করব আমরা। গাজীপুরবাসীকে উন্নত নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগগুলো যথাযথ বাস্তবায়নেও সবাই মিলে ভূমিকা রাখব।

সমকাল: দায়িত্ব নেওয়ার আগ মুহূর্তে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে কী বলতে চান?

কিরণ: সিটি করপোরেশনের দুয়ার সবার জন্য খোলা থাকবে। যে কেউ আমাকে এসে যে কোনো বিষয়ে বলতে পারবেন। জনগণের কল্যাণে কাজ করার ব্রত নিয়ে পথ চলছি। অতীতেও আমি ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে চেষ্টা করেছি প্রাণপ্রিয় গাজীপুর সিটির আধুনিকায়নে কাজ করতে। এই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় আমি জানি, মানুষের দুঃখ, দুর্ভোগ আসলে কোথায়। সেই দুর্ভোগ দূর করে উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করব। জনগণের কল্যাণের লক্ষ্য সামনে রেখেই সব পদক্ষেপ নেব। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা তার সহযাত্রী হিসেবে আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। গাজীপুরবাসীর ভালোবাসাই আমার পাথেয়।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

কিরণ: সমকালকেও ধন্যবাদ।