তৌহিদ রেজা নূর। সাংবাদিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজউদ্দিন হোসেনের ছেলে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি গবেষণা ও লেখালেখির সাথে যুক্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন। প্রজন্ম ৭১ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তাসলিমা তামান্না

সমকাল: স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে দেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই?

তৌহিদ রেজা নূর: এই ভৌগোলিক সীমারেখায় আমরা যারা বসবাস করি ১৯৭১ সাল তাদের জন্য একটা অন্যরকম বিরল ঘটনা। আমরা জানি, একাত্তর সাল তৈরি হয়েছিল একটা বিশেষ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে। নানা ধরনের চাপ আসছিল আমাদের ওপর। নানাভাবে আমাদের নিঃশেষ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছিল। পঞ্চাশ বছর পরে আমরা যদি মেলাতে বা পেছন ফিরে দেখতে চাই তাহলে আমাদের শেকড়ে যেতে হবে।

আসলে একটা স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমরা একটা সমাজ, রাষ্ট্র-ভূমি চাচ্ছিলাম যেটি আমাদের বিকাশের জন্য সহায়ক হবে, যেখানে আমরা সকলে মিলেমিশে থাকব। 'ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা'র মতো একটা জায়গা থাকবে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রিতভাবে থাকতে পারব। এখানে ধর্ম নিরপক্ষেতার বিষয়টি মাথায় রেখে একটা সমাজ গড়ার প্রত্যয় ছিল। ওই সময়ে যখন আমরা একটা আবাসভূমির খোঁজ করছি তখন মুক্তিযুদ্ধ বা নৃশংসতার মুখোমুখি হবো ভাবিনি।

আমাদের ওপর নির্বিচারে হত্যার চাপ শুরু হলো। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময়টা আমরা আরও এক অপরের কাছাকাছি এসেছি। আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা হত্যার শিকার হতে দেখলাম। '৭৫ থেকে দেশে একটা পাল্টা পরিস্থিতি বা আবহ তৈরি হলো। তারপর থেকে স্বাধীনতাবিরোধী যে ধারণাগুলো ছিল বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতা, এক ধরনের ধর্মান্ধতা, পাকিস্তানপ্রীতি, যারা কিনা একাত্তরে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যত ধরনের চেতনাবোধ সেই জায়গা থেকে ক্রমশ আমাদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টা সেটা একেবারেই আক্ষরিক অর্থেই প্রশাসন থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত হয়েছে। ফলে সামরিক শাসনের নাম করে জিয়াউর রহমান এসে যখন ক্ষমতা দখল করল, পরবর্তী সময়ে যখন এরশাদ ক্ষমতা দখল করল তখন আমাদের এই ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এবং মনোগতের মধ্যে বিরাট জটিলতা তৈরি হলো। শিক্ষা ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, গণমাধ্যমে, বিভিন্ন জায়গায় ছাপগুলো পড়তে লাগল। বঙ্গবন্ধুর নামটা উচ্চারণ করা যাবে না, জয় বাংলা বলা যাবে না, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বলা যাবে না— আমাদের বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা হলো। পুনরায় প্রশাসনের বিভিন্ন পদে তাদেরকে বসানো হলো।

৫০ বছর পর আমার মধ্যে খুব মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে। একই সঙ্গে এটা গর্বের— আমরা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে আছি। কিন্তু সমাজ ক্রমশই অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক হয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক হওয়াটা এক ধরনের মুক্তিযুদ্ধের ব্যর্থতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যর্থতা।

এত কিছুর পরেও এই দেশে যারা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল, বিশেষ করে একাত্তরে জেনোসাইডের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল তাদের অনেককেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তৈরি করে বিচার করা গেছে। কাউকে কাউকে শাস্তিও দেওয়া গেছে। আবার অনেকের রায় হওয়ার পরও আমরা কার্যকর করতে পারছি না। যেমন- চৌধুরী মইনুদ্দীন, আশরাফ উজ জামান খান, যারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তাদের বিরুদ্ধে রায় এখনও কার্যকর হয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার এখানে হয়েছে। সেটি একটি ইতিবাচক দিক। তারুণ্যের ক্ষেত্রে যেমন আশার দিক আছে, তেমনি আশঙ্কারও আছে। অনেক তরুণ মুক্তিযুদ্ধকে মনে রেখে অনেক কিছু খোঁজ করার চেষ্টা করছে। নিজেদের তাগিদে অনেক কিছু গবেষণার চেষ্টা করছে। উদ্যোগী হয়ে গঠনমূলক অনেক ভালো কাজের সঙ্গে তরুণরা জড়িত হচ্ছে।

এর বিপরীত চিত্রও আছে। তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। তারাই গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করল। আবার অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করে, অসম্মান করে কোটাবিরোধী আন্দোলন তৈরি হলো। কিছু কুশীলব আছেন, যারা কিনা তারুণ্যকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু করেছে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করে, প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তারপরেও আমি আশাবাদী। দিগন্ত আলোকিত করে বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো একটা জায়গা আমি দেখতে পাই। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যে ঘাটতিগুলো তৈরি হয়েছে তাদের যদি মেলবন্ধন তৈরি করা যায় তাহলে অবশ্যই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

সমকাল: আলবদর বাহিনীর সদস্যরা আপনার বাবাকে যখন ধরে নিয়ে যায় ওই সময়ের স্মৃতি...

তৌহিদ রেজা নূর: আলবদর বাহিনীর সদস্যরা যখন আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যায় তখন আমরা একই বিছানায় ঘুমাচ্ছিলাম। আমার বয়স তখন তিন বছর। ওই বয়সে সাধারণত কোনো স্মৃতি থাকে না। কিন্তু আমার মনে ওই স্মৃতি দাগ কেটে গেছে। পরবর্তীকালে আমি মায়ের সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে এটা-ওটা প্রশ্ন করে জেনেছি এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। যেদিন আব্বাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওই মুহূর্তটি আমার মনে নেই। কিন্তু নিয়ে যাওয়ার পর আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন ভোররাত। দেখলাম খাটে আব্বা, আম্মা, শাহিদ, জাহিদ কেউ নাই। আমি একা খাটে। বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। মশারি তুলে বেরিয়ে না বুঝে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের ড্রইং রুমে গেলাম। সেখানে লাইট জ্বলছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, শাহীন ভাই ফোন ঘুরাচ্ছেন। আম্মা মেঝেতে বসে আছেন। তার চারপাশে আমাদের পরিবারে সদস্যরা আছেন। আমি গিয়ে আম্মার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।

১০ ডিসেম্বর রাতে আমাদের ৫ নম্বর চামেলীবাগের বাড়িতে এসে বাড়িওয়ালার মুখ দিয়ে শাহিন ভাইকে ডাকানো হয়। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ঘরে ঢুকে যায়। আব্বার পরনে তখন স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গি ছিল। তিনি পরবার জন্য পাঞ্জাবি হাতে নিতেই ওরা ভিতরে ঢুকে যায়। তখন আব্বার হাত থেকে পাঞ্জাবি পড়ে যায়। অস্ত্রধারীরা আব্বার নাম, দপ্তর জানতে চায় আধো বাংলায় আধো উর্দুতে। এরপর তারা একটা গামছা চায়। আম্মাই তাড়াহুড়া করে গামছা এনে দেন। গামছা দিয়ে ওরা কি করেছিল জানি না। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। আব্বা খালি পায়ে, স্যান্ডো গেঞ্জি পরে চলে গেলেন ওদের সঙ্গে। আর কখনো আমরা তাকে পাইনি।

সিরাজউদ্দীন হোসেন শুধু দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্ধু ছিলেন। একই সঙ্গে তারা লেখাপড়া করেছেন। তার লেখনী মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য একটা ভূমিকা রেখেছে। সেজন্য আলবদররা চিহ্নিত করে সিরাজউদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর অনেকের লাশ পাওয়া গেলেও আমরা বাবার লাশ পাইনি।

সমকাল: আপনার বাবা চলে গেলেন, আর ফিরলেন না। ওই পরিস্থিতি আপনারা কীভাবে পার করেছেন?

তৌহিদ রেজা নূর: সংসারে যখন একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ করে নাই হয়ে যায় এবং যাদের বাড়িতে অনেক শিশু থাকে, তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। আব্বার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তখন মাত্র ৬৫ টাকা পাওয়া গেছিল। সেটা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের যাত্রা শুরু। আমরা আট ভাই। আমার বয়স তখন তিন বছর। আর বড় ভাই সবে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছেন। বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন।

বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা শহরেই থাকতে পারবো কি-না এরকম একটা প্রশ্ন দেখা দিল। তখন উপার্জনের জন্য ভাইদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। বড় ভাইয়ের গান শেখার ইচ্ছা ছিল। মিউজিক কলেজ ছেড়ে দিয়ে তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। আমি নিজেও ক্লাস সেভেন থেকে টিউশনি করেছি। সংসারে যে অনটন ছিল জানি না মা কীভাবে সামাল দিয়েছেন। মায়ের মানসিক সবলতা ছিল, তিনি ভেঙে পড়েননি। কমবেশি সব শহীদ পরিবারেরই তখন একই ধরনের অবস্থা ছিল।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন। অন্যান্য শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারেরও থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ‌পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে। ইস্কাটনে আমাদের একটা বাড়ি দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরেই আমাদের ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরশাদ ক্ষমতায় আসার সাত দিনের মাথায় অত্যন্ত অপমানজনকভাবে পানির লাইন, ইলেকট্রিসিটির লাইন কেটে দিয়ে অনেক লোকের সামনে আমাদের বাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। একই ঘটনা সুমিতা দেবী, আলতাফ মাহমুদের পরিবারের সঙ্গেও হয়েছে।

সমকাল: বর্তমান সরকার মুক্তিযু্দ্ধের সরকার। শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে এই সরকারের কাছ থেকে আপনারা কতটা সহযোগিতা পেয়েছেন?

তৌহিদ রেজা নূর: আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আলাদাভাবে বলতে গেলে, আমরা আসলে কিছু চাইনি। একটা পর্যায়ে এসে প্রজন্ম একাত্তর নামে আমরা একটি সংগঠন তৈরি করি ১৯৯১ সালে। সেখানে আমরা কিছু দাবি-দাওয়া আনি। এর মধ্যে দুস্থ শহীদ পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা করারও দাবি তুলি। এই সরকার আসার পরে কিছু চেষ্টা করছে। এখনও সব পূর্ণাঙ্গতা পায়নি।

সমকাল: শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে নতুন প্রজন্মর কাছে কী বার্তা দিতে চান?

তৌহিদ রেজা নূর: বাংলাদেশ জেনোসাইডপৃষ্ট দেশ। ৫০ বছর পর বলতে চাই, সকলের সম্মিলিতভাবে কাজে যুক্ত হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিকভাবে জেনোসাইডের স্বীকৃতির দরকার আছে। জেনোসাইডের স্বীকৃতি যদি না হয় তাহলে পাকিস্তানের দিক দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতের শেকড় থেকে যদি আমরা পুরো ব্যাপারটা ফয়সালা করে আসতে না পারি তাহলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। আমাদের সমাজ আরও বেশি সাম্প্রদায়িক হবে। তরুণদের এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন কাজ যেমন- খোঁজখবর করা, অনুসন্ধান করা এসব ব্যাপারে তরুণদের আরও বেশি যুক্ত করতে হবে।