২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো এবারও নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনায় নেবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।
গতকাল সোমবার সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলেছিলেন। যেখানে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। বিএনপি তাতে সাড়া দেয়নি। বর্তমানে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি তুললেও কোনো রূপরেখা দেয়নি। সংবিধানের মধ্যে থেকে বিএনপি যদি নির্বাচনকালীন সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়, সেটা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। আর সেটা প্রধানমন্ত্রী করবেন কিনা, জানা নেই। তবে ২০১৪ সালে তিনি যদি সেটা করে থাকেন, তাহলে এখনও নিশ্চয়ই করবেন। তবে এটা প্রধানমন্ত্রী কিংবা সরকারের কথা নয়। তার (রাশেদ খান মেনন) কথা। তিনি কথাচ্ছলে ও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা বলেছেন। এটা তার সিরিয়াস রাজনৈতিক প্রস্তাবও নয়।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সার্চ কমিটির কার্যক্রম, সার্চ কমিটিতে বিভিন্ন দলের নাম প্রস্তাব এবং বিএনপির নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিসহ সমসাময়িক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন। পুরো সাক্ষাৎকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
সমকাল : নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ নিয়ে আইনও হয়েছে। এটা নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা ভালো হলো?
মেনন : ইসি গঠনে গত ৫০ বছরে আইন হয়নি। এবার হলো। আইনটি অসম্পূর্ণ ও অপূর্ণাঙ্গ। তারপরও এটা বড় ধরনের অগ্রগতি। বাকিটা নির্ভর করবে ইসি এবং রাজনৈতিক দলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর। আগামী দিনে নির্বাচন ব্যবস্থা তথা গণতন্ত্র সফলভাবে
এগিয়ে যেতে পারবে কিনা, সেটা অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচন ব্যবস্থা ও আইনকানুনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করল? একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সফল করতে কতটা সদিচ্ছা দেখাতে পারবে- সেটার ওপরও বিষয়টা নির্ভর করবে।
সমকাল : সার্চ কমিটিতে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির পাঠানো নামের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
মেনন : এটা ভালোই হয়েছে। মানুষ জানতে পারল, কোন নামগুলো এসেছে। সার্চ কমিটি প্রস্তাবিত ৩২২ জনের নাম থেকে কমিয়ে প্রথমে ৫০, তারপর ২০ ও ১২ এবং সবশেষে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করেছে। নিশ্চয়ই তারা নিয়মনীতির ভিত্তিতেই এটা করেছেন। আর সার্চ কমিটির চূড়ান্ত নামগুলো থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। তখন মানুষও বিচার-বিবেচনা ও তুলনা করার সুযোগ পাবে, সার্চ কমিটি কতটা দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে নামগুলো অনুসন্ধান করে বের করতে পেরেছে।
সমকাল : আপনাদের দলও নাম প্রস্তাব করেছে। সেটা কি আপনাদের নিজস্ব বিবেচনা, নাকি আওয়ামী লীগের দেওয়া নামগুলোই আপনাদের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে?
মেনন : সম্পূর্ণ নিজস্ব বিবেচনা থেকেই পছন্দের নাম পাঠিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি। আওয়ামী লীগ কোনো নাম দেয়নি ওয়ার্কার্স পার্টির কাছে। ওয়ার্কার্স পার্টিও কোনো নাম নেয়নি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। ১৪ দলের আরেক প্রধান শরিক জাসদও নিজস্ব বিবেচনা ও পছন্দ থেকেই তাদের নামগুলো জমা দিয়েছে।
সমকাল : গতবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কে এম নূরুল হুদার নামের প্রস্তাব ১৪ দলের শরিক দল তরিকত ফেডারেশনের কাছ থেকে এসেছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। কিছু বলবেন?
মেনন : এমন তথ্য জানা নেই। তবে তরিকত ফেডারেশন যদি এমনটা দাবি করে বা বলে থাকে, তাহলে সেটা হবে ওই দলের বোকামি। কারণ তরিকতের নামের ভিত্তিতে সার্চ কমিটি সিইসি হিসেবে কারও নাম সুপারিশ করেছে কিংবা রাষ্ট্র্রপতিও সে অনুযায়ী নিয়োগ দিয়েছেন- এমন দাবি করা সঠিক বলে মনে হয় না।
সমকাল : জনমনে একটা ধারণা রয়েছে, আওয়ামী লীগ তাদের জোট শরিক বা মিত্র দলের মাধ্যমে কিছু নামের প্রস্তাব দেয়, যাতে সেগুলো চূড়ান্ত হলেও তার দায়ভার তাদের ওপর না আসে। কিছু বলবেন?
মেনন : আওয়ামী লীগের যেসব মিত্র দল বা জোট শরিক রয়েছে, তার মধ্যে সংসদীয় অবস্থানের বিবেচনায় ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদই প্রধান। তারা যদি আওয়ামী লীগের দেওয়া নাম সার্চ কমিটিতে না পাঠিয়ে থাকে অথবা আওয়ামী লীগ যদি তাদের কাছে কোনো নাম পাঠায়, তাহলে অন্য কোন মাধ্যমে নামগুলো আসবে? এগুলো কল্পনাপ্রসূত কথাবার্তা। এ নিয়ে আলোচনার কোনো অর্থও নেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করতে চাইবেইবা কেন? আওয়ামী লীগের প্রধান হচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তার পরামর্শেই নাম চূড়ান্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর কেন দায় ঠেকবে আট-দশটা দলের মাধ্যমে নাম প্রস্তাব করার?
সমকাল : ধরুন, আপনাদের প্রস্তাবিত নামগুলো বিবেচনায় এলো না। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রতি আপনাদের মনোভাব কী হবে?
মেনন : পছন্দের নামগুলো বিবেচনায় না এনেই যদি সার্চ কমিটি বা রাষ্ট্রপতি নতুন ইসি নিয়োগ দেন- সেটার ওপর আস্থা রেখেই ওয়ার্কার্স পার্টিকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। তাছাড়া কারও পছন্দ-অপছন্দের নাম চূড়ান্ত করার ওপর ইসির সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করছে না। ওয়ার্কার্স পার্টি অনাস্থ্থা আনবে তখনই যখন নতুন ইসির কার্যক্রমের ওপর অনাস্থা সৃষ্টি হবে। কিন্তু পছন্দের নাম তালিকায় নেই বলেই ইসির ওপর বিরূপ মনোভাব দেখাতে হবে, সেটা তো ঠিক হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, 'বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়'। ওয়ার্কার্স পার্টি ফলেই পরিচয় নেবে।
সমকাল : আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? দলগত নাকি জোটগতভাবে নির্বাচনে যাচ্ছেন?
মেনন : জোটগত নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি বা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। তবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনী সাব-কমিটি এবং সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার কমিটি থাকে। যারা সারা বছরই নির্বাচন বিষয়ে নানা কাজ করে। ওয়ার্কার্স পার্টিরও তেমন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয় তো পাঁচ বছরের জন্য, এক দিনের জন্য নয়।
সমকাল : আগের নির্বাচনগুলোতে নৌকা প্রতীকে অংশ নিলেও আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত রয়েছে আপনাদের। শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানেই থাকবেন, নাকি কোনো পরিবর্তন আসবে?
মেনন : দলীয় প্রতীক হাতুড়ি নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে ওয়ার্কার্স পার্টি। এটা পার্টির দশম কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। তারপরও নির্বাচনী কৌশল, পরিবেশ-পরিস্থিতি ইত্যাদি অনেক বিষয়ও থাকে। তবে দলীয় প্রতীকেই আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে, এটাই এখন পর্যন্ত ওয়ার্কার্স পার্টির সিদ্ধান্ত।

বিষয় : সাক্ষাৎকার : রাশেদ খান মেনন

মন্তব্য করুন