ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। তার ভাষায়, বিশ্বের সবখানেই চলমান সরকার নির্বাচনের সময়েও দায়িত্ব পালন করে থাকে। মাঝে অগণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকায় বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল। কিন্তু এখন আর সে ধরনের পরিবেশ নেই। দেশে এখন স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে। সুতরাং নির্বাচনকালীন বিশেষ সরকার ব্যবস্থার আর কোনো প্রয়োজন নেই।

সমকালের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক আরও বলেন, রাজনীতি এবং নির্বাচন জনগণের জন্য। জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এটা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার কাছে শতভাগ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এর কোনো বিকল্প নেই।

জনগণের আশা ও প্রত্যাশা পূরণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, যেভাবেই হোক জনগণের আস্থার সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রথম কাজ হলো সাংবিধানিক ক্ষমতার জায়গায় থেকে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করা। এ জন্য রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্যের বিশ্বাস, শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সদিচ্ছা থাকলে কমিশন সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে অবশ্যই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। তা ছাড়া নতুন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না- এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। তারা অবশ্যই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে। সেই যোগ্যতা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আরও বলেন, কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। নিরপেক্ষ সার্চ কমিটির বাছাই করা তালিকা থেকেই তাদের নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ কমিশনের সব সদস্যেরই সুনাম রয়েছে। কর্মজীবনে তারা যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার প্রমাণ দিয়েছেন। তারা অবশ্যই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংবিধানের প্রতি সম্মান ও আনুগত্য রাখতে হবে। মেনে চলতে হবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সেই সঙ্গে কমিশনকে তাদের শপথবাক্য অনুসরণ করতে হবে। আইনের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। ইসি তাদের আইনগত ক্ষমতা সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন বিষয় নয়। ইসির অবারিত ক্ষমতা। ওই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হলে অবশ্যই সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে- এ প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, 'কেন পারবে না? সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই পারবে। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে আসবে কিনা, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। তবে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে কমিশনকেই। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা তাদেরই প্রমাণ করতে হবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন না করার কথা বলছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। নতুন ইসি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করবে। রাজনৈতিক দল ও জনগণ ওই নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রাখবে। এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু হলে কমিশন আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। তখন কোনো রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও মানুষ ওই নির্বাচনকে অবশ্যই গ্রহণ করবে।

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক আরেফিন বলেন, পবিত্র সংবিধানে এ ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। নির্বাচনকালীন সরকার সব কর্মকাণ্ডই পরিচালনা করবে। তবে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত থাকবে। ওই সময় কমিশন যা বলবে, আইনের মধ্যে থেকে সেটাই করতে বাধ্য হবে সরকার। বিশেষ করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখালে ইসি তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। সারা দুনিয়ায় চলমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়ে থাকে। ওই সময়ের সরকারের আকার সাধারণত ছোট হয়। নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে সরকার জড়িত থাকে না। কোনো ধরনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা ইসিকে আইনগতভাবে সব ধরনের সহায়তা দেয়। এ ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না। বাংলাদেশেও সেটাই হবে।

নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটির কাছে বিএনপির পছন্দের তালিকা দেওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেছেন, কমিশন গঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ থাকলে যে কোনো রাজনৈতিক দলই নিজেদের পরামর্শ দিয়ে থাকে। এটাই হওয়া উচিত। বিএনপির তালিকার জন্য সার্চ কমিটি সময়ও বাড়িয়েছিল। সেখানে তাদের অংশ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা করেনি বিএনপি। তবে তারা বিভিন্নভাবে তাদের পছন্দের নাম সার্চ কমিটিকে দিয়েছে। এমনকি তাদের ওই পছন্দের নাম নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের তালিকায় রয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের সময়কালে বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সহিংসতা ও রাতের ভোটের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, রাতের ভোটের অভিযোগের বিষয়টি কোনো তদন্তেই প্রমাণিত হয়নি। এমনকি যারা এই অভিযোগ করেছেন, তারাও রাতের ভোটের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারও এটা বলেছেন। তবে নতুন নির্বাচন কমিশন অতীতের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।