নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের পক্ষে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ পরিবেশে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনেও সম্ভব নয়; সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দেশে আগামী দু'বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার বা সর্বদলীয় সরকারের প্রয়োজন। সেই সরকারে সব রাজনৈতিক দলের এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

তার মতে, গত ১৩ বছরে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয়করণের থাবায় ভেঙে পড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাত্র তিন মাসে রাহুগ্রাসমুক্ত করা সম্ভব নয়। কাকে জাতীয় সরকারের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী করা যায়, তা নিয়েই সম্মিলিতভাবে ভাবতে হবে। এ ছাড়া গত্যন্তর নেই। এতে আমরা ব্যর্থ হলে দেশ মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হবে; সবাইকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে সতর্ক করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে সমকালের অনুরোধে শনিবার দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ডা. চৌধুরী।

তার প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন জাতীয় ও সর্বদলীয় সরকারের আইনি ভিত্তি ও কাঠামো কী হবে- প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দু'ভাবে হতে পারে। বর্তমান সংসদে বিল পাস করিয়ে সংবিধান সংশোধন অথবা রেফারেন্ডাম (গণভোট) দিয়ে করা যেতে পারে। ২০ বা ৩০ জনের মন্ত্রিসভা হতে পারে। এতে আওয়ামী লীগ দুই, বিএনপির দুই, অন্য গুরুত্বপূর্ণ দলগুলো একজন করে এবং বিশিষ্ট নাগরিক বা পেশাজীবীদের মধ্য থেকেও পাঁচজন থাকতে পারেন। এতে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একক প্রাধান্য থাকবে না। সেই সরকার নির্বাচনী আইন পরিবর্তন করবে। দুর্নীতি বন্ধ করবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করবে।

ডা. জাফরুল্লাহ আরও বলেন, আওয়ামী লীগের মনেও আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। শুধু বিএনপিকে আশ্বস্ত করলে হবে না। আওয়ামী লীগের মনে কোনো ভয় ঢুকলে কিছুতেই সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেবে না তারা। এ কারণেই নির্বাচনের আগে একটি জাতীয় সরকার করলে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়া সহজ হবে।

সমকাল: আপনার প্রস্তাবিত ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামীতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করছেন কি?

জাফরুল্লাহ: আমি যে আটজনের নাম প্রস্তাব করেছিলাম, তার মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের নামও ছিল। তাকে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে জানি। তার কর্মজীবন বিবেচনা করলে শক্ত আমলা। আমার একটা বিশ্বাস আছে, আউয়াল সাহেব সাহসী মানুষ। তার চেষ্টা থাকবে। করতে পারবেন কিনা জানি না! প্রথম কথা হলো, তাকে পুরো কমিশনে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় সভা করতে হবে।

অবশ্যই বাকি কমিশনাররা ব্যর্থ। হুদা কমিশনের সেক্রেটারি ছিলেন আলমগীর হোসেন। হুদার ব্যর্থতার দায় তার ওপর চাপে। তাকে কমিশনার করার অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আউয়াল সাহেবকে ব্যর্থ করে দিতে পারেন। আনিছুর রহমানও আমলা। তার শ্বশুর চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সচিব থাকার সময় বিদ্যুতের দাম অনেক বৃদ্ধি করেছেন। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন আমলা। আরেকজন সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। এখানে শিক্ষাবিদসহ অন্য পেশার মানুষ থাকতে পারতেন। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে পারেন- এমন ব্যক্তিদের কমিশনার করা হয়েছে। আমরা আশা করব, অতীতে আউয়াল সাহেবের ভালো কাজের রেকর্ড আছে, কাজ না করতে পারলে তিনি পদত্যাগ করে দেবেন। খারাপ কাজের অংশীদার হবেন না। আর সরকারের সদিচ্ছা এবং সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ছাড়া ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়। নতুন কমিশন নাগরিকদের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সংলাপ করছে। সংলাপের সবকিছু উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।

সমকাল: আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপি আপনার মাধ্যমেই তাদের পছন্দের ব্যক্তির নাম সিইসি হিসেবে দিয়েছে। আবার বিএনপি তা প্রত্যাখ্যানও করেছে।

জাফরুল্লাহ: এটা একদম মিথ্যাচার। এটা তারা পলিটিক্যাল স্ট্যান্ট করেছে। গত ছয় মাসের মধ্যে বিএনপির কোনো নেতৃস্থানীয় নেতার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। আমি আটটি নাম নিজের বুদ্ধি-বিবেচনায় দিয়েছি। অকারণে বিএনপির নাম জড়িয়ে আমার প্রতি তারা অন্যায় করছে।

সমকাল: বিএনপিসহ অনেকে অভিযোগ করেছেন, নতুন সিইসি ও অন্য কমিশনাররা আওয়ামী লীগের লোক। চাকরিকালে হাবিবুল আউয়ালসহ অন্যরা আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত। এদের দিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

জাফরুল্লাহ: কাজী হাবিবুল আউয়াল প্রতিরক্ষা সচিব থাকাকালে দেখলেন, ক্যান্টনমেন্টে বিদ্যুৎ বিল '৭২ সালের মতোই রয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সবাই দিচ্ছে এক নিয়মে, আপনারা কেন অন্য নিয়ম- এটা হয় না। তার ভালো উদ্দেশ্য ছিল। শামসুল হুদা কমিশনের প্রস্তাবিত ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের ভোট দলীয় ভিত্তিতে না করার প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে আউয়াল সাহেবকে কাজ করতে হবে। এর ওপর নির্ভর করছে তার সফলতা। নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করতে হবে। এখনও নাগরিক ঐক্য ও গণসংহতি পরিষদ নিবন্ধন পায়নি। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিতে হবে।

সমকাল: গত নির্বাচনের আগে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন আপনি। তখন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রধান দাবি ছিল আপনাদের। এখন কেন আপনিসহ জোটের শরিক জেএসডিও জাতীয় বা সর্বদলীয় সরকারের দাবি তুলছেন?

জাফরুল্লাহ: আমরা যখন এ সরকারের বিভিন্ন রকম ছলনা দেখছি যে সরকার দিনের ভোট রাতে করতে পারে। পুলিশকে দিয়ে ব্যালট কাটতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। তিন মাসের মধ্যে এতগুলো আমলানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

সমকাল: বিএনপি তো এখনও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবিতে অনড়। আপনাদের বিরোধী রাজনৈতিক জোটে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে দুই মত থাকলে দাবি আদায় কি সম্ভব হবে?

জাফরুল্লাহ: বিরোধী জোটকে একটি দাবিতে আসতে হবে। বিএনপি পরিবর্তনের রাজনীতি করে না। আমি যেমন জাতীয় সরকারের রূপরেখা দিলাম। বিএনপিকে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দিতে হবে। নির্দলীয় ২০ জন লোকের নাম প্রকাশ করুন। তাদের মধ্যে বিচারক থাকলে নিরপেক্ষ হতেও পারেন। ব্যক্তি নির্দলীয় হলেও পরিবার নির্দলীয় পাওয়া কঠিন; তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সমকাল: নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি 'বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট' গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। আপনি কি ওই জোটের সঙ্গে থাকবেন? বিএনপি তো এখন আর আপনাকে শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করে না।

জাফরুল্লাহ: (হেসে হেসে) আমি কখনও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলাম না। আওয়ামী লীগ বলেছে, আমি বিএনপির উপদেষ্টা। আসলে আমি সবার শুভাকাঙ্ক্ষী। রাজনৈতিক কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আমি সহযোগী। দেশকে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। আমি চাই, দেশ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক অবস্থায় ফিরে আসুক। জবাবদিহিমূলক সরকার চাই।

সমকাল: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

জাফরুল্লাহ: হাইকোর্টে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল থাকা উচিত যেন সারাবছর শুধু নির্বাচনী মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করতে পারে। বিগত নির্বাচনের পর বিএনপিকে ৩০০ প্রার্থীর মামলার পরামর্শ দিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক হলো, মাত্র ৭০ জন মামলা করেছেন। তাদের বক্তব্য হলো, করে কী লাভ? আসলে তা-ই সত্য হয়েছে। তিন বছরে একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। যে কোনো নির্বাচনী মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা উচিত। নির্বাচনী আইন সংশোধন করতে হবে। রিকল (নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বাতিল করে নতুন ভোট) হতে পারে।

সমকাল: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধান কি রাখা উচিত, না সেই আসনে পুনর্নির্বাচনের বিধান ভালো হবে?

জাফরুল্লাহ: কোনো আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হওয়া উচিত নয়। একটি আসনে দু-তিনজন প্রার্থী থাকবে না- এটা হয় না। সে ক্ষেত্রে পুনঃতপশিল ঘোষণা করা উচিত।

সমকাল: প্রতিকূল অবস্থা বিবেচনা করেও বড় কোনো রাজনৈতিক দলের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করা সমর্থন করেন কি?

জাফরুল্লাহ: দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভবপর নয়। জেনেশুনে বিষপান করা উচিত নয়। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপির অধীনেও হবে না। আন্দোলন করে এর পরিবর্তন করতে হবে। বর্জন সমস্যার সমাধান নয়।

সমকাল: নির্বাচনের সময়ে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতিত্ব করতে চাপ দেয়, সে ক্ষেত্রে কমিশন বা প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী করতে পারেন?

জাফরুল্লাহ: দলীয় সরকার থাকলে চাপ দেবেই। কমিশন যদি চাপ নিতে না পারে, তাহলে পদত্যাগ করতে হবে। সাংবিধানিক দায়িত্বে থেকে কোনো দলের পদলেহন কাম্য নয়।

সমকাল: সাবেক সিইসি নূরুল হুদাসহ কমিশনারদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী অসততা, দুর্নীতির অভিযোগ এনে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিতভাবে চিঠি দিয়েছিলেন। সে অভিযোগগুলোর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন মনে করেন কি?

জাফরুল্লাহ: আমার মতে, সেই পুরোনো চর্বিতচরণ করে লাভ নেই। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিশনের নতুনভাবে চলা উচিত। তবে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের দায়িত্ব আছে, তিনি দেখেননি। তিনি কেন এত দিন পরও ওই চিঠির উত্তর দেননি? উত্তর না দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

সমকাল: সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা ও ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার জন্য কারা দায়ী বলে মনে করেন?

জাফরুল্লাহ: মূলত দায়ী সরকার। তারা ভয়ে আছে। তাদের অপকর্মগুলো সম্পর্কে তারা সচেতন। তাই তারা দলীয় ক্যাডার, পুলিশ, আমলাতন্ত্রকে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতা করেছে। বিএনপির মতো বড় দল প্রতিবাদে আন্দোলন করতে পারেনি। শুধু তাদের নয়, আমাদের সবার ব্যর্থতা। জনগণও প্রতিবাদ করেনি।

সমকাল: আগামীতে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিদেশি উন্নয়ন অংশীদার দেশগুলো কোনো ভূমিকা রাখবে কি?

জাফরুল্লাহ: বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সারা পৃথিবী উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারছে না। তবে বাইরের কোনো দেশ এসে সরকার পরিবর্তন করে দেবে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দেবে না। আন্দোলন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গতবার একমাত্র ভারত থেকে সুজাতা সিং এসে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বারবার এটা চলবে না। বিনা বিচারে সরকারি বাহিনী ৬০০ লোক মেরেছে। আমরা র‌্যাবকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছি। এটা ন্যক্কারজনক ব্যাপার। আমীর হামজাকে পুরস্কার দিয়ে লেখকদের অপমান করেছি।