সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সদিচ্ছা থাকলে দলীয় সরকারের অধীনেও স্ট্যান্ডার্ড (মানসম্পন্ন) নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। তবে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচনী আইন আরপিওতে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ- ১৯৭২) বেশ কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।

নতুন নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, নতুন ইসিকে অতীত বিশ্নেষণ করে সামনের পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অধীনেও প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করে। এই কমিশনের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুল বিজয় নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে। পরে দলীয় সরকারের অধীনে তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের অনেক নির্বাচন আয়োজন করে এই কমিশন। এই কমিশনের আরেক সদস্য ছহুল হুসাইন এবারের সার্চ কমিটির সদস্য ছিলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে- এটা ধরে নিয়েই বর্তমান কমিশনকে পরিকল্পনা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলো সরকারের কাছ থেকে কী আদায় করতে পারবে, অথবা বিরোধীদের নির্বাচনে আনতে সরকার আদৌ কোনো ছাড় দেবে কিনা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। সংবিধানের বিদ্যমান পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই কমিশনকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। আগের দুটি কমিশন (কাজী রকিব কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশন) কেন ব্যর্থ হলো, তা বিশ্নেষণ করতে হবে। প্রতিটি বিষয়ে কোন পরিস্থিতিতে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, আসলে কী নেওয়া উচিত ছিল, এসব বিষয় মূল্যায়ন করে সামনে এগোতে হবে। অন্যথায় তারা সফল হতে পারবেন না।

কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা মাত্র যাত্রা শুরু করেছেন। ভালো ভালো কথা বলছেন। কিন্তু কথা নয়, কমিশনের কার্যক্রম দেখে তাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে চান সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার।
এক প্রশ্নের জবাবে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ফ্রি (অবাধ) নির্বাচন করতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তর- না। নতুন কমিশন এখনই বলছেন- তাদের ওপর চাপ নেই। চাপের পরিস্থিতি তো এখনও আসেনি। সময় এলে বলা যাবে, তাদের ওপরে চাপ আছে কি নেই।' তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অবশ্যই সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে নির্বাচন কমিশনে যতই যোগ্য লোক বসানো হোক, নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না।

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই কমিশনার বলেন, দক্ষ নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারে যারা থাকবেন, তাদের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে স্ট্যান্ডার্ড নির্বাচন সম্ভব। তিনি বলেন, তাদের আমলে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রবর্তনসহ নির্বাচনী ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন আনা হয়েছিল; কিন্তু বিগত দুই কমিশন যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছে, তাতে শুদ্ধ ভোটার তালিকা এখন আর মুখ্য বিষয় নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রশাসন ও আমলাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে কমিশনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া আছে আইনে। নির্বাচনের সময় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ থাকার বিধান রয়েছে। ইসিকে রাজনৈতিক দলগুলোরও সর্বাত্মক সহযোগিতা করার কথা বলা আছে। এসব বিষয়ে কিছু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কী সংস্কার প্রয়োজন, তা আজ থেকে দশ বছর আগেই তারা বলে এসেছেন। এখন সময় পার হয়েছে। আরও অনেক বাস্তবতা সামনে এসেছে। নির্বাচনী আইন সম্পর্কে দেশে এখন অনেক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারা এসব বিষয়ে কমিশনকে সহায়তা করতে পারেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সরকার অত্যন্ত শক্তভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জায়গায় যাদের দিয়ে নির্বাচন করানো হয়, তারা সরকারি আমলা।

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, আইনে যা-ই থাকুক না কেন, নির্বাচন কমিশন দুর্বলচিত্তের হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাস তা-ই বলে।

তিনি বলেন, অতীতের ১২টি কমিশনের মধ্যে চারটি নির্বাচন কমিশন মোটামুটি ভালো নির্বাচন দিয়ে গেছে। এই কমিশনগুলো নিয়োগ করেছিল নিরপেক্ষ সরকার। তিনি উল্লেখ করেন, এখন সেই তুলনায় দেখা হলে দলীয় সরকারের সময় সে রকম শক্ত লোককে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ করা হয়নি। বর্তমান কমিশন সম্পর্কে অবশ্য এখনই মন্তব্য করা যাবে না।

সদ্য বিদায়ী নূরুল হুদা কমিশনের শেষ ভোট নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনের তুলনা করা যায় না। কারণ এই নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। এর আগেও নারায়ণগঞ্জ সিটিতে ২০১১ ও ২০১৬ সালেও ভালো নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু ওই এলাকার সংসদ নির্বাচনে কি তার প্রভাব পড়েছে? নারায়ণগঞ্জে গত দুটি সংসদ নির্বাচন কি সিটির মতো হয়েছে? ২০১৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তার প্রভাব পড়েছে?

বিষয় : সাক্ষাৎকার: এম সাখাওয়াত হোসেন দলীয় সরকারের অধীনেও মানসম্পন্ন নির্বাচন সম্ভব

মন্তব্য করুন