রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলনে শুরু থেকে সক্রিয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, সারাদেশের মাঠের অবস্থা, ভবিষ্যৎ কর্মসূচিসহ নানা বিষয় নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তার সঙ্গে কথা বলেছেন জাহিদুর রহমান
সমকাল: সৈয়দা রত্না ও তার কিশোর ছেলেকে থানায় নিয়ে আটকে রাখা হলো। আপনি নিজে থানায় গিয়েছেন, আন্দোলনেও সক্রিয় রয়েছেন।

মা-ছেলেকে এভাবে থানায় ১৩ ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনাটি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: একটি মাঠ পুলিশ নিয়ে গেল। সৈয়দা রত্না ভিডিওতে বলেছেন, পুলিশ খেলার মাঠে নির্মাণকাজ করছে। যদি কোনো গোপন কাজ লুকিয়ে ভিডিও করা হতো, তখন হয়তো পুলিশ আইনের দোহাই দিতে পারত। আমাদের এখন আন্দোলনের সময় প্রতিটি কথা বলতে হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মাথায় রেখে। কিন্তু পুলিশ যখন কাউকে 'পুঁটি মাছের বাচ্চা' বলে গালি দেয়, তখন সাধারণ মানুষের কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না।

সমকাল: সরকার তো উন্নয়নের স্বার্থে যে কোনো স্থান ব্যবহার করতে পারে...

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: উন্নয়ন হতে হবে জনগণের স্বার্থের পক্ষে। জনমত জেনে নিয়ে সরকার যদি একটা সিদ্ধান্ত দেয়- সে সরকারের পতন হয় কেমন করে? সরকার যদি বলে, তেঁতুলতলা মাঠ শিশুদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, থানা অন্য জায়গায় করা হবে। এখানে তো সরকার জয়ী হবে। সরকার অনেক মানুষকে কাছে পাবে। এখন আমাদের অত্যাচার, মামলা, হয়রানি ও ধমকাধমকি করে নানা আইনের অজুহাত দিয়ে যদি সরকার জোর করে এখানে থানা করার চেষ্টা করে, তাহলে দেশব্যাপী আন্দোলন হবে।

সমকাল: পুলিশের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, পুলিশ চাইলে যে কাউকে আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যেতে পারবে। নিরপরাধ প্রমাণ হলে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিতে পারবে। সন্দেহ হলেও ধরে নিয়ে যেতে পারে...

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: সৈয়দা রত্নার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়াকেও তারা বেআইনি মনে করে না? এ রকম সাবেক কর্মকর্তা আছেন বলেই তো পুলিশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পুলিশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা কমে যাচ্ছে। পুলিশ কোনো নাগরিককে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তুলে নিয়ে যেতে পারে না। পুলিশ কাউকে সন্দেহবশতও তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। সন্দেহ করার একটা যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে। সন্দেহ করলেই যদি পুলিশ তুলে নিতে পারে, তাহলে পুলিশকেও সে রকম উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হতে হবে।

সমকাল:  'মাঠ নিয়ে আন্দোলন করব না'- এ রকম মুচলেকা নেওয়াকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: এটা আমাদের সবার জন্যই বিব্রতকর। আমরা বলি গণতন্ত্র, আবার বলি মাঠ রক্ষার আন্দোলন করা যাবে না। তাহলে কী নিয়ে আন্দোলন করা যাবে, তার একটা তালিকা দিয়ে দেওয়া হোক। এ ছাড়া কোন কাজ করলে একজন মানুষকে সন্দেহভাজন মনে হবে- সেই তালিকাও দেওয়া হোক। তাহলে আমরা ওইভাবেই চলব।

সমকাল: থানার দেয়াল নির্মাণ তো বন্ধ হয়নি। আপনাদের সঙ্গে সরকারের কেউ আলোচনা করেছে?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। আশা করব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কলাবাগান থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। তিনি সব পক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন। নির্মাণকাজ চলতে থাকলে আলোচনার সুযোগটাই বা কোথায়? আলোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। কাজটা বন্ধ হোক, ঈদের জামাত হোক, বাচ্চারা খেলুক- আসুন, এর মধ্যে আমরা আলোচনায় বসে যাই। কাজ চলতে থাকলে আলোচনা নয়, গায়ের জোর দেখানো হচ্ছে।

সমকাল: পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের নিজস্ব ভবন না থাকায় তারা দুর্ভোগে আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মাঠও জরুরি, থানার ভবন নির্মাণও জরুরি। বিকল্প জমি খোঁজার কথা বলেছেন তিনি। এ বিষয়ে আপনাদের কোনো প্রস্তাব আছে কি?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: পুলিশের জন্য থানা লাগবে না- এ কথা আমরা বলিনি। থানা লাগলে কি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা রমনা পার্কে থানা করা যাবে? যাবে না। তাহলে তেঁতুলতলা মাঠে কেন থানা করা যাবে? কারণ, এখানকার মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এতটা শক্তিশালী নন। ফলে ওদের মাঠটিই নিয়ে নিল পুলিশ। কলাবাগান এলাকায় অনেক পরিত্যক্ত ও অর্পিত সম্পত্তি আছে- সে রকম একটি জায়গা থানাকে দিয়ে দেওয়া হোক। আবার জমি কিনেও থানা ভবন করা যেতে পারে।

সমকাল: আলোচনায় কিংবা নির্মাণকাজ বন্ধ না হলে কি আন্দোলন চলতে থাকবে?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: আমাদের আন্দোলন থামবে না। বেআইনি কাজ বন্ধ হবে কি হবে না- তার গ্যারান্টি আমি দিতে পারব না। আমরা সব পক্ষ থেকেই এটার বিরোধিতা করব। সবার মতামত উপেক্ষা করে যদি সরকার মনে করে, তার জনপ্রিয়তা ও জনস্বার্থ রক্ষায় খেলার মাঠে থানা করতেই হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে। সরকারকে আমরা কেবল যৌক্তিক, ন্যায়সংগত ও আইনসিদ্ধ আহ্বান জানাতে পারি।

সমকাল: মাঠ রক্ষায় সামনে আপনাদের কর্মসূচি কেমন হবে?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মেয়র, রাজউকসহ সরকারি অন্যান্য সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা করার চেষ্টা করব। আর এ আন্দোলনকে দেশব্যাপী একটা দাবিতে পরিণত করার চেষ্টা করব। সব সংগঠনকে যুক্ত করে দেশব্যাপী মাঠ রক্ষার একটা আন্দোলন হিসেবে রূপান্তর করার চেষ্টা করব। শেষ পর্যন্ত যদি সরকার কথা না শোনে, তাহলে আমরা আদালতেরও শরণাপন্ন হব। আসলে আমাদের কাছে যে রকম কাগজপত্র আছে, তাতে আমাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজউকের ডিটেল এরিয়া প্ল্যানেও তেঁতুলতলা মাঠকে উন্মুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমকাল: তেঁতুলতলা মাঠটি আসলে কার?

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: আইনে বলা আছে, কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো জমি যখন খেলার মাঠ, ঈদগাহ কিংবা অন্য কোনো জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়- সেটিই উন্মুক্ত স্থান। তবে সেটির গেজেট নোটিফিকেশন লাগবে। তেঁতুলতলা মাঠের সেই গেজেট নোটিফিকেশন আছে। খসড়া ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) গেজেটের মাধ্যমে জনমত যাচাইয়ের জন্য যা দেওয়া হয়েছে, তাতে তেঁতুলতলা মাঠকে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমন কিছু কাগজ আমাদের কাছে আছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে- তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপাল করপোরেশন এটিকে খেলার মাঠ হিসেবে রক্ষা করতে চেয়েছে। তাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিটেকচার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে এটিকে খেলার মাঠ হিসেবেই রাখতে বলেছে। কারণ, এই এলাকায় আর কোনো খেলার মাঠ নেই।

সমকাল: ঢাকাসহ সারাদেশে খেলার মাঠগুলো হারিয়ে যাচ্ছে...

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: একটা দেশের নগর পরিকল্পনা কতটা বিধ্বস্ত হলে মাঠের জন্য আমাদের আন্দোলন করতে হয়? আগামী প্রজন্মের জন্য মাঠ রক্ষার আন্দোলন করতেই হবে। কারণ, ছেলেমেয়েরা সারাটা দিন বাধ্য হয়ে কম্পিউটারে ডুবে থাকে। এক ফ্ল্যাটের বাচ্চা জানে না, আরেক ফ্ল্যাটে তার সমবয়সী একটা বাচ্চা আছে। ওদের মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব হয় না। এমন মানসিকভাবে পঙ্গু ও শারীরিকভাবে বিকল সমাজ তো আমরা চাই না। আমরা সুস্থ-সবল প্রজন্ম চাই। সে জন্য উন্মুক্ত স্থানে খেলার মাঠ খুবই জরুরি।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

মন্তব্য করুন