দেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, সংসদের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর কারণ, সংসদে যে বিতর্ক হওয়া দরকার, সেটা এখন আর হয় না। সংসদকে প্রাণবন্ত করতে হলে বিরোধী দলের সদস্যদের বেশি করে সুযোগ দেওয়া উচিত।

সাবেক এই সংসদ সদস্য মনে করেন, রাজনীতিবিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যত শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে, ততই সংসদ ও গণমাধ্যম দুটোর সমৃদ্ধি ঘটতে পারে। সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামটরে তাঁর নিজস্ব চেম্বারে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

সমকাল: জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। আপনি স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সংসদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। সংসদের এই পথচলায় সবচেয়ে বড় অর্জন কী? কোনো বিষয় সংসদের অর্জনকে ম্লান করে থাকলে সেটিও জানতে চাই।

এম আমীর-উল ইসলাম: স্বাধীনতার পর  সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে, আমরা একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছিলাম মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে। সংবিধানের পটভূমি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এই সংবিধান সংসদের মধ্যমেই বৈধতা পেয়েছে। এটিও সংসদের বড় অর্জন। আরেকটি বিষয় হলো, সংসদের কার্যপ্রণালি সম্প্রচারের জন্য এখন একটি আলাদা টেলিভিশন চ্যানেল আছে। এর ফলে সংসদ জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়। সংসদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ভালোভাবে জনগণের কাছে ফুটে ওঠে। সংসদ সদস্যরা এলাকার সমস্যা তুলে ধরেন, যা জনগণ সরাসরি দেখে গ্রামাঞ্চল থেকে। এটি খুব বড় কাজে লাগে। আর সংসদের অর্জন ম্লান হয়েছে– এমন কিছু এখন বলা যাচ্ছে না। তবে হয়তো আছে।

সমকাল: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংসদকে ম্লান করেছিল কিনা? তা ছাড়া সামরিক সরকারগুলো ক্ষমতা দখল করে সংসদকে স্থগিত করেছিল। এ বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছেন?

এম আমীর-উল ইসলাম: ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ পাসের বিষয়টি সংসদের জন্য কলঙ্কজনক। এটাকে সংসদে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’কেও বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এর সবই আমাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দিক্দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এগুলো জাতিকে পিছিয়ে দিয়েছিল। আর সামরিক শাসন সংসদকে ম্লান করলেও এখন কিন্তু আর ধোপে টিকছে না। এসব ঘটনা সংসদকে খুবই খাটো করেছে। গণতন্ত্রকে উৎপীড়নের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। সেদিক থেকে এখন আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি– এটা আমাদের সৌভাগ্য। এ ধরনের প্রবৃত্তি রোধে সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলা বাড়াতে হবে। সেখানেই সমাধান আসবে।

সমকাল: যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে; সেই উদ্দেশ্য সংসদের পথচলায় কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

এম আমীর-উল ইসলাম: আমাদের সংসদ অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ইতিবাচক। অন্যান্য দেশের সংসদীয় কার্যপ্রণালি সংসদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে সংসদের কথাবার্তা প্রচার হয়। সে জন্য আমরা বিষয়গুলো জানতে পারছি। সংসদে যত বিতর্ক হবে, ততই জনগণ উপকৃত হবে।

সমকাল: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে মতপ্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে– এটাকে কীভাবে দেখছেন?

এম আমীর-উল ইসলাম: দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাঁদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর ব্যত্যয় করতে হলে তাঁকে পদত্যাগ করে নতুন করে স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। তা না হলে এটি হবে দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। এটা (৭০ অনুচ্ছেদ) ঠিকই আছে গণতন্ত্রের জন্য।

সমকাল: প্রায়শ বলা হয়, রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি থাকছে না। স্থানীয় প্রশাসনেো আমলাদের প্রভাব লক্ষণীয়।

এম আমীর-উল ইসলাম: রাজনীতিতে সংসদ সদস্য যাঁরা আছেন তাঁদের সঠিক সাংবিধানিক মূল্যায়ন ও উপস্থিতি সংসদে থাকে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো অযোগ্য ব্যক্তিকে অর্থাৎ রাজনীতির বাইরে থেকে কাউকে নিয়ে এসে যেন দলের শোভাবর্ধন করতে না পারে, সেটা দেখা দরকার। তা না হলে রাজনৈতিক দল ও জনগণ যেটা পাওয়ার কথা, সেটা থেকে বঞ্চিত হবে। মনোনয়নের যে বিষয়, সেখানে পয়সাকড়ির ব্যাপারও থাকে এবং কিছুটা যোগ্যতার চাইতে দলীয়করণের প্রাধান্য কাজ করে। এতে সংসদ দুর্বল হচ্ছে, গণতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে এবং এলাকার জনগণও যোগ্যতাসম্পন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না।

স্থানীয় প্রশাসনে রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের প্রভাবের যে বিষয়; এর কারণ দলীয়করণ, উপদলীয়করণ, আত্মীয়করণ। এ ব্যাপারে প্রধান দায়িত্ব আওয়ামী লীগের। কারণ তারা বৃহত্তম দল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তাঁর দলে রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য দেন, তাহলে অন্যান্য দলও বাধ্য হবে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়নের সময় শিক্ষিত, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ ও আনুগত্য রয়েছে এমন ব্যক্তিদের প্রাধান্য না দিয়ে উল্টোটা করে।

সমকাল: সংসদে সরকার ও রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কিনা?

এম আমীর-উল ইসলাম: এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যত শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে, ততই সংসদ ও গণমাধ্যম দুটোর সমৃদ্ধি ঘটতে পারে।

সমকাল: এক সময় টেলিভিশনে সংসদের আলোচনা শোনার জন্য জনগণের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যেত। এখন আর সে অবস্থাটা নেই। এর কারণ কী?

এম আমীর-উল ইসলাম: সংসদের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর কারণ সংসদে যে বিতর্ক হওয়া দরকার, সেটা এখন আর হয় না। বিতর্ক উস্কে দেওয়ার মতো বিপরীত পক্ষ থেকেও তেমনভাবে কাজ হচ্ছে না। বর্তমান সংসদেও কয়েকজন মহিলা সদস্যকে দেখেছি। বিশেষ করে বিএনপির একজনকে (সম্ভবত ফারহানা) দেখেছিলাম বিতর্ক উস্কে দিতে। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। জাতীয় পার্টির কয়েকজন আছেন; তাঁরা ভালো বলেন। সংসদকে প্রাণবন্ত করতে হলে বিরোধী দলের সদস্যদের বেশি করে সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁদেরও প্রস্তুতি নিয়ে বিতর্কে অংশ নিতে হবে। সংসদে এখন নিজেদের পার্টির (আওয়ামী লীগ) ভেতরে বিতর্ক হয়। এটাও প্রশংসাযোগ্য। তবে সামগ্রিকভাবে বিতর্ক হচ্ছে না।

সমকাল: বিএনপির সংসদ বর্জনকে কীভাবে দেখছেন? এখন দলটি আসন্ন ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যালোচনা জানতে চাই।

এম আমীর-উল ইসলাম: দলটি ডিপ্রেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে যুক্ত হওয়া উচিত। রাজপথে বিশৃঙ্খলা না করে সংসদে বিতর্কে অংশ নেওয়া উচিত। এটি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সংসদে না থেকে রাজপথে বিশৃঙ্খলা করা বিরাজনীতি করার একটি পথ।

সমকাল: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?

এম আমীর-উল ইসলাম: রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে বলে মনে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে নেতাকর্মী শক্তি পরীক্ষার দিকে যেতে পারে। এ নিয়ে মানুষের মনে শঙ্কা রয়েছে।

সমকাল: বিএনপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকা অবস্থায় তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

এম আমীর-উল ইসলাম: সংবিধানে যেভাবে আছে, সেভাবেই নির্বাচন হতে হবে। অতীতে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা হয়েছিল, সেটা এলোমেলো ছিল। সেদিক থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন না করার যে উদ্ভট চিন্তা– সেটা আমরা গ্রহণ করতে পারি না। নির্বাচন সম্পর্কে বিশ্বের কোনো দেশেই এমন ব্যবস্থা নেই।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

এম আমীর-উল ইসলাম: সমকালসহ রনিকেও ধন্যবাদ।