ঢাকা সোমবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩

সাক্ষাৎকার : নুরুল হক নুর

বিএনপি ভাঙার এজেন্ডা নিয়েছেন রেজা কিবরিয়া

বিএনপি ভাঙার এজেন্ডা নিয়েছেন রেজা কিবরিয়া

নুরুল হক নুর। ছবি: সংগৃহীত

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৩ | ২২:৫৭

গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেছেন, ড. রেজা কিবরিয়া বড় হয়েছেন বিদেশের মাটিতে। ফলে দেশের রাজনীতি, আন্দোলনের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা কম। এটাকে কাটিয়ে উঠতে তিনি চেষ্টা করেননি। এখন তিনি সরকারের ফাঁদে পা দিয়েছেন। সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিতর্কিত সংগঠন ও ব্যক্তির সঙ্গে মিশে বিএনপি ভাঙার প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছেন।

গণঅধিকার পরিষদ ভাঙনের মুখে পড়ার মতো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে দলটির সদস্য সচিব নুরুল হক নুর এসব কথা বলেন। এর আগে সোমবার দলের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া সমকালকে সাক্ষাৎকারে ভিপি নুরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন।

নুর বলেন, বিতর্কিত জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে পুরো গণঅধিকার পরিষদকেই তিনি বিপদে ফেলতে চাচ্ছেন। রেজা কিবরিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং আগামীতে তাঁর নেতৃত্বাধীন দল বা প্ল্যাটফর্ম ক্ষমতায় যাবে বলে মনে করছেন। এর মধ্যে তিনি মনোনয়ন বিক্রি শুরু করেছেন। দলকে বিতর্কিত করছেন এবং আমাদেরও অসম্মানিত করছেন। একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি নিয়েও কথা বলেছেন নুরুল হক নুর।

সমকাল: ড. রেজা কিবরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রেক্ষাপট কী?

নুরুল হক নুর: আমরা যেসব দলকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এড়িয়ে চলি, সেসব দল ও সংগঠনের সঙ্গে ড. রেজা কিবরিয়া গোপনে মিটিং করেন। বিএনপির সঙ্গে আমরা যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে রয়েছি। অথচ বিএনপিকে ভাঙার যে প্রক্রিয়া, তার অংশ হিসেবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া জনৈক মাসুদ করিম বা এনায়েত করিম ব্যাংকক ও কাঠমান্ডুতে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করছেন। সেসব বৈঠকে রেজা কিবরিয়া নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। এই এনায়েত করিম কিংবা মাসুদ করিমরা চাচ্ছেন বাংলাদেশে যেন সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে না ওঠে। এমনকি বিএনপিমনা ও ঘরানার শওকত মাহমুদদের দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। যার অংশ হিসেবে শওকত মাহমুদ প্রায় সময় ঢাকায় ইনসাফ কায়েম কমিটির নামে কর্মসূচি পালন করেন। রেজা কিবরিয়া মনে করছেন, আগামীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন দল কিংবা প্ল্যাফর্ম ক্ষমতায় যাবে। এ জন্য তিনি গণঅধিকার পরিষদের মনোনয়নও বিক্রি শুরু করে দিয়েছেন। এসব কারণে আমাদের মনে হয়েছে, এবার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সমকাল: দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল কিনা?

নুরুল হক নুর: যেখানে গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক হয়েও যিনি মাসুদ করিম বা এনায়েত করিমের ইন্ধনে দল ভাঙার পরিকল্পনা করছিলেন, সেখানে সমাধান অনেকটা দুঃসাধ্য। তিনি এর আগে ২৬ বছরের পুরোনো গণফোরামকে ভেঙেছিলেন। গণঅধিকার পরিষদকেও তিনি সেদিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেজন্য এ রকম বিপজ্জনক ব্যক্তির কাছ থেকে দলকে রক্ষার ভিন্ন উপায় ছিল না।

সমকাল: ইনসাফ কায়েম কমিটিতে সক্রিয় থাকার ইস্যু ছাড়াও বিগত এক-দেড় বছর রেজা কিবরিয়া গণঅধিকার পরিষদের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ছিলেন না। অভিযোগ আছে, আপনি এককভাবে দলের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তিনি দলে কোণঠাসা ছিলেন।

নুরুল হক নুর: কোণঠাসার বিষয়টি সঠিক নয়। মূলত, রেজা কিবরিয়া মনে করেছেন, বাংলাদেশে একমাত্র তিনিই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি, শিক্ষিত ব্যক্তি। কাজেই সবাই তাঁকে নেতা বানিয়ে দেবেন। এ কারণে তিনি দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না।

সমকাল : রেজা আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগে এনেছেন এর মধ্যে রয়েছে– ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টের সঙ্গ বৈঠক, দলীয় ফান্ডের হিসাব না দেওয়া, পদ-পদবি বিক্রি ও প্রবাসে কমিটি-বাণিজ্য ইত্যাদি।

নুরুল হক নুর: প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মতো গণঅধিকার পরিষদের দলীয় ফান্ড দেখভালের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি আর্থিক কমিটি রয়েছে। সেখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই। যখন তাঁকে বহিষ্কার করা হলো, তখন তিনি এসব অমূলক অভিযোগ তুলছেন, আগে কেন বলেননি। আর ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেখানে আমি কীভাবে তাদের সঙ্গে বৈঠক করব।

সমকাল : রাজনীতিতে নতুন দল গণঅধিকার পরিষদ শেষ পর্যন্ত ভাঙনের মুখে পড়েছে কি?

নুরুল হক নুর: নতুন একটা দলকে স্থায়ী করতে, প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রেজা কিবরিয়া আসলে সেরকম রাজনৈতিক লোক নন। আমাদের সিলেকশনটা ভুল ছিল। তবুও ভালো, দল গঠনের এক-দেড় বছরের মধ্যে আমরা সেটা বুঝতে পেরেছি। এখন সেটা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসলে ‘এক গাছের ছাল, আরেক গাছে জোড়া লাগে না।’

সমকাল: গণঅধিকার পরিষদে এই টানাপোড়েনের সঙ্গে বাইরের কোনো ইন্ধন আছে কিনা?

নুরুল হক নুর: থাকতেই পারে। সরকার তো বিরোধী দল ও জোটের মধ্যে ভাঙন কিংবা ফাটল ধরাতে তৎপর রয়েছে। এখানে রেজা কিবরিয়ার একটা সমস্যা হচ্ছে, তিনি তো বাইরে ছিলেন। তাই দেশের সামাজিক ও রাজনীতি বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা কম। এখন তিনি শওকত মাহমুদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। যে শওকত মাহমুদকে বিএনপি বহিষ্কার করেছে। এদিকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে আছে গণঅধিকার পরিষদ। সেখানে তিনি ইনসাফ কমিটির কর্মসূচিতে আছেন। এর মাধ্যমে এটা পরিষ্কার, রেজা কিবরিয়া ভুল পথে আছেন। সেই জায়গায় সরকারের ইন্ধন থাকতে পারে। আবার তাঁর রক্তেই তো আওয়ামী লীগ। তাঁর বাবা আওয়ামী লীগ করতেন। তিনিও একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করেছেন।

সমকাল : দল নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

নুরুল হক নুর: বাংলাদেশে একটি ব্যতিক্রমী দল হিসেবে গণঅধিকার পরিষদকে গড়ে তুলতে চাই। গত পৌনে দুই বছরে দলের কাউন্সিল করতে পারিনি। দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারিনি। এখন সব উদ্যোগ নেব।

সমকাল: গণঅধিকার পরিষদের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন সরকারবিরোধী চলমান আন্দোলনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা?

নুরুল হক নুর: এ রকমটা হবে না। কারণ, রেজা কিবরিয়া কখনোই এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। সুতরাং দল থেকে তাঁর চলে যাওয়ায় আমাদের দলীয় কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সমকাল: মার্কিন ভিসা নীতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা, কিংবা আগামী নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে কি?

নুরুল হক নুর: মার্কিন ভিসা নীতিতে এ দেশের রাজনীতিতে প্রভাব পড়ছে– এটা শতভাগ সত্য। এটা এক ধরনের মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো হয়েছে। অর্থাৎ, আমরা দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি করে আসছি, সেটারই প্রতিফলন ঘটেছে এই মার্কিন ভিসা নীতিতে। নির্বাচনের সময় বিরোধী দলের প্রার্থীর ওপর হামলা করা, নেতাকর্মীর নামে গায়েবি মামলা, কারাগারে নেওয়া, ভোট কারচুপি করা– এর সবকিছুই ভিসা নীতিতে বলা হয়েছে। এটা শুধু সরকারই নয়, নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের বিষয়েও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন