ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

অধমর্ণের জবানবন্দি  

প্রচ্ছদ

অধমর্ণের জবানবন্দি  

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

তুলনামূলক সাহিত্যালোচনার ক্ষেত্রে অন্যতম বিচার্য বিষয় হয়ে ওঠে একজন লেখকের ওপর অন্য লেখকের প্রভাব। একজন লেখক কেবল অন্য লেখক দ্বারা প্রভাবান্বিত হন তা নয়। তাঁকে প্রভাবান্বিত করতে পারে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সাহিত্যিক ঐতিহ্য, প্রচলিত রচনাধারা অথবা চলমান সাহিত্য-আন্দোলন। তিনি যেমন সাম্প্রতিক ধারার বশ্যতা মেনে নিতে পারেন, অন্যদিকে কর্ষণের জন্য তিনি নতুন শস্যক্ষেত্র আবিষ্কারে উদ্যোগী হয়ে উঠতে পারেন। পৃথিবীজুড়ে সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক মহান কবি এবং সাহিত্যিকের উদ্ভব হয়েছে, প্রচলিত রচনারীতির বিপরীতে নতুন কিছু সৃষ্টির অভিপ্রায় যাদের তাড়িত করেছে। ​এই অভিপ্রায় লক্ষিত হয় কবি-সাহিত্যিকদের বিষয় নির্বাচনে এবং রচনাকৌশলে।

 ১৯৩০-এর দশকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার গোড়াপত্তন করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে। উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য এদের হাতে নতুন দিগন্তের ইশারা পেয়েছিল। এরা ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের তন্নিষ্ঠ পাঠক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদে পশ্চিমের কবিতায় আধুনিকতার উন্মেষ এদের নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে আধুনিক বাংলা কবিতার জন্মলগ্নেই ইউরোপীয় ও মার্কিন কাব্যের অনপনেয় ছায়াপাত হয়েছে। তবে এরা কেউ পরজীবী ছিলেন না। পরজীবিতার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়নি কখনও। অন্যদিকে ইউরোপীয় ও মার্কিন কাব্যের কাছে তাদের যে ঋণ তা উপেক্ষণীয় নয়। কবি জীবনানন্দ দাশকে এলিয়ট, ইয়েটস, পাউন্ড ঘরানার একজন কবি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে জীবনানন্দ সর্বাংশে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিলেন।  ২. আমার লেখকজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। ​বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমি নানা রকম কাজ করেছি। ​১৯৮৯ সালে আমার কাছে মনে হলো, ১৯৫৪ সালে কবির অকাল প্রয়াণের পর ১৫টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে ‘কবিতার কথা’ প্রকাশিত হলেও এ বইটির বাইরে অনেকগুলো প্রবন্ধ-নিবন্ধ রয়েছে, যেগুলো তদাবধি কোনো গ্রন্থে সংকলিত হয়নি। ​এই পর্যবেক্ষণ আমাকে জীবনানন্দ দাশের সকল প্রবন্ধ-নিবন্ধ দু’মলাটের ভেতর সংকলনে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে ​১৯৯০ সালের বইমেলায় প্রকাশ করি ‘জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র’। অভিন্নরূপ প্রণোদনা থেকে কবি জীবনানন্দ দাশের তিনটি কবিতার বিভিন্ন আলোচনা নিয়ে তিনটি পৃথক সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করি। ​কবিতা তিনটি হলো– ‘আট বছর আগের একদিন’, ‘গোধূলি সন্ধির নৃত্য’ এবং ‘মৃত্যুর আগে’।  তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুতেই উপলব্ধি করি জীবনানন্দের একটি পত্রসংকলনের গ্রন্থনা ও প্রকাশনার সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘকাল বিদেশে অবস্থানের কারণে কাজের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র’। এটি ছিল ১০১টি চিঠির সংকলন। ​ ১৯৯৩ সালে আমি যখন চট্টগ্রাম শহরে কর্মরত তখন শিল্পী খালেদ হাসান উন্নতমানের প্রডাকশনে একটি গ্রন্থ প্রকাশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। আমি তাঁকে বলি, জীবনানন্দ দাশের বেশ কিছু কবিতা বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে; কিন্তু সেগুলোর কোনো সংকলন গ্রন্থ পাওয়া যায় না। খালিদ হাসান সম্মত হলে তাঁর ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কশপ থেকে ১৯৯৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় ‘পোয়েমস ফ্রম জীবনানন্দ দাশ’। জীবনানন্দ দাশের ইংরেজিতে লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা কুড়িটির বেশি। ​এগুলো দু’মলাটের ভেতর গ্রন্থবদ্ধ করার সুযোগ ছিল। ​এই প্রেরণা থেকে নতুন একটি পাণ্ডুলিপির জন্ম হয়, যার শিরোনাম ‘অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার’। বলা বাহুল্য, এ সবই ছিল শূন্যস্থান পূরণের উদ্যোগ।  জীবনানন্দ বিশেষজ্ঞ কবি ভূমেন্দ্র গুহ ২০০৬ সালে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ডায়েরি লেখার ছয়টি খাতা অবিকল মুদ্রণ করে প্রকাশ করেন। তাঁর এই উদ্যোগের অনুবৃত্তিক্রমে আমি প্রকাশ করেছি ‘জীবনানন্দ দাশের একত্রিশ নম্বর কবিতার খাতা’। এই কাজটি কঠিন ছিল, কারণ জীবনানন্দ দাশের হাতের লেখা এতকাল পরে পাঠোদ্ধার করে তাঁর পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি স্থাপন করা খুব চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল। উল্লেখ্য, কলকাতায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে জীবনানন্দ দাশের ৪৮টি কবিতার খাতা রেয়ার বুক সেকশনে সুসংরক্ষিত আছে।  ৩. পুস্তক প্রকাশনার ক্ষেত্রে গবেষণা আমার একটি প্রিয় অধিক্ষেত্র। ​১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত যশোর, সাতক্ষীরা, বেনাপোল ইত্যাদি সীমান্ত এলাকায় কাজ করেছি আমি। ​সেই সুবাদে কলকাতা থেকে প্রকাশিত পর্নো বা চটি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ​১৯৯৩-৯৪ পর্বে চট্টগ্রামে কাজ করার সময় বাংলাদেশে লিখিত এবং বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত পর্নো বা চটি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ​এ সময় আমার মনে হয় যে পূর্ব বাংলার চটি সাহিত্য এবং পশ্চিম বাংলার চটি সাহিত্যের মধ্যে নানা বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ​পৃথিবীতে পর্নোগ্রাফি নিয়ে গবেষণার সংখ্যা অপ্রতুল। ​বিশেষ করে ওই সময়ে কনটেন্ট অ্যানালাইসিস একটিও ছিল না। ১৯৯৪-৯৫ সালে কলকাতায় লিখিত ও প্রকাশিত পাঁচশ চটি গল্প এবং বাংলাদেশে লিখিত ও প্রকাশিত আরও পাঁচশ চটি সাহিত্যের মধ্যে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি। ​পাণ্ডুলিপির নাম দিই ‘চটি সাহিত্যের পূর্ব-পশ্চিম’। ​বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় দীর্ঘদিন তা প্রকাশ থেকে বিরত থাকি। ​একটি সংক্ষিপ্ত ও ভদ্রস্থ সংস্করণ ২০১৪ সালে ‘আমাদের সময়’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ভবিষ্যতে এটি পুস্তকাকারে প্রকাশের প্রশ্নটি বিবেচনায় আছে। ৪. বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অন্য অনেকের মতো দু’চারটি গল্প লিখেছি। সেটা সত্তর দশকের শেষ দিককার কথা। ​পরবর্তীকালে গল্প বা উপন্যাস লেখার কোনো অন্তরপ্রেরণা দীর্ঘকাল নিজের মধ্যে অনুভব করিনি। ​তবে বিশ্বসাহিত্য থেকে মাঝেমধ্যে অনুবাদ করেছি।​ ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নারীবাদী লেখিকা নোবেল পুরস্কার লাভ করার পর তাঁর গল্প অনুবাদ করি। ​লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়ার সময় ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে দেখি টাইমস লিটেরেরি সাপ্লিমেন্টে ‘অভিলাষ টকিজ’ নামে একটি গল্প ছাপা হয়েছে। ​লেখিকার নাম অরুন্ধতী রায়। ​ভারতীয় এই লেখিকা ইংরেজি ভাষায় লিখে থাকেন। ​তাঁর ইংরেজি ভিন্ন স্বাদের অন্যরকম ইংরেজি। ​‘অভিলাষ টকিজ’ খুব ভালো লেগেছিল। তাই সেটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করি। ​কলম্বিয়ান নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গার্সিয়া মার্কেস ২০১৪ সালে পরলোক গমন করলে তাঁর অপ্রকাশিত লেখার সন্ধানে নেমে পড়ি। ​একটি স্প্যানিশ পত্রিকায় পাওয়া যায় একটি গল্প, যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। হিস্পানি ভাষায় গল্পটির শিরোনাম ছিল ‘এন আগোস্তো নোস ভেমোস’। বাংলায় অনুবাদ করে সেটি ‘আগস্টে আবার দেখা হবে’ শিরোনামে প্রকাশ করি। এরকম ​অন্তত ত্রিশটি অনূদিত গল্প গ্রন্থাকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। ​গল্পগুলো উচ্চমানের এবং বাংলাদেশের পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করা দরকার এরকম একটি পরোপকারী মনোবৃত্তি থেকে এগুলো অনুবাদ করেছিলাম। ৫. ২০১৯ সালে কবি মাহবুব আজীজ আমাকে গল্প লেখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। ২০১৯ সালে ‘এই শ্রাবণে পরবাসে’ নামে একটি গল্প লিখে ফেলি। এই গল্পটির মূল বিষয় ছিল নারী-পুরুষের দাম্পত্য সম্পর্ক। ​কোনো একটি ভারতীয় ছবিতে একটি সংলাপ ছিল এরকম– ‘রিশ​তা টুট যাতে, আধিকার নেহি যাতে’। বিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে বিচ্ছেদ হওয়ার পরও যে পারস্পরিক সম্পর্ক অন্তর্লীন থেকে যায়, সে বিষয়টি ছিল এ গল্পটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য।  গল্পটি প্রকাশের আগে আমি যত্নের সঙ্গে সম্পাদনা করেছি। প্রকাশের পর খুব মনোযোগ দিয়ে গল্পটি বারবার পড়েছি, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অপ্রয়োজনীয় বাক্য চিহ্নিত করা এবং কোনোরূপ ফাঁকফোকর থেকে থাকলে তা নিরূপণ করা। ​এ ছাড়া গল্পটির কাঠামো, বর্ণনারীতি, সংলাপ ইত্যাদির মধ্যে ভারসাম্য আছে কিনা তা পরীক্ষা করা। ​এহেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া গেল যে গল্প ভালোই লেখা হচ্ছে, কাহিনি আকর্ষণীয় হচ্ছে, বিষয়বস্তু গুরুত্ববহ হচ্ছে। ​একদিকে থাকছে বিনোদন, যা সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য; অন্যদিকে থাকছে বাস্তবজনোচিত চিন্তার খোরাক। সুতরাং মনে মনে এই আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয় যে গল্প লেখা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এখানে বলে রাখতে চাই, সাহিত্য সমালোচনার ভাষাভঙ্গির জন্য আমি পণ্ডিত শিবনারায়ণ রায়ের কাছে ঋণী। ১৯৭৮-এ পড়া তাঁর ‘কবির নির্বাসন ও অন্যান্য ভাবনা’ শিরোনামীয় গ্রন্থটি আমাকে সাহিত্য সমালোচনা ও প্রবন্ধের ভাষা নির্বাচনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে আমি সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের কাছে ঋণী।  উপন্যাস বা গল্প লেখার ক্ষেত্রে কুম্ভিলকবৃত্তি আগেও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু সেটা আমার পেশা নয়। তবে বিশ্বসাহিত্যের কোনো কোনো গল্প ও উপন্যাস আমাকে নতুন বিষয়বস্তু নতুন কাঠামো নতুন রচনাশৈলীর দিকে ইঙ্গিত করেছে। সে ইঙ্গিত আমি গ্রহণ করেছি মাত্র। যেমন আমার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কক্সবাজার’-এ একটি নৈশ রেস্টুরেন্টের প্রসঙ্গ আছে। রাত্রিকালীন রেস্টুরেন্টের কথা মনে পড়েছে মুরাকামির ‘আফটার ডার্ক’ উপন্যাস থেকে।  নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে, বিশেষ করে দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে আমার মনে যে কৌতূহল রয়েছে তা অতলান্তিক। এ বিষয়ে গতানুগতিকতার বাইরে নতুন গল্প লেখার আগ্রহ জেগে উঠলে ​লিখে ফেলি একটি গল্প, যা ‘মেয়াদী বিবাহ’ নামে পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়। বিয়ে নারী ও পুরুষের এমন একটি বন্ধন, যার উদ্দেশ্য বিচ্ছেদ নয়। এই প্রত্যয়ে, ​নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ে কোনো কার্যকর প্রস্তাব হতে পারে কিনা, সে প্রশ্নটি বিবেচনা করাই ছিল এ গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। কিছু দিন পর বয়স্ক ব্যক্তির প্রতি তরুণী নারীর আকর্ষণ নিয়ে একটি গল্প লেখার কথা মাথায় আসে। ​গল্প লেখা শুরু হয়। লেখালেখির একটি অন্তর্গত ডায়নামিক্স আছে। লেখা শুরুর পর পাত্রপাত্রীরা যে কী করবে তা সবসময় আগে থেকে প্রেডিক্ট করা যায় না। এ গল্পটি লেখার সময় একপর্যায়ে গল্পের গতিধারা বদলে যায়; যার কারণে গল্পটির শিরোনাম রেখেছিলাম ‘আপনার বান্ধবীকে কি আজ সন্ধ্যার জন্য ধার পেতে পারি?’ শিরোনামটি চিত্তাকর্ষক হয়েছিল। এ শিরোনামের জন্য আমি গ্রাহাম গ্রিনের কাছ ঋণী। এ গল্পে নানাবিধ যৌনানুষঙ্গ নিয়ে অনেকের অভিযোগ ছিল। মানুষের জীবনের যৌনতার অনুষঙ্গ আমার মনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যৌবনের শুরুতে হেনরি মিলারের ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’, ‘ট্রপিক অব ক্যাপ্রিকর্ন’, ‘আন্ডার দ্য রুফ অব প্যারিস’ ইত্যাদির পঠনপাঠন সেসব প্রশ্নকে উসকে দিয়েছে। তাই গল্প-উপন্যাস লিখতে গিয়ে যৌন প্রসঙ্গের উৎপাত ঠেকাতে পারি না। একবার কবি মাহবুব আজীজ একটি রহস্যগল্প লেখার জন্য তাগাদা দিলেন। আমি একটি খুনের গল্প মুসাবিদা করলাম। লেখার পর রিভিউ করতে গিয়ে ​বিচারে খুনির ফাঁসির রায় হবে এরকম সময়ে হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীকে আমদানি করে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিলাম। ​তাতে গল্পের কাঠামো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ল। এ সময় মনে পড়ল দীর্ঘকাল আগে পড়া একটি উপন্যাসের কথা, যার শিরোনাম ‘আমস্টারডাম’;​ লেখক ইয়ান ম্যাকইয়ান। ​এই উপন্যাসে দুই বন্ধুর একত্রে আত্মহত্যার কাহিনি ছিল।​ আমিও রহস্যগল্পের মধ্যে খুনের বদলে যুগপৎ আত্মহত্যার কাহিনি ঠেসে দিলাম। দু’জনের একসঙ্গে রাত দশটায় বিষপানের কথা। যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ তিনি রাত দশটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে একপর্যায়ে বিষ না-খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লেন। যিনি বয়োকনিষ্ঠ তিনি সময়মতো বিষ পান করে মারা গেলেন। ​ফলে বয়োজ্যেষ্ঠের ওপর খুনের দায় চাপানো হলো। কিন্তু রায় ঘোষণার আগে আগে হুমায়ূন আহমেদের ​মিসির আলী স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আদালতে এসে বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি খুনি নন আদৌ। ​ ৬. ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে খুব ভালো গল্প লেখা হয়েছে এরকম দাবি করা অসত্য ভাষণ হবে। হুমায়ূন আহমেদের গল্প ও উপন্যাসগুলো ব্যতিক্রম। ​আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি গল্প লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং সেখানে দেখাই যে, শত্রুর প্রতি গুলিবর্ষণের আগে মুক্তিযোদ্ধা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ​গল্পের নাম ‘প্রথম গুলির নিশানা’। ​যারা হাসান আজিজুল হকের ‘শত্রু’ গল্পটি পড়েছেন তারা হয়তো বুঝবেন যে আমি এ গল্পটি দ্বারা কিঞ্চিৎ অনুপ্রাণিত হয়েছি। তবে গল্প দুটি আদৌ যমজপ্রতীয় নয়। আমার গল্পটি ইয়েটসের ‘দ্য ক্যাট অ্যান্ড দি মুন’ জীবনানন্দের ‘বেড়াল’ হয়ে ওঠা নয়। বরং এডগার এলেন পো’র ‘টু হেলেন’ কবিতাটি ‘বনলতা সেন’ হয়ে ওঠার মতো।  মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার দ্বিতীয় গল্পের নাম ‘১৯৭১’। ​এখানে গল্পের পাত্রপাত্রীরা প্ল্যানশেট করে নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করে। ​কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং প্ল্যানশেট চর্চা করেছেন বলে কথিত আছে। ​আমার গল্পের প্ল্যানশেটে রবীন্দ্রনাথকে ডেকে আনা হয়। ​তাঁর সঙ্গে কথোপকথন বেশ ‘ইন্টারেস্টিং’ হয়েছিল বলে অনেক পাঠক আমাকে জানিয়েছেন। ঘটনাকে ‘ইন্টারেস্টিং’ করে পরিবেশনার শিক্ষা পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে।  ৭. উপন্যাসে আমার প্রথম উদ্যোগ ছিল দুর্দানা খানের চিঠি। ​এর মূল প্রণোদনা ছিল এই যে, ২০১৭ সালে আমেরিকাপ্রবাসী বাঙালি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ​অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভের পর তাঁর প্রথমা স্ত্রী নবনীতা দেবসেন ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি অভিনন্দনসূচক নিবন্ধ লিখেছিলেন। কিছুটা তাঁরই প্রভাবে আমি এ উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় রচনা করি। ​অচিরেই আমি উপর্যুক্ত সূচনাংশকে একটি চিঠিতে রূপান্তর করি ফেলি, যেখানে হুমায়ূন আহমেদের প্রথমা স্ত্রী দীর্ঘকালের নীরবতা ভঙ্গ করে প্রাক্তন স্বামীকে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে অভিনন্দন জানাচ্ছেন চিঠি লিখে। ​প্রথম চিঠি লিখবার পর আমি পুরো উপন্যাসটিকে চিঠির-উত্তরে-চিঠি দিয়ে সাজানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এ বিষয়ে আমি সম্ভবত ইসরায়েলি লেখক অ্যামস ওজ-এর নিকট ঋণী। ​১৯৯৭ সালে লন্ডনে একটি পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে দুই পাউন্ডে কেনা ‘ব্ল্যাক বক্স’ শিরোনামীয় উপন্যাসটি আমাকে এহেন কাঠামো নির্বাচনে উৎসাহিত করে থাকবে। ৮. সাম্প্রতিককালে ঈদসংখ্যার জন্য একটি উপন্যাস লিখি, যার নাম ১৯৭১। ​মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ আমি পাইনি কম বয়সের কারণে। ​একই কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ইতিহাস কম জেনেছি। ​মুক্তিযুদ্ধেকে নানা দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আলোকপাত করা যায় এবং করা হয়েছে। ​যুদ্ধ একটি ঘটনা বা প্রেক্ষাপট, যার মধ্য দিয়ে মানুষের চরিত্র নতুন আঙ্গিকে চিত্রায়িত করা সম্ভব। ​মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লিখতে গিয়ে আমি এই কথাটি মনে রেখেছি। ​আমাকে একটি রণাঙ্গন বেছে নিতে হয়েছে। ​যশোর নাভারন বেনাপোল সাতক্ষীরা কর্মসূত্রে আমার পরিচিত জায়গা। ​এই জায়গা বেছে নিতে আমাকে সাহায্য করেছে মেজর হাফিজের ‘রক্তেভেজা একাত্তর’ বইটি। ​উপন্যাস কখনও ইতিহাস গ্রন্থ হতে পারে না। ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব ইতিহাস রচনা নয়। ​হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’ রচনা করে দেখিয়েছেন কী করে সময়কে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ধারণ করা যায়; কী করে নানা মানুষের বিচিত্র চরিত্র নানাবিধ কার্যকলাপ এবং আচরণের মধ্য দিয়ে চিত্রায়িত করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে বাস্তব ঘটনা থাকবে কিন্তু সর্বোপরি উদ্দেশ্য হবে বিচিত্ররূপ মানুষের চরিত্র বিশ্বাসযোগ্যভাবে পাঠকের সামনে উন্মোচিত করা। ​যুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাস পড়া ছিল। ​সেগুলো নতুন করে একবার পড়েছি। ​যার মধ্যে রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ও ছিল।  ​কিন্তু এসব গ্রন্থের কাছে আমার ঋণ শূন্য বা সামান্য। ​আমি বাস্তবের প্রেক্ষাপটে কল্পনার শক্তিতে গল্প রচনা করেছি। কাউকে অনুসরণ করতে হয়নি। ​ ৯. আমার সত্তার মধ্যে একজন গল্পকার বসবাস করে তা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। আমি লিখতে পারি এই আত্মপ্রত্যয় উদ্বোধনের পর ​আমি ভালো গল্প লিখতে চেয়েছি, ভালো উপন্যাস লিখতে চেয়েছি। ​আমি নতুন রকমের গল্প লিখতে চেয়েছি, যেরকম গল্প বাংলা ভাষায় এযাবৎকাল লেখা হয়নি। এজন্যে গত দশ বছরে প্রকাশিত এবং প্রসিদ্ধ বেশ কিছু গল্প আমি গত পাঁচ বছর একে একে মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। ​ সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ আমার লেখকসত্তা পরিগঠন করেছেন। মুরাকামির কাছে আমি ঋণগ্রস্ত হয়েছি, কারণ তিনি দেখিয়েছেন কী করে কথার পিঠে কথা দিয়ে গল্পের পরিসর আকর্ষণীয়ভাবে বিশদ করা যায়। ​অস্কার ওয়াইল্ডের কাছে আমি ঋণী, কারণ তিনি শিখিয়েছেন, লিখলেই হবে না, সাহিত্য সমালোচনা হোক কিংবা গল্প-উপন্যাস হোক, তাতে উদ্ধারণযোগ্য বক্তব্য থাকতে হবে। আয়ু দীর্ঘায়িত হলে আমি আরও গোটা কুড়ি গল্প ও গোটা তিনেক উপন্যাস লিখতে চাই। সম্পূর্ণ নতুন রকম গল্প। এরকম গল্প আমি কয়েকটি লিখেছি, যেমন– ‘আফজালুর রহমানের জন্মতারিখ’, ‘গাছের ছায়া’, ‘লম্বা দাড়ি রাখার পাঁচটি কারণ’ এবং ‘কেবিন নম্বর ৪৫১’।  

আরও পড়ুন

×