প্রচ্ছদ

জাঙ্গলিক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ণালী সাহা

তোমার খবর পেলাম টোপ বাহাদুরের কাছে, মেজদা, ঠিক শেষ শটে যখন কমলেশদা দাঁড়িয়ে ছিলেন দুটো শালগাছের মাঝখানে—এটাই আমার শেষ শট; শ্যুটিং তো আগেই প্যাক-আপ হয়ে গেছে—আর জানলাম আমার ওপর তোমার নাকি বেজায় রাগ, কারণ আমি নাকি 'হারামখোর' আর থিয়েটারের ঋণ ভুলেই গেছি, আর তোমার ঋণের কথাও কাউকে বলি না আর মা নাকি তোমায় বলেছে আমার জন্য মেয়ে দেখতে, অর্থাৎ এমনকি মা'ও মনে করে তুমি ছাড়া আমি অচল। একটা মিনিট দাঁড়াও মেজদা—শ্যুটিংয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়াবার (তোমাদের পূর্ববঙ্গের ভাষায় 'দুই পাও একত্র করার') ফুরসত পাচ্ছি না, বুইলে তো- সবটুকু খোলাসা করে বলছি তোমায়। তার আগে বল, তোমার বড়দাদা যে সেনিলিটিতে ভুগছিলেন—ওঁর অবস্থা কী আজকাল? উৎপলদার দলে রদবদল হলো কিছু? গ্রুপ থিয়েটার করে গণআন্দোলন জমানোরই-বা কতদূর? পার্টি নাকি আবার ভাঙছে? চারুদা-কানুদা নাকি এবার M-এর পরে L লাগাচ্ছেন? উৎপলদাও নাকি 'বন্দুকের নল শক্তির উৎস' বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন? তা উনি পার্টির পোস্টার বয় যতদিন আছেন, ততদিন ওঁর এসব তামাশা তো দেখে যেতেই হবে।
যাক‌! এবার লাঞ্চের ব্রেক—এবার বলি শোনো, মেজদা—তোমার ঋণ কী করে ভুলি বল তো? কী করে ভুলি সেই যে তোমার শাশুড়ি ওঁর ট্যাক্সিতে কার যেন ভুলে ফেলে যাওয়া ক্যাননেট QL17 কুড়িয়ে পেয়ে তোমার হাতে দিলেন, আর তুমি সবার আগে ভাবলে আমার কথা, ভাবলে 'সুবিমলটা ফোটোগ্রাফির ম্যাগাজিন জমায়, ওকে দিই গে'—নোনাধরা দেয়ালের মেসের ঘরে তখন রাজ্যের অ্যালমানাক অভ ফোটোগ্রাফিক জার্নালের পুরোনো কপি, তাই দিয়ে তুমি দরজার তল দিয়ে আসা জল আটকাতে আর আমি মেজাজ দেখাতাম—তারপর আমার হাতে ক্যামেরাটা গছিয়ে দিয়ে বললে 'শোন বাবু, আমার কিছু দেনা ছিল তোর কাছে—জানিস‌ তো? ওটা ভুলে যা'—কী মারাত্মক ভালো ক্যামেরা ছিল ওটা বল? কুইক লোড, অটো এক্সপোজার—আর লেন্সের কী স্পিড বাওয়া!— কী করে ভুলি মাল খেয়ে একদিন আমায় বলেছিলে 'থিয়েটার কইরা কী হইব? তুই ফিল্মে ট্রাই কর‌ গা!', আর কী করে ভুলি তুমি বলেছিলে সিনেমার বন্ধুদের কাছ থেকে বাড়তি কাটপিস ফিল্ম মানে রোলের ক্যানের শেষ অংশটুকু এনে আমায় দেবে, কারণ ফিল্ম কেনার পয়সা নেই আমার, আর কী করে ভুলি কমলেশদার (তখনো আমার কাছে পদ্মভূষণ কমলেশ রায়) ছবির লোকেশনে মজা দেখতে গিয়ে সেই যে একটা ছবি তুলেছিলাম তোমার দেওয়া ক্যামেরাটা দিয়ে—সেই যে গাছের তলে রাখা একখানা ঢোলের ছাউনির উপর জল পড়ছিল পাতা বেয়ে, আর তাতে একটা নিবিড় 'ছ্‌ঢম-ছ্‌ঢম-ঢম-ঢম-ছ্‌ঢম' বোলে বেজে উঠছিল ঢোলটা—তাতেই আমার জীবনের খেলা ঘুরে গেল? গড়িয়াহাটে সেই যে ছবি ডেভেলপ হলো, আর তুমি সেই ফোটো দেখে আমার গালে চুমু খেয়ে বসলে, আর তাস খেলতে খেলতে তোমার ইয়ারদোস্তদের কাছে বললে 'ছেলেটার কম্পোজিশন শেন্স দারুণ!', আর ওদের মাঝে কমলেশদার ইউনিটেরই একজন ছিল যে কিনা আমায় নিয়ে গেল কমলেশদার কাছে, আর গিয়ে আমি ওঁকে বোকার মতো বলে বসলাম—'আমি থিয়েটার করি। আমায় আপনার ছবিতে পার্ট দিন', আর উনি আমার তোলা ছবি হাতে নিয়ে হেসে পিঠ চাপড়ে বললেন, 'আপনি দেখছি আমার অ্যাঙ্গেল মেরে দিয়েছেন! ছবি তুলুন, মশাই, ছবি তুলুন'—সেসব কথা ছবির চেয়েও পষ্ট মনে আছে আমার, মেজদা। তুমি তো আমার আপন দাদা নও— কলকাতার সক্কলের 'মেজদা'—সেই কথা ভুললেও চলবে কেন?
'উনি বললেন শালশা নাচের শিনটা কলকাতায় গিয়ে আগের ক্যামেরাতেই শ্যুট‌ করতে হবে'—আমার দিকে খাবারের বাকসো বাড়িয়ে দিতে দিতে এইমাত্র জানাল মানিক, মানে সিনেমাটোগ্রাফারের অ্যাসিস্ট্যান্ট। রবারের সাপের মতো ঠান্ডা হাত মানিকের—হাতের পাতা সবসময় ঘামে ভেজা। কমলেশদার বই মানেই মানিকের টেনশন। চারজন যুবক, দুটো যুবতী মেয়ে—তার মধ্যে একটি অকালবিধবা—একটি মেয়ের বাবা, আর একটি সাঁওতাল মেয়ে নিয়ে ছবির গল্প; ছবির নাম 'জাঙ্গলিক'। গাড়ির ভেতর থেকে দুই নায়িকা শব্দ করে মাত্রই হেসে উঠল। দুই নায়িকা বলতে সাঁওতাল মেয়েটি আর দুই যুবতীর একজন—এই দুটো রোলে কমলেশদা যাদের নিয়েছেন, তাদের কথা বলছি, বুইলে? তো তারা আবার পুরোনো বন্ধু। সাঁওতাল হয়েছে—বললে বিশ্বাস করবে না—রাজকাপুরের আবিষ্কার, বম্বের রেশমা। আরেক নায়িকা ওর বান্ধবী, তোমার অতি প্রিয় সঙ্গীতা—'অভিপ্রায়', 'অতলের অভিসার', 'করিম মাঝির সংসার' এইসব ছবির হিট নায়িকা সঙ্গীতা—তা সঙ্গীতা তো আর সঙ্গীতা নয়, বেগম খানবাহাদুর; মাস তিনেক আগে ছোট নওয়াবকে বিয়ে করেছে কিনা! তা আমার মতো গাছের সাথে মিশে থাকা অংশত-পাতা-অংশত-বাঁদর ফটোগ্রাফারকে চেনার ওর দায় পড়েনি, তবু শুনি গালভরা কথা বলায় নাকি জুড়ি নেই ওর—ওর ক্রিকেটার বর নাকি কোন‌ ম্যাচে বোলিং-এর সময় আম্পায়ারকে হেঁকে বলেছিল 'হাউ'জ দ্যাট', আর আম্পায়ার নাকি মৃদুস্বরে জবাব দিয়েছিল, 'হুজুর, ওটা তো আউট নয়!'। যতসব গালগপ্পো। ইউনিটে তো সবাই এই নিয়েও হাসাহাসি করে যে, ছোট নওয়াব তার বেগমের মন জোগাতে গালিবের শের নিজের নামে চালিয়ে দিত, আর বেগম ভাবত 'আহা, আমার স্বামীর যেমন প্রতিভা, তেমন প্রেম'। মাগিটা ছিল যেমন বোকা, তেমন হিংসুটে। তোমাদের পূর্ববঙ্গের ববিতাকে অন্য এক ছবিতে গ্রামের বউ চরিত্রে নিলেন কমলেশদা, সঙ্গীতাকে না নিয়ে, তাই নিয়ে হেভি হল্লা মচিয়েছিল ও—ববিতার নাকি ইয়া লম্বা লম্বা, নেইলপলিশ মারা নখ ছিল, গ্রামের মেয়ে আবার ওরম হয় নাকি? —যেন কমলেশদা বেগমসাহেবার কাছ থেকে শিখবেন কী করে কাস্টিং করতে হয়। তা কমলেশদারও ওর উপর রাগ ছিল বইকী—বম্বে গেলি ভাল কথা, বাঙালি মেয়ে কেন ওরম বিকিনি পরে শট দিতে গেলি ফিল্মফেয়ারের পাতায়? আর ও কোনো ফটোগ্রাফি হলো? না কোনো কমপোজিশন, না কোনো আর্ট—শুধু পাছার মাংস। ছি! বম্বের নায়িকা, সে তো রেশমাও—যে সে নায়িকা নয়, রাজকাপুরের নায়িকা—কী বলব মেজদা, কী ক্লাশ মেয়েটার! ইংরিজি কী উচ্চারণ! আর কী গ্রেশফুল! পেডিগ্রি বুঝিয়ে ছেড়েছে এই মেয়ে—বিলেতে বড় হয়েছে কিনা। আরো বলি শোনো, শোনো—ছোট নওয়াব, যাকে সঙ্গীতা পাকড়াও করে ভেড়া বানিয়ে ছাড়ল—তার সাথে প্রেম ছিল এই রেশমারই। ভাবতে পারো? সঙ্গীতার জন্য শেষমেশ ওর বান্ধবী রেশমাকেই লেঙ্গি মারলেন নওয়াব সাহেব। রেশমার ফ্ল্যাটে সিধে গিয়ে বললেন, 'আমায় মুক্তি দাও', আর এই রেশমা নাকি নাকের-জল-চোখের-জল বুকে চেপে রেখে নওয়াবকে বলেছে, 'আরে, গ্লাশের জল যে গ্লাশেই রয়ে গেল তোমার? একটু লেমোনেড দোবো?'— বিলিতি শিক্ষা বাওয়া! এখানেই শেষ নয়, নওয়াব বিদায় নেওয়ার সময় ওঁর আপত্তি উপেক্ষা করে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিতেও গেছে রেশমা—আর ওই মুহূর্তেই ঘটল অনর্থ। সিঁড়ির মুখে কেন্নোর মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে অপেক্ষা করছিল—আর কেউ নয়, রেশমার প্রাণের বন্ধু সঙ্গীতা—নীল ঘাগরা, সবুজ চোলি শ্রীরাধিকে। রেশমাকে দেখে কুণ্ডলীর প্যাঁচ খুলে গেল শ্রীরাধিকার, সিঁড়ি বেয়ে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে হিলতোলা উঁচু জুতো সামলাতে না-পেরে পপাত ধরণীতল—একেবারে মাঝসিঁড়িতে। নওয়াবসাহেব ওকে ধরতে গেলেন না, ওদিকে তাকালেন না পর্যন্ত—কিছুই দেখেননি এরম ভাব করে লিফটের বোতাম চাপতে লাগলেন উন্মাদের মতো। পরিস্থিতি জঙ্গম, তাই রেশমা বেচারি স্থবির হয়ে গেল—ওর ফোটো তো দেখেছ; কেমন শান্ত-স্থির নির্মেঘ আকাশের মতো ও; বিলেতে যেরম আকাশ দেখা গেলে লোকে বলে 'ইন্ডিয়ান সামার'—দৃশ্যটা কল্পনা কর, মেজদা! নন-সেকোইটরের ভাল বাংলা কী হবে গো? উৎপলদা শিখিয়েছিলেন? মনে পড়ছে না। তো গত বছরের ডিসেম্বরে ধুমধাম করে শুভকাজ সমাধা করে বেগমসাহেবা আজকাল চুটিয়ে কাজ করছেন—শুনেছি রেশমাও গেছিল ওদের বিয়েতে। রেশমা তো আর সঙ্গীতার মতো হিংসুটে ছোটলোক নয়। তবে বিয়ের পর সঙ্গীতার জেল্লাটা যা খুলেছে না মেজদা, মাইরি! শ্যুটিং-এর ছবি তো দেখতেই পাবে আজ নয় কাল—ব্লাউজের খাটো আর আঁটসাঁট হাতার নিচে স্বাস্থ্যময় সাদা বাহুবল্লরী ঠেলে বেরিয়ে আসছে; কনুই ভাঁজ করলে টুলটুল করে। বন্দুকের দানার মতো বুনি দুটো। সঙ্গীতা, গড় হই মহারানি লক্ষ্মীছাড়ি! থুড়ি, মহারানি নয়; বেগমসাহেবা।
ভেবো না যা যা বললাম, তার সবটুকু কানকথা। রেশমা নিজমুখে এসব বলেছে আমায়, বুইলে? ও আমায় বলেছে, সঙ্গীতা যে আজও ওর বন্ধু—'কমরেড' বলে ডেকেছে সঙ্গীতাকে, ভাবতে পারো?—তার প্রমাণ দিতে-দিতে যদি ওকে শেষ হয়ে যেতেই হয়, হলোই বা শেষ। বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে বলেছে এসব রেশমা আমায়; বলেছে, 'আপনার কাছেই সিখে নোবো', বলেছে, 'অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরবাবুর ইতনা টাইম কাঁহা আমাকে বাংলা সিখানোর?'। আমি মনে মনে বলেছি, 'হ্যাঁ কমরেড, ওঁদের টাইম কোথায় আমাকেও সিনেমা বোঝানোর?'। আদতে তো এরা সব চোতামারা ছাত্র। "অত কাছে যেও না। অত কাছে গেলে ডেপ্‌থ অভ ফিল্ড পাবে কী করে?"—ক্যামেরার ছেলেদেরকে এইসবও বলে দিতে হয় কমলেশদার। অথচ আমি কাজ করি এতটা নিভৃতে, নির্দেশনাবিহীন, একা—'আজ তবে আসি দাদা' বলবার আগ পর্যন্ত কমলেশদা টেরটি পর্যন্ত পান না যে আমিও সেটে ছিলাম।
অন্য দাদাদের সাথে কমলেশদার ফারাকটা কোথায় বল তো? উনি পিঠ চাপড়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে পালে ভিড়িয়ে দেন না—উনি কাগজে-কলমে কারবার করেন—ওঁকে সেই অর্থে কমলেশ না ডেকে 'কলমেশ'ও ডাকতে পারো। উনি দস্তুরমতো চিঠি লিখে ওঁর ইউনিটে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা সিদ্ধ করেছিলেন—ভাবতে পারো? এই দেখো চিঠির ভাষা—
"সুপ্রিয় সুবিমল,
আপনি জানেন, সিনেমার আয়োজন বিশাল। এই মহা-আয়োজনের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকে প্রচুর তথ্য এবং গল্প। নেপথ্যের অনেক প্রয়োজনীয় ও কৌতুকদীপ্ত ইতিবৃত্ত ভবিষ্যতে দর্শক ও চলচ্চিত্রকারদের কাছে প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হবে। আমার বন্ধু ফরাসি চলচ্চিত্রকার ত্রুফো তো একটি সিনেমাই করতে যাচ্ছেন এই সিনেমা তৈরির গল্প নিয়ে। (আমার এই বন্ধুটি একদা ছিলেন আমার কট্টর সমালোচক- আমার প্রথম ছবি, অনেক আশা নিয়ে যে ছবি আমি নিয়ে গেছিলাম বিশাল বিশ্বের মঞ্চে, সেই ছবির শো চলাকালীন উঠে গেছিলেন ত্রুফো। বলেছিলেন একদল গেঁয়ো চাষা হাত দিয়ে ভাত খাচ্ছে, এর মাঝে দেখার কী আছে? সেই গল্প অন্যত্র।) মোটকথা, এই নেপথ্যের কথা লিখে রাখতে পারলে যাঁরা সিনেমা করেন এবং যাঁরা সিনেমা দেখেন উভয়ই উপকৃত হতে পারেন; কিন্তু সেটা লিপিবদ্ধ করা খুব দুরূহ।

আপনার তোলা ছবি দেখে আমি শুধু মুগ্ধই হইনি, আপনার কাজের অপার সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা নিয়েও নিঃসন্দেহ হয়েছি। শব্দ যেখানে ব্যর্থ, ছবি সেখানে সফল। বিলিতিরা বলে, A picture is worth a thousand words. 

প্রথমত, আমার এবং আমার ইউনিটের সকলের কয়েকটি পোর্ট্রেট এবং কয়েকটি গ্রুপ ফোটো তুলে দেওয়ার জন্য আমি আপনাকেই অনুরোধ করলাম। আপনার পূর্ণ ক্রেডিটসহ ছবিগুলো যাবে, যেখানেই যাক। দ্বিতীয়ত, আমার পরবর্তী ছবি (সম্ভাব্য প্রযোজকের বিবেচনাধীন) 'জাঙ্গলিক'-এ আপনাকে ইউনিটের চিত্রগ্রাহক হিসেবে পেলে বিশেষ আনন্দিত হবো। শ্যুটিংয়ের বেশিরভাগ অংশ ডালটনগঞ্জ (পালামৌ সদর, ঝাড়খন্ড) এলাকার কাছে ছিপাদোহর নামে একটা লোকেশনে সারা হবে। শিগগিরি আমাদের কর্মসচিব অখিল বিস্তারিত আলাপ করতে আপনার সাথে যোগাযোগ করবে।
দ্রুত আপনার মতামত জানাতে পারলে ভাল হয়।
শুভেচ্ছা রইল।
কমলেশ রায়"
কেমন বুইলে সহবত, বল? এই চিঠি পেয়ে আমার তো একেবারে উৎপলদার ভাষায় 'বজ্রের সমান করে বুকেতে নির্ঘাত'। এই ব্রেকটা না পেলে একদিন-না-একদিন তেতোই হয়ে যেতাম তোমার মতো, মেজদা। ভাবতাম, 'যাহ্‌ সালা, ভাসিয়ে দোবো সব গঙ্গার জলে! কিসের কী ছবি বাল'! যদিও এই কাজ না জুটলে কিছু একটা করে খেতাম নিশ্চয়ই। তোমার মতো পরিবহণ দপ্তরের চাকরি না হোক, অন্য কিছু। ধর দেয়ালে কি ল্যাম্পপোস্টে হ্যান্ডবিল সাঁটাবার কাজ। ঘাড়ে মই, আঠার বালতি। বার্নল, দাদের অত্যাশ্চর্য ঔষধ, সাধনা ঔষধালয়ের ক্ষীণপ্রতাপ কমপিটিটরদের বিজ্ঞাপন। 'আমাদের পরিবারের ছেলে হয়ে, বাবু, তুই এই কাজ করবি?', কাকু বলেছিল। ছোঃ। যতসব ভেতো পরম্পরার ধ্যাষ্টামো। বাবা চলে না-গেলে এই কাকুটা কাঁটাবাজি করার সুযোগই পেত না। যাক, এখন আর কিছু না হোক, তিরিশ নয়া পয়সা দিয়ে প্যাকেট সিগারেট কেনার ক্ষমতা তো হলো। রেশমার সামনে সেদিন হামফ্রে বোগার্টের মতো করে ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে একটু চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতে গেলাম—রেশমা বলল ওর মার্লোন ব্রান্ডো পছন্দ। বোঝ! রাত্তিরে লালরঙের মরচে-বৃষ্টি হয়েছিল। শ্যুটিঙের গাড়িগুলোর কাচে দেখলাম খয়েরি জলের ফোঁটা ব্রণর মতো শুকিয়ে আছে। এক পাশে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়, অন্য পাশে নদী পেরিয়ে আদিবাসীদের কয়েকটি গ্রাম। তারপর ধু-ধু টাঁড়। কার যেন বাচ্চা কেঁদে উঠল— চৌকিদারের ছেলে হয়তো। কারা যেন শুয়োরের বাচ্চার মতো হর্ন বাজাচ্ছিল জঙ্গলের শব্দকে গাড়িচাপা দিয়ে। বাংলো পেরিয়ে একটা গুমটি, আর সেই গুমটির বাইরে নারকোলের দড়ির মুখে আগুন জ্বলছিল। রেশমা বলছিল, ও যে পারফিউম মাখে, তা বার্লিন ছাড়া নাকি কোত্থাও পাওয়া যায় না। কী তার বিশেষত্ব? না, সেই পারফিউমের মিডল নোট লিলি, টপ নোট লেমন, আর বেইজ নোট নাকি ভ্যানিলা; তায় আবার উচ্চমাত্রার 'high sillage' (উচ্চারণ :সিয়াজ, জানতে?)। আমি হা করে শুনছিলাম—রেশমার সখী আমি; হয়তো রেশমাও মুগ্ধ হয়ে শোনে আমার মুখে ক্যামেরার বর্ণনা। রেশমার এখানে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল—বাথটব, গ্যাস গিজার, চব্বিশ ঘণ্টা গরম জল পেয়ে যে মেয়ে অভ্যন্ত, সেই মেয়ে ফরেস্ট রেস্ট হাউজে ঘর ভাগ করে শোয়, বাথরুম নেই তাই সক্কাল-সক্কাল জঙ্গলে গিয়ে কাজ সারে, আর তারপর লক্ষ্মী হয়ে বসে সাঁওতাল মেয়ের মেকআপ নেয়—গালে, পিঠে, পেটে, হাতে, পায়ে, এমনকি কানের বারান্দায়, শাড়ি-মাকড়ি-হাঁসুলি-কল্ক্কেফুল পরে নেয়, তারপর মাটিতে শুয়ে চার নায়কের একজনের সাথে কেলির শীন করে (সেই ছবিও তুলে নিয়েছি বইকী), সন্ধেবেলা চার ঘণ্টা লাগিয়ে মেকআপ তোলে। প্রথমে তো কমলেশদা ওকে শিফ্‌টই দিলেন না; চরিত্র বোঝাতে ওকে নিয়ে গেলেন ভাটিখানায়—মানে যেখানে লোকালরা মহুয়া আর হাঁড়িয়া খায়—কমলেশদা মদ ছোঁন না, আর আমরাও নীট খাইনি বাওয়া, প্রোডাকশনের গাড়ি করে কোল্ড ড্রিংক এসেছিল রাঁচী মেট্রো থেকে, আর রেশমা বলল 'কান্ট্রি লিকার' খাবেই না, যদিও ছবিতে ওর রোলটা মূলত চকচকে বগল খুলে মহুয়া খেতে খেতে মাতলামো করা একটা লোকাল মেয়ের। সঙ্গীতাকে নেওয়া হয়নি; ও তো শ্যুটিঙের সময় ছাড়া বাকি সময় নিজের রুমে বসে থাকে; ফ্লোরে এসেও ডায়ালগের পাতায় মুখ ঢেকে রাখে—উৎসুক জনতা এড়াতে। তা যে- দেশের লোক রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রা থেকে পর্যন্ত চুল-দাড়ি ছিঁড়ে নিয়ে আসে, তারা তো সুযোগ পেলে সঙ্গীতা-কি-রেশমার বুক খুবলে নেবেই! যা হোক, মাতাল হয়ে শুভেন্দু তো কুরোশাওয়া কপচাল—নিকুচি করেছে ওর কুরোশাওয়া—আর তারপর কমলেশদার ওখানে না-থাকার ফায়দা নিয়ে বলল, 'বম্বের আনন্দম্‌ পত্রিকা... হুঁ... তিন কপি নিয়ে ঘুরি আমি সব-সোময়, বুইলে বাবা? ওতে আমার নাম আছে কমলেশের ক্রু-মেম্বার হিসেবে। হুঁ!' রেশমার দিকে ইশারা করে অন্যদের বলল, 'ওরে! হিরোইনকে লেমোনেড দে। কমলেশদাকে বুইলুম না বাওয়া। জল খেতে কিনে এনেছেন হিরের গবলেট'। রেশমা তো বাংলা মাত্রই শিখছে; বেচারী হয়তো বোঝেইনি জড়ানো গলায় মাতালটা ওকে নিয়ে কী বলল। কোনো হাসির কথাই হবে, ভেবে একটু হাসল পর্যন্ত ও। কী দরকার ছিল ওর এখানে এসে বসবার! বাংলোতে ফিরে গিয়ে সঙ্গীতা আর কমলেশদার সাথে শ্যারাড বা স্ক্র্যাবল বা মেমরি গেম খেললেই পারত। মেমরি গেম জানো তো? একজন একটা বিখ্যাত মানুষের নাম বলবে, পরেরজন সেই মানুষটার নামের সাথে আরেকজন বিখ্যাত মানুষের নাম যোগ করবে, পরেরজন যোগ করবে আরেকজন বিখ্যাত মানুষের নাম—এইভাবে খেলা চলবে। নামের সিরিয়ালে যার ভুল হবে—কিম্বা কোনো একটা নাম বলতে যে ভুলে যাবে—সে হয়ে যাবে আউট। সঙ্গীতা আর রেশমা ক'দিন আগে রেস্ট হাউজের ঘরে বসে পরদিনের শটের রিহার্শেল দিতে দিতে মেমরি গেম খেলছিল আর আমরা ক'জন ছিলাম দর্শক :
সঙ্গীতা : 'রবীন্দ্রনাথ'
রেশমা : 'রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্ক্স'
সঙ্গীতা : 'রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্ক্স, ক্লিওপ্যাট্রা'
রেশমা : 'রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্ক্স, ক্লিওপ্যাট্রা, অতুল্য ঘোষ'
সঙ্গীতা : 'রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্ক্স, ক্লিওপ্যাট্রা, অতুল্য ঘোষ, হেলেন অভ ট্রয়'
তো বুইলে তো? এরম খেলা চলছে দু'জনে। শেষে এসে যেই না 'রবীন্দ্রনাথ, কার্ল মার্ক্স, ক্লিওপ্যাট্রা, অতুল্য ঘোষ, হেলেন অভ ট্রয়, শেক্সপিয়র, মাও সে-তুং, ব্র্যাডম্যান, রানি রাসমণি, কেনেডি, টেকচাঁদ ঠাকুর, নেপোলিয়ন, মমতাজ মহল'-এ এসে ঠেকেছে খেলা, আর শিকার স্পট-করা বনবেড়ালের মতো বিছানার ওপর বসে সঙ্গীতা প্রায় ঝুঁকে পড়েছে রেশমার দিকে, রেশমা মারল এক শুইঙ্গিং ইয়র্কার। সবগুলো নাম ঠিক ঠিক বলে শেষে যোগ করে দিল, 'মুর্তাজা'। ব্যস্‌! জানো নিশ্চয়ই, নওয়াবসাহেবের—মানে সঙ্গীতার ক্রিকেটার বরের—আসল নাম ছিল মুর্তাজা। লোকে বলে রেশমা ছাড়া দুনিয়ার কেউ নাকি নওয়াবসাহেবকে ওই নামে ডাকত না, আজও ডাকে না। সঙ্গীতার প্রায়-জিতে-গেছি মুখ পাঁশুটে হয়ে গেল। একদম ঠিক হয়েছে! অন্যের পছন্দ নিয়ে ভাগবে তুমি, আর তোমায় কেউ কিছু বলবে না! মামদোবাজি? তা খেলা ওখানেই শেষ। দর্শকদের মধ্যে কে যেন প্রসঙ্গ পালটে বলে উঠল, 'এই শোন্‌ না! কমলেশদার জন্মদিন তো এবার শ্যুটিং-এর মাঝেই পড়ল। কী করা যায় বল‌তো?'।
নিশ্চয়ই ভাবছ, সুবিমলটার মেয়েলি স্বভাব গেল না—পরচর্চা করতে পেলে আর কিছু চায় না। হা হা, প্রথমেই পষ্ট করে বলি যে, শ্যুটিং-এর শেষদিন আজ, অতএব দু'পাত্তর পড়েছে—তাই একটু চড়েছে। তার ওপর আমি ক্রিয়েটিভ মানুষ, মেজদা। এ শোলো আর্টিস্ট ইন এ ইঁদুর-থুড়ি-ভেড়ার পাল। তা জানো তো, কল্পনার অনাথ স্টেপ-সিশ্‌টার হচ্ছে কৌতূহল! কিম্বা, কল্পনা যদি একটা অসীম সংখ্যারাশির সাগর হতো—উৎপলদার ভাষায় 'বেবাম সায়র'—আর সেই সংখ্যাসাগরের এক ঘটি জল যদি তুলে নিয়ে আসা হতো, আর সেই এক ঘটি জল যদি একটা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে ঘরে তোলা হতো, তাহলে দেখা যেত সেই সংখ্যাগুলি হয় দুই, নইলে তিন, নইলে তেরো কিম্বা আটতিরিশ- এই যাঃ! আটতিরিশ নয় বাওয়া, সাঁইতিরিশ। মানে বুইলে তো? প্রাইম নাম্বার। মানে কৌতূহল। কৌতূহল কল্পনার চেয়ে অবিভাজ্য, মৌলিক। কৌতূহল হাত দিয়ে ভাত মেখে খায়, আর কল্পনা সেই হাতে-ঝোলে মাখামাখির দৃশ্য দেখে পাবলিকলি উঠে চলে যায় ত্রুফোর মতো, আর গোপনে-গোপনে কৌতূহলের সাথে ফ্রেন্ডশিপের প্যাক্ট করে।
আর বিশেষ কী? আমাদের জঙ্গলের কাজ—জাঙ্গলিকের কাজ—শেষ। কাল সকালে সব মাল বেঁধেছেঁদে তোলা হবে। বাকি শট কলকাতায়—কিছু হবে প্রিয়ার ড্রেসিং রুমে, আর কিছু সহজ পাসিং শট্‌স এখানে ওখানে। জানি কলকাতা ফিরে গিয়েও তোমার সাথে দেখা হবে না—বলতে পারো, একরকম মেনেই নিয়েছি তোমার ইনশিকিওরিটি, তোমার অভিমান। এদিকটায় তুমি এলে গাছপালা, জন্তুজানোয়ার নিয়ে মেতে থাকতে জানি—আমি তো ছবিই তুলি এদের, চেনো তো সব তুমি। কমলেশদা বার্কিং ডিয়ার চেনালেন—কটরা বলে এদিকটায়—তুমি থাকলে হয়তো ওদের কত শিং-এ ক'টা শাখা মুখস্থ বলে দিতে।
ওদিকটা দেখি গিয়ে। ইউনিটের জংলিগুলো হই-হই করে বলছে সঙ্গীতার রবীন্দ্রসঙ্গীতের টেস্ট নেবে। ভাটিখানায় একটা সত্যিকারের সাঁওতাল মেয়েকে কে যেন 'এ বাউরি, এ বাউরি' বলে শিস দিয়ে ডাকছে। চলি এবার, মেজদা—কেমন?

বিষয় : কালের খেয়া