প্রচ্ছদ

তোমাদের হারানো নাম

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হেলাল হাফিজ

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার দিক হলো, মা আমাকে কী নামে ডাকতেন- এ জীবনে তা আর জানা হলো না। মাকে আমি পাইনি। আমার তিন বছর বয়সে মা মারা যান। নিশ্চয়ই মা আদর করে ডাকতেন আমাকে, কিন্তু আমার তো তখনও সেই বোধ বা স্মৃতি তৈরি হয়নি। তাই সে ডাক আর মনে নেই। তবে এই বেদনা প্রকারান্তরে আমাকে দিয়েছেও অনেক। আজকে যে আমি দু-এক পঙ্‌ক্তি কবিতা লিখেছি- ওই মাতৃহীনতার বেদনাই আমাকে কবি করে তুলেছে।
সৃষ্টিকর্তা একদিক দিয়ে আমার কাছ থেকে নিয়েছেন যেমন, আরেক দিক দিয়ে দিয়েছেনও। শেষ পর্যন্ত সেই দেওয়ার কাজটা মা-ই করে গেলেন। নিজে বিদায় নিয়ে সেই বেদনাটা আমাকে উপকরণ হিসেবে দিয়ে গেলেন।
বাবা হেলাল বলেই ডাকতেন। আমার সমস্ত আত্মীয়-স্বজনও এই নামেই ডাকতেন আমাকে। এ ছাড়া আলাদা কোনো ডাকনাম ছিল না।
আমার তিন বোন। সেই বোনেরা আমাকে তুমি করে বলে না, আপনি করে বলে। ভাইবোনদের ছেলেমেয়েরা আছে, তারা আমাকে তুমি করেই বলে।
যখন একটু একটু করে কবিখ্যাতি হতে লাগল- সেই থেকেই আস্তে আস্তে আমার নাম ধরে ডাকার নামটা আমার কান থেকে কমতে শুরু করল। সবাই তখন কবি বলে ডাকে।
আমার সাংবাদিকতা জীবনের পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। এই পঞ্চাশ বছরে খুব কম মানুষই আমাকে নাম ধরে ডেকেছে। অনেক পুরোনো প্রবীণ সাংবাদিক যাদের আমি সাংবাদিকতার প্রথম জীবনে পেয়েছি- যেমন অবজারভারের সম্পাদক আব্দুস সালাম, সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, নির্মল সেন, এনায়েতউল্লাহ খান, এবিএম মূসা প্রমুখ; এরা কেউই আমাকে নাম ধরে ডাকতেন না। সবাই আমাকে কবি বলে ডাকতেন। জুনিয়ররা কেউ কেউ বরং হেলাল ভাই, হেলাল ভাই করত। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার নামটা হারিয়ে যাচ্ছিল। মানে কানে খুব কমই আসত নামটা। এটা কলেজ জীবন থেকেই শুরু হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আরও বেশি। বিশেষ করে উনসত্তরে এসে সেই কবিতাটা- 'এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়' লেখার পর থেকেই ব্যাপকভাবে কবি নামে ডাকা শুরু হয়ে গেল। বলা যায় স্বাধীনতার সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই উনপঞ্চাশ বছরে হেলাল নামটা আমি কমই শুনেছি। মানুষ বড় হতে থাকলে আসলে ধীরে ধীরে তার ডাকনামটা মুছে যেতে থাকে।
তবে আমাকে মিষ্টি করে একভাবে ডাকতেন আমার নানু। ওনাকে পেয়েছি আমি বেশকিছু দিন। উনি আমাকে ডাকতেন 'হেইল্যা' নামে। গ্রামের সহজ সরল মানুষ, আদর করে এমন নামে ডাকতেন। তবে যখন একটু বড় হয়েছি, কিছুটা নামডাক হয়েছে, তখন আর নানু সেই আদুরে নামে ডাকেন না, তখন হেলাল নামেই ডাকতেন।
আমার সমসাময়িক যত মেয়ে বন্ধু, তাদের অধিকাংশই এখন জীবিত নেই। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আদর করে ডাকত বেবী মওদুদ। নাম ধরে হেলাল বলেই ডাকত। কিন্তু যে দরদটা ছিল তার ডাকের মধ্যে, তা এক কথায় অসাধারণ। আর এখন আমাকে নাম ধরে ডাকে আমার কিছু মেয়ে বন্ধু। যারা আমার চেয়ে বয়সে অনেক কম। কিন্তু খুবই ঘনিষ্ঠ আমরা। এ ঘনিষ্ঠতা হয়েছে ফেসবুকের কারণে। অ্যান্ড্রয়েড ফোন এই সুবিধাটা করে দিয়েছে। যার কল্যাণে অনেক ধরনের নতুন নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। তাদের কেউ হয়তো আমার চাইতে বিশ বা ত্রিশ বছরের ছোট। কিন্তু তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। বন্ধুতো বন্ধুই। একেক বন্ধুর সাথে একেক রকমের অনুরণন। তাদের একেকজন একেক রকম সম্বোধন করে ডাকে। মানুষের সাথে এমন বিচিত্র সম্পর্ক ভালোই লাগে। তুই করে যারা ডাকে, তাদের বেশি ভালো লাগে।
নেত্রকোনার জীবনের দিকে তাকালে- সেখানে যখন স্কুলে পড়ি, কবিতা লেখা ও আবৃত্তি করার কারণে কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলাম। অনেকেই তখন কবি বলে ডাকা শুরু করেছে। কলেজের শিক্ষকরাও আমাকে কবি বলে ডাকতেন। সেটি লেখার চেয়েও সম্ভবত কবিতা আবৃত্তির কারণেই বেশি।
সেই নেত্রকোনায় আমার সবচেয়ে বড় প্রেম হেলেন ছিল না, ছিল সবিতা মিস্ট্রেস। সবিতা সেন। সেই সবিতা দি আমাকে কখনও হেলাল, কখনও-বা কবি বলে ডাকত। আমি তখন স্কুলে নাইন বা টেনে পড়ি, তারপর ইন্টারমিডিয়েটে- কত যে ভালো লাগত! আহা এত রূপসী এবং এত বিদুষী মহিলা। উনি কিন্তু আমার চেয়ে তেরো-চৌদ্দ বছরের বড়। মানে মায়ের মতো। আমাদের সম্পর্কটাই হয়েছিল মা-ছেলের মতো। এমনিতেই মা নেই ঘরে। তা ছাড়া আমার বাবা ছিলেন নাম করা শিক্ষক। তাই সবাই আমাকে আদর করত। সবিতা সেনও তার আঁচলের তলায় করে একেবারে সন্তানের মতো রাখতেন। সেই একধরনের প্রেম হতে হতে আমি যখন বড় হলাম, তখন এই মা-ছেলের সম্পর্কের মধ্যে আমার মনে ফ্রয়েডও কিছু কিছু উঁকি দিতে লাগল। আমি তখন বয়োপ্রাপ্ত হচ্ছি, তাই হয়তো সবিতা দি'র মাতৃস্নেহ ক্রমেই আমার ভেতরে অন্য ভাবনার সঞ্চার করতে থাকল। ওই বয়সে এটি খুবই স্বাভাবিক। তবে তার অবশ্য কোনো প্রায়োগিক দিক ছিল না। তার মুখে ডাকা নাম আমাকে বিমোহিত করত। উনি কবি ডাকলেও সেটি আহদ্মাদ করেই ডাকতেন। আসলে তিনি চাইতেন আমি জীবনে বড় কিছু হই।
আর হেলেন- সে আমাকে হেলাল ভাই বলে ডাকত। আর কিছু না। সে যখন কলেজে উঠেছে, আমিও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলাম। তখন সে আর হেলাল ভাইও বলত না, কিছুই বলত না। তখন নাম ধরে ডাকাটাই যেন বন্ধ হয়ে গেল। কিছুটা চোখের চাহনি, আভাসে, ইঙ্গিতেই রয়ে গেল আমাদের প্রেম।
আসলে মানুষের জীবনে, বিভিন্ন বয়সে বিভিন্নভাবে তার নাম ধরে ডাক শোনার আকাঙ্ক্ষা থাকে। অতীত দিনের ডাকগুলো মনে ও মগজে যেন গেঁথে থাকে। হয়তো অনেক কিছু মনে নেই, মনে রয়ে গেছে সেইসব ডাক নাম। এই যে আমি শুনতে পাচ্ছি নানু আমাকে সুর করে হেইল্যা বলে ডাকছে- 'এই হেইল্যা, কই গেলিরে? এই হেইল্যা, এদিগে আয়, ভাত খাইয়া যা। এই হেইল্যা, দুধের সরটা নিয়া যা।'
সবিতা সেন যখন কবি বলে ডেকে আঁচলের তলায় নিয়ে ঢাকত, কী অনুরণন যে হতো তখন! তখন ভাবতাম কী করে আরও দুটি সুন্দর লাইন লিখব। দিদি খুশি হবে, আরও বেশি আদর করবে। কপালে একটা চুমু দেবে।
তারপরে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম, তখন ১৯৬৭ সাল। বাঘা বাঘা সব শিক্ষক। আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম- এমন আরও অনেকে। সব শিক্ষকই আমাকে হেলাল বলেই ডাকতেন। কিন্তু '৬৯ সালের ওই কবিতা লেখার পর থেকে সবাই কবি বলেই ডাকতে শুরু করল। হঠাৎ দুই রাতে সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার দুই লাইন চিকা মারা হয়ে গেল। একদম সাড়া পড়ে গেল। রাতারাতি আমি যেন কবি খ্যাতি পেয়ে গেলাম। মানে পরবর্তী কয়েক মাসের জন্য এটা যেন টক অব দ্য ক্যাম্পাসে পরিণত হলো। ক্যাম্পাসে হঠাৎ করেই যেন আমার হেলাল নামটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কিছু শিক্ষকও আমাকে কবি বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন। মুনীর চৌধুরী একদিন আমাকে ডেকে বসলেন- এই কবি এদিকে আসো। রফিক স্যার তো এখনও জীবিত, রফিক স্যার আমাকে সবসময় কবি বলতেন উনসত্তরের ওই কবিতার পর।
আরও পরে যখন সৈয়দ আকরম হোসেন স্যার এলেন, তিনি একেবারে প্রথম দিন থেকেই আমাকে কবি বলে ডাকতেন। কখনোই হেলাল বলেননি। তা ছাড়া আমার সব বন্ধুবান্ধব, হলের ছেলেরা কবি কবি বলতে বলতে হঠাৎ করেই যেন হেলাল নামটা হারিয়ে গেল। আমি কবি হয়ে গেলাম।
মুক্তিযুদ্ধ যেন আমাকে এক ধাক্কায় আরও বেশি ওপরে তুলে দিল। একাত্তরে সেই কবিতা আমাকে রণাঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছে। যুদ্ধের মাঠে অনেক জায়গায় এই কবিতাটা ব্যবহূত হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল বাম রাজনৈতিক দলের কর্মীদের। বিশেষ করে আন্ডারগ্রাউন্ড বাম রাজনীতি যারা করতেন, তাদের অনেকের কাছে তখন এই কবিতাটি সূচনা সংগীতে পরিণত হলো- 'এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'। বাহাত্তরেও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি তখন পূর্বদেশ পত্রিকায় চাকরি করি। পূর্বদেশ তখন খুব নাম করা কাগজ। ওখানে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে চাকরি করি। এই সবকিছুই আসলে সম্ভব হয়েছে ওই এক কবিতার জন্য। ওই একটি কবিতার জন্য আমার খ্যাতি যেমন হয়েছে, তেমনি হেলাল নামটাও হারিয়ে গেছে।
আসলে মানুষের যত নামডাক হবে, ততই তুই বলে ডাকার লোক কমে যাবে। অথচ আমার তো খুব ভালো লাগে তুই-তুকারি করতে। আমাকে আমার বড় ভাই ছাড়া আর হেলাল ডাকার লোকই নাই এখন। সবাই কবি ডাকে।
বাংলা ভাষায় তো তিনটি সম্বোধন- আপনি তুমি তুই। আমার জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে এই সম্বোধন নিয়ে। সেটি বলার আগে আরেকটা বিষয় বলে নিই।
আমার প্রথম বই 'যে জলে আগুন জ্বলে' যারা দেখেছেন, তাদের হয়তো মনে আছে যে, আমি বইটিকে উৎসর্গ করেছি 'আপনাকে তোমাকে ও তোকে'। অর্থাৎ সম্বোধনের এ বিষয়টি বহু আগে থেকেই আমার ভেতরে অনুরণিত হচ্ছে। যে বইটা আমাকে এত খ্যাতি এনে দিল, সেটি প্রকাশের সময় থেকেই আমি বিষয়টি প্রয়োগ করে রেখেছি বইটির উৎসর্গপত্রে। সম্বোধনের প্রতি আমার যে মনোযোগ, সেটি এ থেকে বোঝা যায়। এবং এর সঙ্গে আমার জীবনের অনেক আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, ভালো লাগা-মন্দ লাগার সম্পর্ক রয়েছে।
এবার সেই বিষয়টা বলছি- যখন প্রেম হয় কিংবা নতুন পরিচিত ছেলে বা মেয়ে একে অন্যকে সাধারণত আপনি বলেই শুরু করে। একটু ঘনিষ্ঠ হলে তুমি হয়। একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তো আমি তাকে তুমি বলতে পারি না। তুইও বলতে পারি না। ধরা যাক একটি মেয়েকে আমি পছন্দ করি। সেও আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি যে, তুমি বলে ডাকব। দু'জনই খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। একধরনের অনুরাগ তৈরি হয়ে গেছে; কিন্তু পারছি না তুমি করে বলতে। এই সময়টাতেই সম্পর্কটি থেমে গেল। কিংবা আর এগোলো না। আমরা যে যার পথে চলে গেলাম। এমনই একটা সময়ে মেয়েটি আমাকে বলল- আচ্ছা আপনি এমন একটি কবিতা লিখতে পারেন যাতে তুই বা তুমি নেই কিন্তু প্রেম আছে?
সত্যিই তো, ভেবে দেখলাম আমরা দু'জন তুমি বা তুইতে নামার আগেই এই যে আপনি থেকেই চলে যাচ্ছি- এই আপনি দিয়ে কি প্রেমের কবিতা হয় না! মনে ও মগজে প্রশ্নটা খুব লেগেছে, কিন্তু আমি এটা কোনোভাবে কবিতায় প্রকাশ করতে পারছি না। এর মধ্যে অনেক বছর চলে গেছে। সেই মেয়ে কোথায় আছে, দেশে না বিদেশে, জীবিত না মৃত- কিছুই জানি না। কিন্তু তার ওই আকাঙ্ক্ষার কথাটা আমার মনে আছে। সেই আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে একদিন লিখলাম- 'আপনি' কবিতাটি। দুই পঙ্‌ক্তির কবিতা-
আপনি আমার এক জীবনের যাবতীয় সব
আপনি আমার নীরবতার গোপন কলরব।

বিষয় : কালের খেয়া