শ্রদ্ধাঞ্জলি

রশীদ হায়দার: তিনি আমাদের

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মাকিদ হায়দার

রশীদ হায়দার [১৫ জুলাই ১৯৪১-১৩ অক্টোবর, ২০২০]

রশীদ হায়দার [১৫ জুলাই ১৯৪১-১৩ অক্টোবর, ২০২০]

আমাদের দাদুভাই রশীদ হায়দার আমাদের ছোট থাকা সময়েই ছোটদের গল্প, কবিতা পড়ে শোনাতেন। তিনি খুব ভালো গান গাইতেন। আমরা শুনতাম।
তিনি যখন পাবনা গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশনে নবম শ্রেণির ছাত্র, তারই সম্পাদনায় স্কুল ম্যাগাজিন বেরিয়েছিল ১৯৫৭ সালে। তাঁর কথা না শুনলে মাঝেমধ্যে উত্তমমাধ্যম জুটতো কপালে।
দাদুভাই শৈশবে-কৈশোরে খুব ভালো আজান দিতে পারতেন এবং পিতার সঙ্গে নিয়মিত নামাজ পড়তেন। কৈশোরে পথের পাঁচালীর অপু হতে চেয়েছিলেন। লেখাপড়া শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হতে চেয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই লিখবার ইচ্ছা তার ছিল।
আমাদের দুই অগ্রজ জিয়া হায়দার সোনা ভাই এবং রশীদ হায়দার দাদুভাই- ১৯৬৪-৬৫ সালে পাবনা থেকে এনে তারা আমাকে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন।
২.
কাব্য ও শিল্পের জগৎ বিশাল। সেই বিশালত্বের মধ্যেই ছিল আমার পড়ালেখার ভুবন। বিশেষত স্কুলজীবনেই প্রথম গল্প ছড়া লিখতে শুরু করেছিলাম দুই অগ্রজের অনুপ্রেরণায়। প্রতিটি কবির লেখকের দায়িত্ববোধ অবশ্যই আছে দেশ ও জাতির প্রতি। সে ক্ষেত্রে আমি ব্যতিক্রম নই।
অনুজের প্রতি অগ্রজের অনুভূতি সহজেই অনুমেয়। দাউদ হায়দার চার দশকের বেশি সময় স্বদেশ ভূমির বাইরে। দাদু ভাই রশীদ হায়দারের অনুভব ছিল- হয়তো দাউদের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না। আমার মন্তব্য দাউদ দীর্ঘজীবী হোক। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলে আমরা সুখী হবো।
৩.
বাংলা একাডেমিতে চাকরির সময়ে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় মাসিক 'উত্তরাধিকার' নিয়মিত প্রকাশিত হতো। তার অমরকীর্তি 'স্মৃতি একাত্তর' বইটির সম্পাদনা। তিনি জাতীয় গ্রন্থাগারের পরিচালক থাকাকালে একদিন উপসচিব তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করায় পরদিনই চাকরি ছেড়ে বাংলা একাডেমিতে ফিরে আসেন। বর্তমান সরকার তাকে নজরুল ইনস্টিটিউশনের দায়িত্ব দেওয়ার পর কুমিল্লায় নজরুল মিলনায়তন নির্মিত হয়েছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায়।
দাদুভাই মানবিক এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন নির্বিকারভাবে। এই নির্বিকার মনোভাব ছিল তার করায়ত্ত। তিনি কখনো অনৈতিক কর্মে নিজেকে লিপ্ত করেননি; আজ তাই তাকে সবাই সম্মানের চোখে দেখে থাকবেন। যদিও তিনি ভারত ও আমেরিকায় লেখাপড়া শেষে ভালো ভালো চাকরি পেয়েও শিল্প- সাহিত্য অঙ্গনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন- বাংলা একাডেমিতেই।
৪.
আমাদের ছোট কাকা আবুল কাশেম ছিলেন অভিনেতা নাট্যকার। দেশভাগের আগেই কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করতেন। তিনি আমাদের পাবনা শহরের জিলাপাড়ার বাড়িতে এবং পরবর্তী সময়ে দোহারপাড়ার বাড়িতেও শীত মৌসুমে নাটক করতেন। আমরা ভাইবোন এবং ভাগ্নিরা রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি, সামান্য ক্ষতি ইত্যাদিতে অভিনয় করেছি। প্রতি মাসেই কবিতা পাঠের আসর বসতো দোহারপাড়ার বাড়িতে। জিয়া ভাই একাধারে কবি, নাট্যকার, গীতিকার। তার কবিতা ৫০ দশকের শুরুতে সব পত্রিকায় ছাপা হতো- দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদে এবং রশীদ হায়দারের গল্প মধ্য পঞ্চদশ থেকে প্রকাশিত হতো।
প্রথম উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধের পর খুব আলোড়ন তোলে পাঠক মহলে। উপন্যাসটির নাম 'খাঁচায়'। এর আগে তার ছোট গল্পের বই বেরোয় মধ্য ষাটে। নাম- 'নানকুর বোধ' তার সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প 'কাক'। গল্প, উপন্যাস এমনকি কিশোরদের নিয়ে লেখা সবই উল্লেখযোগ্য। তবে 'কাক' গল্পটি, প্রথম উপন্যাস এবং নাটক 'তেল সংকট' বিকিরণ ঘটেছিল পরবর্তী অনুবাদের ভেতরে।
'স্মৃতি ৭১' এর যেসব লেখা তার সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে- চিঠিগুলো পড়ে আমি এখনো চোখ বন্ধ করে দেখতে পাই আমি এবং আমার মা রহিমা খাতুন কীভাবে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে জীবন রক্ষা করছিলাম ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল রোববারে।

৫.
প্রথমেই বলেছি তিনি একজন সুগায়ক হতে চেয়েছিলেন। কণ্ঠ ছিল অপূর্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার জীবন শেষে হওয়ার পর চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি গত বছর কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন নতুন একটি উপন্যাস অচিরেই শুরু করবেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি শেষ অনেকটা সময় ছিলেন বাকরুদ্ধ। তবে তিনি আশা করেছিলেন তার সম্পাদনায় 'স্মৃতি ৭১'-এর জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার তিনি পাবেন; কিন্তু পাননি।
সমকালীন সাহিত্য বিশেষ বাংলাদেশের জনাকয়েক কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকারদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করলেও কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন উল্লেখযোগ্য ধ্রুপদি সাহিত্যের সৃষ্টি তেমনভাবে হয়নি।
ভাই হারানোর অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছি। এত ভালোবাসা তার জন্য লুকিয়েছিল, এখন টের পাচ্ছি।
আমরা জানি, স্বামীর আগে যদি স্ত্রী প্রয়াত হন, তখুনি স্বামীর মনের ভেতরে মৃত্যুচিন্তা জাগ্রত হয়। বিয়ের বাসরঘর থেকে তার ৫২ বছরের সংসার-স্মৃতি।
আমি যতটা দেখেছি, তিনি পছন্দ করতেন বাংলাদেশের অন্যতম লেখক সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ এবং প্রফেসর আনিসুজ্জামান এবং অগ্রজ জিয়া হায়দারের রচনা।
অতি সাধারণ জীবন-যাপন ছিল রশীদ হায়দারের; গাড়ি-বাড়ির শখ তিনি করেননি। করেছেন লেখাপড়া, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সকল ঔপন্যাসিক; বিশেষত এই সময়ে পূর্ব-পশ্চিমে পদ্মা নদীর মাঝি, রবীন্দ্রনাথও তার প্রিয় তালিকায় আছেন। পাবনা শহরের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে রসকদম-প্যাড়া খুব ছিল তার পছন্দের তালিকায়।
তিনি যেহেতু ইউরোপ আমেরিকা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তরে গিয়েছেন, সেদিক থেকে বাংলাদেশকে একটি সুখী দেশ হিসেবেই মূল্যায়ন করেছেন আমাদের কাছে। তবে তার অভিধায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গাটি- আমাদের দোহারপাড়া, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল, ১৫ জুলাই ১৯৪১ সালে।
আমরা ছিলাম ১৪ ভাইবোন- সাত ভাই, সাত বোন। এখন ছিলামই বলতে হচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে চার ভাইবোন পৃথিবী ছেড়ে অন্যলোকে পাড়ি দিয়েছেন। বাবা মারা গেছেন ১৯৭০ সালে। সেই থেকে আমাদের পরিবারে সরাসরি মৃত্যুর হানা। মঙ্গলবার গেলেন রশীদ হায়দার- আমাদের দাদুভাই। বাবা ও মায়ের উৎসাহেই আমাদের পুরো পরিবার ছিল সাহিত্যমনস্ক। আমরা পাঁচ ভাই তো কবি। এমন খুব বেশি দেখা যায় না। তবে বাবা-মার পর এই কৃতিত্ব বা সাফল্য, যা-ই বলি না কেন তা আমরা দিই বড় দুই অগ্রজ জিয়া হায়দার ও রশীদ হায়দারকে। তারাই একে একে প্রতিটি ভাইবোনকে ঢাকায় এনে রাজপথ চিনিয়েছেন।
গত বেশ কয়েক মাস দাদুভাই ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। স্পষ্ট কথা বলতে পারতেন না। শরীরটা বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। আমি মাঝে মাঝে যখন তার পাশে গিয়ে বসতাম- বড় বড় দুই চোখে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সেই দুই চোখে অনেক কথা আমি শুনেছি। চোখ দুটি ছিল নিষ্পাপ ও নির্লোভ। আসলেই রশীদ হায়দারের মতো ভালো আর নির্লোভ মানুষ আমি আর দেখি নাই।