আমার অতিপরিচিতজন, পেশায় শিক্ষক। লকডাউনের আগেই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখনো বন্ধ হয়নি, তিন দিন আগেই ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন! লোকে বলে, করোনার ভয়ে! আমি বলি, না! তেমন নয়! পারিবারিক কাজেই গিয়েছিলেন। সেই তিনি ক'দিন আগে ভয়ানক রাগ! কর্তৃপক্ষের ওপরে। বলছিলেন, দেশে করোনা বলতে কিচ্ছু নাই, সব গুজব! শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে! জট বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া প্রয়োজন। আমি বললাম, 'একবার ছড়িয়ে পড়লে তো কর্তৃপক্ষকে দুষে মানববন্ধনে ব্যানারটা কে যে ধরত! সামনে শীত, অনেক দেশে আবার সংক্রমণ বাড়ছে।' তিনি এবার বললেন, 'দেশে দেশে বসে থাকি।' এ ধরনের মানুষের জন্য অতি সতর্কতাও সমস্যা, আবার উদাসীনতাও সমস্যা। এরা নাসতর্কউদাসীন! এমন আরেকটা উদাহরণ দিই। লকডাউনের শুরুর দিকে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি দোকানগুলোর সামনে সাদা বৃত্তে ভরা! গোল গোল তিন ফিট দূরত্বের বৃত্ত। শুনলাম, মহল্লার যে ছেলেগুলোর খুব একটা কাজ নাই, তাঁরা খুব সিরিয়াসলি মুখে মাস্ক পরে সারারাত এই কর্ম সম্পাদন করেছে। বেশ! ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না। নিঃসন্দেহে মহৎ কর্ম! তারপর যখন আরো খবর আসতে শুরু করল, মাকে জঙ্গলে ফেলে দিচ্ছে সন্তান, বাবার লাশ স্পর্শ করছে না, হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে স্বজন! দুঃসংবাদগুলো একদিকে যন্ত্রণা বাড়াচ্ছিল, অন্যদিকে এই ছেলেগুলোর মাস্ক পরা মুখ ভেসে উঠলে চোখের শান্তি, মনে তৃপ্তি পাচ্ছিলাম। ওরা দেশের মানুষের জন্য কাজ করছে। বাসার কোনার চায়ের দোকানটায় এখন রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত আড্ডা হয়। শুনলাম ওরা করোনাকে জয় করে ফেলেছে! কারোরই করোনা হয়নি। কতদিন আর ঘরে বসে থাকবে? ওরা স্বর্গের ঢেঁকি! তাই রাতভর 'ধান'ই ভানছে, আগের মতোই। কারো মুখে মাস্ক নেই, গলাগলি করে চা-চু খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, উৎফুল্লের ধাক্কায় কাপ কাত করে কারো চা ফেলে দিচ্ছে। হচ্ছেটা কী! যারা শুরুতে করোনার ভয়ে সমাজকর্ম করছিল, তারাই এখন করোনাকে পাত্তা দিচ্ছে না! এ মুশকিলের ব্যাখ্যা কী? আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে একটা ছড়া আছে, ফোকলোরের ভাষায় যাকে আমরা লোকছড়া বলি। 'আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে/লেবু পাতা, করমচা, যা বৃষ্টি ঝরে যা।' এই ছড়ার মধ্যে মুশকিলের আসান পাওয়া যায়। আমরা স্বভাবের দিক থেকে এমনই! খুব যত্নে বৃষ্টিকে ধানের লোভ দেখিয়ে নামাই। বৃষ্টি যখন চলে আসে সত্যি সত্যি, তখন সাথে সাথেই আমরা বিদায় দেওয়ার আপ্রাণ আহ্বান জানাই, লেবুপাতা, করমচা, পারলে হাবিজাবির লোভ দেখাই। আমরা এমনই সদাচঞ্চল। আমাদের আবেগ ধরতে পারা কঠিন। সেলিম আল দীনের একটা কথা আছে এ প্রসঙ্গে- 'যখনই গঠিত হই, তখনই মিলাই।' ধানের শর্তে বৃষ্টি নামালাম, সেই বৃষ্টি তো মেহমান, আমাদের ডাকেই বৃষ্টি এলো, আর আমরাই উপভোগ না করে আবার ঝরে যেতে বলছি। এ কেমন অতিথিপরায়ণতা! আমরা আসলেই কি এমন? 'মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।' সেই মানুষ কি আমরাই? কারণ ইউরোপের লোক বৃষ্টিকে নামিয়ে, যেতে বলে না। বৃষ্টিকে ডাকার কথা থাকলে ডাকে, বৃষ্টি এলে উপভোগ করে। আবার বৃষ্টির দরকার না থাকলে সরাসরি না করে দেয় তাকে। 'রেইন রেইন গো অ্যাওয়ে, কাম অ্যাগেইন অ্যানাদার ডে'! এই লোকছড়াটি তার প্রমাণ। অন্যদিন আসতে বলে দেয়, আজ তাদের খেলা আছে। কিন্তু আদর করে ডেকে, যা তা ভাবে তাড়িয়ে দেয় না। সম্মান দিয়ে যেতে বলে, সম্মান দিয়ে আসতে বলে। অন্যদিন খেয়াল মতো আসতে বলে। এসব লোকছড়ার মধ্যে একটি জাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে থাকে। থাকে সামষ্টিক অবচেতন। মোটেও হেলা করার নয়। করোনার ছুটির মধ্যে আমরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছি। আমাদের নাগরিক সমাজ, আলেম সমাজ, দলীয় সমাজ- সর্বপ্রকারে দুই ভাগে। একদল অতিসচেতন হয়ে গিয়েছিল, আরেক দল গায়েই মাখেনি, একদল চোরের খাতায় নাম লিখিয়েছে, আরেক দল চিকিৎসা দিয়েছে, দাফনেও সাহায্য করেছে। একদল কাজ করেছে জনগণের জন্য, আরেক দল ঘরে বসে বসে হালখাতায় ভুলের বাকি টুকে রেখেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় করোনা মোকাবেলা করেছে! স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষের পাশে থেকেছে! অন্যদিকে কোথাও কোথাও করোনা স্কোয়াড গঠন করে ছেলেমেয়েরা পাশে ছিল মানুষের। সর্বক্ষণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাইরেই ছিল, সচেতন করেছে, খাবার জুগিয়েছে ভুখার, অভুক্তের! এখন অবস্থা যতটা সুখী, মোটামুটি সহনীয়। সাধারণ ছুটির মাঝের দিনগুলোতে ছিল আতঙ্ক, অধিকাংশ গার্মেন্ট শ্রমিক হেঁটে বাড়ি ফিরেছে, হেঁটে এসেছে, সেবাই মিলছিল না কোভিড আক্রান্তের, শনাক্তর ছিল বিড়ম্বনা, রাস্তায় পড়ে মরে ছিল জ্বরগ্রস্ত, আগুনে পুড়ে গেছে করোনার রোগী। আমরা আসলে বুঝে উঠতে পারিনি তখন পুরোপুরি। সেই দিনগুলো অসহনীয় ছিল। বাংলাদেশের ম্যাজিক রিয়েলিটির মধ্যে সেই দিনগুলোতে ম্যাজিক রিয়েলিটি আরো বড় বাস্তবতা হয়ে ধরা দিয়েছিল। প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটছিল আর মনে পড়ছিল 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ'। যাকে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পরিভাষায় লোকে নাম দিয়েছে 'কীয়েক্টাবস্থা'! এই কীয়েক্টাবস্থা আমাদের ম্যাজিক রিয়েলিটির আরো বড় পরিণতি, শব্দটিকে মোটেও হেলা করে দেখলে চলবে না, লোকের আত্মা পরিস্থিতি টের পায়, তার বহিঃপ্রকাশও ঘটনায়। হৃদয়ের বেদনা অথবা আনন্দ যে শব্দে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, ভালো প্রকাশ করতে পারে, সেই শব্দটিকেই তারা নাজিল করে। করোনাকালীন আমাদের উপায় না পাওয়া দশাগুলোকে বলা যায়, 'কীয়েক্টাবস্থা'! এসব শব্দ প্রয়োগে কেউ কেউ অযথা রাগ করে। উষ্ফ্মার কিছু নেই। নতুন শব্দ ভাষার জন্য স্বাস্থ্যকর। ওষুধের মতো ব্যবহার করুন! ফল মিলবে, অবদমন কেটে যাবে।
২.
তিনতলায় থাকি। ঘরের পশ্চিমে কলাগাছ, দক্ষিণ কোণে নিম। তিনতলা সমান উচ্চতার কলাগাছ আমি এর আগে দেখিনি। এর চেয়ে একটু ছোট উচ্চতার কলাগাছ দেখেছিলাম বিরিশিরি গারোপাড়ায়। তা ছাড়া ঢাকা শহরে এতবড় কলাগাছ! কমকথা নয়। নিম মানা যায়। অন্যান্য নিমের মতোই প্রশস্ত, পাতারা যেন সবুজ ছোট মাছের ঝাঁক, বাতাসে হঠাৎ দোল খেলে মনে হয় এই বুঝি চিড়িক দিয়ে ছুটল।

নিম আর কলা দুটিই আমার প্রিয় গাছ। প্রিয় কিছু নিয়ে বলতে গেলে বাড়তি বলার ঝুঁকি থাকে। বাড়িয়ে কিছু বললে ক্ষমা করবেন। বর্ষাটা ঘরে বসেই কাটালাম, তারপর শরৎ, এখন হেমন্ত! এই দুই গাছের কারণেই যেন ঋতুগুলো টের পেলাম। বৃষ্টির পানির তরতর আর বাতাসের ঝাপটার তোড়ে কলাপাতা আকাশ ও মাটিকে একবার পিঠ দেখায়, আরেকবার বুক দেখায়। পাতার নুয়ে থাকা দিকে সুশৃঙ্খল পানির স্রোত বেয়ে যায়, যতক্ষণ বৃষ্টি হয় ততক্ষণ। জলের স্রোতের বাড়াবাড়ি নেই, যতটা সহনীয় ঠিক ততটাই নেয় পাতা বুক পেতে, ঝিরঝির ফোঁটায় সিক্ত হয় কচিপাতার সবুজ হৃদয়। মনে হয়, এইসব সৌন্দর্য দেখার জন্যই মানুষ বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকতে চায় আর ক'টা দিন পৃথিবীতে। কলাপাতার একটুখানি সবুজ মানুষকে টেনে নিয়ে যায় সবুজ পাহাড়ে, সবুজাভ বনাঞ্চলে! চোখের রোগীর পথ্য, এইসব সবুজ। চায়ের কাপে ধোঁয়া, ছিৎছিৎ বৃষ্টি জলের প্রবাহ যেকোনো মানুষের অন্দর বদলে দেয়, বিরহ থাকলে প্রেমে ফুরিয়ে দেয়, আর প্রেমে মজে থাকলে অযথা বিরহী করে দেয়! এর মধ্যে হেমন্তে বৃষ্টি হলো! এর নাম দিয়েছি 'নিম বৃষ্টি'! নিমের পাতাদের পরস্পর গায় গায় আরো ঘনিষ্ঠ করে দেয় বৃষ্টি। চুবচুবে পাতাদের গা থেকে জলের ফোঁটা মাটি স্পর্শ করে। ফোঁটা মুক্তির আগমুহূর্তে যেন ধপ্‌ করে একটু পেছন চেপে আলিঙ্গন করে পাতার শেষ প্রান্তের সাথে, শিরশির আলোড়িত করে পাতার শরীর। বৃষ্টির অবিরল জলস্রোত পাতায় পাতায় নাচে, এ-ডাল থেকে ও-ডালে, ছিটকে ছিটকে ওঠে। যতক্ষণ বৃষ্টি হয় ততক্ষণ গায় গায় লেগে থাকে পাতারা! দেখে মনমরা অনুভূতি হয়। ইচ্ছে হয়, পাতাদের মতোই প্রিয়কে জড়িয়ে ধরি, জল ঝরে যাওয়ার আগে পাতার শেষবিন্দুকে যেমন আলিঙ্গন করে, ঠিক তেমনি প্রিয়াকে আলিঙ্গন করি! মানুষ জন্ম! এই করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্যবিধির কারণে পারা যাচ্ছে না, স্পর্শ, আলিঙ্গন এসব থেকে মানুষ প্রায় দূরে। হঠাৎ দেখায়ও এখন আগের অভ্যাসগুলো পালন করা যাচ্ছে না, হাত মেলানো, জড়িয়ে ধরা ইত্যাদি। তাই! এই বৃষ্টিলগ্নে মন মোর নিমের পাতা হতে চায়, বৃষ্টির ফোঁটা হতে চায়! অন্যদিকে, কলাপাতা দূরত্ব বাড়িয়ে দেয় বৃষ্টির সময়, এদিক ওদিক ছোটে বাতাসের তোড়ে, আমরা কার্যত এখন কলাপাতা! অস্পর্শের আনন্দে, আমাদের বাঁচার অনুভবে! তবু কোথাও অন্তর বাজে। মন পোড়ায়। কবে এই মহামারি বিদায় নেবে কিংবা কখনো নেবে কিনা সংশয়ে ফেলে দেয়। দূরে থেকে প্রিয়জনের কত কাছে, সবই উপলব্ধি দিয়ে, মনের আঙিনায় ছুঁই, এই তো সোনা তুই। মরণ যেমন দূরে, হঠাৎ একদিন এসে হাজির হয়, তথাপি নিত্য মানুষের মাঝেই রয়, শ্যাম সমান, তেমনি আমার প্রিয় আমার মধ্যেই লীল হয়ে রয়, যত দূরেই থাকুক না কেন। কোভিড-১৯, বিশ বিশ বৎসরের অনেক অবসরে মনের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে মানুষের। কত মাস দেখা নেই কত কত প্রিয়জনের! ভাবা যায়! তবুও যেন তোমাকে অনুভব করি- এ কথা বলার অপেক্ষা কারো নাই। আমরা পরস্পরকে দেখি, দেখি সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, অন্তর দিয়ে ছুঁই। নতুন এক বাস্তবতা আমাদের জীবনবোধকে পাল্টে দিয়েছে। মন বা আত্মাই পৃথিবী। এখানে শরীর এক ইলিউশন। আমাদের শরীরের যোগাযোগ ইউটোপিয়া, আমাদের শরীরের অতি যোগাযোগ মনের চাইতে তা যেন বিষণ্ণ ভ্রম ছিল আমাদেরই যোজনায়। সব টের পাইয়ে দিচ্ছে কোভিড। সমাজে আমরা কতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলাম প্রকৃত বাস্তবতায়? আমরা বরং ঘনিষ্ঠ থাকার ভান করেছিলাম! আমরা গঠিত থেকেও ভেতরে ভেতরে বিচ্ছিন্নই ছিলাম। কাজেই কোভিড আমাদের মধ্যে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নাই। আমাদের কোভিডজাত বিচ্ছিন্নতা আমাদের তেমন কাতর করেছে কি? আমরাও বিচ্ছিন্নই ছিলাম, আমরা বরং ভং ধরে আচ্ছন্ন কিংবা ঘনিষ্ঠ ছিলাম, আমরা মুখোশ পরেই ছিলাম। তাই প্রকৃতি আমাদের সত্যিকারের মুখোশ ও বিচ্ছিন্নতা চাপিয়ে দিয়েছে। অবচেতনে সমাজিকভাবে পরস্পর থেকে দূরেই অবস্থান করছিলাম আমরা, যান্ত্রিক সংহতি এতদিন আমাদের আত্মসুখ দিয়েই রেখেছিল! পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ থেমেছিল? কোথায় মানুষের জৈবিক সংহতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিল কি নিকট অতীতে, এই বলে- তোমরা পরস্পর ঘনিষ্ঠ হও, আর বিচ্ছিন্ন থেকো না। জানায়নি। কাজেই এই মহামারি কেবল স্বাস্থ্য খাতের আতঙ্ক আর ব্যস্ততা বাড়িয়ে তুলেছে মাত্র, মনের খাত যেমন ছিল, তেমনই আছে। তাই মানুষের মনে তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি কোভিড। মানুষ মানুষকে অনুভব করে স্পর্শের শূন্যতা দিয়ে আলিঙ্গনের মর্যাদা বুঝে বন্ধ রাখেনি, চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, হিংসাসহ রিপুর তাড়না। বন্ধ রাখেনি। মানুষ যা ছিল প্রকৃতি তাতেই তাকে সমর্পিত করেছে মাত্র। প্রকৃতির কাজ প্রকৃতি করেছে, প্রকৃত ভারসাম্য এনে দিয়েছে। যে ছদ্ম মনুষ্য গুণাবলিকে ধারণ করে আমরা ছদ্মবেশীরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, প্রকৃতি তার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে, প্রকৃত মুখোশ পরিয়ে, প্রকৃতার্থে বিচ্ছিন্ন করে আমাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে।
৩.
পাশ্চাত্য যেমনি হোক, প্রাচ্যে অদ্বৈত-এর একটা মূল্য সবসময় ছিল। জীব আত্মা আর পরম আত্মা দ্বৈত থেকে অদ্বৈত হয়েছে। মানুষের মতোই তার বহু শিল্পাঙ্গ একের ভেতর এসে মিলিত হয়েছে, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী অবস্থানে আমাদের মানুষ ও শিল্পের 'রাধাকৃষ্ণ এক প্রাণ, দুই দেহ ধরি।' কাজেই বাঙালি সমাজে এখনো অর্ধেকের মতো মানুষ পাওয়া যাবেই যারা করোনায় মানসিকভাবে হয়তো কাতর। প্রিয়জনের আলিঙ্গন আর স্পর্শের শূন্যতা অনুভবের ক্ষমতা এখনো তাদের লুপ্ত হয় নাই, নিশ্চয় অনুভব করছে। অন্তর দিয়ে পরমকে যেমন স্পর্শ করছে এই অঞ্চলের মানুষ, তেমনি প্রিয় মানুষকেও স্পর্শ করছে মন দিয়ে। এর ব্যত্যয় ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না। পৃথিবীতে এই অঞ্চলের অদ্বৈতবাদী মানুষের মতো যত আছে মানুষ, মন-মন্দিরে আজ তাদের একটাই নিবেদন, কবে আসবে সুদিন! মানুষ মানুষের সাথে সোল্লাসে সাক্ষাৎ করবে, মানুষ মানুষকে স্পর্শ করবে নির্ভয়ে, মানুষ মানুষকে চুমু খাবে নিঃসংশয়ে, মানুষ হাত বাড়িয়ে পথ আগলে দাঁড়াবে মানুষের আলিঙ্গনের জন্য! অবশেষে তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকবে। রূপকথার গল্পের প্রথম বাক্যের মতো শোনাবে কোভিডকে, যেমনটি বলবো- এক পৃথিবীতে ছিল এক কোভিড...।

বিষয় : নিমবৃষ্টিতে কোভিড নিমগ্ন মন

মন্তব্য করুন