আয়নায় নিজমুখের ক্ষতচিহ্নগুলি দেখিতে পাইয়া... আয়নাটিই ভাঙিয়া ফেলিলাম কিন্তু চিহ্নগুলি মুখেই রহিয়া গেল
এই গল্পটিতে কোনো দার্শনিক বৃদ্ধ নাই। তবে আমাকে গল্পটি যিনি বলিয়াছিলেন তিনি একজন গ্রাম্যদেশীয় সহজিয়া ভাবুক।
গ্রাম্য বলিলাম- যেহেতু তিনি গ্রামে জন্মিয়া গ্রামেই জীবনপাত করিয়াছিলেন, তথাপি নূ্যনধিক বিদ্যাভ্যাস তাহার পছন্দ ছিল। যদিও সেই ব্রিটিশ শাসনামলের একজন আন্ডার এন্ট্রান্স ব্যতীত বলিবার মতো তাহার আর বিশেষ কোনো পরিচয় ছিল না। যদিও প্রাত্যহিক প্রয়োজনে পুত্র-কন্যাদি, পৌত্র-পৌত্রীদিগের সহিত তিনি প্রচল গ্রাম্য ভাষায় কথা কহিতেন; কিন্তু যখনই বক্তা হিসেবে কোনো বিষয়ের অবতারণা করিতেন অর্থাৎ যখন তিনি ভিন্ন অন্য সকলে শ্রোতা- তখন এই এতক্ষণ যে ভাষ্যরীতিটি আমি ব্যবহার করিতেছি তিনি সেই ভাষাটিই ব্যবহার করিতেন। গ্রামে গেলে আমি তাহার সাক্ষাৎপ্রার্থী হইতাম গল্প শোনার লোভে এবং তিনি ঠিক যে ভাষ্যে তাঁহার অধিকাংশ বক্তব্যগুলি আমার উদ্দেশে উৎসর্গ করিতেন, আমি তাহার অধিকতর নিকটবর্তী থাকিবার বাসনায় বক্ষ্যমাণ গল্পটিতে সেই ভাষারীতিরই অনুবর্তী হইয়াছি।
অতঃপর একদা একটি আষাঢ়কালীন দ্বিপ্রহরের পূর্বাংশে আমি তাহার দহলিজে উপনীত হইলাম।
ঋতুর চরিত্র অনুযায়ী তাহার কিয়ৎকাল পরেই শুরু হইল আষাঢ়ের নামসাযুজ্য রক্ষাকারী ভারি বৃষ্টিপাত। দিগন্ত ঝাপসা হইয়া আসিল। ধৌত-পত্র ফলদবৃক্ষাদির তলদেশে, তাহাদের প্রশাখাসমূহের ভাঁজে ভাঁজে ঝুলিয়া রহিল কিঞ্চিৎ গম্ভীর আবছায়া। মন্দ বাতাসে সেই আধো-আঁধারের গাত্রাবরণ কখনো কিছুটা উন্মোচিত হইলেও ঝোপ প্রজাতির বামুনাকৃতি বিশিষ্ট গাছগুলির তলদেশে তাহারা অনুন্মোচিত এবং ঘনীভূত হইয়া বসিয়া রহিল... কোথাও চলিয়া গেল না। দূরবর্তী প্রান্তর হইতে আগত হাওয়া- ধান বনে তাহাদের আন্দোলন শেষে বসতি বৃক্ষের পাতায় পাতায় শোঁ শোঁ শব্দ তুলিয়া আমাদেরকে চুপ করাইয়া রাখিল। আমার মনে হইতে লাগিল গ্রাম্য দেশের এই
আষাঢ়কালীন বৃষ্টিপাতের মূল বৈশিষ্ট্যের এইটুকু নগরজীবনে নাই যে গ্রাম্যবৃষ্টি অপেক্ষাকারীর জন্য বহির্গমনের প্রয়োজন এবং আগন্তুকের আগমনের সম্ভাবনা- এইসব রুখিয়া দিতে এক নিরবচ্ছিন্ন এবং একাগ্রচিত্ত চেষ্টায় সংশ্নিষ্ট সকলকে অসাড় করিয়া রাখে।
যাহারা মাসসমূহের নামকরণের দিনে জীবিত ছিলেন এবং এই মুহূর্তে যাহারা একটি সম্পন্ন দহলিজের ভারী, পুরাতন খুঁটিতে হেলান লাগাইয়া বসিয়া রহিয়াছেন- অসাড় করা এই আষাঢ় যেন তাহাদের সবার তুলনায় শক্তিমত্ত। ফলতঃ আমরা বসিয়াই রহিলাম। তবে বুঝিতে পারিতেছিলাম যে, নীরব নহে তবু এই নীরবতা সেই বৃদ্ধ মানুষটিকে কোথাও লইয়া যাইতেছে। আমার প্রত্যাশা দৃঢ়বদ্ধ হইতে লাগিল যে, হঠাৎ সৎবৃদ্ধ কিছু বলিয়া উঠিবেন।
মেঘ মসিবর্ণ ধারণ করিল আরো। বাতাস ঘনীভূত হইয়া এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেই যেন কী এক অশ্‌রুত গল্পের দিকে ঠেলিয়া দিতে লাগিল। সাধারণত বাক্যালাপকালে তিনি যে স্বরগ্রাম ব্যবহার করতেন, তাহা হইতে একটু নিচু এবং ভারী একটি দূরাগত অর্থাৎ ওঠানামা করিতে প্রয়োজনহীন স্বরে বৃদ্ধ বলিয়া উঠিলেন- প্রিয় বৎস, আমি তোমাকে এখন একটি বেদনাকে বুঝতে না পারার বেদনাকে বুকে নিয়া মরিয়া যাওয়া একজন সন্তানহীন বৃদ্ধের যুবক বয়সের গল্প বলিব। গল্পটিতে হয়তো তোমার জন্যে শিক্ষণীয় কিছু নাই, তবে নিশ্চয়ই ইহাতে উপযুক্তের জন্য অনুভবের বহুকিছু রহিয়াছে। এবং শুনিয়া রাখো- ইহা বলিবার মতো মুখরুচিকর কোনো গল্প নহে তবে নিশ্চয়ই গল্পটি কথকের বলিবার অধিকারের অধিক। আরো বলি শুনো- ইহা একটি মুহূর্তমাত্রের গল্প, যাহা নিমেষের অধিক দীর্ঘ নহে। আমার দিকে ফেরো.. শুনিয়া নাও- আমি ভিন্ন এই বিশ্বচরাচরে এই গল্পের আর কেহ সাক্ষী নাই, আর ইহা যাহাদের গল্প তাহারা এতদিনে তাহাদের গল্পটিকে বুকে করিয়া গোপন হইয়া গিয়াছেন। অবশিষ্ট রহিয়াছি কেবলমাত্র আমি, আর যদি অনুভব করিতে সামর্থ্যবান হও, তবে সেই প্রায় শতাব্দীপূর্বেকার একটি নির্জন দুপুরের কয়েক মুহূর্তের এই গল্পটি আজ হইতে তোমার হইয়া যাইবে।
আমি নীরব রহিলাম। বৃদ্ধ বলিয়া চলিলেন-
... আমি তাহার সমবয়স্ক ছিলাম। নিজের সামান্য পৈতৃক চাষজমির কাজ শেষ হইলে কাশেম হালী ... হ্যাঁ, হালীই ছিল তাহাদের পরিচিতি- পরে যাহা তাহার পূর্বপুরুষদিগের পদবিতে পরিবর্তিত হইয়াছিল, যাহারা কেবলমাত্র হাল চাষের তথ্যাদিই জানিত। চাষ মরশুমের শেষদিকে সেই কাশেম হালী আমাদের মাইনদার বাহিনিতে আসিয়া যোগ দিত, তবে অন্যান্য মাইনদারদিগের ন্যায় আমাদের দহলিজে রাত্রিবাস করিত না। কেননা, তাহাদের যৎসামান্য গৃহে সে চাহিতো না যে, তাহার মা একাকী রাত্রিযাপন করেন। উল্লেখ করার মতোই ছিল তাহার মাতৃভক্তি।
গ্রামে কটুভাষিণী হিসাবে মায়ের কিছু দুর্নাম থাকিলেও কাশেম তাহা গায়ে মাখিত না বলিয়া আমি জানিতাম। পূর্বেই বলিয়াছি আমরা সমবয়স্ক ছিলাম কিন্তু এখনো আমি নিশ্চিত জানিনা সে কেন বয়োজ্যেষ্ঠের ন্যায় আমাকে সমীহ করিত এবং কেনই-বা আমি তাহাকে বয়োঃকনিষ্ঠের ন্যায় স্নেহ করিতাম। এই বর্ষায় ওই দূরগ্রামের ন্যায় ইহাও ঝাপসা।
বৃদ্ধ আমাকে উদ্দেশ করিয়া বলিয়া চলিলেও কোনো অবসরে আমি 'রা' শব্দটিও কাড়িলাম না ... পাছে বহু বৎসর পূর্বেকার সেই মুহূর্তটি আমি হারাইয়া ফেলি। বৃদ্ধ বলিয়া চলিলেন- তখনকার গ্রাম্যরীতি অনুসারে যথাসময়ে কাশেম হালীর বিবাহ হইয়াছিল বিংশতি বৎসরে উপনীত হইবার পূর্বেই। কনে নির্ধারণ হইয়াছিল পার্শ্ববর্তী গ্রামের শাহেজ আলীর ওলাউঠার মহামারিতে পিতৃমাতৃহীন হওয়া ভাগিনেয়ী সখিনা বিবি। মাতুলানীর ঠেলা-গুঁতা খাইয়া যে নিরুপায় হইয়া তবু এতদিন বাড়িয়া উঠিতেছিল এবং দরিদ্রের সংসারে আশ্রিতা হইবার অভিজ্ঞতা- তাহাকে সহ্যশীলা এবং কর্মঠ হিসাবে গড়িয়া তুলিতেছিল। ফলতঃ কাশেম হালীর সংসারে হাঁসে-মুরগিতে, গরুতে-ছাগলে শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিলো এবং দুইজন নবীন বয়সের মানুষ ক্রমে পরস্পরকে আশ্রয় ভাবিতেও অভ্যস্ত হইয়া উঠিল। মাকে গোপন করিয়া পদ্মফুলের নমুনায় একটি অতিক্ষুদ্র নাকফুল- এক হাটফেরতা রাত্রে সখিনাবানুর হাতে তুলিয়া দিয়া কাশেম কহিল- রাত্রে রাত্রে পরিও।
এইরূপে দিনরাত্রি কাটিয়া যাইতে লাগিল। তবে তাহারা স্মরণে রাখিতে পারিলো না যে, বৎসর হইল দিনরাত্রিরই সমষ্টি। এমতাবস্তায় কখন জানি কাশেমের মায়ের মনে স্বামীর পিতৃবংশ রক্ষার প্রশ্ন আসিয়া দাঁড়াইল এবং বাড়িয়া চলিল সূর্যোদয়ের সংখ্যার তুলনায় গঞ্জনার অনুপাত। দিনান্তে বাড়ি ফিরিয়া গৃহবধূর ঈষৎ ফুলিয়া থাকা চোখের পাতা কাশেমকে নিরতিশয় উত্ত্যক্ত করিয়া তুলিতে লাগিল এবং বাংলাদেশে জন্মানো গল্পগুলির এই পর্যায়ে যুগান্তরব্যাপী যাহা ঘটিয়া আসিতেছে সেই মতোই বাড়িতে কবিরাজ ও গুণিনের আনাগোনা বাড়িয়া চলিল। স্বল্পজ্ঞানী মৌলভীদিগের তাবিজ-তুমারে ভারী হইয়া উঠিতে লাগিল বানুর গায়ের ওজন এবং কাশেমের কপালের রেখাগুলি। তোমাদের এই যুগে যত সহজে তোমরা বুঝিতে পারো যে, সন্তান হওয়া না-হওয়া কেবলমাত্র রমণীদিগের দোষ অথবা গুণের বিষয় নহে- সেই যুগে এমনটি ছিল না এবং গ্রাম্য রমণীদিগের কটুবাক্য যে কতখানি কটু হইতে পারে তাহা অনুধাবন করিতে পারাও তোমাদিগের পক্ষে সবিশেষ দুঃসাধ্য।
হতবুদ্ধি কাশেম দিনভর মাঠের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে ঘরে ফিরিয়া আরো ক্লান্ত বোধ করিতে লাগিল। সহ্যসীমা অতিক্রান্ত হইলে অসহায় বধূটির উপর তাহার ক্ষোভ, বিরক্তি, হতাশা উগরাইয়া দিতেও সে কসুর করিল না। পিঠে পাঁচনের দাগ এবং দুঃসহ অপমানে কাঁদিতে কাঁদিতে বউটি বলিতে লাগিল-
আমি তাহার দাসী হইয়া থাকিব,আপনি আবার বিবাহ করেন।
কাশেম মারিতে পারিতো ঠিকই তবে অতদূর ভাবিতে পারিত না।
এই পর্যায়ে আসিয়া বৃদ্ধ গল্পকথক কিয়ৎকাল নিশ্চুপ রহিলেন। হইতে পারে যে বয়সে আসিয়া একজন মানুষ সংসারের যাবতীয় স্থাবর সম্বন্ধে নিরুৎসাহিত বোধ করে বয়সের সেই চিরকালীন মর্মবাদ এক্ষণে বৃদ্ধের মনে ক্রিয়াশীল হইয়া উঠিল। মেঘগুলির ন্যায়
বোধকরি তিনি অন্য একদিকে মুখ করিয়া ভাসিয়া চলিলেন...। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ পানিতে ডুবিয়া থাকিতে বাধ্য হওয়া মানুষ যেমন ভাসিয়া উঠিতে সুযোগ পাইয়া প্রথমেই ভুশ্‌ করিয়া নিঃশ্বাস ছাড়িয়া বাঁচিয়া ওঠে- কী একটা বেদনার তলদেশ হইতে জাগিয়া উঠিয়া বৃদ্ধ তদ্রূপ বলিয়া উঠিলেন-
তাহাদের বিচ্ছেদ হইয়া গেল!
তাঁহার মুখের দিকে চাহিবামাত্র আমি বুঝিতে পারিলাম বিচ্ছেদ কেবলমাত্র একটি শব্দ নহে এবং বিচ্ছেদের অনুভব কোনো গল্পে আঁটিবার বিষয় নহে। বোধ হইল শব্দটি তাহার অক্ষরবৃত্তীয় সংগঠন ছাড়িয়া এই পৃথিবীর একটি ক্লান্ত হৃদয়ে এক্ষণে তাহার অর্থভিত্তি গাড়িয়া দিতেছে। মোনাজাত শেষের ছল করিয়া মুখে হাত বুলাইয়া নেওয়ার ভঙ্গিতে বৃদ্ধ তাহার অক্ষিকোনা মার্জনা করিয়া নিলেন। না দেখিয়াই আমি তাহা অনুমান করিয়া নিলাম ...।
ইত্যবসরে বৃষ্টি কমিয়া আসিতে লাগিল। বৃদ্ধ বলিতে লাগিলেন- অতঃপর পুনরায় কাশেম হালীর বিবাহ হইয়া গেল। তবে মৃত্যুর পূর্বে কাশেমের মাতা তাহার সাজনপটু নতুন পুত্রবধূর কোলে সন্তানাদি দেখিয়া যাইতে পারিলেন না। শোনা গিয়াছিল দূরগ্রামে সখিনারও বিবাহ হইয়াছিল।
এই দুইজন মানুষকে লইয়া যেহেতু পৃথিবীর আলাদা কোনো বিবেচনা ছিল না- তাই তিনি ঘুরিয়াই চলিলেন তাহার নিয়তিনিষ্ঠ কক্ষে- আর চিরকালের বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রম না আনিয়া মহাকালও গড়াইতে লাগিলেন তাহার যাত্রাপথে।
অতঃপর যে সমস্ত মুহূর্তগুলি এক মানুষজীবনে বারবার আসিবার নহে- তেমন একটি মুহূর্ত কাশেম হালীর সম্মুখে মুহূর্তেক আসিয়া মুহূর্তে উধাও হইয়া গেল। পরবর্তী সারাটি জীবন যে মুহূর্তটির আয়নায় নিজেকে বিম্বিত দেখিতে বাধ্য হইয়াছিল বিশেষণ বিবর্জিত একজন অখ্যাত হালচাষি। যে আয়নাটিতে চিরকালের মানবরেখা- সামনে দাঁড়ানো একজনের দেহরেখায় প্রতীকায়িত হইয়া যায়, ফুটিয়া ওঠে।
দিনটি ছিল নিমতলীর হাটবার।
নিজের প্রয়োজনে সঞ্চয়ে রাখা বীজধানের অর্ধেক পরিমাণ কাঁধে ফেলিয়া কাশেম দ্বিপ্রহরের আগেই হন্‌হন্‌ করিয়া হাটের অভিমুখে হাঁটিতে লাগিল। আমাদের এদিকের তুলনায় নিমতলীর হাটটি ছিল জমাটি এবং সেদিকে যাইতে অদ্য কাশেমের উদ্দেশ্য ছিল- নতুন বউয়ের নিত্যদিনের প্যানপ্যানানি এবং মুখঝামটা বন্ধ করিতে বীজধানের অর্ধেকখানি বিক্রয় দিয়া সে আজই একটি পদ্মমুখী নাকফুল ক্রয় করে। পথিমধ্যে ক্লান্তি হেতু কাঁধের বস্তাটি নামাইয়া একটি ঘন বাঁশঝাড়ের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসিয়া নিতে স্থির করিল সে। ছায়াশীতল মৃদু বাতাসে কিসের একটি ঘোর যে তাহার লাগিল তাহা সে নিজেও জানিল না। এমন সময়ে সামনের পথটি আড়াআড়ি পাড়ি দিতে একটি রমণীমূর্তি বাঁশবাগান পার হইয়াই একজন যুবককে আধবস্তা ধানের উপর বসিয়া থাকিতে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। ঘাড় ঘুরাইয়া কাশেম চাহিয়া দেখিল, আর কেহ নহে ... সখিনা!
কী কহিবে, কথা কহিবে নাকি কহিবে না- ভাবিতে ভাবিতে যে কথাগুলি কাহারও নয়- যে কথাগুলি কথার অধিক- যে কথাগুলি গত কিম্বা অনাগত দিনের ... কাশেম তাহাই বলিয়া উঠিল-
কেমন আছো!
মুহূর্ত পরে শুধরাইরা নিয়া আবার কহিল-
কেমুন আছেন গো ভিন্ন গাঁয়ের বৌ ...
সখিনার মনের খবর কাহারো নিকট নাই। কিন্তু কে না জানে দেবীমূর্তি মাটির! সেই সর্বংসহা মৃত্তিকামূর্তি কথা কহিয়া উঠিলে যেমন শোনাইতো, সখিনা সেই স্বরে কহিল-
ভালো আছি যেন্‌ ... কতদূরের পথ যাইবেন!
বীজধান বিক্রয় দিয়া নাকফুল কিনিবার প্রয়োজনের কথা বলিবার শেষে কাশেম কহিল- নিমতলী!
একটু কী সময় দিবেন?
বলিয়া সখিনা ঘোমটাখানি টানিয়া দিয়া ক্ষণকালের তরে পাশ ফিরিয়া দাঁড়াইলো। অতঃপর ঘুরিয়ে দাঁড়াইতেই এতক্ষণে নির্বোধ চাষাটি দেখিতে পাইল- নাকফুলহীন একটি পরিপূর্ণ রমণীমুখ। যাহার চোখের পাতা একবার মাত্র কম্পিত হইয়া স্থির হইয়া গিয়াছে। রমণী কহিল-
দেড়বৎসরে স্বর্ণ তো পুরাতন হয় না!
কাশেম দেখিল, একটি পদ্মমুখী নাকফুল নতুনের ন্যায় এখনো ঝকঝক করিতেছে। সেদিন কেন যে কাশেম আঁজলা পাতিয়া ধরিয়াছিল- মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত নিজেকে সে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়া যাইতে পারে নাই। চিরটাকাল কাশেমের কানে ধ্বনিত হইতে লাগিল সখিনার শেষ কথাগুলি। নিজমনে যে কথাগুলি বলিতে বলিতে সে চলিয়া গিয়াছিল চিরতরে ..
বীজধান বিক্রয় হয়ে গেলে আর কীইবা থাকে চাষার!
শেষ দৃষ্টিপাতের শেষে একবার কাশেমের মনে হইল কি হইলো না যে, ভিন্ন গাঁয়ের বৌটি বুঝিবা অন্তঃসত্ত্বা!
পরবর্তী বৎসর কৃষকের সামান্য ধানক্ষেতে ফলিয়া উঠিল যেনবা কাহার অতিগোপন শুভেচ্ছা... সূর্যালোকে পাকা ধানগুলিকে দেখাইতে লাগিল যেন মুঠি মুঠি পদ্মমুখী নাকফুল ...।
এতক্ষণে বৃষ্টি থামিয়া গেল। বৃদ্ধ কহিলেন, অদ্য জুমাদিবস.. নামাজান্তে আমার সহিত আহার করিয়া যাইও।
গাঁয়ের মসজিদে অর্ধচেনা, অচেনা কিম্বা চেনা, এমন বহুমানুষের সহিত আমার দেখা হইলে আমি তাহাদের মুখের পানে চাহিয়া রহিলাম ... কিন্তু কাহাকেও কাশেম হালীর ন্যায় ক্ষতচিহ্নিত এবং সম্পদশালী বলিয়া বোধ হইল না।

বিষয় : নাকফুলের অধিক

মন্তব্য করুন