দিনে দিনে বিগত মুহূর্তের ছায়া জমে মানুষের শরীর-মন হয়ে ওঠে এক স্মৃতি-জাদুঘর। জাদুঘরের প্রধান সম্পদ- অভিজ্ঞতা। একজন মানুষের সমস্ত কিছু কেড়ে নিলেও অভিজ্ঞতা তার মননের অবিচ্ছেদ্য অংশ; ছিনিয়ে নেয়া অসম্ভব। তবে একের অভিজ্ঞতা অন্যের জ্ঞান হতে পারে যদি তা মৌখিকভাবে অন্যকে শেখানো হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ধীর বলে অভিজ্ঞতার বিস্তার এবং স্থায়িত্বের সংকট অবশ্যম্ভাবী। তাই মানুষ প্রধানত অভিজ্ঞতাকে কর্মে তথা শিল্পে রূপান্তরিত করে- যে উপায়ে তার ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। বস্তুত যে মানুষের পক্ষে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকে না, সৃষ্ট শিল্পের মাধ্যমে সরাসরি সে অভিজ্ঞতার ছোঁয়া পেতে পারে, হয়ে উঠতে পারে অনেকটা অভিজ্ঞ। এভাবেই একের অভিজ্ঞতা অন্যের হয় এবং ফলে, অভিজ্ঞতা বহমান প্রক্রিয়া হয়ে টিকে থাকে।
অভিজ্ঞতায় আলোকিত ব্যক্তি কখনো কর্মী, কখনো পাঠক, কখনো শ্রোতা, কখনো আবার চিত্রশিল্পের সমঝদার। অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান আর প্রবহমানতা দেশ-কালের সীমানা মানে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে, গুরুত্বপূর্ণ বা বিশেষ, সমস্ত অভিজ্ঞতা প্রায় হস্তান্তরযোগ্য। এখন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একরকম ধারণা হয়ে সারা পৃথিবীর আকাশ দখল করে। শিশু-কিশোর যেমন পানি বর্ণহীন দেখেও সমুদ্র আঁকলে নীল রঙে ভরে দেয়; সমুদ্রকে দূরত্ব থেকে নীল দেখায়, সে কোনোভাবে জেনে যায়। গাছের পাতায় সবুজের জায়গায় মাখায় হলুদ-লাল-কমলাটে রঙ; পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে ঋতু পরিবর্তনের রঙের খবর তার অগোচরে থাকে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অভিজ্ঞতার উপস্থিতি নির্দেশ করে।
জন্ম থেকে মানুষ মূলত শেখে; যেমন- প্রথমে শেখে খাওয়া, হজম করা, ঘুমানো। ধীরে ধীরে শেখার তালিকায় অগুনতি বিষয় যুক্ত হয়- উচ্চারণ, আচার-ব্যবহার। তবে কথা বলতে শিখে গেলেও কোথায় কী বলা উচিত বা অনুচিত- এই শিক্ষা জীবনভর চলতে থাকে। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের প্রত্যেকটি বহিঃপ্রকাশ বা প্রতিক্রিয়া তার প্রাপ্ত শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার ফসল। সুতরাং বলা যায়, অভিজ্ঞতার প্রক্রিয়া নিজেও এক অভিজ্ঞতা থেকে উৎসরিত। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা যে অর্জন করতে হয় এবং কাজেকর্মে প্রয়োগ করতে হয়- এটাও এক শেখানো জ্ঞান। অভিজ্ঞতাকে সফলভাবে কাজে লাগানো যায়, তা মানুষ শিশুকালেই জানতে পারে। যেমন- আঙুলে ছ্যাঁকা খাওয়া শিশু আর কখনো আগুনের শিখার দিকে আঙুল বাড়ায় না। আসবাব থেকে পড়ে ব্যথা পাওয়ার অভিজ্ঞতার পরে উঁচু থেকে লাফ দেয়ার আগে বারবার ভাবে। সুতরাং জীবনে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য যা প্রয়োজন পড়ে, তা অভিজ্ঞতা; মানসিক পরিপকস্ফতা অর্জনের জন্য এক কথায় যা অপরিহার্য।
এ তো গেল সাধারণ জীবনে অভিজ্ঞতার ব্যবহারের কথা। কিন্তু যদি মাধ্যম হয় শিল্প? শিল্প সৃষ্টিতে কেবল অভিজ্ঞতা হলেই চলে না, সৃজনশীলতা লাগে। পরিবেশ-পরিস্থিতিও অনুকূলে থাকতে হয়। তবে অন্য সবকিছু আছে, কেবল প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নেই, এই পরিস্থিতি থেকে উতরানো অসম্ভব। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন বলেছিলেন, 'যার পকেটে শৈশব নেই, সে যেন কোনোদিন প্রতিভার নদীতে না নামে। নামলেই ডুবে যাবে।' ঋত্বিক ঘটকের মতও ছিল এক, 'সিনেমা বানাতে এলে এক পকেটে শৈশব, আরেক পকেটে থাকতে হবে দারু।' 'শৈশব' বলতে তিনি স্মৃতি এবং স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা এবং দারু বলতে 'প্যাশন' বা 'সৃষ্টির নেশা' বুঝিয়েছেন। এর অপরিহার্যতার পিছনে কারণ হলো, মানুষ মূলত নিজেকেই মেলে দেখাতে পারে। লেখক বলতে গেলে বারে বারে নিজেকেই লেখেন। ছায়াছবির নির্মাতা প্রধানত নিজের অভিজ্ঞতাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন। শিল্পী তুলিতে আঁকেন আজীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। কল্পনা ও অভিজ্ঞতা তখন হাত ধরাধরি করে চলে। কারণ, মানুষ সাধারণত যা দেখেনি বা শোনেনি, তার কাছাকাছি কিছু কল্পনাও করতে পারে না। মানুষের কল্পনা তার অভিজ্ঞতার অলিগলিতেই ঘুরপাক খায়।
কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে, সাহিত্যিক কল্পিত আবহে একটি সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। চরিত্র, স্থান, কাল- সমস্ত কিছু কল্পিত বা বানানো হলেও কথাশিল্পী নিজের জীবনে অর্জিত একটি অভিজ্ঞতাই মানুষকে জানাতে চান। জানাতে চান অভিজ্ঞতা তার কাছে সত্য, যে সত্য কল্পনার অধিক। লেখক সেই সত্যকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র বা বিশাল ক্যানভাসে একটি কাহিনির অবতারণা করেন। সেখানে বহু চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে, ঘটনার উত্থান-পতনের ঢেউ চলতে থাকে। কিন্তু লেখক কলম নিয়ে সেদিকেই রওনা দেন যেখানে গেলে অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যটি পাঠকের সামনে উন্মোচিত হবে। হতে পারে সত্যটি একমুখী, হতে পারে তা বহুমুখী। মূলত সেই সত্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত লেখকের নিস্তার নেই। প্রকাশে প্রশান্তি; প্রকাশেই নিজের অভিজ্ঞতাকে চলার পথ দেখানোর নিশ্চয়তা।
পৃথিবীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনায় লেখকের মনস্তত্ত্ব বা অভিজ্ঞতার ছায়া স্পষ্ট। বহু রচনা ইতিহাসনির্ভর, যা মানুষের সত্যিকারের অভিজ্ঞতায় বোনা ও মোড়ানো। ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের সময়কার অভিজ্ঞতা যেমন কাহিনি হয়ে উঠে আসে চার্লস ডিকেন্সের এ টেল অব টু সিটিস উপন্যাসে। বানানো কাহিনির আবহে বিপ্লব ও বিপ্লব পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা হাজির করা হয় যুগান্তরের পাঠকের জন্য। সালমান রুশদির মিডনাইট'স চিলড্রেন পড়লে যেমন করে ঔপনিবেশিক শক্তির পতনের কাহিনি চোখের সামনে ভাসে। অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার পথে আসা বাধা আর আত্মত্যাগের অভিজ্ঞতা লেখক অভূতপূর্ব নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তোলেন। স্রষ্টার সৃষ্টির পিছনে অভিজ্ঞতা থাকে কখনো নিজের, কখনো-বা শেখানো বা শোনা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে শিল্পী কামরুল হাসান ইয়াহিয়া খানের যে একটিমাত্র ছবি আঁকেন, তা ইয়াহিয়া সম্পর্কে অর্জিত অভিজ্ঞতার চিহ্ন বহন করে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোগদানকারী গেরিলা যোদ্ধা বা গানের দলে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাদের অভিজ্ঞতা সরাসরি দর্শক-শ্রোতার মধ্যে প্রবাহিত করার পক্ষে এর চেয়ে সুন্দর বহিঃপ্রকাশ আর কী হতে পারে! তাই তো সেই সময়ের জীবন থেকে নেয়া বা ওরা এগারোজন এবং কিছুকাল আগের গেরিলা জাতীয় চলচ্চিত্র বছরের পর বছর দর্শককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে। উল্লেখ্য, আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত উপন্যাসের কথা। মার্চের গণহত্যার ধকল সহ্য করার পরপরই লিখিত হয়েছিল উপন্যাসটি। টাটকা অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপান্তরিত করার এ রকম নিদর্শন পাওয়া কঠিন।
তবে শিল্পী, লেখক বা চলচ্চিত্র নির্মাতা যদি সৃজনশীলতার স্পর্শবিহীন কেবল ধারাবাহিকভাবে ও সরাসরি নিজের অভিজ্ঞতা শিল্পে বিলিয়ে যেতে থাকেন, তবে সেই শিল্প অনেক সময় পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের মন জয় করতে পারে না। বরং তা অনেকাংশে বিরক্তির উদ্রেকও করতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় দর্শক বা পাঠকের জানবার প্রয়োজন থাকে না। একজন খাঁটি শিল্পী জানেন ঠিক কোন উপায়ে দর্শক-শ্রোতাকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আলোকিত করা যায়, এতটুকু একঘেয়েমিতে না ভুগিয়ে। যেমন- সাহিত্যে, বর্ণনা যখন পাতার পর পাতা সাধারণ জীবনের হুবহু চিত্র হয়ে পড়ে, তখন তা পাঠকের মনে ঘোর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। লেখক তা জানেন বলেই 'রিয়েল' থেকে 'আনরিয়েল' বা 'সুররিয়েল'-এর আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতাকে বাস্তবতা থেকে সরিয়ে যতই পরাবাস্তবের দিকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, আদতে তা লেখকের অভিজ্ঞতাই। অভিজ্ঞতা একটি নির্মাণ-কাঠামো, যার উপরে ভর করে লেখক তার সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করেন। যা বলার প্রয়োজন ছিল তা বলেন এবং পাঠকের মনে নিজের অভিজ্ঞতা অনুরণিত হতে দেন। অভিজ্ঞতা শিল্পীর ক্ষেত্রে কেবল এক উপাদান হলেও বলা যায় অভিজ্ঞতাই সৃষ্টির ভিত্তি। অভিজ্ঞতার দৃঢ় জমিনে বসে সৃজনশীলতার কোমল আর মিহি কারুকাজ।
অনেকে মনে করেন, সুসাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে কড়কড়ে বাস্তব অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। তাই ধরে নেন, রচনার পটভূমি যে স্থান, সেখানে গিয়ে রচয়িতাকে দিনযাপন করতে হবে। বর্ণনার আধার যে জনগোষ্ঠী, তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হবে। হয়তো সত্যি এরও প্রয়োজন পড়ে কোনো ক্ষেত্রে। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয়েছে লেখকের বহু বছর আগের অভিজ্ঞতা এবং পটভূমি বা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের সময়ে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ বিদেশের মাটিতে বসে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাহিনিনির্ভর লালসালু উপন্যাস রচনা করেছেন, সৈয়দ শামসুল হক দেশান্তরী হয়ে লিখেছেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। পৃথিবীতে বহু লেখক নিজের দেশ ও জনগোষ্ঠী থেকে দূরে অবস্থান করে নিজের সংস্কৃতিনির্ভর সাহিত্যচর্চা করেছেন। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম ফকনার, হুলিও কোর্তাসার কিংবা এ যুগের হারুকি মুরাকামির কথা উল্লেখ করা যায়। তাই দেশ এবং নিজস্ব জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত যে স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা, তা প্রকৃতপক্ষে লেখক তার মাথার ভিতরে বহন করেন। সুযোগ পেলে সৃজনশীলতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠকের সামনে পরিবেশন করেন। এভাবেই সীমানা আর আকার-আকৃতিকে উপেক্ষা করে দেশ এবং কাল একটি ধারণা; শেষবিচারে, অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। তখন তাকে যে কোনো পটভূমিতে প্রতিস্থাপন করা যায়, এমনকি কল্পিত পটভূমিতেও; যেমন, গার্সিয়া মার্কেসের মাকোন্দো, উইলিয়াম ফকনারের ইয়কনাপাতাওফা, আর সৈয়দ শামসুল হকের জলেশ্বরী।
অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক বর্ণনা একঘেয়ে হবার সম্ভাবনা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে চরম ব্যতিক্রম দেখা যায়। দিনপঞ্জির আকারে লেখা অভিজ্ঞতাও অনেক সময় শিল্প হয়ে ওঠে। বলা যায়, আনা ফ্র্যাঙ্কের ডায়েরি কিংবা জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি-র কথা। অন্যদিকে, আহমদ ছফার মুক্তিযুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব ও আন্তর্জতিক রাজনীতির বিশ্নেষণসমৃদ্ধ রচনা অলাতচক্র যখন ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন তাকে লেখকের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধের দিনপঞ্জি বলে মনে হয়। তবে আরো পরে উপন্যাস আকারে সম্পূর্ণ বইটি পাঠকের হাতে আসে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ব্যতিত ওরকম কালজয়ী সৃষ্টি অসম্ভব। সাধারণ অভিজ্ঞতা মহান লেখকের নিপুণ হাতে কল্পকাহিনি বলে ভ্রম হয় বৈকি। যেমন- শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি নিছক তার অভিজ্ঞতার, অর্থাৎ বাস্তব জীবনের গল্প। কিন্তু বছরের পর বছর বইটি উপন্যাস হিসেবে প্রচার পেয়েছিল। আরো বলা যায়, সমারসেট মম দ্য রেজর'স এজ (১৯৪৪) উপন্যাসে নিজের অভিজ্ঞতাকে অভিনব কায়দায় কাজে লাগিয়েছেন। দেখা যায় কাহিনির ক্রমবিকাশে তিনি নিজেই উপন্যাসের চরিত্র। কাহিনির বাঁকে বাঁকে নিজেও উপন্যাসে প্রবেশ করেন এবং চরিত্রদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে নির্যাতিত যোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে তিনি তার অভিজ্ঞতা পাঠকের সামনে উপস্থাপনের দায়িত্ব নেন।
অন্যদিকে, অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক বর্ণনা যে কখনো ইচ্ছে করেই লেখককে উপস্থাপন করতে হয় না, তা নয়; ইতিহাসের বর্ণনা বা ভ্রমণ কাহিনি যার উদাহরণ। সরাসরি বর্ণনা হলেও, একই জায়গা ভ্রমণ করে এসে দুজনের ভ্রমণ কাহিনি দু'রকমের হতে পারে। একই ইতিহাস একাধিকভাবে রচনারও প্রচুর উদাহরণ মেলে। কখনো মত ও দৃষ্টিভঙ্গি আর কখনো সৃজনশীলতার পার্থক্য এর জন্য দায়ী।
ভয়ানক মানসিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকেও শিল্প সৃষ্টি হতে পারে। ফ্রিদা কাহলো, জন লেনন, রবিন উইলিয়াম, ভার্জিনিয়া উলফ এবং আরো অনেক লেখক-শিল্পী কৈশোরে বা জীবনের কোনো ধাপে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। 'ট্রমা' জাতীয় অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে, অন্য অর্থে, বিপর্যয়কে কাটিয়ে উঠে তারা শিল্প সৃষ্টি করেন এবং নিরলস শিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকেন। বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতাকে তারা সৃষ্টিতে কাজে লাগান। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে এটা অনেক সময় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যাকে বলে, পোস্ট ট্রমাটিক গ্রোথ। ২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায় যে, মানসিক বিপর্যয়ের পরে সত্তর শতাংশ মানুষ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের জন্য ইতিবাচক কাজ করেন।
মানুষ যা দেখে আর অনুভব করে, সেখান থেকেই তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করে। বলতে গেলে, মানুষের মাথার ভিতরটা এক কারখানা। সেখানে অভিনব তথ্য প্রবেশ করে এবং অতীতের তথ্যের সঙ্গে মিথস্ট্ক্রিয়ার ফলে নতুন অনুভূতির সৃষ্টি হয়। নতুন অনুভূতি অনুযায়ী মানুষ পরবর্তীকালে নিজেকে উপস্থাপনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যের ক্রমাগত প্রবেশ ও সিদ্ধান্তের ক্রমশ আত্মপ্রকাশের প্রক্রিয়া কখনো বন্ধ হয় না। বয়স যত বাড়তে থাকে, মানুষ শুধু একই বিষয়কে বিচিত্র কোণ থেকে অবলোকন করার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। যে যত বেশি দৃষ্টিকোণ অর্জন করতে পারে তাকে তত অভিজ্ঞ বলা যেতে পারে। জ্ঞান হবার পর থেকে কাউকে বিরান এলাকায় অন্ধকার ঘরে একাকী কাটাতে হলে তার কেবল অন্ধকার ও নৈঃশব্দ্যের অভিজ্ঞতা হতো। তাই বলতে গেলে মানুষের সামনে যা আসে, যে সমস্তকিছুর ভিতর দিয়ে তাকে যেতে হয়, সবকিছুই অভিজ্ঞতা হিসেবে জমা হয়। এক অভিজ্ঞতা তাকে আরেক ঘটনার মোকাবিলা করতে শেখায়। ঘর-পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে সতর্ক হয়ে যায়। নতুন ঘটনাকে মোকাবিলা করার ঘটনা আবারো নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে জমা হয়। আর এভাবেই, অভিজ্ঞতা মানুষকে জীবনের অনাগত দিনে পা রাখতে সাহসী করে তোলে। প্রতিটি পদার্পণে তার নতুন জন্ম হতে পারে। অভিজ্ঞতা এমন এক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে প্রাকৃতিক জন্মের পরেও বহুবার বহু রূপে জন্মগ্রহণের স্বাধীনতা দেয়।

বিষয় : কী হয় অভিজ্ঞতায়

মন্তব্য করুন