গ্লাসগো শহরের কর্মজীবী শ্রেণির ছোট্ট এক বালক ছিলেন ডগলাস স্টুয়ার্ট। সেই বয়স থেকে কীভাবে নিজের মাদকাশক্ত মায়ের মনের অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, সেটা তাকে শিখে নিতে হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে ডগলাস স্টুয়ার্টের জন্ম। তিন ভাইবোনের মধ্যে ডগলাস ছিলেন সবচেয়ে ছোট। তার মা ছিলেন মাদকাসক্ত। ১৬ বছর বয়সে ডগলাস মাদকাসক্ত মাকে হারান। তিনি বলেন, 'আমার মা মাদক আর নেশায় আসক্ত হয়ে খুব দ্রুত মারা যান।' সেই অভিজ্ঞতা থেকে ডগলাস লিখলেন তার প্রথম উপন্যাস 'শাগি বেইন'।
৪৪ বছরের ডগলাস স্টুয়ার্ট তার প্রথম উপন্যাস শাগি বেইন লিখে ২০২০-এর বুকার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এই উপন্যাস লিখতে ডগলাস স্টুয়ার্টের ১০ বছর সময় লেগেছিল। শাগি বেইন উপন্যাসের গল্পে এক কিশোরের তার মায়ের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা ও আবেগকে বর্ণনা করতে গিয়ে ডগলাস স্টুয়ার্ট আসলে নিজেকেই বর্ণনা করেছেন।
ডগলাস স্টুয়ার্ট মাধ্যমিক পাস করার আগেই তার মাকে হারান। গ্লাসগোতে স্কটিশ কলেজ অব টেক্সটাইলস থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন করেন। সাহিত্য তত্ত্ব নিয়ে তার কোনো একাডেমিক পড়াশোনা ছিল না। তার শিক্ষক ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে তাকে নিষেধ করেছিলেন। কারণ, ডগলাস যে পরিবার আর অবস্থা থেকে এসেছেন, সেখানে ইংরেজি সাহিত্য তার জন্য তেমন ভালো কিছু বয়ে আনবে না। পড়াশোনা শেষ করে ডগলাস আমেরিকায় চলে আসেন ক্যারিয়ার গড়তে। আমেরিকায় ফিরে আসাটা আসলে ডগলাসের জন্য ছিল নিজের ছেলেবেলায় ফিরে আসা। ডগলাস প্রথম উপন্যাস শাগি বেইন লেখা শুরু করেন ৩০ বছর বয়সে। সে সময় তিনি পৃথিবীর যেখানেই ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেখানেই হোটেল, এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ- যেখানেই সুযোগ পেতেন তার উপন্যাসের কাজ এগিয়ে নিতেন।
প্রথম উপন্যাস লেখার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে ডগলাস উত্তর দিয়েছিলেন, 'প্রথমত আমার নিজের কাছে নিজেকেই প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, আমি লিখতে পারব কিনা। আমি সৃজনশীল লেখার কোনো অনুশীলন ক্লাস করিনি, আমার কোনো লেখক বন্ধু বা কমিউনিটি ছিল না, আমি এই কাজটা করেছি শুধু এজন্য যে, এই কাজটা করতে আমি ভালোবাসতাম, এই কাজটা করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম আমি।'
ডগলাস স্টুয়ার্টকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'শাগি বেইন লিখতে আপনি কীভাবে উৎসাহ পেলেন?'
ডগলাস উত্তরে বললেন, 'তেমন বিশেষ কিছু না। আমি বড় হয়েছি গ্লাসগোতে আশির দশকে। আমি যখন একদম কিশোর, তখন মাকে হারাই। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। শুধু শিক্ষার ক্ষমতাবলে অসহায় সেই বালক নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছিল। স্কটল্যান্ডকে ধন্যবাদ যে, তখন স্কটল্যান্ড দরিদ্র থাকলেও সে আমাকে এমন এক শিক্ষা দিতে পেরেছিল, যা দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করে ফেলা যায়। আমি নিউইয়র্ক শহরে বাস করছি গত ২০ বছর। ছেলেবেলার সেই ছোট্ট আমির জন্য কষ্ট অনুভব করি আমি। শুধু তাই না, যে শহরটাতে আমি বেড়ে উঠেছিলাম, তার চারপাশের লোকজন, সবার জন্য আমার বেদনাবোধ কাজ করে। এই সবকিছু বইয়ের পাতায় গুছিয়ে লিখতে তাগিদ অনুভব করছিলাম। আমি আসলে শুরু করেছিলাম ১৩তম অধ্যায় থেকে, যেখানে উপন্যাসের চরিত্র লিক ও শাগি একসঙ্গে হাঁটছিল আর লিক তার ছোট ভাইকে শিক্ষা দিচ্ছিল কীভাবে একজন পূর্ণ মানুষের মতো হাঁটতে হয়। এটা বর্ণনা করতে গিয়ে আমি দেখলাম, উপন্যাসের গতি উঠে গেছে। এরপর আর কোথাও আমাকে থামতে হয়নি।'
শাগি বেইন কোনো আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস নয়। যদিও এই উপন্যাসে ডগলাস স্টুয়ার্ট ভীষণভাবে উপস্থিত আছেন। শাগি বেইন উপন্যাসটি ডগলাস স্টুয়ার্ট তার মৃত মাকে উৎসর্গ করেছেন।
শাগি বেইন উপন্যাস ৩২ জন প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর অবশেষে এটা প্রকাশিত হয়। প্রকাশকালের অভিজ্ঞতার বিষয়ে ডগলাস বলেন, 'উপন্যাসটা বিস্ময়করভাবে অভিনন্দন পেয়েছে। উপন্যাসটা যদিও একটা নির্দিষ্ট সময় আর স্থানকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে। তবুও এর আবেদন ও আবেগ বৈশ্বয়িক। আমেরিকার ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি প্রযোজ্য।'
প্রথম উপন্যাস দিয়ে বুকার পুরস্কার জিতে যাওয়ার পর বুকারপ্রাইজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। তার চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
-বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা থেকে আপনি প্রথম উপন্যাস দিয়েই বাজিমাত করে দিলেন, পুরস্কার জিতে ফেললেন, কেমন লাগছে এখন?
ডগলাস স্টুয়ার্ট: এটা আসলে অতি প্রাকৃতিক লাগছে আমার কাছে, বাস্তব মনে হচ্ছে না। আমি একজন শ্রমজীবী শিশু ছিলাম, যার কাজের ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন এবং যে লেখালেখি শুরু করেছে অনেক দেরিতে। কাজের বৈধতা আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছিল। আমি মনে করি, শ্রমজীবীদের নিয়ে গল্প লিখলে এটা অন্যদের উৎসাহিত করবে।
-১৯৮০-এর দিকে গ্লাসগো শহরের গল্প নিয়ে শাগি বেইন লেখা হয়েছে। আপনি এখন যেখানে থাকেন সেখান থেকে অনেক দূরে নিজ জন্ম শহর নিয়ে লিখতে আপনার কেমন লাগল?
--শাগি বেইনের চরিত্রের অস্তিত্ব পৃথিবীর কোথাও নেই। গ্লাসগো শহর তাদের রক্তে যেমন মিশে আছে, সেভাবে আমার রক্তেও মিশে আছে। আপনি যখন এমন কোনো শহর থেকে আসেন, যেই শহরে অত্যচারী, দুষ্টআত্মা, আক্রমণাত্মক মানুষ, আবার একই সঙ্গে হাসিখুশি মানুষরা ঘুরে বেড়ায়। সেই চরিত্রগুলোই আপনার পরবর্তী জীবনের জন্য আপনাকে একটা পথ দেখিয়ে দেবে। বাকি জীবন আপনি কেমন মানুষ হবেন, সেটা ঠিক করে দেবে। গ্লাসগো শহরে আমার শৈশব ছিল ভয়ানক, আর সেই শহর থেকে দূরে থাকাটা আসলে আমাকে অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে গল্পটা তৈরি করতে আরও ভালোভাবে সাহায্য করেছে। এই দূরত্বের কারণে সেই শহরকে আমি ফের ভালোবাসতে পেরেছি।
-আপনার উপন্যাস খুব জটিল কিছু বিষয় নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। যেমন- দারিদ্র্য, মাদকাসক্ত, প্রবল ভালোবাসা থেকে উপেক্ষিত হওয়া। আপনি কি মনে করেন আশাবাদী মনোভাব আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ? যদি তাই হয়, তাহলে কেন?
--এটা স্কটিশদের স্বভাব, খুব খোলামেলাভাবে জটিল পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া। আমি গ্লাসগোবাসীদের মতো এত উদার ও দয়াশীল মানুষ কম দেখেছি। তাদের মধ্যে অহঙ্কার পাবেন না। তারা পরস্পর সহযোগিতার মনোভাব রাখে। কারণ ১৯৮০-এর দিকে থেচারের শাসনামলে সবাই খুব বাজে পরিস্থিতিতে ছিল। ফলে আমাদের একত্রিত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আপনার যে ধরনের সমস্যাই থাকুক না কেন, মা-দাদিদের সেটা খেয়াল করার সুযোগ থাকবে না, যদি না তখন পর্যাপ্ত টাকা থাকে। টাকা না থাকলে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আপনাকে সম্মুখ সারি থেকেই সেটার মুখোমুখি হতে হবে। এ অবস্থায় ভালোবাসা, হাসিখুশি ভাব আর আশাবাদী হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমি মনে করি, গ্লাসগো শহর আর অধিবাসীরা জন্মগতভাবেই আশাবাদী। এ ছাড়া আমরা তো বেঁচে থাকতে পারব না।
-আপনার প্রথম উপন্যাস শাগি বেইন লিখতে কত সময় লেগেছিল?
--অন্য সব লেখকের মতো আমাকেও সারাদিন কাজ করতে হতো। আমি কাজ করতাম ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ভীষণ ব্যস্ত একটা জায়গা। শাগি বেইন লিখতে আমার ১০ বছর সময় লেগেছিল। প্রবল ব্যস্ততার মধ্যে আমাকে খুব স্বার্থপরের মতো সময় বের করতে হতো। দিনের একটা নির্ধারিত সময় আমি শাগি বেইন লিখতাম। তবে উপন্যাসটা যখন দাঁড়িয়ে যেতে শুরু করল, তখন আর সব কাজ আমার জন্য বাধা হয়ে গেল। আমি উপন্যাসের চরিত্রগুলোর কাছে ফিরে যেতে উদগ্রীব থাকতাম। ওই সময়ের চরিত্রগুলোর গল্প আমাকে একদম গিলে খেয়েছিল।
-আপনি কি নির্দিষ্ট রুটিন ধরে লেখালেখি করেন, নাকি স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে লিখতে থাকেন?
--এখন সারাদিনই লিখি। আমি এখন পেশাদার লেখক। তাই একটা নিয়ম ধরে সকালের নাশতা করে লেখার টেবিলে বসে যাই। তবে লেখার বিষয়ে নিজেকে আমি পীড়াপীড়ি করি না। যখন কোনো লেখা আসে না তখন আমি নিজের মনের ওপর জোর করি না। যখনি আমি কোথাও আটকে যাই, তখনই আমি নিউইয়র্ক শহর দেখতে বের হয়ে পড়ি। আপনি তো জানেন, নিউইয়র্ক কত অদ্ভুত শহর। ঘুরতে ঘুরতে আমি এত অদ্ভুত মানুষ আর এত বিচিত্র আচরণের মুখোমুখি হই যে, ফের আমি লেখার উদ্দীপনা ফিরে পাই।
-আপনার লেখা চরিত্র শাগির মধ্যে কি নিজেকে দেখতে পান আপনি?
--আমি মনে করি, অনেক লেখকের চরিত্রই বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসে। বিষয়টা এমন না যে, আমি নিজেকে শাগির মধ্যে দেখি; বরং বিষয়টা হলো- যে জীবন আমি যাপন করেছিলাম গ্লাসগোতে, যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছিলাম, সেগুলোই উপন্যাসের নানা চরিত্রের ভেতর চলে এসেছে। আমি মনে করি, আপনি উপন্যাসে এটা খুব শক্তিশালীভাবে অনুভব করবেন।
-বুকারজয়ী কোন উপন্যাসটা আপনার পছন্দের?
--জেমস কেলমানের হাউ লেট ইট ওয়াস হাউ লেট, এই উপন্যাস আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। খুব সাহসী একটা বই। এর গদ্যের গতিময়তা, এর চেতনাবোধ, জ্ঞান সত্যিকার অর্থেই চিন্তা-ভাবনা করার মতো। এই বই দিয়েই আমি সর্বপ্রথম আমার এলাকার লোকদের ভাষাভঙ্গি ভালোভাবে বুঝতে পারি।
-আপনার কাছ থেকে পরবর্তী কোন বইটা আশা করতে পারি?
--আমার পরের উপন্যাসের চূড়ান্ত কাজ এখন করছি। এই উপন্যাসটা ১৯৯০-এর গ্লাসগো শহরের ওপর ভিত্তি করে লেখা। দু'জন কিশোর বালকের ভালোবাসার গল্প, যাদের অঞ্চল, জাত, রং, সাম্প্রদায়িক সীমা ভিন্ন হওয়ার পরও একে অপরের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করে। আমি সবসময় কঠিন জটিল পরিস্থিতিতে সূক্ষ্ণ মায়া আর ভালোবাসাকে খুঁজে বেড়াই।
*দ্য বুকার প্রাইজেস, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য সানডে পোস্ট অবলম্বনে