ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

শূন্য দিনের গান

শূন্য দিনের গান

.

রুবায়েত হাসান

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৩

গণিতের প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী নামটা ভার ভারিক্কির মনে হলেও আসলে তিনি একজন ছোটখাটো মানুষ। এখন জড়সড় হয়ে বিশাল একটা টেবিলের সামনে বসে আছেন। টেবিলের ঠিক ওপাশেই তিনজন হাই অফিসিয়াল বসে আছেন। তিনজনের চেহারাতেই বেশ অদ্ভুত রকম মিল। তিনজনেরই মাথায় টাক, মুখে হালকা দাড়ি, সুটেড বুটেড চেহারা। এই তিন ভদ্রলোকই হচ্ছেন দেশের নামকরা বিজ্ঞানী। তারা মূলত কম্পিউটারের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করেন। 
আগে এই তিনজনের নাম জানলেও প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী কেবলমাত্র মাঝখানের যে বয়স্ক ভদ্রলোক আছেন, তাঁর নামটা মনে করতে পারছেন। বাকি দু’জনের নাম তাঁর মনে আসছে না। তিনি জানেন মাঝখানের ভদ্রলোকের নাম হচ্ছে ড. রাফাত হাসান। তাঁর হাতে বেশ মোটা মতন একটা ফাইল। ফাইলটা ডক্টর হাতেম আলীর তৈরি করা।
ড. রাফাত হাসান বললেন, ‘আপনার ফাইলটা আমরা পড়েছি। কিছু কিছু জায়গায় অস্পষ্টতা আছে। আপনাকে অনুরোধ করব আমাদেরকে সংক্ষেপে আপনার ধারণাগুলো বলুন।’
বাকি দু’জন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলীর দিকে। তাদের অগ্নিদৃষ্টি উপেক্ষা করে সামনে রাখা গ্লাস থেকে এক গ্লাস পানি খেলেন ডক্টর হাতেম আলী। তারপর বলা শুরু করলেন।
‘ঘটনা হয়েছে কী, স্পেনে আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে। মানে আপনারাও তো জানেন আমি ফলিত গণিত নিয়ে ডক্টরেট করেছি স্পেন থেকে। তো সেখানকার আমার যে বন্ধুবান্ধব আছে, তারা কিছু পুরাকীর্তি পেয়েছে স্পেনের একটা গুহা থেকে। জানেন তো, স্পেনের আলতামিরা গুহাতেই খ্রিষ্টপূর্ব ১১,০০০ থেকে ২১,০০০ খ্রিষ্টপূর্বের মাঝামাঝি সময়কার গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। তো এই নতুন আবিষ্কৃত গুহাতে অবশ্য কোনো গুহাচিত্র পাওয়া যায়নি। প্রায় দুই হাজার বছর আগে সম্ভবত এখানে মানুষজন বসবাস করত। পুরোনো কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেছে এই গুহাতে। খুব বেশি পুরোনো নয়, খুব একটা মূল্যবান নয় সেগুলো পুরাকীর্তি হিসেবে। তা যাই হোক, সেখানে পাওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে কিছু হাড়, মাটি, পাথর ও কাঠের তৈরি জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। সেগুলো পাওয়ার পরে আমাদের বন্ধুবান্ধবরা স্পেনের একটা ল্যাবে কার্বন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোর বয়স আবিষ্কার করতে চেষ্টা করছিলেন। তারা মোটামুটি ধরে নিয়েছেন যে ওইসব জিনিসপত্র দুই হাজার বছর আগে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রেডিও কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করতে গিয়ে ওইসব জিনিসপত্রের ভেতর কিছু এমন ধরনের অ্যানোমালি বা অসংগতি, অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।
‘কী ধরনের অসামঞ্জস্য?’
‘মানে জৈব পদার্থের কার্বনের ক্ষয় মেপে তো অনেক কিছুরই বয়স মাপা যায়। কিন্তু যারা পরীক্ষা করছেন, তাদের কাছে মনে হয়েছে, ২০০০ বছর আগে ঠিক যে সময়টা নিয়ে তারা পরীক্ষা করছিলেন, সেই সময়ের কার্বনের অণুর ভেতরে অদ্ভুত রকম কিছু পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। আসলে ঠিক পরিবর্তন নয়, বলা চলে কোনো পরিবর্তনই দেখা যায়নি। মানে অনেকটা কোনো কিছুকে ডিপ ফ্রিজে রাখার মতন আর কী। ধরুন আপনি বাজার করে একটা মাছ নিয়ে ফ্রিজে রেখে দিলেন। তারপর ফ্রিজ থেকে যখন বের করলেন তখন সেটা আবার আগের মতন তরতাজা হয়ে গেল। মানে ওই সময় ‘সময়’টা ফ্রিজ হয়ে গিয়েছিল।’ 
‘আপনার কথাটা ঠিক পরিষ্কার নয়।’
‘তাহলে আমাকে আবার আমেরিকায় যেতে হবে। মানে আমার আমেরিকার বন্ধুদের কথা বলতে হবে। আমার আরেক বন্ধু জন রবার্ট, আমার সাথে স্পেনে পড়ত কিন্তু তার বাড়ি হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়াতে। সে বর্তমানে আমেরিকায় ফসিলের বয়স নিয়ে গবেষণা করছে। আমি কার্বন ডেটিং-এর এই অদ্ভুত পরীক্ষার ফল জন রবার্টকে জানিয়েছিলাম। ওদের ল্যাবে কিছু পুরোনো গাছের কাণ্ড রয়েছে। পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো কাণ্ডগুলো ফসিলে রূপান্তরিত হয়েছে। জানেন তো প্রতি বছর গাছের কাণ্ডের ভেতরে একটা করে রিং হয়। এই রিংয়ের সংখ্যা দেখে গাছের বয়স বোঝা যায়। ওকে যখন বললাম গাছের রিংগুলো পরীক্ষা করতে, তখন ও রিং পরীক্ষা করে দেখে যে ফসিল গাছের গুঁড়িতে যতগুলো রিং থাকার কথা তা নেই। ঠিক দুই হাজার বছর আগে যে রিংটা থাকার কথা ছিল, সেটা নেই। নেই মানে একেবারেই গায়েব।’
‘হ্যাঁ, আপনার রিপোর্টে এসব তো দেখলাম আমরা। কিন্তু আপনার বক্তব্য সম্পর্কে আমরা, যাকে বলে একটু সন্দিহান। আপনি আমাদেরকে আর একটু পরিষ্কার করে বলবেন?’
‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এই ঘটনার পরে আমি আমার কার্যক্ষেত্র ফলিত গণিত নিয়ে কাজ করা শুরু করি। শেষে অনেক বিশ্লেষণ করে আমি দেখতে পেলাম, আমাদের ইয়ার জিরোর সাথে এর একটা সম্পর্ক আছে। একটা বছর সবার জীবন থেকে একবারে হারিয়ে যেতে পারে না।’
‘হ্যাঁ, ইয়ার জিরো নিয়ে আপনি এখানে লিখেছেন।’ 
‘তারপরও আমি একটু ব্যাখ্যা করি। কেমন?’
এবার একসঙ্গে তিনজন মাথা নাড়লেন। 
‘আপনারা তো জানেন যে আমরা মোটামুটি সবাই গ্রেগরিয়ান  ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি। মানে ধরুন বর্তমানে আমরা রয়েছি ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে। তো আমরা যদি সময়কে পেছাতে থাকি তাহলে পেছাতে পেছাতে চলে যাব ১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আবার যদি আরও পেছাতে থাকি তাহলে চলে যাব ১ খ্রিষ্টপূর্বে। তারপর ২ খ্রিষ্টপূর্ব, ৩ খ্রিষ্টপূর্ব এভাবে বাড়তেই থাকবে। এখানে লক্ষ্য করবেন যে আমরা কিন্তু শূন্য খ্রিষ্টাব্দে পৌঁছাতে পারছি না।’ 
‘এটা খুব কমন প্রবলেম। এটাকে বলা হয় ইয়ার জিরো সমস্যা। এই কারণে খ্রিষ্টপূর্ব ১-কে ধরা হয় ইয়ার জিরো।’ 
‘জি, এইখানটাতে আমার একটু আপত্তি আছে।’ মৃদু কেশে উঠলেন ডক্টর হাতেম আলী।
‘আপনি বলতে পারেন।’ 
‘আমি ভালো করে চেক করেছি। গাণিতিকভাবে দুই হাজার বছর আগেকার যত রকম ঘটনা আছে লিপিবদ্ধ করেছি। প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছি। এইসব দেখে আমার কাছে একটা স্পেশাল প্যাটার্ন ধরা পড়েছে। তা হলো, আমরা এই ইয়ার জিরো বলছি যাকে, তার অস্তিত্ব আসলে ছিল। মানে শূন্য খ্রিষ্টাব্দ বলে কোনো একটা জিনিস অবশ্যই ছিল। এই শূন্য খ্রিষ্টাব্দের এক বছরের ইতিহাস আমরা হারিয়ে ফেলেছি।’
এই পর্যায়ে সামনে বসা তিনজনের মুখই গম্ভীর হয়ে গেল। ‘আপনি বলতে চাইছেন শূন্য খ্রিষ্টাব্দ বলে আসলে কিছু ছিল?’
‘অবশ্যই ছিল।’ 
‘তাহলে সেটার উল্লেখ কেন ইতিহাসে নেই?
‘এখানটাতেই তো সমস্যা।’ 
‘পরিষ্কার করে বলুন।’
‘আমি অনেক বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছি, শূন্য খ্রিষ্টাব্দ তো বলে একটা জিনিস ছিল। এই সময়ে আমাদের মহাবিশ্বে অথবা সৌরজগতের এই অংশে কোনো একটি মহাজাগতিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। অথবা তা কসমিক কোনো রেডিয়েশনও হতে পারে। সেই সময়টায় আমাদের মহাবিশ্বের এই অংশটি সম্ভবত কোনো কারণে ফ্রিজ হয়ে গিয়েছিল। মানে একেবারে কোনো রকম কোনো মুভমেন্ট ঘটেনি। প্রতিটা অণু-পরমাণু তার জায়গাতেই স্থির ছিল। সে কারণেই স্পেনের গুহায় পাওয়া জিনিসগুলোতে কার্বন ডেটিংয়ে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে, আমেরিকায় গাছের গুঁড়ির রিং-এর সংখ্যাও বাড়তে পারেনি।’ 
এ পর্যায়ে ড. রাফাত হাসানের দুই পাশে বসা দুই ভদ্রলোক অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। কিন্তু ড. রাফাত হাসান মোটেও হাসলেন না। বললেন, ‘আপনি এটাকে প্রমাণ করতে পারবেন?’
‘হ্যাঁ, এইজন্য আমি একটা গাণিতিক মডেল তৈরি করেছি। আমাকে সময় দিলে আমি সেটা আপনাদের সামনে উপস্থিত করতে পারি।’
‘সরি, প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী, সেটার আর প্রয়োজন হবে না। আমরা আমাদের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যার ‘অন্য-ভুবন’কে দিয়ে আপনার এই সমস্ত রিপোর্ট ভালো করে চেক করিয়েছি। আমাদের নতুন আবিষ্কার করা যে এআই মডেল রয়েছে, সেটাকে টেক্কা দিতে পারে পৃথিবীতে এমন কোনো এআই মডেল নেই। আপনার দেওয়া সমস্ত তথ্যই আমাদের এই মডেলের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। ফলাফল তো আমরা আগেই জানতাম। তারপরও, অনেক পরিশ্রম করার পরেও সেই একই ফলাফল এসেছে।’ 
হতাশ প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী উঠে দাঁড়ালেন। এখানে এমনভাবে প্রত্যাখ্যাত হবেন তিনি ভাবতেও পারেননি।
ড. রাফাত হাসান হাতের ফাইলটা ফিরিয়ে দিলেন প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলীর হাতে।
হতাশ প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। 
একটু পরে তিনি নেমে এলেন গুলশানের অফিসপাড়ার মূল সড়কে। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগলেন অজানার গন্তব্যের দিকে।
ইয়ার জিরো। শূন্য খ্রিষ্টাব্দ। স্পেন। সমুদ্রের ধারে একটি গুহা। প্রায় ২০০০ বছর আগের ঘটনা।
গুহার ভেতরে মানুষজন রান্নাবান্নার আয়োজন করছে। গায়ে পোশাক-আশাক দেখে সভ্য মানুষ বলেই মনে হয়। সমুদ্রে কিছু মাছ ধরার নৌকা ভাসছে। 
একজন বাবা ও তার ছেলে বেশ বড় দুটি মাছ কাঁধে করে নৌকা থেকে সমুদ্রের পানিতে নামল। দু’জনে এগিয়ে যেতে লাগল গুহাটার দিকে। 
আকাশে সূর্য ঝলমল করছে। 
বাবা তার মাছটি কাঁধে নিয়ে গুহার ভেতরে ঢুকল। ছেলেটি গুহার ভেতরে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ করে থমকে গেল। পেছনে ফিরে ওপরের দিকে চাইল। অবাক হয়ে দেখল এক ঝাঁক পাখি শব্দ করে উড়ে যাচ্ছিল আকাশে, হঠাৎ ওড়া অবস্থায় পাখিগুলো থমকে গেল। সমুদ্রের পানির ওপরে নৌকাগুলো নাচছিল, সেগুলো হঠাৎ কোনো এক জাদুমন্ত্রবলে থমকে গেল। এসব দেখে ছেলেটি তার বাবাকে ডাকতে চাইছিল, কিন্তু মুখ খোলার আগে সেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কারণে নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। 
একটা হালকা কুয়াশার মতন মেঘ ওদেরকে ঘিরে ধরল। সেই মেঘ কিন্তু কোনো বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থমকে গেল না। কারণ সেই মেঘ ছিল এত সূক্ষ্ম যে বস্তুর অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, কোয়ার্ক পর্যন্ত সেই সূক্ষ্ম মেঘের জালে ধরা পড়ল না। ধরা না পড়লেও জগতের সমস্ত কণাই গতি হারিয়ে ফেলল। যতক্ষণ এই সূক্ষ্ম পাতলা মেঘ, এই সূক্ষ্ম পাতলা মহাজাগতিক সূপ মহাবিশ্বের এই প্রান্ত ত্যাগ না করল ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত কিছুই গতি হারিয়ে ফেলল।
একসময় সেই সূক্ষ্ম মেঘ তার নির্দিষ্ট চলার পথে চলে গেল। সবাই প্রাণ ফিরে পেল। ছেলেটি দেখল আবারও পাখি আকাশে উড়ছে। সে গুহার ভেতরে ঢুকে পড়ল। মনের ভেতরে একটু খচখচ করলেও সে কাউকে কিছু বলল না। 
সবই স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু মাঝখানে কত হাজার, কোটি বছর পেরিয়ে গেল তার কোনো হিসাব রইল না। প্রফেসর ডক্টর হাতেম আলী যা ভেবেছিলেন, তা যে সত্য ছিল– এটি তিনি জানতে পারবেন না কোনো দিনও। তবে সময়ের গরমিল ছিল তাঁর আনুমানিক এক বছরেরও অনেক, অনেক বেশি। 

আরও পড়ুন

×