ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

অন্যভুবন

দেজাভু

দেজাভু

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

ধ্রুব এষ

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৭

সে কে?
চিপস কোড, ডি এক্স-থ্রি ও ওয়ান।
সব তথ্য আছে ছোট ডিভাইসটায়।
এবং একটা মগজ তার আছে। ডিভাইসটা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সেই মগজে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তারা ডিভাইস চালু করল এবং সে জানতে পারল সে ডগ লিটন। পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং খুনি। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ডিএমপির থানা ৫২টা। সব থানার ওয়ান্টেড বোর্ডে ছবি আছে ডগ লিটনের। ডাটা আছে আইটি স্টোরেজে। পিক্সেলভাঙা একটা ছবি এবং কারিকুলাম ভিটা এন্ট্রি করা আছে।
ধরা পড়ে না, ব্যাপার আছে।
সে হলো ডগ লিটন।
বয়স আটত্রিশ!
বিবাহিত ব্যক্তি। নিঃসন্তান। এগারো বছর আগে ফকিরচাঁদ লেনের ইনকাম ট্যাক্স উকিল নিয়ামত করিমের দ্বিতীয় মেয়ে ফারনাজকে বিয়ে করেছে। নিয়ামত করিমের ছয় মেয়ে। ছেলে একটা ছিল। মরে গেছে। ড্রাগ করত। তার নাম ছিল রাজ্জু। তার কথা কেউ আর মনে করে না। নিয়ামত করিমের ছয় মেয়ের মধ্যে মাত্র দুই মেয়ের এখনও বিয়ে হয়নি। এদের মধ্যে মেহেক এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তাসনিম পড়ে মহানগর কমার্স কলেজে। এই দুই শালির এক শালির প্রতি সামান্য হৃদয়ঘটিত দৌর্বল্য আছে ডগ লিটনের। সে হলো তাসনিম। এই শালি দেখতে পাক্কা হলিউডের অভিনেত্রী জো সালদানার মতো। জো সালদানা ‘অ্যাভেটার’-এ ছিল। কিন্তু ‘অ্যাভেটার’ দেখলে বোঝা যাবে না জো সালদানা কী জিনিস, দেখতে হবে ‘কলাম্বিয়ানা’। মারদাঙ্গা ছবি। সেই ছবির কাতালিয়া জো সালদানার কার্বন কপি হলো তাসনিম। কাতালিয়া একরকম অর্কিডের ফুল। শাদা রঙের। সিনেমার কাতালিয়া অবশ্য শাদা রঙের না। তামাটে শরীর। তাসনিমেরও মতো। চোখের সামনে তাসনিমকে দেখলে মাথা নয় দুকুনে আঠারোটা চক্কর খায় ডগ লিটনের।
ফারনাজ জানে তার জামাই স্ট্রাইকার। পেশাদার খুনি। টাকার বিনিময়ে খুন করে অগা-মগা সমাজের বগাদের। বিয়ের পরের এগারো বছরে ২১টা খুন করেছে এ যাবৎ। কোন খুনের ঘটনা কীভাবে ঘটেছে সব জানে একমাত্র ফারনাজ। ডগ লিটন আনন্দের সঙ্গে বলে বউকে। তবে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। কালও একটা ঘটনা হয়তো বলবে, হয়তো সন্ধ্যায়।
তাসনিম এসব কিচ্ছু জানে না। কী জানে?
জানে লিটন ভাই এলাকার ভাই। বিরাট ক্ষমতাবান ব্যক্তি। লোকাল থানার এসআই, সেপাইরা তাকে উঠতে বসতে আদাব-সালাম দেয়। তবে ক্ষমতা বোঝার বয়স হয়নি, ক্ষমতার মোহে লিটন ভাইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি তাসনিম, দুই কারণে আকৃষ্ট হয়েছে। এক, লিটন ভাই দেখতে অভিনেতা জিতু আহসানের মতো। দুই, লিটন ভাই পেন পাইপ বাজায়। পেন পাইপ এক রকমের বাঁশি। লিটন ভাই ছাড়া আর কাউকে এই বাঁশি বাজাতে দেখেনি তাসনিম। অদ্ভুত একটা ট্র্যাক বাজায় লিটন ভাই। বলেছে, ‘কিল বিলের সাউন্ড ট্র্যাক এটা।’
‘কিল দিল?’
‘দিল না, বিল। কিল বিল।’
‘কিল বিল’ অত্যন্ত প্রিয় একটা ছবি ডগ লিটনের। ভলিউম ওয়ান, ভলিউম টু দুটোই। বলতে পারবে না কতবার দেখেছে। না, এখন পারবে। পাঁচ বছর আগে প্রথম দেখেছিল। এর মধ্যে আরও সাতাশবার দেখেছে। তার মানে আঠাশবার। তার প্রথম ক্রাশ? উমা থারম্যান। ‘কিল বিল’-এর কিডো। ডগ লিটন যদি আমেরিকায় থাকত প্রপোজ করত উমা থারম্যানকে।
ডগ লিটন।
কুত্তা লিটন।
চোখ পিটপিট করে তাকাল।
সে কোথায়?
শাদা একটা ঘরে।
শাদা পোশাক পরা তিনজন মানুষ তাকে দেখছে। তিনজনই অত্যন্ত অল্প বয়স্ক। ছেলে একটা, মেয়ে দুটো। সে জানে এরা কারা। খুবই বিখ্যাত তিনজন। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী সবচেয়ে অল্প বয়স্ক মেয়ে দুটো, জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিঙে অবদানের জন্য দুই বছর আগে নোবেল পেয়েছে, এরা যমজ। নোবেল কমিটির শর্ট লিস্টে ছেলেটার নামও ছিল। এ কাজ করে এ.আই নিয়ে। বছর দেড়েক ধরে এরা তিনজন একসঙ্গে কাজ করছে জেসিবি-দুই ল্যাবে। জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিঙ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মিলিয়ে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার তারা সম্ভবত এর মধ্যে করে ফেলেছে। যুক্তিসংগত কারণে সেটা গোপনও রেখেছে। কথা হলো ডগ লিটনের কি এদেরকে চেনার কথা সত্যি? চেনার কথা না। তাও বিস্মিত হলো না সে। ডগ লিটন। যমজ বিজ্ঞানীর একজনের চোখের মণি বাদামি, একজনের সবুজ। এ ছাড়া দেখতে শুনতে আর কোনো ফারাক নেই দুই বোনের। তার ছিঁড়ে গেছে। তার মাথায়। ডগ লিটন ভাবল। না হলে সে এই শাদা ঘরে কেন? ঘরে আবার এই তিন মূর্তি কেন?
যমজ বিজ্ঞানী একসঙ্গে বলল, ‘হাই?’
ছেলেটাও বলল। আট ন্যানো সেকেন্ডের এদিক-ওদিক হবে। এটা হাসাল ডগ লিটনকে। যে ভাটি অঞ্চলে সে জন্মেছে, সেই অঞ্চলে একটা কথা আছে, ‘কানা নাগারচির দেইরা টোকা।’ নাগারচি মানে বাজনদার। ঢোল বাজায় যারা। একসঙ্গে যখন বাজায়, সকলে একসঙ্গে ঢোলে বাড়ি দেয় তারা, কানা বাজনদার তাদেরটা শোনে বাড়ি দেয়। সময়ের তেমন কিছু তফাত না, কিন্তু তার বাড়িটা আলাদা করে শোনা যায়। ‘বাড়ি’ হলো টোকা। কানা নাগারচির দেইরা টোকা। ‘দেইরা’ হলো বাড়তি। শাদা পোশাক পরা কানা নাগারচি মনোকল পরে আছে। এক চোখের চশমা। কখন পরল? তবে এটা আরও হাস্যকর হয়েছে। হাস্যকর কানা নাগারচি বলল, ‘উইশ ইউ লাক।’
এবার কানা নাগারচি হলো মেয়ে দুটো। ডাবল কানা নাগারচি বলল, ‘উইশ ইউ লাক।’
মানে কী এর? উইশ ইউ লাক মানে? গুড লাক না, শুধু লাক! এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন এরা?
আজব! এরকম একটা পরিস্থিতিতেও আবার ঘুম ধরে গেল ডগ লিটনের। সব ভুলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল সে। পরদিন তাকে ঘুম থেকে ওঠাল ফারনাজ। সকাল ৬টা ১১ মিনিটে। খুবই বিরক্ত হলো ডগ লিটন। কী হয়েছে?
ফারনাজ প্রায় ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘তুমি পালাও।’
বিস্মিত ডগ লিটন বলল, ‘পালাব? কেন?’
‘তোমার অনেক বিপদ! তুমি পালাও!’
‘কী বিপদ? তোমারে কে বলছে? তোমার বিখ্যাত হুজুর আপা? বলছি না তুমি এই ভণ্ড মহিলার ধারে-কাছে যাবা না আর। ইয়ামেনে একশ দুই বছর ছিল! বিরাট ভণ্ড।’
‘হুজুর আপা কিছু বলেন নাই। আমি জানি।’
‘তুমি কী করে জানো? তুমি কি জ্যোতিষ সম্রাট কাবিল দেওয়ান নাকি?’
ফারনাজ যা বলল তাতে এই ঠান্ডা সকালেও শরীর জ্বালা করে উঠল ডগ লিটনের। কাহিনি হলো, সে-ই নাকি ফারনাজকে বলেছে, ‘পালাতে বলো তোমার জামাইকে। তোমার জামাইয়ের বিরাট বিপদ।’
কাহিনি ঘটেছে স্বপ্নে।
কেউ ‘কন্ট্যাক’ দিলে ডগ লিটন এখন অবশ্যই খুন করত এই বোকামতীকে। মেডিটেশনের ক্লাস করেছে  
কিছুদিন। ডগ লিটন নিজেকে বলল, ‘শান্ত হ, ভাই। শান্ত হ, ভাই।’
শান্ত হলো ভাই। বলল, ‘আচ্ছা, আমি পালাব। তুমি এখন ঘুমাও।’
বোকামতী! ঘুমিয়ে মাটির ঢেলা হয়ে গেল মুহূর্তে। আছেন কোনো ভাই, এই ধুমসীর ধুমসী আলীবাবার মটকাকে খুন করার ‘কন্ট্যাক’ দেবেন?
দুর! এমন হতচ্ছাড়াভাবে স্টার্ট নিল দিনটা। ডগ লিটনের ঘুম আর ধরল না। সে মোবাইল ফোন নিয়ে থাকল। অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা তার ফোনসেট। ফেসবুক, ভাইবার, ইউটিউব নেই। সতর্কতামূলক এটা।
৭টা ১৯ মিনিটে তার ছেলেবেলার বন্ধু নজরুলকে কল দিল ডগ লিটন।
‘কিরে ঘুঘু?’
‘কিরে! তুই!’
‘তুই কী করিস? ছাত্রী পড়াস?’
‘ছাত্রী পড়াই! ছাত্রী পড়াই মানে?’
খেপে গেল নজরুল। সে দর্শন পড়ায় কলেজে। সহকারী অধ্যাপক। প্রেম না, পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুসারে বিয়ে করেছে শহরতলির এক রূপবতী ছাত্রীকে। মাহমুদা আখতার পাখি। তাকে একবার দেখেছে ডগ লিটন। পাখির মতোই। বছর তিনেকের বিবাহিত জীবন, নজরুল শহরে বিখ্যাত হয়ে গেছে দ্য গ্রেট স্ত্রৈণ হিসাবে।
এই সাতসকালে ছাত্রী পড়ানোর কথা শোনে এমন খেপল, ফোনের লাইন কেটে ফোন অফ করে দিল নজরুল। হা! হা! হা!
৮টা ১৯ বাজল।
৯টা ১৯ বাজল।
১০টা ১৯ বাজল।
ফারনাজ উঠল না।
নিচে হোটেল আছে। লাভলী হোটেল এবং ভাই ভাই হোটেল। লাভলী হোটেলের ম্যানেজার মশিউল রেজা তুষারকে কল দিল ডগ লিটন, ‘পরোটা, নেহারি।’
তুষার বলল, ‘সিঙ্গিল না ডাবল?’
‘সিঙ্গেল। আরেক সিঙ্গেল এখনও ঘুম থেকে উঠে নাই।’
‘আরে! ডাবল তো শুধু তোমার জন্যই বস। কম পরিশ্রম গেছে রাইতভর।’
‘শালা!’
লাভলী হোটেলের বয় খোকন নাশতা দিয়ে গেল।
১১টা ২৭ মিনিটে ডগ লিটন তার মোবাইল ফোনের মনিটরে নোটিশ দেখল, ‘নো স্পেস ফর নিউ মেসেজেস।’
তার মানে কিছু মেসেজ ফেলে দিতে হবে।
ডিলিট করতে গিয়ে আটকাল ডগ লিটন। কিডো কে? রাত ১২টা ১৯ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে এই কিডো তাকে মেসেজ দিয়েছে।
: পেড ব্যথা, দাদাভাই।
‘ট’ না ‘ড’ লিখেছে। পেড ব্যথা।
আজব। সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিয়েছে সেও, ‘কী খাইছিস?’
রিপ্লাই: বরইয়ের আচার, তেঁতুলের পানি, (পাগলা পানি), ঝালমুড়ি, ভাত, কই মাছের তরকারি, ধনিয়া ভর্তা, দই, নুডলস, কোল্ড কফি, আঙুর, ইসবগুলের ভুসি ইটিসি।
রিপ্লাই: শাবাশ ভাতিজি!
রিপ্লাই: ওউ! টমেটোর চাটনিও খাইছি। এন্ড সিগারেট।
রিপ্লাই: পনির সসেজ বাদ পড়ল। এন্ড বোরহানি।
রিপ্লাই: হুহ্। একদিন না হয় বেশি খাইছি: তাই বইলা এমন করবা আমার লগে! হায়রে কপাল!
রিপ্লাই: তা তো অবশ্যই। এত কম খাইলে পেড ব্যথা তো অইবোই।
রিপ্লাই: তুমি একটা ক্রুয়েল, দাদাভাই। আমি ঘুমাই। তুমিও ঘুমাও।
আরও কিছু টেক্সট দেখল ডগ লিটন। আগের। তার বয়ফ্রেন্ডের কথা লিখেছে মেয়েটা। সত্যি কি তার নাম কিডো?
কিডো! কে এটা?
একদমই মনে পড়ল না ডগ লিটনের। ১৮ ঘণ্টা আগে এই মেয়েই আরও একটা টেক্সট পাঠিয়েছে তাকে, ‘তুমি ভাল আছো। তবে মাথায় গণ্ডগোল আছে।’
সত্যি কি এত কিছু সে খেয়েছে? কিডো? মেসেজগুলো ডিলিট করে দিল এবং কিডোর নাম্বারে কল দিল ডগ লিটন। নাম্বার নট ভেলিড।
বক্সে নতুন মেসেজ ঢুকেছে তিনটা। একটা মোবাইল ফোন কোম্পানি, একটা এক চেইন শপের। না পড়েই প্রথম দুটো মেসেজ ডিলিট করে দিল ডগ লিটন। তিন নম্বর মেসেজটা পড়ল।
: সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের গলি। ৬টা।
আর কিছু মাথায় থাকল না। ডগ লিটন ডগ লিটন হলো। এই মেসেজটা তাকে পাঠিয়েছে সিধু। তার ইনফরমার। টাকা নেয়। ভুল ইনফরমেশন কখনও দেয় না। আতাউল গনি। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের গলিতে আজ সন্ধ্যা ৬টায় থাকবে লোকটা। আজিমপুর গোরস্তানের কবরের আজাবের উপযোগী করে দিতে হবে তার বডিটা।
ডগ লিটনের কাছে এখন একটা চকচকে ট্রিগারের বেরেটা অটোমেটিক আছে। আর একটা পুরানা মাউজার। আতাউল গনির মৃত্যু হবে মাউজারের একটা সোনালি বুলেটে।
টেলিভিশনে কলকাতার বাংলা সিরিয়াল এবং দুনিয়ার রান্নার অনুষ্ঠান দেখে ফারনাজ। রেসিপি রেকর্ড করে রাখে এবং কখনও কখনও দুয়েক পদ বানায় মুড থাকলে। আজ মুড ছিল। এঁচড়ের দুই পদ খেয়ে তারিফ করতে হয়েছে ডগ লিটনকে। সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয়ে সে বলেছে, ‘তুমি এই পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি।’
তারিফের বিনিময় মূল্য দিতে হয়েছে। ভাতঘুম না, ভাততন্দ্রার একটা সুখময় অংশ ব্যয় করতে হয়েছে ফারনাজের সঙ্গে। ম্যালা দিন পর। ডগ লিটনের টান টান স্নায়ু তাতে ঢিলেঢালা হয়েছে খানিকটা। ৫টায় সে বেরুল মাউজারটা নিয়ে। বাস ধরল। বাসে ক্যাওস, নানা পদের হল্লা। সায়েদাবাদ স্টপেজের এক ক্যানভাসারকে বড়ো মনে ধরল ডগ লিটনের। লজেন্স এবং মাথা ধরার ওষুধ বিক্রি করে সে। বাসে উঠেই যে ডায়লগটা দিল, মনে থাকবে।
‘হায়রে আমার সোনার দেশ! মুততে লাগে দুই ট্যায়া।’
সায়েদাবাদ বাস স্টপেজের ইউরিনালে প্রস্রাব করতে গেলে দুই টাকা লাগে।
অল্প শীত আছে হাওয়ায়। চে গেভারা ক্যাপ পরেছে ডগ লিটন। পোরশের ডার্ক গ্লাস। পাশের যাত্রী এক বয়স্ক হুজুর। ৫ টাকা দামের একটা দৈনিক পত্রিকা কিনেছেন এবং মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। হঠাৎ চোখ গেল ডগ লিটনের। মানে কী এর?
ক্রসফায়ারে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডগ লিটন নিহত। নিউজ হয়েছে ৫ টাকার পত্রিকায়। পোরশের গ্লাস খুলতে হলো না, মধ্যবয়স্ক হুজুরের উদাসীন বদান্যতায় জাম্পসহ খবরটা পড়তে পারল ডগ লিটন। যে কোনো ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওত পেতে ছিল সিদ্ধেশ্বরী মন্দির রোড এলাকায়। টের পেয়ে দলবলসহ তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয় ডগ লিটন এবং অক্কা। ক্রসফায়ারে। ক্লাস সেভেন-এইটে পড়েছিল, অক্কা শব্দটা মনে আছে দেখে ভালোই লাগল ডগ লিটনের। কিন্তু সে অক্কা পেয়েছে নাকি? গতকাল সন্ধ্যায়! পত্রিকায় ডগ লিটনের ডেডবডির একটা ছবি, মুখাবয়ব অস্পষ্ট করে ছাপানো হয়েছে। এটা স্বস্তির। কিন্তু এই ঘটনাটা কী? বিশেষ কোনো কারণে ভাইদের কোনো চাল? আতাউল গনিকে ফেলে দেওয়ার পর কথা বলতে হবে আলো ভাইয়ের সঙ্গে। মোহাম্মদপুর কাটাসুর এলাকার আলো ভাই। রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তি। ‘আলিফ লায়লা’ সিরিয়াল যারা বানায়, তারা তাকে দেখেনি বলে। দেখলে জিনির রোল অফার করতই। সাক্ষাৎ জিনি আলো ভাই হয়তো কিছু আলোর ইশারা দিতে পারবেন।
৫টা ৪১ মিনিটে বাস থেকে ফুটপাতে ল্যান্ড করল ডগ লিটন। শান্তিনগর মোড়ে। আজবভাবে ফাঁকা রাস্তাঘাট।
একটা রিকশা নিল ডগ লিটন। আজব! গলিতেও যানজটে পড়ল না। পাক্কা আট মিনিটের মাথায় সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের গেটের উল্টো দিকে সে নামল। মোবাইল ফোনে দেখল ৫টা ৫২। মাউজারটা? আছে। আতাউল গনি আর ৮-৯ মিনিট পর ‘চিরবিদায় স্টোরের’ ডিল হয়ে যাবে। তার কুলখানি হবে কতদিন পর? ৪০ দিন? খেতে যাবে ডগ লিটন। আতাউল গনি বিয়ে করেনি, জনস্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিল। ইট খোলায় ইট বানানো কি জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম না? পাহাড়ের মাটি কেটে বসত করা কি জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম না?
৫টা ৫৪।
আতাউল গনির হাত কি অনেক লম্বা? ৫৬ হাজার মাইল লম্বা হলেই বা কী?
দুর!
কী করে? আনমনে সেই অচেনা কিডোর নাম্বারে কল দিল ডগ লিটন। কেন? এবং আজব, কল যাচ্ছে। রিসিভও হলো। ডগ লিটন বলল, ‘কিডো।’
কিডো বলল, ‘দাদাভাই!’
এই সময় ডগ লিটনের পিঠে হাত রাখল কেউ, ‘হ্যালো ব্রাদার।’
ডগ লিটন ঘুরল এবং দেখল তার মৃত্যুদূতদের। তারা তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে নিল এবং কালো কাপড় দিয়ে তার চোখ বেঁধে দিল। নিউজের পরবর্তী অংশ জানে ডগ লিটন। পড়েছে পত্রিকায়। শুধু আর ১ মিনিট যদি সে কথা বলতে পারত কিডোর সঙ্গে। কিডো কে?
বহুদূরের একটা শাদা রঙের ঘর। এটা আসলে একটা স্যাটেলাইটের অংশ। ঘরে বসে আছে সেই তিনজন। সবুজ চোখের মণিঅলা মেয়েটা নিরাবেগ গলায় বলল, ‘তার মনে হবে এটা দেজাভু। কাল সন্ধ্যায়ও ক্রসফায়ারে মরেছিল সে।’
যমজ বোন বলল, ‘দেজাভু নয় কী?’
তারা অতি পরিমিত হাসল। তারা তিনজন। পৃথিবীর আর কেউ মনে হয় তাদের এই উচ্চমার্গের রসিকতার অর্থ করতে পারবে না। হাসির রেশ ঠোঁটে থাকল, এ.আই গবেষক ছেলেটা বলল, ‘আমরা কি তাকে জানতে দিতে চাই, কিডো কে?’
দুই বোন একসঙ্গে বলল, ‘না।’
‘কেন চাই না? সে তো মরেই যাচ্ছে।’
‘তাও না।’
‘আতাউল গনির কী হবে? ক্রিমিনাল সে।’
‘ব্যাকআপ আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন নিয়ে যাবে ডগ লিটনকে। পার্টি সতর্ক। বিলাই নসুকেও ‘কন্ট্যাক’ করেছে তারা। নদ্দাবাজারের বিলাই নসু। আতাউল গনির ব্যাপারটা সে দেখবে।’
দুই বোন প্রতিটা শব্দ একসঙ্গে বলল। মনে হলো একজনই বলছে। ছেলেটা অভ্যস্ত। সে বলল, ‘অ। আমরা এখন কী করব তাহলে? অকেজো করে দেব ডিভাইসটা?’
‘অবশ্যই।’
‘আর কী আমরা আবার... কী বলা যায়... পুনুরুজ্জীবিত করব এই ডগ লিটনকে?’
‘হয়তো। হয়তো না। সে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ।’
‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি শেষ হয়ে গেছে?’
‘তা কখনও শেষ হয় নাকি? আপাতত আমরা যা করা দরকার করব।’
সর্বসম্মতিক্রমে ডিভাইসটা অফ করে দিল তারা।
কাভার্ড ভ্যানে বসে কিডোর কথা আর মনে থাকল না ডগ লিটনের। ফারনাজ, তাসনিম আলো ভাই, নজরুল, সিধু, একটা মানুষের কথা মনে থাকল না। চোখ বাঁধা তার। সে শুধু ভাবল, কাল হয়তো না, হয়তো পরশু কিংবা হয়তো আর কোনো দিন, সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের গলিতে ছিল সে। ঠিক অল্প আগের মতো তার কাঁধে হাত রেখেছিল কেউ, ‘হ্যালো ব্রাদার।’
পরদিন পৃথকভাবে দুটো জীবনাবসানের নিউজ হলো মিডিয়ায়। শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রফেশনাল কিলার ডগ লিটন ক্রসফায়ারে নিহত এবং জনৈক আতাউল গনি গতকাল সন্ধ্যায় খুন হয়েছেন আজিমপুর চায়না বিল্ডিঙের গলিতে।
কিডো সকালে ঘুম থেকে উঠে অনলাইনে দুটো নিউজই দেখল। পড়ল। তেমন কিছু মাথায় নিল না, কারণ দু’জনের কেউ তার পরিচিত না। সে একটা টেক্সট লিখল এবং সেন্ড করল, ‘গুডমর্নিং, দাদাভাই!’ 

আরও পড়ুন

×