দেশি ফুলের সৌন্দর্য ও সুঘ্রাণ খুঁজতে গিয়ে মাধবীলতা ও শিউলির পাশাপাশি আমার প্রিয় ফুল দোলনচাঁপার আদিনিবাসের খোঁজ পাই নেপাল অর্থাৎ ভারতের হিমালয় অঞ্চলে।
এটি এখন কিউবার জাতীয় ফুল। চার পাপড়ি বিশিষ্ট প্রতিটি সাদা ফুল দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। বাটারফ্লাই জিঞ্জার লিলি যেমন বলে, তেমনি ওয়াটার জিঞ্জার লিলিও বলে।
আশ্চর্য হচ্ছে লাতিন আমেরিকায় দোলনচাপা ফুল ছড়িয়ে পড়ে স্প্যানীয় ঔপনিবেশিক আমলে। বিশেষ করে ব্রাজিলে এই ফুলের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা করা হয় ক্রীতদাস পত্তনির সময়ে এর আবির্ভাব। ক্রীতদাসরা এই গাছের পাতা তোশকের পরিবর্তে ব্যবহার করত; আর এখন রাক্ষুসে আগাছা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে সেখানে।
স্প্যানিশ উপনিবেশের সময় নারীরা এই ফুলের মধ্যে গোপনবার্তা লুকিয়ে আদান-প্রদান করত ভালোবাসার। তীব্র সেই মানবিক আকাঙ্ক্ষা, জরুরি বার্তার জন্য ভালোবাসার মানুষকে জানানোর তীব্র বাসনা। ফুলের এমন ব্যবহার ঔপনিবেশিক জীবন-মৃত্যুর অমানবিক পৃথিবীতে! আহা কী-বা কোন শব্দে ধারণ করবো একে? কবিতায় দোলনচাঁপা ফুলের এমন ব্যবহার কিংবা ব্রিটিশ স্টিমারের কথা ব্যবহার করতে গেলে ক্রীতদাস জীবন আর দেশ বিভাগের সময় শেষ স্টিমারের যাত্রীদের কথা মনে পড়ে। এই উপলব্ধি থেকে কত কত লেখা-অলেখা লেখা-লেখা খেলা খেলছি এখনও। কী হচ্ছে জানি না তবে দুই লাইনের এই পদাবলিগুলো মূলত দীর্ঘ একটি কবিতা লেখার বীজতলা হিসেবে ভাবছি।
এই কবিতাগুলোর জন্ম আসলে চর্যাগীতি আর 'বৈষ্ণব পদাবলী' পড়ার সময়ে, সেই একুশ, বাইশ বছর বয়সে তবে নজরুল অনূদিত রুবাইয়াৎ ছিল দারুণ পছন্দ। প্রথম বইয়ে 'চর্যাধুনিক' নামে বেশক'টি পদ লিখেছিলাম। ফর্ম বা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এখন যদি বলেন, তাহলে বলব এখনও পাইনি, খুঁজছি বলেই তো অনুশীলন করছি। ধরুন সেই সময়ের একটি লেখা- 'আমি তোমার বড়শিতে গাঁথা শামুক/তুমি এক শিকারী ধীবর।' ওয়ার্ডসওয়ার্থ কিংবা শেষ রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথের মতন জীবন দেবতা বা ঈশ্বর লিখিয়ে নিচ্ছেন আমাকে দিয়ে, ভাবতে পারতেন, বিশুদ্ধ উত্তর হয়তো এখন মানুষই ঈশ্বর, মানুষই প্রেমিক, মানুষই জীবন দেবতা কিংবা শয়তান। তথাকথিত ইউরো-আফ্রো আধুনিকতা দিয়ে তাড়িত নই আমি।
আমি আমার কবিতার অনুভূতির ভেতর দিয়ে বারবার নিজেকে ছুঁয়ে দেখি, স্পর্শ করি। সত্যিই যা লিখিনি, লিখতে পারিনি তা আসলে ছুঁতে পারিনি। সেই রহস্যময় জাদুর ধাঁধাঁয় ঘুরপাক খাই প্রতি মুহূর্তে। অনেক সময় লিখতে লিখতে আবিস্কার করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্যকে। পরবর্তী সময়ে মনে হয় সৌন্দর্য তো অধরা রয়ে গেছে! বাঁচার প্রেরণা তো জাগে সেই বিষাদাক্রান্ত হৃদয়কে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত হতে দেখলে। কী আশ্চর্য তাই না! মৃত্যুর আগে পর্যন্ত লিখতে পারলে সবযন্ত্রণাই যেন সইতে পারব, জাগতিক।

-ভালোবাসা আসলে কী? হৃদয়ের স্পর্শ পেতে ছুটে যাওয়া মরুঝড়
নাকি একে অন্যের কাছে হেরে যাওয়া কবুতর?

-জেতা আর হারা একই লড়াইয়ের দুই রূপ
ধৈর্য ভিন্ন আগুন, ধারণেই প্রকৃত সুখ।

-উজ্জ্বল স্মৃতিরা ঘাঁই মারে, সব তারা নিভে গেলে পর
আমি সেই শুকতারা, দিনেও জেগে থাকি, আলোর ভিতর।

-গোধূলি হতেও রাজি, অস্তমিত সূর্য নয়
কিছু স্মৃতি গোধূলির মতো, হৃদয়ে ঊহ্য রয়।

-সেই ভোর হতে চাইনি, যে ভোরে নেই সূর্যোদয়
যে স্মৃতিতে আলো নেই, সে স্মৃতি রাখে না হৃদয়।

-মিলনের বাসনা, মিলনের চেয়ে উত্তম নয় কি?
লায়লাকে দেখো, দেখো বেহুলার মন- একই কথা কয় কি?

-গোলাপের সৌন্দর্যে ঈর্ষা হয়, তাই ফুলের কথা বলো না আর
প্রিয়তমা এই ফুল ভালোবাসে, তাই গোলাপ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আমার।
-প্রেমের ব্যথা ছাড়া জীবনে ঔজ্জ্বল্য কোথায়
যে পায়নি সে ফেরেশতা হতে পারে, মানুষ মোটেই নয়।

-প্রদীপের মতো নেভাতে চাইলেই কি নেভে মন
কতখানি পুড়েছো? খোঁজ রাখোনি, জ্বালিয়েছো যখন।

-বীজজন্মের সাধ পৃষ্ঠা ওল্টালে পাবো নিশ্চয়
প্রেমই ধর্ম, পৃথিবী গ্রন্থ ভিন্ন কিছ ুনয়।

-আমার ভিতরে সাত সমুদ্র তের নদীর বাস
সাঁতার জানো মেয়ে? ডুবে মরলে সর্বনাশ।

-মনের কোন্‌ ঘরে পরমের খোঁজে তুমি যাও?
স্বর্গবেশ্যা আড়ালে মুচকি হাসে, কিছু কি টের পাও?

-চোখের জলে জোছনাকে ভিজতে দেখেছি সেবার
নতুন শাড়ি পরে অচেনা লোকের ঘরে ঢুকেছো যেবার।

-শামীম কেন যে দিনমান বিষাদের গান গাও
মেঘ কেটে রোদ্দুর নামবেই, তবু শুধু বিরহই টের পাও।

-এতদিনে জেনে গেছি দেহখানি সমগ্র বিশ্ব
আমি তার কর্তা, বিবেক যার একান্ত শিষ্য।

-কান্না চোখে তুমি ফিরে গেলে, যেন ঢেউতোলা বিষখালী নদী
তুমি তো জানো এপাড় ভাঙে, আমি বলি- ওপাড় না জাগে যদি।

-শুধু মারী ও মড়কের কথা বলো নাকো আর
জেনেছি প্রেমে বেঁচে থাকার অদ্ভুত সাঁতার।

-আফিমের নেশা ধরে তোমাকে দেখে বিস্ময়
পপিগাছ জমি নয় শুধু, মনেতেও জন্মে নিশ্চয়।

-মরে যাবে একদিন শামীম, জন্মানোর এই তো রীতি
কালের শরীরে কর্মফল রেখে গেলে, থাকে শুধু স্মৃতি।

-ভালোবাসতে জানি, তবু আমার শক্র তো কম নয়
ঈর্ষাও যদি না থাকে, তবে কী থাকে আর শক্রর পরিচয়।

-মায়াবীজ রোপণ করেছি স্বপ্নগাছের আশায়
একটাই মানব জন্ম, বেঁচে আছি শুধু মানুষের ভালোবাসায়।

বিষয় : লেখার স্বপ্নবীজ

মন্তব্য করুন