'কবিতা কত প্রকার ও কী কী?' প্রশ্নটা স্কুল-শিক্ষকসুলভ শোনালেও এর বিশেষ অর্থ আছে বৈকি! গঠনশৈলীর দিক থেকে কবিতাকে নানা শ্রেণিতে ভাগ করে দেখানো সম্ভব, যেমন সনেট/চতুর্দশপদী, ব্যালাড, ষষ্ঠপদী, অষ্টক, লিমেরিক, হাইকু, মহাকাব্য, গীতিকবিতা ইত্যাদি। বিষয়বস্তুর দিক থেকেও কবিতাকে আত্মজৈবনিক, অন্তর্মুখী, কলাকৈবল্যবাদী, বহির্মুখী, কিংবা প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা- এমন বহুবিধ শ্রেণিবিভাজন সম্ভব। তেমনি একশ্রেণির কবিতাকে বলা যায় 'প্রোফাইলধমী' যেগুলোয় থাকে একজন ব্যক্তির প্রসঙ্গ। তবুও, তা কেবল ব্যক্তির প্রোফাইল অঙ্কনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজ-সংসারের নানা অনুষঙ্গ কিংবা সামগ্রিক জীবন-দর্শন মূর্ত হয়ে ওঠে ব্যক্তির কথকতায়-কখনো কবির নিজ ভাষায়, কখনো সরাসরি ব্যক্তির মুখ থেকে উচ্চারিত কথকতায়।
বাংলা কবিতার অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা দেখা যায়- প্রোফাইলধর্মী কবিতায় একজন ব্যক্তির মাধ্যমে অঙ্কিত হয় সমাজের শ্রেণিবৈষম্যজাত বঞ্চনা এবং অত্যাচার-অনাচারের চিত্র-কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকী, কখনো-বা রূপকবাহী চিত্রকল্পের আবডালে। কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতায় বর্ণিত হয়েছে:
দেখিনু সেদিন রেলে/কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলো নিচে ফেলে;/চোখ ভরে এলো জল:/এমনি করিয়া জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
কবি নজরুলের এই প্রোফাইলধর্মী কবিতায় একজন কুলির ওপর একজন উঁচু স্তরের লোকের অত্যাচারের বর্ণনায় চিত্রায়িত হয়েছে শ্রেণিবৈষম্যজাত সামাজিক অনাচার। এতে ছন্দ ও মিল রক্ষা ছাড়া অন্য কোনো কাব্যকুশলতার আশ্রয় নেওয়া হয়নি; সরাসরি একটি সাদামাটা চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। তবুও, কেবল প্রকাশভঙ্গির কারণেই হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে এই দৃশ্য এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পরশ পাথর' নামের একটি প্রোফাইলধর্মী কবিতায় দেখি 'ক্ষ্যাপা' নামের একটি চরিত্র যা এক সাধক-পুরষের প্রতীক। জীবনের অন্যসব কাজ ভুলে লোহার শিকল গায়ে এক পাগল-পুরুষ সমুদ্রতীরে পরশ পাথর খুঁজে বেড়াচ্ছে। কবিতাটিতে আছে অজস্র প্রতীকী চিত্রকল্পের ব্যবহার। বাংলা কবিতার ভান্ডারে এই কবিতার সমতুল্য কবিতা খুব কমই পাওয়া যাবে। অজস্ট্র চিত্র-চিত্রকল্পের সমন্বয়ে রচিত হলেও কবিতাপাঠের পর পাঠকচৈতন্যে খেলা করে একটিমাত্র বৃহৎ চিত্রকল্প :সমুদ্রতীরে পরশ পাথরের সন্ধানে ক্ষ্যাপার বিরামহীন বিচরণ যা কোনো ব্রতচারী সাধক-পুরুষের প্রতীক উপহার দেয় পাঠককে।
আমার নগণ্য কাব্যচর্চায় পেছন-ফিরলে দেখা যায়:আমার হাতেও কিছু প্রোফাইলধর্মী কবিতা কখন রচিত হয়ে গেছে। এসব কবিতায় সব চরিত্রই বাঙালির সমাজ-জীবন থেকে চয়িত। সবগুলোতেই চিত্রায়িত করার চেষ্টা রয়েছে সামাজিক বৈষম্য কিংবা সংস্কারের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতজনের উপকথা; কোনো-কোনোটিতে রয়েছে কোনো ব্যক্তির দুর্ঘটনাজনিত পঙ্গুত্বের ফলে সৃষ্ট অসহায়ত্বের চিত্র। লক্ষণীয় যে, কবিতাগুলোয় প্রাকৃতজনের কথকতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব পড়েছে বেশ পরিমাণে। এগুলো কতটা কবিতা হয়ে উঠেছে তার মূল্যায়নের ভার পাঠকের ওপর:
সুন্দরালির যৌথ অবচেতন
পউষের ঘাসে পরীর পেসাব!
বাতাস ধরেছে বরফের ভাব,
ফাটা পায়ে হেঁটে হাল নিয়ে যায় ক্ষিপ্ত সুন্দরালি-
বিগত রাতের ব্যর্থতা ভাবে:
কী যেন কীসব দেখেছিলো খা'বে,
পাঁচন উঁচিয়ে বিড়বিড় করে গাইটাকে দেয় গালি:

বাঁয়ে ক'লে দেহি ডানমুহি যাস,
মইত্যার মা'র দেমাগ দেহাস,
হেট হেট হট, সিধা অ'য়া চল্‌, ফাডায়া ফালামু বেডি;
মেয়া-মানুষের মন বোঝা ভার,
দরদ বোঝে না দিল-কলিজার,
পরান দিলেও ফুঁস মারে য্যানো মনুমোড়লের জেডি!

হায়রে কপাল! দোষ ধরি কার:
একবেলা ভাত, দুই বেলা মাড়,
মইত্যার পেডে যাই কিছু ঢোহে কিরমিরা খা'য়া ফ্যালে-
জমিনে ঢোহে না লাঙলের ফাল,
মাডি য্যানো দেও-দানবের ছাল
বানে-ডোবা জমি তা-ও ভাসি' ওডে মরশুম চলি' গ্যালে।

একাত্তরের যুদ্ধ করিছি,
দেশের জন্যি অস্ত্র ধরিছি,
কান ভরি' হুনি হগলে আমারে মুক্তিযোদ্ধা ডাহে!
যত চিল্লাই 'চেতনা চেতনা'
নেতায়া পড়িছে গোখরোর ফণা-
চেতনা খা'য়া কি কারো কোনোদিন পেড ভরে কও বাহে?

নারান্দির নূরী পাগলি

নারান্দির নূরী পাগলি রাতদিন চষে ফেরে সমস্ত শহর,
পথের সম্রাজ্ঞী যেন, বহুকাল পথই তার ঘর।
সে এখন বৃন্তচ্যুত পাপড়ি-ছেঁড়া অবিন্যস্ত ফুল:
পাথুরে ভাস্কর্যে কারা পরিয়েছে ছিঁড়া-তেনা, এলোমেলো চুল।
ক্লেদে ও চন্দনে মাখা পুরুষ্ট ঊরুতে আর অবারিত পিঠে
নিশ্চিত দোররার ঘায়ে চিত্রাঙ্কিত বাদামী কালশিটে।

একদা রমণী ছিলো, হয়তো ছিলো স্বামী ও সন্তান,
'ভাবী' ডেকে তৃপ্তি পেতো মুদি ও বেপারী থেকে পাড়ার মস্তান;
অথবা হয়নি বিয়ে, ছিলো কোনো মা-বাবার উছল কুমারী,
নয়তো সে অন্ধকারে বেড়ে-ওঠা অন্য কোনো নারী।

কী হবে এসব জেনে, এখন অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মিছে-
প্রায়ই দেখি শূন্যমুঠো আগলে রেখে নিতম্বের পিছে
কী এক সম্পদ যেন লুকোতে-লুকোতে বলে: দিমু না দিমু না!
চা'য়া কী দেহস বেডা, দোজহের লাকড়ি আমি, দেহা বড় গুনাহ!
তোগোর মতলব জানি: হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ হিঃ হিঃ. . .
আচ্ছা তবে ক' তো দেহি এই হাতে কী?

কখনো উৎসুক হয়ে কেউ যদি বলে দেখি কী এমন ধন!
হাত খু'লে নূরী বলে:
ক্যান্‌ তোর চক্ষু নাই? এই দ্যাখ, আমার যৈবন....


হরিপদর দিনরাত্রি
তরল হীরের নদী,
সোনারঙ নৌকো দোলে দূরে-
স্বেচ্ছায় লাফিয়ে পড়ে ঝাঁক ঝাঁক রুপালি ইলিশ...

সহসা স্বপ্নের ঘোরে হেসে ওঠে হরিপদ জেলে:
দেখে সে গঞ্জের হাটে আজ বড়ো ক্রেতাদের ভিড়,
নিবিড় ছায়ার মতো মলিনার চোখ মনে পড়ে,
বলে 'ও জাইল্লার মেয়ে, আর ক'ডা দিন,
আগামী আশ্বিনে তোরে ঘরে তুলি নিমু...'

অথচ কোথায় ঘর!
স্বপ্নফেরা হরিপদ নিয়তির ঘাটে
ফুটো নৌকো, ছেঁড়া জাল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কলসতাড়িত জলে নিত্যদিন কেঁপে ওঠে বিমূর্ত মলিনা,
স্নানার্থিনী ধীবরকন্যার গাঢ় সোমত্ত যৌবনে
আগতর লেপ্টে-থাকা লালপেড়ে শাড়ি
কে যেন হৃদপিণ্ডে তার পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে
ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধে রেখে যায়...

৪.
পরিবানুর পরাবাস্তব পা
[খবর: ধসে-পড়া রানা প্লাজা থেকে অনেক পোশাক শ্রমিককে হাত-পা কেটে উদ্ধার করা হয়েছে]

পা কেটে উদ্ধার-করা পরিবানু-বস্ত্রকন্যা, পোশাকশ্রমিক
কী দেখতে কী দেখে ফেলে, আগামাথা কিছু নাই ঠিক:
পায়ের আদলে গড়া বিচিত্র বেলুন যেন হাইড্রোজেন ভরা
ক্ষণে-ক্ষণে উড়ে আসে প্লাজা থেকে; নির্মম মশকরা!
পঙ্গু ও বস্ত্রমন্ত্রী হাত রেখে আলুথালু রোগিনীর চুলে
বলছেন: যা হবার হয়ে গেছে; অতীতকে যেতে হবে ভুলে;
হাত-পা জোগাড় করা আজকাল খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়-
তবে কিনা চিড়ে ভিজতে দিতে হবে কিছুটা সময়;
টেন্ডার-প্রক্রিয়া শেষ; সরবরাহ এসে গেলো বলে...
পরিবানু সিক্ত হয় ইত্যাকার সান্ত্বনার জলে।
কিন্তু একি! জানালা গলিয়ে এসে আচম্বিতে কথিত বেলুন
মন্ত্রীর মাথার কাছে দ্রুতলয়ে ওঠে-নামে, পরি হেসে খুন;
সে হাসি কান্নার মতো; পরি ছাড়া শোনেনি তো কেউ-
এত যে মিডিয়াকর্মী, মন্ত্রীদের দেহরক্ষী কিংবা কোনো ফেউ।

পরিবানু জানতে চায়: প্রশ্ন শুনে সকলেই হতবিহ্বল:
'আচ্ছা স্যার, এ-পায়ে আগের মতো পরা যাবে মল?'

কদম মাঝির স্বগতোক্তি

বিষ্টি শ্যাষ- অহনও হাওয়ার তোড়ে দানবের তেজ
য্যানো কোনো বেলেহাজ কামুক ইতর
নারাজি ছেমড়ির মত
নাওডারে ঠেইল্লা নিবো জলিধান খেতের ভিতর!
যতই বৈডা মারি, দুই ধারে লজ্ঞিগ্দ মারে তাগড়া দুই পোলা,
গলুই লড়ে না দেহি- জিনের আছরে নায়ে উল্ডা পাল-তোলা!

নাওরে নাও, মনে নাই: হেই ভরা যৈবনের কালে
হুঁতের উজানে বা'য়া তরতরায়া গেছি গিয়া মান্দারের খালে...

ভরা-কটালের দিনে আওলা-ঝাওলা অয়ে গেলে মন
আচম্বিতে গলা মারতো মারফতির টান;
দেখিছি গাঙের ঘাটে ক্যামন ট্যারায়া চায়
কলিমের বইন থিকা বেওয়া নূরজাহান!
বেচইন মনের তারে টুনটুনায়া মরি' গেছে আরো কত গান
য্যামুন লজ্ঞিগ্দর ঘায়ে লুদের ভুরভুরি ওডে খইয়ের লাহান।
গেছেগা গানের গলা, কী আছে কইতে আর করি না কসুর:
নদীর মাছের লগে কই জানি চইল্লা গেছে নিকিরির সুর।

আমার কতা কী কমু, ঘুণে-ধরা দেহি তর নিজেরও যৈবন-
ঝাড়েবংশে জেল্লাদার ফড়িয়া-পাইকার আর ধূর্ত মহাজন।

বিষয় : প্রোফাইলধর্মী কবিতা ও কথকতা

মন্তব্য করুন