ফুরফুরে রিকশা। হনহন ছুটছি। আমার দু'পাশে বাতাসের ঢেউ সরে সরে যাচ্ছে। আরো যাচ্ছে আরো রিকশা, টুকটুকে বেবিট্যাক্সি, হোন্ডা মোন্ডা, করোলা জি ও ইত্যাদি। ধরে নিন ওটা সাতমসজিদ রোড। কিংবা সাতরাস্তা। কিংবা বনানী এগারো। হুডখোলা রিকশা আমাকে টেনে নিচ্ছে হাওয়ায় হাওয়ায়। যত এগুচ্ছি, ততোই নিজেকে স্বাধীন আর সার্বভৌম লাগছে। যত এগুচ্ছি, ততোই অনুভব করছি আমার ব্যাগের ভেতরে কড়কড়ে কিছু টাকা- যা আমি নিজে কামাই করেছি। এবং এও ভাবছি, এই যে বসে আছি রিকশায়, হুডখোলা, বাতাসে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে, যেন আমি এক রাজকন্যা, কিংবা আমি হাওয়া ফুঁড়ে ফুটে ওঠা এক পরী। আমার অনেক ক্ষমতা। আমার অনেক পাওয়ার।
তো, ফোনটা আসে সেই মুহূর্তেই। ওপাশে ষাটোর্ধ ভদ্রমহিলা, কাঁদো কাঁদো স্বর।
- আজকে এত রাত হচ্ছে যে!
- আসছি তো
- রাস্তাঘাট ভালো না... আআআআআ
- তো কী করবো
- তাড়াতাড়ি আয়
- সেটা কীভাবে সম্ভব? কাজ শেষে বেরুলাম মাত্র
- বিপদ বিপদ
- কোথায় বিপদ মা?
- রাস্তাঘাটে... লোকজন ভালো না... তাড়াতাড়ি আয়...
এরপর ফোনটা রেখে দিলুম। গলার রগ ফুলিয়ে বিবাদ করতে বড় সাধ হচ্ছিল। সে ইচ্ছেটা ধামাচাপা দিলাম। থাকগে। মা তো! চিন্তা করবেই।
তো, ফোন রাখবার পরই টের পেলুম এক গভীর বিষাদ। আমার সার্বভৌমত্ব, আমার স্বাধীনতার রস রূপ গন্ধ সব পালিয়েছে। আমার বুকের ভেতরে, মগজের ভেতরে, হৃদয়ের ভেতরে যে হুডখোলা পালতোলা বাতাসের ঢেউ আর রাজকন্যের ক্ষমতার গল্পটা ছিল, সে গল্প ভেগেছে। আমার আত্মবিশ্বাস, আমার সাহস, আমার বিশ্বাস, যা কিনা নিজের প্রতি- সব গেছে। এখন এই মুহূর্তে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক আততায়ী। এই আততায়ীর নাম মাতৃস্নেহ, এই আততায়ীর নাম নারীজন্ম, এই আততায়ীর নাম নারীবিদ্বেষী সমাজ আর নিরাপত্তা দিতে অক্ষম রাষ্ট্র- যা আমার নারী জীবনের প্রতি পদে ছুরি হাতে উদগ্র অপেক্ষায় আছে আমার সকল আনন্দ আর স্বাধীনতার বোধকে হত্যা করার জন্যে।

২.
একটা কবিতা পেয়েছে আমায়। একটা সুন্দর দৃশ্য ভাসছে আমার চোখে। একটু গাছে পেয়েছে আমাকে। গাছে পাওয়া মানে বাগানে পাওয়া। ইচ্ছে করছে সব ছেড়েছুড়ে ছুটে যাই ওই একচিলতে বারান্দায়। পুঁইশাকের ডাঁটা বাড়ছে। পাশেই ডালপালা ছড়িয়ে এলাহি কারবার দেখাতে শুরু করেছে বাগানবিলাস। রবিবাবুর কী বুদ্ধি বাপু। বোগেনভিলিয়াকে বানিয়ে দিলে বাগানবিলাস। বাগানের বিলাস! রবিবাবু বলতেই মনে পড়লো বহুদিন শুনি না ওই গানটা- পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ/তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ আহা! বারান্দার গ্রিল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে যাওয়া উঠে আসা বাগানবিলাস- সহসা ডালাপালা তোর উতলা যে/কারে তুই দেখতে পেলি আকাশ মাঝে?
আহা! আহা! আকাশমাঝে আকাশমাঝে, সন্ধ্যের আগে, সন্ধ্যের মুখে মুখে!
তেমনি করে আমার হৃদয়ভিক্ষুরে/কেন দ্বারে তোমার নিত্যপ্রসাদ পাওয়াও না আজ এই মুহূর্তে এ গানটা না শুনলে আমার পিত্তি পড়বে। আমার অনিদ্রা আর ক্ষুধামান্দ্য হবে। তো, হোক না। কী যায় আসে কার। আপাতত অফিস তুঙ্গে। কত কত মিথ্যে কথা খবর হয়ে আসে। কত মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, কত মিথ্যে বোলচাল, তথ্য-উপাত্ত- তবু তারা এত টাটকা, মোড়কে ঢাকা, চকচকে। আর কি কথার ফিনকি বাপু! শুনলেই মজে যাবেন। মজলেই ব্যস, ধরা খেলেন।
ধরা খেয়েই আছি। গুষ্টিসুদ্ধ। জাতিসুদ্ধ। অথচ আমাকে তখন বাগানে পেয়েছিল। রবিবাবুতে পেয়েছিল। বাগানবিলাসের হাওয়া ছাড়ছিল বুকের ভেতরে। তবু আমি যেতে পারলুম না। রইলুম একগাদাখানেক মিথ্যের নিচে চাপা পড়ে!
এই যে আমাকে চাপা দিলো একগাদা মিথ্যে, যারা সংবাদ হয়ে আসে, নিউজরুমে হৈহৈ ফ্যালে, তারাই আমার আততায়ী। তারা আমায় খুন করে। তারা বুকের ভেতরে ঘাই দিয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের গানগুলোকে খুন করে। বাগানবিলাসকে খুন করে। তারপর একগাদা মিথ্যের তল থেকে বেরিয়ে এসে রাতদুপুরে যে মানুষটা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, সে তো আমার লাশ। আমি তো খুন হয়ে গেছি সেই বিকেলেই, যখন গোধূলি হচ্ছিলো আর আমি মিথ্যেগুলোকে নিয়ে সাজাচ্ছিলাম রানডাউনের খাতায়।
আততায়ী, তুমি একসঙ্গে ক'টা খুন ঘটিয়ে দিতে পারো?

৩.
যে রোদ্দুরকে দেখলে আমার শৈশবের কথা মনে হয়, সেই রোদ্দুরটি মারা গেছে। আমি যেবার ওর মৃত্যুসংবাদ পেলাম, জানলাম, ও খুন হয়েছে। যে রোদ্দুর আমার জন্মমুহূর্ত থেকে আমাকে চেনে, আমিও যাকে চিনি, সে বিদায় নিয়েছে। অথচ আমার কপালে চুমু খেয়েছিল সে, মায়ের পরেই। এরপর ওর চুমুতে ভিজতে ভিজতে আমি বেরিয়ে এসেছিলাম পৃথিবীতে। আমার ভোর সাড়ে ছটার জন্মমুহূর্তকে আলোয় আলোয় জ্বালিয়ে দিয়েছিল যে ফেব্রুয়ারির রোদ, সে আর নেই।
এ শহরের সব রোদ পালিয়ে যাচ্ছে। যারা পালাতে পারছে না, তারাই নিহত হচ্ছে। যেমন আমার রোদটি। তাই যার যার রোদ, তারা তারা তার রোদটিকে হুঁশিয়ার করেছেন আগেই। আমি স্বার্থপর। আমি বেপরোয়া গোঁয়ার। আমি ওকে বলিনি কিছুই। সতর্ক করিনি। আমি ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিলাম, সাথে রেখেছিলাম, বুকে রেখেছিলাম, গায়ে মেখে মেখে রেখেছিলাম, ঠিক যেরকম রাখতাম সবসময়!
তো, ও আর পারলো না টিকে যেতে। শহরের হা রে রে রে দালান, খেঁকিয়ে ওঠা হাইরাইজের লাথি খেয়ে ছিটকে পড়তে হলো ওকে। তারপর একটা বিশাল কালো ট্রাক সাঁই করে চাপা দিলো, আর রোদ মরে গেল। রোদের মৃত্যু হলো দিনেদুপুরে। আমার সেই এক টুকরো নিজস্ব রোদ। আমার আশৈশবের রোদ। তার মৃত্যু হলো। এখন আমার দিনরাতে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমি রোদহীন। আমি একটি অসভ্য শহরে রোদহীন বসে আছি ও থাকি। আমি এক দুর্গন্ধ নগরে রোদহীন অপেক্ষা করি আততায়ীর। যে আততায়ী হত্যা করেছে আমার রোদটুকুকে। যে একদিন হত্যা করবে আমাকে।

৪.
তুমি আমার বন্ধু হবে?
এরপর আমাকে ভালোবাসবে?
তুমি আমাকে শেখাবে কীভাবে আনন্দ করে বাঁচতে হয়?
তুমি আমার প্রেমিক হবে? গাছের মতো ছায়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে? তুমি কি জানো এক একটা আস্ত ছায়া কেমন করে উধাও হয়ে যায়, অথচ ছায়াদের কত ডিমান্ড! সব্বাই ছায়া খোঁজে। তবে আমি তারা খুঁজছিলাম। 'ঘুম' হয়ে যাওয়া বিদেশি তারা। 'পিল্গজ' হয়ে যাওয়া ভিনদেশি তারা। সাগরপাড়ের তারা। কিচ্ছু না জানা তারা, যার সাথে অনেকটা দূর যাবার কথা। বিশ্রাম নেবার কথা। একে অপরকে স্পর্শ করে জ্বর মাপবার কথা।
সেই তারাটার কথা ভাবলে বহুকাল খুব খুন খুন লাগতো আমার। খুনের নেশায় আমি তার ঘরঅব্দি ছুটে যেতে পারতাম। টুঁটি ধরে টেনে আনতে পারতাম। ফিনকি টুটিয়ে রক্ত ঝরাতে চাইতাম। সেই প্রথম আমি নিজেই আততায়ী হতে চেয়েছিলাম। ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম আর টানা চেয়ে রইতাম তার ঘরে ফেরার পথের রাস্তার দিকে। তার ভালোবাসাবাসির চির অবসান ঘটিয়ে দিতে আমি রাত জেগে অপেক্ষায় অপেক্ষায় নিজেকে ক্ষয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। অথচ কী নিদারুন সত্য, এরও বহু আগেই আমি নিজেই খুন হয়ে গেছি। আর খুন হয়েছি তারই হাতে যাকে খুন করবো বলে আমি আততায়ী আততায়ী খেলেছি নিজের সাথে।
মৃত লাশ কি আততায়ী হতে পারে?
৫.
লাল নীল গোলাপি ধূসর বেগুনি হলুদ সবুজ কচি সোনার মতো জ্বলজ্বলে, রুপোর মতো ঝিলিক ওঠা- কত কত রঙ খেলছে চতুর্দিকে। এই রঙের ভেতরেই ডুবসাঁতার খেলছে যারা, ওদের নাম স্বপ্ন। ওদের নামে বুঁদ হয়ে থাকা।
আমার স্বপ্নেরা রঙিন জলে সাঁতরে বেড়ায়। আমি জলের পাড়ে বসে বসে তাদের পাহারা দিই আর ধরতে চাই। হাত বাড়িয়ে দিলে ওরা উঠে আসে, কোলে আসে। আমাকে জড়িয়ে ধরে।
তারপর একদিন কোন এক অদ্ভুতুড়ে ভোরে, কি রাতে, কি ভরসন্ধ্যায় মরা মাছ ভেসে ওঠে! আমার বাড়ানো হাতে ধরা দেয় রাশি রাশি মৃতদেহ। লাল নীল গোলাপি ধূসর বেগুনি হলুদ সবুজ কচি সোনার মতো জ্বলজ্বলে, রুপোর মতো ঝিলিক ওঠা! চোখ খোলা, যেন তখনও ভাবছে। মুখ খোলা, যেন তখনও বাঁচতে চাইছে!
একটা জীবন কেমন মখমল হয়ে যায়, যদি স্বপ্নেরা থাকে। আবার সে জীবনটাই কেমন অস্ম্ফুট, বেদনাক্লান্ত, শ্যাওলাপড়া, বিষাদে বিবাদে বিবমিষায় মোড়ানো, যদি স্বপ্নরা চলে যায়, যদি স্বপ্নরা মরে যায়। কে তাকে মারে? কে তাদের মারে? লাল নীল গোলাপি ধূসর বেগুনি হলুদ সবুজ কচি সোনার মতো জ্বলজ্বলে, রুপোর মতো ঝিলিক ওঠা স্বপ্নরা কার হাতে খুন হয়?
খেলনা গাড়ি ঠেলে ঠেলে বহুদূর পেরিয়ে যায় শিশু। বাড়ি, বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে উঠোন, প্রতিবেশীর উঠোন, একচিলতে লন, সবুজ দরোজা, ঘাসফড়িঙের বাগান, গোলাপের সুবাস, ছোট রাস্তা, বড় রাস্তা, বন্ধুর বাড়ির বারান্দা, ঘর, জানালা, জানালার পর্দা ওড়ে- একটা খেলনা গাড়ি গড়গড়িয়ে যায়। শিশুর হাতে ধরা লাল সুতোটুকু ওকে গড়িয়ে নেয়। ওই ছোট্ট কাঠের গাড়ির ওপরে বসে থাকে স্বপ্ন বুড়ি। স্বপ্ন বুড়ির ভ্রমণ শুরু হয়, কিন্তু হঠাৎ কখন কার কাঠের গাড়ি উল্টে থেমে যায় সব যাওয়া সব আসা, উল্টে যায়, মুখ থুবড়ে পড়ে, চোখের সামনে শিশু দেখে তার গাড়ি থেকে স্বপ্ন বুড়ির উল্টে যাওয়া, মুখ থুবড়ে পড়া; তখনও সে লাল সুতো ধরে আছে শক্ত মুঠোয়।
গাড়িতে বসা স্বপ্নগুলোকে হত্যা করে কে? শিশুর বুকের ভেতরে কচি ঘাসের মতো গজিয়ে ওঠা স্বপ্নগুলোকে পা দিয়ে মাড়িয়ে যায় কে? কিংবা ধরুন ওই ঘাসগুলো চাপা পড়ে থান থান ইটে। চাপা পড়েই থাকে। বহু বহু কাল পর, কোনো বিপন্ন চোখ, দুর্বল শরীর ক্লান্ত হাতে সেই থান ইট সরিয়ে দেয় নিভৃতে। সেই ঝলমলে কচি দূর্বাঘাস তখন হলুদ থেকে খয়েরি, বিবর্ণ, বিকট, বিশ্রী, বীভৎস!
কে চাপা দেয় ইটের নিচে? কে খুন করে কচি ঘাস?
উত্তর আসবে না। তুমিও আসবে না আমি জানি।

৬.
লেসফিতাওয়ালা ঘণ্টাখানেক ঘুরে ঘুরে চলে গেছে অন্য পাড়ায়। আমি ছিলাম স্নানে। বেরিয়ে দেখি সে উধাও। অথচ আমার একটা লাল ফিতে চাই। হজমিওয়ালা আসবে দুপুরে। ছোট ছোট কাগজে মুড়ে দেবে মুচকুচে কালো হজমি। হাতে তুলে দিতে দিতে বলবে, 'এত খেও না বেটি, এত সুন্দর চেহারাটা খারাপ হয়ে যাবে।'
জগতে এমন বিক্রেতা কেউ দেখেছে কোনোকালে, নিজের পণ্যের গুণ গায় না! বদনাম করে?
সকাল নটায় শুক্রবারে বাবা সপ্তাহের বাজার সেরেছেন। ডিম আলু মুরগি মাছ সবজি চাল ডাল। আমি ফ্রকের কোঁচর কি একটা ছোট চটের ব্যাগে ভরে নিয়েছি দুটো ডিম। চার পাঁচটে আলু। আধসের চাল। একটু ডাল। আর তো ধরে না ছোট ব্যাগে। যা হয়েছে সেটুক নিয়েই দৌড়াই নিচে। একটা কাঠের পাটাতনে দুটো চাকা বসিয়েছে। এরপর সেই চাকায় বসিয়েছে বুড়িকে। বুড়ি হাঁটতে পারে না। ঠেলে ঠেলে নিয়ে আসে ওর নাতি। আমাকে দেখে ফোকলা দাঁতে হাসে বুড়ি। আমি ব্যাগখানা বাড়িয়ে দিই। বুড়ি শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে একটা লজেন্স বের করে। নাবিস্কো লজেন্স। আমাকে দেয়। আমি হাত বাড়িয়ে নিই। এরপর বুড়ি চলে যায়।
কোনো কোনো হলুদ রোদের দিনে, যেদিন ইশকুল নেই, বসে বসে পাটিগণিতে হাত পাকাচ্ছি, নিচ থেকে ক্ষীণ স্বরে ডাক আসে, 'ও বেটি!' ছুটে গিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে দেখি বুড়ি এসেছে, ডাকছে হাত নেড়ে। বুড়ির নাতি বলে, 'তোমার জন্য জিনিস এনেছে।'
মা তো স্নানে। বোনেরা যে যার মতো ঘরে। টুক করে ছিটকিনি খুলে নেমে যাই নিচে। বুড়ি ফের আঁচলের তলায় হাত ঢুকায়। জাদুমন্ত্র উচ্চারণের মতো বিড়বিড় করে। এরপর বের করে আনে মাটির তৈরি পুতুল, হাঁড়ি, পাতিল, এটা সেটা কত কি! যে জীবন আজ যাপন করছি, সেই জীবনে ছিটকিনি খুলে দৌড়ানোর সবগুলো পথ শূন্যে মিলিয়েছে। দোতলার বারান্দা দিয়ে উঁকি দিলে হাতছানি দেয় না কেউ। আঁচলের তল থেকে বের করে আনে না রঙিন পুতুল। আমার ফ্রকের কোঁচরও ভরে ওঠে না ডিমে আলুতে চালে ডালে। আমার হাত পা চোখ মুখ শরীর বেড়েছে। আমার জীবন দীর্ঘ হতে হতে শূন্যে মিলাচ্ছে। এই মিলিয়ে যাবার, দীর্ঘ হবার যাত্রাপথে কখন কাকে ফেলে এসেছি অবহেলায়, প্রয়োজনে! কখন কাকেই-বা খুন করেছি অজান্তে। কোন সে সম্পর্ক, কোন সে মানুষ, কোন সে প্রেম, কোন সে বন্ধুত্ব, কোন সে আত্মার বন্ধন- ভুলেই গেছি আমি। আমাকেও খুন করেছে কেউ, আমাকেও খুন করেছে তারা। ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে থেকে দেড় হাত দূরে, কখন সুযোগ বুঝে ঘা মেরেছে নিঃশব্দে। আমি লুটিয়ে পড়েছি। অথবা আমিও কখনও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকেছি দূরে। কত কত সম্পর্ক, কত কত নাম, কত আদর, কত সময়ের স্মৃতি-বিস্মৃতির ডালপালা- আততায়ী ছুরির ফলায় ছেঁটে দিয়ে সব। কেটে দিয়েছি হাড়-মাংস। তারপর একা হয়ে গেছি।
একা হয়ে যাওয়াটাই রীতি। আততায়ীর হাতে অকস্মাৎ খুন হয়ে যাওয়া অথবা নিজেই আততায়ী হয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা- এই অদ্ভুতুড়ে সময়ে এই আমাদের বিমর্ষ গন্তব্য।

মন্তব্য করুন