পরিবারের সকলে মিলে মেয়ে দেখে আংটি পরিয়ে আসার পর সংবাদটি শোনার জন্য কেউ তৈরি ছিলো না। এই রকম একটি ঘটনা ঘটবে বা হতে পারে তা কারও জানাও ছিলো না। ঘটনাটা জানার পর সকলেই প্রথমে নিস্তব্ধ! কী করা যায় এই ভাবনা প্রথমেই আসেনি, এসেছে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনার মাধ্যম দিয়ে। এই আলোচনা প্রথমে বাড়ির বড়দের মধ্যে শুরু হলেও পরে সঞ্চারিত হয় ছোট অন্যান্য সকলের মধ্যে। কী সেই ঘটনা যে, সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে?
ফোনের মাধ্যমে জানালো ছেলের বাবা হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী বন্ধু সাকলায়েন জার্ফত কন্যার বাবা খুনি! স্ত্রীকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। পরে কীভাবে যেন ছাড়া পেয়ে যান। আশার কথা হলো মেয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। মেয়ে মামারবাড়িতে বড় হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে। মূলত মামাই সব।
এই কথাগুলো বাড়ির সকলে জানার পর আলোচনা হচ্ছে- মেয়ের বাবা খুনি! খুনি মেয়ে বাড়ির বউ হয় কী করে? বিয়ে হবে না ভেঙে দেওয়া হবে? ইত্যাদি ইত্যাদি।
হাফিজ সাহেবসহ বাড়ির বড়রা প্রথমেই বিয়ে ভেঙে ফেলার যাবতীয় ব্যবস্থা করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় ছেলের মা জরিনা খাতুনের কথা সকলের মনে ধরলো। 'মানা তো করাই যায়; কিন্তু আরও কয়েকজনের সাথে কথা বললে হতো না?' হাফিজ সাহেব প্রথমে রাজি না হলেও পরে বুঝতে পারলেন এবং ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে ছেলে বা পাত্র কায়সার চৌধুরী এই পরিস্থিতিতে অসহায় বোধ করতে থাকে। বন্ধু পারভেজ আলমকে ফোন দিয়ে বিষয়টি বলাতে বন্ধু সহসাই কিছু না বলে অপেক্ষা করতে বলে। কায়সারের অস্থিরতা বাড়ে।
- কিসের অপেক্ষা?
- এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করতে হবে বুঝে ওঠার জন্য।
- এত মেয়ের মধ্যে এটিই পছন্দ হলো, আর এখন শোনা যাচ্ছে খুনির মেয়ে।
- আচ্ছা বাবা খুনি শিওর হলি কী করে?
- মানে?
এবার অবাক হবার পালা কায়সারের।
- কেউ বললে আর তোরা বিশ্বাস করে নিলি? এটা কোন কথা। সম্বন্ধটি এনেছে কে? তোর মামা?
- হ্যাঁ মানে আপন মামা না, মার চারতো ভাই।
- ওই হলো। সে জেনে-বুঝে এই সম্বন্ধ আনবে কেন? সে কী বলছে?
- সেটা তো বাবা-মা জানে। যতদূর জানি বাবা জানিয়েছে, তিনি বলেছেন বিষয়টি তিনি জানেন না। খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছেন।
- তাহলে অপেক্ষা কর।
- আর কত অপেক্ষা করবো, ভালো লাগছে না।
ধৈর্য ধারণ করার জন্য বলে পারভেজ ফোনটি রাখে। এদিকে কায়সারের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তখনই আসে মামাতো ভাই সায়েম। বয়সে কায়সারের থেকে প্রায় দু'বছরের ছোট হলেও দু'জনের মধ্যে সম্পর্ক চমৎকার।
- কী হলো? জানতে চায় কারসার।
- কী আর হবে, ফুপা তোর চারদিকে ফোনাফুনি শুরু করেছে? জানালো সায়েম।
- তা তো বুঝলাম। কী হবে বলতো?
- আমি আর কী বলবো? এই ধরনের সমস্যায় তো কখনো আমরা কেউ পড়িনি।
- বিয়ে কি তাহলে ভেঙে যাবে?
- তুই কী চাস?
- আমি... ইয়ে মানে আমি তো কনফিউজড।
- কনফিউজড মানে? তুই কি খুনির মেয়েকে নিয়ে সংসার করবি?
- খুনি তো মেয়ে না মেয়ের বাবা।
- তুই কী চাস বলতো?
- আমি... আমি আবার কী চাইবো!
- তাহলে মুরব্বিদের ওপরে ছেড়ে দে...
কথা বলে দুজনেই চুপ হয়ে যায়।
হাফিজ সাহেব এরই মধ্যে কয়েকজনের সাথে কথা বলে ফেলেছেন। এদিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ড্রইংরুমে মিটিং করার মতো লোকসমাগম হয়ে গেছে। কনে দেখতে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে চলে এসেছেন সায়েমের বাবা ও মা ফজলে খোদা ও নাফিজা বেগম, কনের খোঁজ আনা জামাল আবেদিন, ছেলের মেজো ও ছোট চাচা সাহেদ উদ্দিন চৌধুরী ও শামীম উদ্দিন চৌধুরী এবং দুই চাচি শারমিন জামান ও ওয়াহিদা খাতুন; এছাড়া দুজন প্রতিবেশী আখতারুজ্জামান ও মাহবুব মুর্শেদ। গৃহকর্মী ইতোমধ্যে চা ও হালকা নাশতা পরিবেশন করেছে। নাশতা খাওয়ার আগে ও পরে আলোচনার দিকে সকলের মনোযোগ। বিষয়টি আসলেই জটিল। উপস্থিত কারোই জীবনে এই ধরনের বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়নি। ইতোমধ্যে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে, এসেই নিশ্চিত করেছে জামাল আবেদিন। সে এও জানালো ইতোমধ্যে মেয়ের মামাকে সে তথ্য গোপন করার জন্য ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি বিয়ে হচ্ছে না বলে একধরনের কথা আগ বাড়িয়ে জানিয়েও ফেলেছে। সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই এ কথাটি বলা ঠিক হয়নি বলে তাকে মৃদু বকাবকি করলেও ফলাফল সেদিকেই চলে এলো। আলোচনায় সকলের মতামত- আংটিই তো পরানো হয়েছে, বিয়ে তো আর হয়নি, তাই বিয়ে ভেঙে ফেলাটাই উত্তম। এর মধ্যে চাচা শামীম চৌধুরী ছেলের মতামত নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। বাবা ছেলের আবার সিদ্ধান্ত কী? আমরা যা বলবো তাই হবে বলে উড়িয়ে দিলেও সকলে বলাতে বাবা ছেলেকে ডাকার অনুমতি দিলেন।
২.
কায়সার চৌধুরী সকলের দিকে তাকিয়ে আছে। এই পরিচিত মুখগুলোকে অপরিচিত মনে হচ্ছে। আর গলাটি কেন যেন শুকিয়ে আসছে। চাকরির জন্য ভাইভা বোর্ডে সমানে ইন্টারভিউ দিতে এতটা ভয় বা অনিশ্চয়তা কাজ করেনি, কিন্তু আজ ভয়ের চেয়ে জীবন পরীক্ষায় বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ হচ্ছে কায়সারের। এ কেমন পরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে তাকে? কিছুই মিলাতে পারছে না এখন। সন্ধ্যায় সব ঠিক ছিল, আর রাত এগারোটায় সব ওলটপালট অবস্থা। এখনও সব ঠিক আছে, কায়সারের মতামতের ওপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আর এ কারণে কায়সার কিছু না বলে সকলের দিকে অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সকল পরিচিত মুখ অপরিচিত মনে হচ্ছে। কী বলবে? এক্ষেত্রে কী বলা দরকার? পরিবার তো বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পক্ষে, সেখানে কায়সারের মতামত কেন দরকার হলো? মেয়েটিকে তার খুব পছন্দ ছিলো বলে কেউ দায় নিতে চাচ্ছে না? কী বলবে সে?
- কি তুমি চুপ করে আছো কেন? কথার উত্তর দাও? বাবা বেশ কড়া মেজাজে কথাটি বললেন।
- জি বলছি, আমি রাজি মানে বিয়েতে রাজি! কায়সার শুকনো গলায় যতটুকু সম্ভব জোরে বলা যায় বলে ফেলে।
এ কথাটি শোনার জন্য কেউ সেভাবে তৈরি ছিলো না। সকলে অবাক এবং আশ্চর্য হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাতে থাকে।
- কী বললে তুমি? আর ইউ ম্যাড!
- জি এটাই আমার মতামত।
- এই ছেলে বলে কি? তুমি ঠিক আছো তো বাবা? প্রতিবেশী আখতারুজ্জামান বলে উঠলেন।
- বংশের ইজ্জত কি থাকবে? বলে বসলেন শারমিন জামান।
- খুনির মেয়ে কি করে এ বাড়ির বউ হয়, আমি জীবন থাকতে এটা হতে দিতে পারি না। বললেন সাহেদ উদ্দিন চৌধুরী।
- ওর কথায় গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আমরা বরং মানা করে দিই? বলে উঠলেন জামাল আবেদিন।
- না। আমাকে যেহেতু ডেকেছেন, আমার মত হচ্ছে, বিয়ে ভাঙা চলবে না।
- ছেলেটা বলে কি? এই ছেলে তুমি সমাজ বুঝো, আমাদের সমাজ নিয়ে চলতে হয়। সমাজ কী বলবে? বললেন মাহবুব মুর্শেদ।
- সমাজ সমাজ করবেন না। আপনারা কোন সমাজে চলেন ভালোই জানা আছে? কায়সার বলে বসে।
- দেখেন হাফিজ ভাই আপনার ছেলে কী বলে? আখতারুজ্জামান বলে ওঠে।
- আহ কায়সার ঠিক ভাবে কথা বলো? ধমক দিয়ে বললেন ওয়াহিদা খাতুন।
- খুনির মেয়েকে কেন বিয়ে করতে চাচ্ছ, বলবে? প্রশ্ন করলেন ফজলে খোদা।
- মেয়েটাতো খুনি নয়, খুনি তার বাবা। এটা তো তার অপরাধ নয়। তাছাড়া মেয়েটিকে আমার পছন্দ হয়েছে। বলে ফেলে কায়সার।
- তুমি বললেই তো হবে না, বিয়ে কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, দুই পরিবারের বন্ধন। তোমার বাবা-মার মতামত এখানেই আসল। বললেন শামীম উদ্দিন চৌধুরী।
- আপনারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; কিন্তু সে সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমাকে জানাবেন।
কথাটি বলে কায়সার চলে আসে। সবাই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
৩.
রেস্তোরাঁটি বেশ নিরিবিলি। উত্তরায় গাউসুল আযম এভিনিউতে নতুন হয়েছে তাই লোকসমাগম কম। এখানেই তাহমিনা আক্তার কনাকে আসতে বলেছে কায়সার। কায়সারের সঙ্গে সায়েম।
- আসবে তো?
- হ্যাঁ।
- আমার তো মনে হচ্ছে আসবে না?
- আর একটু দেখ, আসবে...
- চারটায় আসার কথা এখন পাঁচটা বাজে, চল কেটে পড়ি, আর মামা শুনলে আমার ওপর রাগ করবে।
- তাহলে তুই চলে যা। আমি অপেক্ষায় আছি।
কায়সার না যাওয়াতে সায়েমও যেতে পারছে কই। সকলকে না জানিয়ে সায়েম চলে এসেছে কায়সারের ফোনে। গতকালই কায়সারের পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বিয়ে হচ্ছে না। কায়সার তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সকালে সায়েমকে ফোন্ত তুই আমার বাসায় চলে আয়। সায়েম বাসায় আসার পর কী করা যায় দুজন আলোচনা করে কনাকে ফোন দেয় সায়েম। সায়েমকে রীতিমতো মানা করে দেয় কনা, এরপর কায়সারের অনুরোধে দেখা করতে রাজি হয়। জায়গাটা কায়সারের পরিচিত হওয়ায় কনাকে আসার ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়েছিলো।
পাঁচটার পরে কনাকে রেঁস্তোরাতে আসতে দেখা যায়। কনা একাই এসেছে।
নির্দিষ্ট টেবিলে বসার পর কায়সার খাবারের কথা জানতে চাইলে কনা চুপ করে থাকে।
- মানা করার পর আমার সাথে আপনার আর কী কথা থাকতে পারে? সহসা জানতে চায় কনা।
- কারণ আমি বিয়েতে মানা করিনি, এই কথা বলার জন্য তোমাকে আসতে বলা।
- সেটা আপনি ফোনেও বলেছেন। আমি এতদূর এসেছি জানা কথা শোনার জন্য নয়, আপনি কী যেন বলবেন বলেছিলেন।
কায়সার এবার একটু চুপ হয়ে যায়। তারপর বলে ওঠ্তে চলুন আমরা বিয়ে করে ফেলি?
কনা আর সায়েম আবাক। সায়েম কী বলবে বুঝতে পারছে না কারণ এত কথা হলেও বিয়ের সিদ্ধান্তের কোনো কথা হয়নি দুজনের মধ্যে। এদিকে কনারও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে কায়সার এই কথা বলবে ভাবেনি কনা।
- কি কথা বলেছো না কেন? জানতে চায় কায়সার।
- বিয়ে! বিয়ে তো সম্ভব না। খুব ধীরে দৃঢ়তা নিয়ে বলে কনা।
- কেন? মানা করেছি বলে?
- মানার প্রশ্ন নয়, বিয়ে তো দুজনের নয়, বিয়ে হয় দুই পরিবারের মধ্যে, সমাজের মাধ্যমে তার স্বীকৃতি। খুনির মেয়েকে পরিবার বা সমাজ গ্রহণ করছে না, সেখানে আপনি কে? আপনার কথাই কেন আমাকে শুনতে হবে?
- শুনবে, শুনতে হবে যে, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি?
- কী বলছেন এসব? আর ইউ ম্যাড! কনা রীতিমতো একটু চিৎকার করে ওঠে।
- তাইতো! কী বলছিস এসব! সায়েম প্রশ্ন না করে পারে না।
- পাগল হইনি, তবে আমি যা বলছি ভেবেচিন্তে বলছি। কেন, আগে থেকে জানাশোনা না থাকলে কি প্রেম হয় না? হয়, আমার যেমন হয়েছে। তোমার ছবি দেখার পর থেকে আংটি পরানোর আগ পর্যন্ত একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। তুমি কেমন হবে, কেমন হলে ভালো হয় ইত্যাদি চিন্তা তোমাকে নিয়ে আমার চলছে এই সময়টাতে। তোমাকে সামনে দেখার পর আরও মনে হয়েছে এই মেয়েটিই আমার; একান্তই আমার।
- বাহ, আপনি খুব চমৎকার করে কথা বলতে পারেন, তাই বলে আমাকে আপনাকে বিয়ে করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই!
- তুমি এখনও রেগে আছো। রাগ নিয়ে ভাবা যায় না। তুমি হাল্ক্কাভাবে উড়িয়ে দিতে পারো কিন্তু তুমি যে এসেছো, কেন? যদি কিছু নাই থাকতো তা হলে তুমি আসতেই না।
- আমার আসাটা দুর্বলতা ভাবছেন?
- দুর্বলতা ভাববো কেন কিন্তু... কায়সার একটু থামে। কনা তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আমাকে নিয়ে তোমার মধ্যে কি কোনো ভাবনা তৈরি হয়নি? তুমি সত্যি কথা বলবে, যদি কোনো ভাবনা না-ই থেকে থাকে, তাহলে চলে যেতে পারো, আমি আটকাবো না। কায়সার কথা শেষ করে বসে থাকে।
- দেখেন আমি সিদ্ধান্ত দিতে পারবো না বা আমার পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু একটা কথা বলতে এখানে আসা, তা হচ্ছে এনগেজমেন্টের পর বিয়ে ভেঙে যাওয়া একটা মেয়ে জন্য কতটা সমস্যাপূর্ণ তা বলে বোঝাতে পারবো না। আর তার চেয়ে বড় হচ্ছে খুনির মেয়ে- এই পরিচয়টা আবার নতুন করে নিয়ে আসায়। পুরো এলাকায় এখন গেলে দেখতে পারবেন আমাকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে। কেউ ফোনে, নয়তো বাসায় এসে যখন কথাগুলো বলছে মামা-মামি, মামাতো ভাইবোনেরা বিব্রত। আমার দিকে যখন তাকায় নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। একসময় আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলাম, পরে নিজেকে প্রবোধ দিয়েছি। আসলে সব তো ভুলেই ছিলাম, এই বড়কালে যে দাগ আপনারা দিয়ে দিলেন এটা বোধ হয় যাবে না। খুনির মেয়ে এই পরিচয় সামনে চলে আসবে। আর বিয়ে, কী বলছেন এসব। এতটা উদার হবেন না। খুনির মেয়েকে বিয়ে করতে নেই। এই সমাজে খুনির মেয়েদের পরিচয় খুনি হিসেবে। আবেগ নিয়ে চলবেন না। বাসায় ফিরে যান। আজ আসি।
কনা উঠেপড়ে চলে যায়। কায়সার আর সায়েম হতভম্ব হয়ে বসে থাকে।
৪.
ঘটনা এখানে শেষ হতে পারতো; কিন্তু কায়সারের কারণে শেষ হয়েও হলো না। সে মেয়েটিকে বোঝাতে তার অফিস পর্যন্ত চলে আসে। এই নিয়ে কনা পড়ে আরেক বিপত্তিতে। পরে অফিস কলিগদের সহায়তায় কনা সে যাত্রা রক্ষা পেলেও কারসার কনাদের বাসায় গিয়ে চেষ্টা চালাতে থাকে।
কনার মামা ও তার ছেলেমেয়েরা ভদ্র আচরণ করাতে কায়সার বেশ ক'বার যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলাফল আগে যা ছিলো তাই, কনা ও তার পরিবার এই বিয়েতে মত দেওয়ার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করে না। কনার শত মানাতেও যখন কায়সার বুঝতে পারছে না এবং আশা করে আছে কনার সম্মতির, তখন অগত্যা কনার মামা কায়সারের পরিবারের কাছে অভিযোগ জানাতে বাধ্য হয়। কায়সারের পরিবার রীতিমতো লজ্জায় অপমানিত বোধ করে। পুরো ব্যাপারটিতে তারা যারপরনাই বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। কায়সারকে রীতিমতো ভর্ৎসনা করা হয়। সায়েমও কায়সারের এই কাণ্ডকারখানায় সহায়তা না করে দূরে সরে আছে অনেকদিন হয়।
কায়সার তার পরও মানতে পারছে না পুরো বিষয়টি। শেষ চেষ্টা হিসেবে পথ আটকে কনাকে বোঝাতে গিয়ে নতুন বিপত্তি ডেকে আনে কায়সার। খুনির মেয়ে হলেও মেয়ে তো, কনার চেঁচামেচিতে পাড়ার কিছু ভাইবোন এগিয়ে আসে। কনার হাত ধরার অপরাধে চড়থাপ্পড় খেতে হয়। কনা পুরো ব্যাপারটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে ফেলায় এবং কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কায়সার প্রচন্ড মনোবেদনায় আক্রান্ত হয়। ক'দিন আর ঘর থেকে বের হয় না। কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন সকালে তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়।
ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো, লোকের প্ররোচনায় হোক অথবা একমাত্র সন্তান হারানোর শোকেই হোক কায়সারের বাবা হাফিজ সাহেব আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেন কনার বিরুদ্ধে ফলে যা হবার তাই হয়, গ্রেপ্তার হয় কনা। খুনির মেয়ের পরিচয় এখন আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে।