আমাদের দেশে ইতিহাস চর্চায় একটি বড় সমস্যা হলো ধারাবাহিকতা রক্ষার অভাব। এমনকি সাধারণত এদিকটায় আমরা খুব একটা নজরও দিই না। আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন যে, আমাদের ইতিহাসটা শুরু হয়েছে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে। পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশ- এ ঘটনাটা আমাদের মনের মধ্যে খুব করে গেঁথে গেছে। আমরা যেহেতু কিছুটা হলেও আমলাতান্ত্রিক ভাবনার সঙ্গে জড়িত; আমরা গেজেটভিত্তিক চিন্তা করতে পছন্দ করি। আমরা ভাবি যে, একসময় পাকিস্তান ছিল; সেই পাকিস্তান থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি ইত্যাদি। এর বেশি আমরা জানি না বা আমাদের জানার আগ্রহ নেই। আমাদের তথ্যের প্রতি আগ্রহ নেই। আমরা আবেগনির্ভর। পাকিস্তানকে আমরা গালি দিই। কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করি না কেন আমাদের সমস্যাটা তৈরি হয়েছে। এই হচ্ছে প্রথম কথা।
দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে, যখন আমরা সাতচল্লিশকে হালাল মনে করি, তখন মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপনিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াকেই হালাল মনে করি। এবং তখন সাধারণ মানুষের উপনিবেশবাদবিরোধী যে আন্দোলন, তাকে আমরা গুরুত্ব কম দিই। আমরা মনে করি উপনিবেশবাদীরা যে তারিখটা ঠিক করে দিয়ে গেছে, যে সিদ্ধান্তটা দিয়ে গেছে সেটিই সঠিক। এর কারণ আমাদের ইতিহাস চর্চা সীমিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের ইতিহাস দুটি সমান্তরাল ধারায় চলেছে। একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা আমলাতান্ত্রিক ধারা। অন্যটি সামাজিক ধারা বা জনগণের ধারা। এখন আমরা কোন ধারায় চলব তা আমাদেরই ঠিক করে নিতে হবে।
১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট পাকিস্তান নামে একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্ম হয়- তা ঠিক আছে। কিন্তু পাকিস্তান আদৌ কোনো রাষ্ট্র ছিল কিনা তা নিয়ে আমার দ্বিমত রয়েছে। কারণ যে রাষ্ট্র তৈরি করতে এতকিছু করা হলো, সেই 'রাষ্ট্র' মাত্র ২৪ বছরেই শেষ হয়ে যায় কীভাবে! এ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে ইতিহাসের অবস্থান থেকেই। কারণ জিন্নাহর পাকিস্তানের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৪ বছর। সেদিক থেকে ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তান- যেটির জন্ম হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১; তার বয়স ৫০ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন জিন্নাহর পাকিস্তানের চেয়ে দ্বিগুণ বয়স নিয়ে ইয়াহিয়ার পাকিস্তান টিকে আছে। সে কারণে আমি মনে করি এখন যে পাকিস্তানের নির্মাণটা রয়েছে- সেই নির্মাণটাই সঠিক। ওই এলাকায় ওই কেন্দ্রে ওই ধরনের শাসন ব্যবস্থা পাকিস্তানিদের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে নিয়ে একটি 'রাষ্ট্র', যা তৈরি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে- সেটি ভ্রান্ত, এবং সবচেয়ে বড় কথাটি হলো এর কোনো ঐতিহাসিক পটভূমি ও ধারাবাহিকতা নেই।


পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু সে আন্দোলনে আমরা আমাদের নিজস্ব বিশ্নেষণ কাঠামোর নির্মাণগুলো কম করেছি। সে কারণে আমরা কেবল পাকিস্তান একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছিল এটা ভেবেই ক্ষান্ত থেকেছি। প্রকৃতপক্ষে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রও কিন্তু সাম্প্রদায়িক হয়। আমরা ভাবি না যে, আমরা যখন বলি এটা বাঙালির রাষ্ট্র- আমরাও সাম্প্রদায়িক হচ্ছি। হয়তো আমরা সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে, তখন পার্থক্য করি- ভালো সাম্প্রদায়িকতা আর খারাপ সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে। আজকালকার দিনে জাতীয়তাবাদের দিকেও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আমি নিজেও মনে করি না যে, শুধু বাঙালি হওয়ার জন্যই একটা রাষ্ট্র তৈরি করার কোনো প্রয়োজন ছিল। কেননা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন ধরেই; এবং সেই রাষ্ট্র হচ্ছে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র, প্রান্তিক মানুষের রাষ্ট্র। ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি আলাদা দেশ ছিল দীর্ঘকাল আগে থেকেই। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন অবস্থায় এটা কখনও ভুক্তিহীন ছিল, কখনও উপভুক্ত ছিল, কখনও সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছে। যেমন একাত্তরে।
আমাদের এটা অনুধাবন করতে হবে যে, রাষ্ট্রের মূল সূত্র বা মূল শক্তি তার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। সেদিক থেকেই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এক নয়। আমাদের শত্রু আর তাদের শত্রুও এক নয়। এ কারণে পাকিস্তান যখন জন্ম নিল, মৌলিক দ্বন্দ্বটা তখনই চলে এলো। যদি আমরা এক রাষ্ট্র কিংবা এক দেশের মানুষ হতাম তাহলে তো প্রথম দিন থেকেই আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হতো না। দ্বন্দ্ব শুরু হবার কারণ হচ্ছে, আমাদের এই আলাদা ইতিহাস। বাংলাদেশের মানুষ আর পাকিস্তানের মানুষ আসলে আলাদা ধরনের রাষ্ট্র চেয়েছিল। আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র তৈরির কথাগুলো সমস্তই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বয়ান। কিন্তু সাধারণ মানুষের যে ইতিহাসে ভূমিকা বা অভিজ্ঞতা- তা আমরা আমাদের চর্চায় আনতে পারিনি। তার একটা বড় কারণ সম্ভবত আমাদের ইতিহাসভিত্তিক ধারণাগুলো উপনিবেশবাদ দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত।
১৯৪০ না ৪৭?
১৯৪০ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে একটি প্রস্তাব নেওয়া হয়- সেই প্রস্তাবের নাম লাহোর প্রস্তাব। যাতে খুব পরিস্কার করে বলা হয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য আলাদা দুটি রাষ্ট্র হবে। ভারতের পূর্ব অঞ্চল নিয়ে একটা রাষ্ট্র হবে, আরেকটা ভারতের পশ্চিম অঞ্চলকে নিয়ে। এটা স্পষ্টভাবে লেখা আছে এবং এই ভিত্তিতে বাংলাদেশে রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনও হয়েছিল স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান নামে।
১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত যে আন্দোলনটা হয়েছিল সে সময় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান নামে অসংখ্য মিটিং হয়েছে। আবুল হাশিমের খুব আলোচিত একটা লেখাও প্রকাশিত হয়েছিল 'ইনডিপেন্ডেন্ট ইস্ট পাকিস্তান' নামে। এছাড়া ইস্ট পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি নামেও একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল যেখানে পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের অনেকে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তখন পূর্ব পাকিস্তানের এই যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল তাকে ১৯৪৬ সালে শেষ করে দেওয়া হয়।
কী কারণে ১৯৪০ সালের প্রস্তাব করা হয়েছিল? এর কারণ ১৯৩৭ সালে যে নির্বাচন হয় সে নির্বাচনে আমাদের যে আজকের বাংলাদেশ- সেখানে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি জয়লাভ করে। অন্য কোনো স্থানে তারা এত বিপুলভাবে জয়লাভ করতে পারেনি। মূলত এই জনগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়েই পাকিস্তানের প্রস্তাবটা নেওয়া হয়। এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে প্রস্তাবটা উত্থাপন করতে দেওয়া হয় কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। '৩৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯৪০ সালের প্রস্তাবটি যেমন হয়, ঠিক একইভাবে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যখন মুসলিম লীগ বাংলাদেশে একক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজয় লাভ করে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন দেখলেন যে, এটা তো একটা আলাদা দেশ হতে যাচ্ছে; যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

সে সময় দিল্লিতে মুসলিম লীগের নবনির্বাচিত বিধায়কদের সভায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একক পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি আলাদা রাষ্ট্রের এই প্রস্তাব উত্থাপনের পর বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম খুব দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করে বলেন, 'এটা তো ঠিক না। লাহোর প্রস্তাবে এটা নেই।' জিন্নাহ সাহেব বললেন, 'কে বলেছে ঠিক না।' তখন রেজ্যুলুশনের বইটা আনা হলো। সেখানে ঠিকই দেখা গেল লেখা আছে 'states', অর্থাৎ রাষ্ট্রসমূহ। কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন বললেন, এটা বোধহয় টাইপিংয়ের ভুল হয়েছে। শুরু হলো এক নতুন জটিলতা। এ পরিস্থিতি নিরসনে তখন প্রস্তাব উঠল যে, তাহলে ভোট নেওয়া হোক। সেই ভোটে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রসমূহের বদলে একটি একক রাষ্ট্র গঠন করার পক্ষে জিতে গেলেন।
আবুল হাশিম সেখান থেকে ফেরত এসে বাঙালির জন্য প্রথম রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন 'ইউনাইটেড বেঙ্গল মুভমেন্ট' শুরু করলেন। আবুল হাশিম এ আন্দোলন শুরু করলেন বঙ্গীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। এবং আশ্চর্যের বিষয় নিজের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপক্ষে গিয়ে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এই আন্দোলনকে আবার সমর্থন করলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান যদি আসলেই পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতো, তবে কি এই প্রস্তাব তিনি সমর্থন করতেন? আমি মনে করি ১৯৪৬ সালের দিল্লি প্রস্তাব এবং ১৯৪৭ সালের যৌথ বাংলা প্রস্তাব- উভয় সময়েই জিন্নাহ রাজনৈতিক অসততার পরিচয় দেন। কিন্তু জিন্নাহ যদি ইতিহাস সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতেন, এটা ভালো করেই বুঝতেন যে, এরকম শঠতা দিয়ে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা যায় না। সে কারণেই ১৯৪৬ সালে যেদিন এক পাকিস্তানের প্রস্তাব দেওয়া হলো, সেদিনই সেই পাকিস্তানের মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়ে গেল। ঐতিহাসিক বাস্তবতাই একই তারিখ ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্ম নিশ্চিত করে দিয়েছিল। তাই ১৯৭১ সালে 'পাকিস্তান' দ্বিখণ্ডিত হয়নি, বরং তার নিজের ইতিহাসের যৌক্তিক উত্তরাধিকারেই পরিণত হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রই ছিল না। মূলত ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানের জন্ম হয়।



পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ
পূর্ববঙ্গের মানুষের যে ইতিহাস, সেটা দীর্ঘদিনের অনেক বেশি সংগ্রামের ইতিহাস। সর্বভারতীয় অঞ্চলের যে কোনো মানুষের চেয়ে সবচেয়ে বেশি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে পূর্ববঙ্গের মানুষ। সে কারণে অবধারিতভাবেই সেসব মানুষের সংগ্রামকে আটকে রাখা গেল না। '৪৭ এর পরে '৪৮ সালেই আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। একে একে পঞ্চাশের আন্দোলন, বায়ান্নর আন্দোলন, চুয়ান্নর আন্দোলন- এভাবে ছাপ্পান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি, উনসত্তর, সত্তর, একাত্তর। এসব আন্দোলন আমাদের জন্য অবধারিতই ছিল। তাই পাকিস্তানের মৃত্যুদণ্ড যদি কেউ দিয়ে থাকে, সেটা তার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেই দিয়েছিলেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে দেয়। যা একসময় আর আমরা সহ্য করতে পারিনি, আলাদা হয়ে গেছি। কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, কেন পাকিস্তান আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল সেটি বোঝার চেষ্টা করা। দু'পক্ষই যদি একই দেশের নাগরিক হয়ে থাকে, তাহলে তো দুর্ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্ব্যবহার যে করেছিল- এর কারণ হচ্ছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিল, ভারত বা ভারতীয় কংগ্রেসের যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আসলে একই জায়গার লোক। অর্থাৎ উত্তর ভারতীয়। এরাই কিন্তু সমগ্র ভারতে দখলদার বাহিনী। কিন্তু আমরা ভাবতে পারি না বাংলা নামে যে অঞ্চল, অর্থাৎ এই বঙ্গ তো আসলে এদের দ্বারা বারবার দখল হওয়া। এবং এই দখল করেছে হয় পরবর্তী সময়ে যারা কংগ্রেস করেছে, না হয় মুসলিম লীগ করেছে তারা। এই ভূমি আর্যরা দখল করেছে, মধ্য এশীয়রা দখল করেছে, মোঙ্গলরা দখল করেছে, আফগানরা দখল করেছে। অথচ বাংলার মানুষের দখলদারদের প্রতি এক ধরনের প্রীতি রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, আমরা মোটামুটি এরকম একটা সংস্কৃতিতেই বসবাস করি। টিকে থাকার জন্য হুজুর হুজুর করার প্রবণতাকে এখানে সহজ স্বাভাবিক মনে করা হয়। বিশেষ করে আমাদের মধ্যবিত্তরা এই ধরনের সংস্কৃতির ওপরই সবসময় নির্ভর করে এসেছে।
বাংলার রাজনীতি বলতে তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা এখানে আসার আগে কি বাংলায় রাজনীতি ছিল না? ছিল- কিন্তু কেবল একটিমাত্র শ্রেণির মাধ্যমে কোনোদিন আন্দোলন সংঘটিত হতে পারে না। যখন তারা যৌথ হয়, তখন সেই যৌথ শ্রেণির মধ্য থেকে আন্দোলনের সূচনা হতে দেখা যায়। ইংরেজরা আসার আগে বাংলার সাধারণ মানুষের বাইরে যে শ্রেণিটা এখানে ছিল না, সেটা হচ্ছে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইংরেজরা আসার পর প্রথম দিকেই যাদের বিতাড়িত করা হয় বা যাদের ক্ষতি করা হয়, তাদেরকেই কিন্তু প্রথম বিদ্রোহী শ্রেণি হিসেবে দেখা যায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলে প্রথম বিদ্রোহটা হয়েছিল ১৭৬০ সালে- ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন। সেই ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলনকে দেখলে বোঝা যায় যে, আসলে যাদের সুবিধাটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা গ্রামের মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে চলত- সেই শ্রেণিটাই প্রথম বিদ্রোহের সূচনাটা করে। সেই শ্রেণি নিজে তো এককভাবে শক্তিশালী কোনোদিন নয়। তাদের সাথে সাধারণত যুক্ত হয় বাংলার নির্যাতিত কৃষকরা। গবেষণা করে দেখা যাবে ১৭৫৭ থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত গোটা বঙ্গে অজস্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। এই বিদ্রোহগুলো সংঘটিত হয়েছে যৌথভাবে এবং এতে হিন্দু-মুসলমান কৃষকরা অংশ নিয়েছে।
১৭৯৩ সালের পর এই বিদ্রোহ কিছুটা স্থিমিত হয়ে গেল যখন জমিদারি ব্যবস্থার শুরু হলো। জমিদারি ব্যবস্থা তো সুবিধা দিয়েছিল হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠীকে। কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠী সেই জমিদারি ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করার জন্য সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব আর দিল না। আর যখন মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেতৃত্ব দিতে রাজি না হয়, তখন শুধু গরিব শ্রেণির পক্ষে আন্দোলন করা খুব কঠিন হয়ে যায়। এই যৌথ আন্দোলনের বিষয়টা আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। [চলবে]

মন্তব্য করুন