এক.
'আ আ! আউ-!' কী এক আর্তনাদের বোবা সংলাপ আমাদের কানে আসে। মুহূর্তেই ফিসফিসে কান্নার আওয়াজ- চলার পথে এমন কণ্ঠস্বরে আমরা চমকে উঠি। ভ্যান থামিয়ে লোকটিকে দেখার চেষ্টা করি। কে সে? কী তার দুঃখ! ঠিক তখনই ছিন্ন-মলিন বেশের মানুষটিকে দেখতে পাই। পরনে ছেঁড়া জামা, লুঙ্গি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। লাল মোরগের ঝুঁটির মতো চুলে প্যাঁচানো একখণ্ড লালফিতা। গলায় তাবিজ-কবজের স্তূপ। তার ওপরেই ঝুলছে আধভাঙ্গা একটি স্লেট। যাতে চক দিয়ে লেখা- 'জয় বাংলা'। তার পিছু নিয়েছে কিছু উচ্ছৃঙ্খল শিশু। 'পাগল' বলে বলে ঢিল ছুড়ছে।
অজস্র বৃক্ষরাজি ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ বৃক্ষগুলোর সে যেন পাহারাদার। কখনও বৃক্ষকে জড়িয়ে ধরে দু'চোখ আকাশে মেলে ধরে। আবার চক দিয়ে বৃক্ষের বুকে কী এক চিহ্ন এঁকে যাচ্ছে। হয়তো জীবনের অলৌকিক স্বপ্নে সে বিভোর। কিংবা নিজেকে নতুন করে নির্মাণের পাঠে মগ্ন।
লোকটির নাম জয়নুদ্দিন মিয়া। বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের যুবকদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গড়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর সে মানসিক চাপে বোবা হয়ে যায়। কাউকেই ঠিকমতো চিনতে পারে না। তবে আকস্মিকভাবে মাঝে মাঝে স্মৃতিশক্তি ফিরে পায়। বাড়ি গিয়ে বউয়ের কাছে ভাত খেতে চায়। চক দিয়ে স্লেটে লেখে তার মনের ভাব জানায়। তবে সেই সুখের মুহূর্তগুলো বছরে দু-একবার ফিরে আসে। কথাগুলো বলছিল ভ্যানচালক মোশারেফ ভাই।
ভীষণ কষ্ট হলো আমার। কিন্তু তার চোখে আমি যে জ্বলন্ত আগুন দেখেছি! লাল আগুন। সে আগুন হতে পারে প্রতিবাদের কিংবা জীবনযুদ্ধ পরাজয়ের। হাঁটাচলার ভেতর জমিদারি ভাব। পেছন থেকে দেখলে যে কেউ অবাক হবে! যেন শেখ মুজিব বীরদর্পে হেঁটে যাচ্ছেন। মানুষটির কী পরিচয়! শেখ মুজিবকে তিনি কি দেখেছেন কখনও! কথা বলেছেন?
'জানেন আপা, এলাকার ব্যাবাক মাইনষি তারে চেনে। কেউ সালাম দেয়, আবার কেউ শালা-চুদিরভাই কইয়া গাইল দেয়। আমি তারে খুব ভালোবাসি। রুটি কিনা খাওয়াই। ভ্যানে নিয়া ঘুরবার যাই।'
'কী বলছেন মোশারেফ ভাই?'
'হ আপা, আমি ঠিকই কইছি। শ্যাখসাবের সাথে তার নাকি ভারি খাতির ছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর শ্যাখসাব তারে একটা থ্রি ব্যান্ড রেডিও উপহার দিছিল। গিরামের ব্যাবাক মাইনষি তার উঠোনে বইসা বিবিসির খবর, গান, নাটক শুনতো। পরে শুনছি, তার বউ অভাবের জ্বালায় রেডিওডা বেইচ্যা খাইছে।'
আমি নির্বাক যেন! চম্পাও আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। একজন মুক্তিযোদ্ধা পাগল হয় কি করে! বিবেকের কশাঘাতে আমার ভেতর একপ্রকার ভাঙন শুরু হয়। জয়নুদ্দিন ভাইয়ের বাড়িতেই আজ থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিই। তাকে জানতেই হবে।
আমরা মোশারেফ ভাইকে বিদায় জানাই। কিছুটা হতাশ মনে গাঁয়ের সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। রাস্তার দুধারে অজস্র বৃক্ষরাজি। মৃদু বাতাসে পাতাগুলো করুণ আর্তনাদে ঝরে পড়ছে। আমাদের শরীরেও টুপটাপ খসে পড়ছে রূপ-অহংকার হারিয়ে। চম্পা তো পাতাগুলো মাটিতে পড়ার আগেই ধরতে চেষ্টা করে। কী অদ্ভুত অনুভূতি। অন্যরকম শিহরণ! হাতের বাম দিকে বুড়োমায়ের গাছতলা। জ্যৈষ্ঠ মাসে মায়ের নামে পুজো হয়। কবিগানের আসরসহ মেলা বসে।
শেষ বিকেলে আমরা জয়নুদ্দিন মিয়ার বাড়িতে আসি। জয়নুদ্দিন ভাইয়ের বারান্দায় খেজুরপাটিতে বসে আমরা বিশ্রাম নিই। কয়েকটি বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে একচালা টিনের ঘর। ভাঙাচোরা পাটকাঠির বেড়া। বৃষ্টি হলে ঝপ ঝপ করে জল পড়ে। জানা গেল ঝড়ের দিনে জয়নুদ্দিন ভাইয়ের পরিবার স্কুলঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। উঠোনের পাশেই হাঁস-মুরগির খোপ। বাড়ির পেছনে পালান। হাঁস-মুরগির ডিম, পালানের শাক-সবজি বিক্রি করেই সংসার চলে।
তখনই লাল পাড়ের ছেঁড়া শাড়ি পরা একজন ভদ্রমহিলা এসে নিজেই তার পরিচয় জানালেন। উনি মরিয়ম বেগম। জয়নুদ্দিনের স্ত্রী। তখনও তার চোখ জলে ভেজা। বাটিতে করে নিয়ে এলেন সরিষার তেল, পিঁয়াজ-মরিচ দিয়ে মাখানো মুড়ি। অন্য বাটিতে ডিম ভাজা। মুড়ি দেখে কয়েকটি মুরগি আমাদের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মরিয়ম ভাবির নির্মম নিয়তির কথা শুনে আমাদের চোখ জলে ভিজে ওঠে।
দেশ স্বাধীন করে জয়নুদ্দিন গ্রামে ফিরল। গ্রামবাসীর সে কি গর্ব! একটি পায়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলি লেগেছিল। সেই থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। ভারী কাজ করতে পারে না। দেশ স্বাধীন করলেও অভাবের কাছে তিনি চরমভাবে হেরে যান। দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন চাকরির জন্য। এলাকার চেয়ারম্যান তাকে গ্রামে পাহারা দেওয়ার চাকরি দেয়। কিছুদিন ক্ষেত-খামারেও কাজ করেছেন। পঙ্গু হওয়ায় তাকে কেউ কাজেও ডাকে না। যে মুখে 'জয়বাংলা' স্লোগান দিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন- সেই মুখেই লোকচক্ষুর অন্তরালে 'দশটি টাকা দ্যান ভাই, ভাত খাবো- 'এমন করুণ সুরে ভিক্ষাবৃত্তিও করেছেন জয়নুদ্দিন। একসময় কষ্ট সইতে না পেরে স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেন।
জয়নুদ্দিনের দুই সন্তান। তাজু বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। ভ্যান চালিয়ে যা উপার্জন করে তা দিয়েই সংসার চলে। বউয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝে মধ্যে মাকে চাল-ডাল-নুন দিয়ে যায়। রাজনগর গ্রামের নুরু মিয়ার সাথে লাইজুর বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের দিন কবুল পড়ানোর সময় নুরু মিয়া বুঝতে পারে লাইজু কিছুটা বাকপ্রতিবন্ধী। সব বুঝেও সে চুপ করে থাকে। মনে মনে নতুন কোনো ফন্দি আঁটে। স্বামীর ঘরে গিয়ে লাইজু জানতে পারে, নুরু মিয়া তার স্বামী নয়, একটা পশু। সাত দিন নিজের শরীরের খায়েশ মিটিয়ে তাকে দেহব্যবসায় নামানোর চিন্তা করে। একদিন বন্ধু কাদেরকে লাইজুর ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। রাতভর সে লাইজুকে ধর্ষণ করে। শেষরাতে লাইজু জ্ঞান ফিরে পেলে জানালা দিয়ে দেখে, নুরু মিয়ার হাতে তার বন্ধু কাদের টাকা দিচ্ছে।
লাইজুর জীবনের প্রতি এতটুকু দুঃখ নেই। আছে বুকভরা অভিমান। সে ভাবে, আল্লাহ যদি তার সহায় হতেন তাহলে সুস্থ করেই দুনিয়ায় পাঠাতে পারতেন। প্রতিবন্ধী হলেও তার রূপের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। ডাগর ডাগর চোখ। হূষ্টপুষ্ট শরীর। রূপ-যৌবনে সত্যিই সে অপরূপ। দিনভর উঠানে টুলু-মনারা আড্ডা দেয়। বেড়ার ফাঁক দিয়ে একশ টাকার নোট বের করে লাইজুকে কাছে ডাকে। লাইজু টুলুর কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে ভয়ে মাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদে।
একদিন বাড়িতে এক ভদ্রমহিলার আগমন ঘটে। তিনি তার ঢাকার বাড়িতে লাইজুকে কাজ করানোর জন্য নিয়ে যেতে চান। লাইজু আপত্তি করে না। মরিয়মের হাতে দিয়ে যায় তিন হাজার টাকা। মাসখানেক পরেই জানা গেল ভদ্রমহিলা মানুষরূপী ডাইনি দৌলতদিয়া পতিতালয়ের জুলেখা মাসি। তার হাতেই লাইজু পতিতাবৃত্তির দীক্ষা নেয়। এ খবর বাতাসের আগে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জয়নুদ্দিনের মেয়ে এখন পতিতা। টুলুরা দলবেঁধে ছুটে যায় যৌনপল্লিতে। টুলুকে কাছে পেয়ে লাইজু সেদিন চিৎকার দিয়ে ওঠেনি। বরং খুশিই হয়। টুলু বেশ খদ্দের নিয়ে আসে। খদ্দের যে লক্ষ্মী! যত খদ্দের, তত বেশি টাকা।
টুলুকে লুচ্চা হিসেবেই সবাই জানে। টুলুর ঘরে বউ আছে। তবু ওরা লাইজুদের ঘরে আসে। টুলু বলে, ঘরের বউতো বিছানার মৃত কোলবালিশ। খুশিমতো এপাশ-ওপাশ করা যায়। তাতে আনন্দ নেই। অন্য নারী মানেই আলাদা অনুভূতি। লাইজুদের দেহ ওলট-পালট করে খেতেই তাদের মনে অন্যরকম শিহরণ জাগে। লাইজু ভাবে, টুলুর মতো লুচ্চার সংখ্যা যত বেশি বাড়বে, লাইজুরা ততবেশি সুখে থাকবে। টুলুকে ঘরে ঢুকিয়ে লাইজু আজকাল আম কেটে খাওয়ায়। মুড়ি-চানাচুর মেখে দেয়। এক থালায় বাতাবি লেবু চটকিয়ে পুঁটি-পান্তা খায়। নিজ হাতে সে টুলুকে ভাত খাইয়ে দেয়। পুঁটিমাছের কাঁটা বেছে দেয়।
লাইজু এ যাবৎ তার ঘরে যত খদ্দের পেয়েছে টুলুই সেরা। সেই বেশি আনন্দ দিতে জানে। কালো হলেও গায়ের জেল্লা আছে। মেদহীন শরীর। টিয়া পাখির মতো লাল ঠোঁট। বুকে কালো পশমে ঠাসা। সুন্দর করে কথা বলতে জানে। লাইজুকে 'পিরিতের পঙ্খী' বলে ডাকে। শুধু পেটের ক্ষুধা নয়, শরীরের যে গোপন চাওয়া থাকে। লাইজুর শরীরের কোনায় কোনায় উচ্ছৃঙ্খল যৌবনের পোকাগুলো বড্ড জ্বালায়। যে চাওয়া টুলুকে দিয়েই মেটানো সম্ভব। সহজে কাবু হয় না। টাকাও বেশি দেয়।
নিয়তির একটা গোপন সূত্র থাকে, যে সূত্রটা হয়তো নুরু মিয়ার জানা ছিল না। তাই তো একদিন অন্ধকারে তার স্ত্রী লাইজুর ঘরে ঢুকে পড়ে। নুরু মিয়ার কণ্ঠ ভালো করেই চেনা আছে তার। বিদ্যুৎ না থাকায় লাইজুর মুখ দেখা হয়নি নুরুর। অন্ধকারেই আদর-সোহাগে লাইজু তার কামভাব জাগিয়ে তোলে। নুরুমিয়াও সঙ্গমের নেশায় অস্থির হয়ে ওঠে। সুযোগ বুঝেই লাইজু নুরু মিয়ার পুরুষাঙ্গে ব্লেড দিয়ে পোঁচ মারে। 'উঁহ্‌ আল্লাহ' বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। পাশের ঘর থেকে যৌনকর্মীরা ছুটে আসে। রক্তাক্ত পুরুষাঙ্গ লুঙ্গি দিয়ে চেপে ধরে বিছানায় ছটফট করতে করতে বলে, 'হেই মাগি তুই কিডা? আমার সর্বনাশ করলি ক্যান?'
ততক্ষণে আলোতে লাইজুর মুখখানা নুরু মিয়ার চোখে ঝলমলিয়ে ওঠে।
'আইজ তোরে পাইছিরে নুরু। আমার জীবনডারে তুই নষ্ট করছিস। আইজ তোরে জাহান্নামে পাঠাব।'
লাইজু খাটের নিচ থেকে বঁটি-দাও হাতে নেয়। নুরুমিয়া নিজেকে রক্ষা করতে অন্ধকার পথে জান নিয়ে পালায়।
জয়নুদ্দিনের পুরোনো শত্রু বশির শেখ। মিথ্যে মামলা দিয়ে জয়নুদ্দিনকে দু'দফা জেলেও পাঠিয়েছে। বশির শেখ ছিল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। যুদ্ধের সময় গোটা এলাকা নিজের দখলে রেখেছে। থানা সদরে পাকিস্তানি ক্যাম্পের সাথে বশিরের ছিল প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। সে ছিল ক্যাপ্টেন ফাকের আলির খুব বিশ্বস্তজন। বশিরের দাড়িতে হাত বুলিয়ে ক্যাপ্টেন আহদ্মাদের সুরে ডাকত- 'আমার বশু'। বর্ষার মৌসুমে নৌকায় করে গরু, খাসি, হাঁস-মুরগি রান্না করে ক্যাম্পে পাঠাত।
কুমার নদী তখন জলে টইটুম্বুর। একদিন নৌভ্রমণে ক্যাপ্টেন ফাকেরকে এ গ্রামে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সারা গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাশের রাজনগর গ্রামে গিয়েও অনেকে আশ্রয় নেয়। বশির শেখের কাঁধে হাত রেখে ক্যাপ্টেন ফাকের গোটা গ্রামে ঘুরেছে। এলাকার মানুষ দেখেছে বশির যেন তার যমজ ভাই। সেদিন দুপুরে বশির শেখের বাড়িতে রাজকীয় হালে খানাপিনার আয়োজন চলে। বিশ্রামের জন্য অতিথির ঘরটি সাজানো হয় সদ্য ছিঁড়ে আনা সুগন্ধি ফুল দিয়ে। উপঢৌকন হিসেবে রাখা হয় কাশিনাথের চৌদ্দ বছরের কিশোরী মেয়ে বীথিকে। অপূর্ব তার গানের গলা। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় সে প্রথম হতো। জেলাতেও রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে সেরা হয়েছিল। বীথির গুণের খবর ক্যাপ্টেনের কানে আগেই পৌঁছে দেওয়া হয়। বীথি সেদিন ভরদুপুরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শোনায় তার প্রিয় গানটি- 'এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে, বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে।'
বীথির গান আর রূপের প্রশংসায় ক্যাপ্টেন তখন মশগুল। উর্দু ভাষায় বশিরকে বলে- 'এমন রত্ন তুমি অযত্নে ফেলে রেখেছ বশু। এ অসম্ভব! এই প্রতিভা আমি নষ্ট হতে দিতে পারি না। আমি ওকে বিখ্যাত শিল্পী বানাতে চাই। তুমি আজই ওকে ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।'
রবীন্দ্রসংগীতের সুরের মতোই ক্যাপ্টেনের পায়ে চাপাকান্নায় মাথা ঠুকেছিল বীথি- 'আমি কী অপরাধ করেছি স্যার। আমাকে বাবার কাছে যেতে দিন।'
ক্যাপ্টেন বীথির লাল টকটকে ঠোঁটে তর্জনী বুলিয়ে আবার গানটি গাইতে বলে। বীথি ফাকেরের শকুন চোখে একবারই চোখ রাখার সাহস করে ধরেছিল গানের প্রথম অন্তরা। ক্যাপ্টেনের কপাল জুড়ে চিক চিক ঘাম। যৌবনের তীব্র নেশায় সে অস্থির। ঘন ঘন নিঃশ্বাস টেনে বীথিকে নিজের বুকে জাপটে ধরে। লাটিমের মতো শক্ত স্তনে দাড়িওয়ালা গাল ঘঁষে চুলকানি কমায়। একসময় সুতোহীন লাটিম নিয়ে খেলতে শুরু করে। কখনো ঠোঁট দিয়ে, কখনো বা হাতের তালু দিয়ে। বীথির শরীরটা পুতুলের মতো উঁচু করে নিজের কোলে বসায়। ঠোঁট চুষে চুষে রক্ত জমিয়ে দেয়। একসময় শক্তি খাটিয়ে বিছানায় শোয়ায়। একটানে সালোয়ারের গিঁট খুলে উলঙ্গ করে। বীথির যৌবনের ঘরে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। বীথি জ্ঞান হারাবার আগে একবার চিৎকার করেছিল- 'ও বাবাগো, আমি মরে গেলাম!'
ক্যাপ্টেন সাহেব চলে যায়। বীথিকে সুস্থ করে তোলার জন্য পাশের বাড়ির সোনা কবিরাজকে ডেকে আনে। রাতেই বীথিকে নৌকাযোগে সেনাক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাপ্টেন ফাকের বীথির আগমন পথের দিকে চেয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই ক্যাম্পের ঘাটে নৌকা ভেড়ে। নৌকায় বশির শেখসহ দুজন। বীথি নেই। বশির শেখ ভয়ে কাঁপতে থাকে। কী জবাব দেবে গুরুকে। অবশেষে ভয়ে ভয়ে সত্যিটা জানায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বীথি মাঝপথেই মারা যায়। লাশটা তারা কচুরিপানার ভেতর চাপা দিয়েছে। বশির প্রমাণস্বরূপ বীথির পরনের রক্তাক্ত সবুজ রঙের সালোয়ার হাতে নিয়ে দেখায়।
জয়নুদ্দিন মাঝে মধ্যে ভুল করে বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাত খেতে দিলে কখনো খায়, আবার লাথি মেরে ফেলে দেয়। মরিয়মের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে কী যেন ভাবে। গতরাতে তাজুর ভ্যানগাড়িটি চুরি হয়ে গেছে। আজই শেষ রাতে দুটো হাঁস গেছে শিয়ালের পেটে। মরিয়ম নিয়তিভাঙা কষ্টের কথা আমাদের আর বলতে পারে না।
'আল্লার ব্যাবাক গজব আমাগো সংসারে নাইমা আইছে গো আপা।'
পরদিন সকালেই আমরা চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করি। এ গাঁয়ে দুস্থ-অসহায় পরিবারগুলোকে আত্মনির্ভরশীল করতে বিভিন্ন সহযোগিতার আশ্বাস দিই। এমন মহতী উদ্যোগের কথা শুনে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন। মেম্বারকে ডেকে গ্রামে সমাবেশের আয়োজন করতে বলেন। আমাদের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। মুহূর্তেই মানুষের ঢল নামে কৃষ্ণাদিয়া প্রাইমারি স্কুলে।
এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বর এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য শেষে আমি মাইকের সামনে দাঁড়াই। চারদিকে বিপুল উৎসাহ। মুহুর্মুহু করতালি। আমি প্রথমেই বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুদ্দিনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি, কৃষ্ণাদিয়া গ্রামবাসী হিসেবে আপনারা ধন্য, গর্বিত। আপনাদের গ্রামে একজন মুক্তিযোদ্ধা জয়নুদ্দিন আছেন। দুর্ভাগ্য তাঁর, দেশের যুদ্ধে জয়ী হলেও জীবন যুদ্ধে সে পরাজিত। আজ তাঁর পরিণতি দেখে আমরা সত্যিই মর্মাহত। জয়নুদ্দিনকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করার জন্য আমরা অবশ্যই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করব। কথা দিচ্ছি লাইজুকে যৌনপল্লি থেকে ফিরিয়ে এনে এই সমাজেই পুনর্বাসিত করব। এক সপ্তাহের ভেতর তাজুর জন্য নতুন ভ্যানগাড়ি কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। শুধু মরিয়ম ভাবি নয়, আমরা জেনেছি এ গ্রামেই রয়েছে বেশ কিছু দুস্থ পরিবার। তাদের জন্য পর্যায়ক্রমে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার নির্মাণের ব্যবস্থা করা হবে।
মরিয়ম ভাবির চোখ তখন আকাশের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ভোরের শিশিরদানার মতো এক টুকরো হাসি। সে হাসি মিলিয়ে যায় আকাশের সবুজের সাথে। তার মনের ভেতর স্বপ্নের পাখিরা উড়তে চায়। আমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কত কী ভাবে!
আমার বক্তব্য শেষ না হতেই একজন ভিখারি হন্তদন্ত হয়ে সভাস্থলে ছুটে আসে। সে চিৎকার করে জানায়- 'জয়নুদ্দিন ভাই মইরা গ্যাছে।' মাইকেও মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে দেওয়া হয়। মরিয়ম ভাবির বুকের ভেতর স্বপ্নের ডাল-পালা মেলার আগেই তার নিয়তির পৃষ্ঠায় আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হলো। সে এখন বিধবা।
ইতোমধ্যেই মাসুদ, জাহাঙ্গীর, কামালেরা জয়নুদ্দিন ভাইয়ের মৃতদেহ সভাস্থলে নিয়ে আসে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! জয়নুদ্দিনের মুখে-পিঠে কামড়ের চিহ্ন। গতরাতেই হয়তো মারা গেছে। লাশ পড়ে ছিল বাগানে। শিয়াল-শকুনে মাংস খুবলে খেয়েছে। মরিয়ম 'আল্লারে'! বলে চিৎকার দিয়ে স্বামীর মুখ ধরে। মানুষের শোক-আহাজারিতে গোটা পরিবেশ থমথমে হয়ে ওঠে। দেশের একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন নির্মম পরিণতি সহ্য করতে কষ্ট হয়। রাজাকার বশির শেখ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় বলে যায়, 'আপদ বিদায় হইছে- পাগল-ছাগলের জন্যি এত দরদ দেহাবার কি হইছে।'
আমরা দেরি না করে উপজেলা সদরে রওনা হই। প্রথমে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সুপারিশ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে মুক্তিযোদ্ধা জয়নুদ্দিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাশ দাফন করার প্রস্তাব করি। আর জয়নুদ্দিন ভাইয়ের নামে কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের রাস্তাটির নাম রাখার লিখিত আবেদন করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়- জয়নুদ্দিন ভাইয়ের নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত না থাকায় কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে অসম্মতি জানায়। তবে মানবিক কারণেই তাঁর নামে রাস্তাটি হতে পারে বলে সম্মতি দেন।
সময় যত গড়ায়, মানুষের ভিড় বাড়তেই থাকে। জয়নুদ্দিনকে ভালোবাসে না, এমন মানুষ কমই ছিল। সবার চোখেই জল গড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে চোখের জলে জয়নুদ্দিনের জানাজা শেষ হয়। চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং 'জনকল্যাণ' এনজিওর পক্ষ থেকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা জয়নুদ্দিনকে সম্মান জানাই। লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলে। দুজন শ্রমিক মূল রাস্তার পাশে চার ফুট উচ্চতার নামফলকটি নির্মাণ কাজ শেষ করে।
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে আমরা নামফলকটির শুভ উদ্বোধন করি। চারদিকে সে কী উল্লাস! মরিয়ম ভাবি নামফলকটি বুকে জড়িয়ে কতক্ষণ কাঁদলেন। আজ থেকে সবাই গর্ব করে বলবে এ পথ মুক্তিযোদ্ধা জয়নুদ্দিনের পথ। এ গ্রাম জয়নুদ্দিনের গ্রাম। এমন একটি কাজ করতে পেরে আমাদের গর্ব হয়। নতুন করে গ্রামের পবিত্র নিঃশ্বাস নিতে খুব ইচ্ছে করে। কী এক গভীর মায়ার সুতোয় আমরা যেন কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের সাথে বাঁধা পড়ে আছি। আমাদের বিদায় জানাতে শত শত মানুষ এসেছে। মরিয়ম ভাবি আমাকে জড়িয়ে ধরে কতক্ষণ কাঁদেন। আমরা কৃষ্ণাদিয়া গ্রামকে বিদায় জানিয়ে, অনেক আনন্দ এবং কষ্ট বুকে নিয়ে যে পথে হেঁটে যাচ্ছি- তার নাম 'মু্ি‌ক্তযোদ্ধা জয়নুদ্দিন সড়ক'।

মন্তব্য করুন