১.
নরম পায়ের নূপুরধ্বনি কে না শুনিতে চায়। অথবা, নগ্ন পায়ের লাজুক চলা- তাহাও কম আকর্ষণীয় নহে। নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায়- রবীন্দ্রনাথ তাহা শুনিয়েছেন এবং দেখিয়াছেন। কিন্তু সেই রাবীন্দ্রিক অবস্থা কিংবা পরিস্থিতি এখন আর নাই। হয়তো কোথাও তাহার ছিটাফোঁটা থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু তাহা আমার জন্য নহে। কেন নহে- তাহা ভাবিয়া বলি।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন যখন জারি করা হয়, তখন আমার বয়স ৭/৮ বছর। ভয়াবহ বুট-জুতার শব্দ নিঃশব্দ পাড়াটাকে মাড়াইয়া গিয়াছিল। আমার শিশু মনে সেই শব্দ গাঁথিয়া গিয়াছে। সচেতন মনে সেই বুট-জুতার প্রতিধ্বনি এখনও শুনিতে পাই।
এইবার দ্বিতীয় কৈফিয়ত। বছর বিশেক ধরিয়া পাহাড়ের পাদদেশীয় একটি এলাকায় আমি থাকি। তিন দিকে পাহাড়, চারিদিকে বনাঞ্চল। মৌজা অনুযায়ী এলাকাটির নাম জঙ্গল পশ্চিমপট্টি। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গের শব্দে আমি মুগ্ধ হইবার চেষ্টা করি। মাঝেমধ্যে তাহাকে প্রকৃতির অর্কেস্ট্রা বলিয়া মনে হয়। পক্ষান্তরে, প্রযুক্তিবিজ্ঞানের একটি উপসর্গ আসিয়া বাদ সাধে। তাহা হইল মাইক।
প্রযুক্তিবিজ্ঞানের বেশকিছু আবিস্কার আমার অপ্রিয়। তাহার মধ্যে দ্বিতীয়টি হইল মাইক। প্রথমটি হইল মারণাস্ত্র, বিশেষ করিয়া পারমাণবিক বোমা। বিষাক্ত ধুতুরা ফুলের মতো মাইককে আমি এক নম্বরেও স্থান দিতে পারিতাম। কিন্তু, 'নিখোঁজ সংবাদ'-এর মতো ইতিবাচক দিকটির কারণে তাহা পারিলাম না।

২.
নানা রকম অনুষ্ঠান উপলক্ষে চতুর্দিক হইতে মাইকের তীব্র আওয়াজ ছুটিয়া আসে। সকাল হইতে আরম্ভ করিয়া শেষরাত্রি অবধি তাহার স্থিতিকাল। আজ এইখানে তো কাল ওইখানে। আজ গায়েহলুদ তো কাল নিউইয়ার। আজ ভ্যালেন্টাইন ডে। কাল পিকনিক পার্টি, পরশু অন্য কিছু।
যেহেতু শিশু, মুমূর্ষু, বৃদ্ধ, একনিষ্ঠ পরীক্ষার্থী, অনিদ্রা-রোগী কাহারও প্রতি মায়ামমতা নাই। কাহার ঘরে কে মরিল- তাহাতেই বা কী! মাইকের অধিকার কতো, এই ব্যানারে সরকারি আইনের উল্লেখ করা হইয়াছিল ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকে তাহা এইরূপ- অপপড়ৎফরহম :ড় হড়ঃবং ঢ়ড়ষষঁঃরড়হ (জবমঁষধঃরড়হ ধহফ ঈড়হঃৎড়ষ জঁষব ২০০৬) ধপপবঢ়ঃধনষব ংড়ঁহফ ষবাবষ ধৎব ৫৫ ফবপরনবষং ভড়ৎ ফধু-ঃরসব, ৪৫ ফবপরনবষং ভড়ৎ হরমযঃ রহ ৎবংরফবহঃরধষ ধৎবধং, ৭০ ফবপরনবষং ভড়ৎ ফধু ধহফ ৬০ ফবপরনবষং ভড়ৎ হরমযঃ ধঃ পড়সসবৎপরধষ ধৎবধ ধহফ ৭৫ ফবপরনবষং ভড়ৎ ফধু ধহফ ৭০ ফবপরনবষং ভড়ৎ হরমযঃ রহ রহফঁংঃৎরধষ ধৎবধং.্থ
এত নিভৃতে থাকিয়াও আমি এই বিধিবিধানের সুফল পাইলাম না। তখন আমার মধ্যে অসহায় ক্ষোভ জমিয়া ওঠে। আরও একটি ঘুমের বড়ি খাইয়া, যেন প্রতিশোধ লইতেছি এইভাবে, আবারও সিগারেট ধরাই, বায়ুদূষণ করি। অর্থাৎ অন্যের কারণে নিজের টাকা পোড়াই।
চিৎকারপ্রেমীদের মনোভাব সম্ভবত এইরূপ- টাকা দিয়া মাইক ভাড়া করিয়াছি, অতএব ফুল-ভলিউমে মাইক বাজাইয়া পয়সা উশুল করিতেই হইবে।
আমরা জানি, প্রকাশ্যে ধূমপানের জন্য জরিমানা ধার্য করা আছে। কোথাও কোথাও এই আইনের সফল প্রয়োগও হইয়াছে। অথচ শব্দদূষণের ব্যাপারে কিছুই শুনি নাই। হয়তো শুনিবার যন্ত্রেই তালা লাগিয়াছে।
৪.
নিজের কষ্টের কথা বলিয়া অন্যের কষ্ট আর বাড়াইব না। দেখি, মোড় কাটাইয়া প্রসঙ্গটিকে অন্যদিকে লইয়া যাইতে পারি কিনা।
পদ বলি আর চরণই বলি- উভয় শব্দের একাধিক অর্থ। পদ শব্দের প্রাথমিক অর্থ পা, অর্থাৎ চরণ, যাহার সাহায্যে মানুষ হাঁটে। পদের আর একটি অর্থ হইল বিভক্তিযুক্ত শব্দ, যাহা শব্দকে হাঁটাইয়া বাক্যার্থের বাড়িতে পৌঁছাইয়া দেয়। এতদ্‌ব্যতিরেকে, পদ্য বা কবিতাতেও পদের ভূমিকা অনুরূপ। মানুষের মতো কবিতারও চরণ আছে; চরণে ভর করিয়া তাহারাও হাঁটিতে হাঁটিতে কবিতার গন্তব্যে উপনীত হয়।
২০২০ সালে প্রকাশিত আমার ক্ষোভান্বিত কাব্যগ্রন্থের নাম 'চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডহীন' সেখানে ২০টি কবিতা আছে, সেগুলির শিরোনাম নাই; অর্থাৎ শির নাই মানে মুণ্ড নাই। হয়তো অবচেতন মনের নির্দেশ অনুযায়ী আমি কবিতাগুলি শিরোনাম করিয়াছি। ইহাই হইল শিরোনামের গ্রন্থের ব্যাখ্যা। সমান্তরালভাবে এই নামের পরাবাস্তব তাৎপর্যও বিদ্যমান। তা এইরূপ- প্রগতিশীল ব্যক্তিমানুষের মুণ্ড কাটিয়া ফেলিলেও তাহার সামষ্টিক অগ্রগতি থামাইয়া রাখা যায় না। ক্রমাগত চরণেরা তাহাদের ভূমিকা পালন করিয়া যায়। তাই, কবিতার চরণ হউক কিংবা মানুষের চরণই হউক, অগ্রগতি রচনাতেই তাহার সার্থকতা। সেই ক্ষেত্রে বিক্রয়যোগ্য মাথার দরকার নাই। যে চক্ষু দেখিয়াও দেখে না, তাহারও প্রয়োজন নাই।-
হেঁটে যাচ্ছে চরণেরা মুণ্ডহীন পাতালপ্রবণ,
চক্ষুহীন মাতাল রাস্তায়।
গলির মোড়েই ছিল নাকফুল-পরা হাস্নুহানা-
কামার্ত গন্ধের ভারে নুয়ে পড়ে পিচ্ছিল শ্যাওলায়।
ঘ্রাণহীন চরণেরা
বৃষ্টির নূপুর ছুঁয়ে ছন্দ ঠিক রাখে।
চন্দ্রসূর্য-গ্রহণের যাবতীয় কারুকাজ
অর্থহীন আজ।
তবু অন্ধ চরণেরা পৌঁছে যাচ্ছে ঠিক অন্ধকারে,
যেখানে অপেক্ষা করে
গুল্মলতা পারদের তৃষ্ণাসহকারে।
চরণে লুটিয়ে পড়ে পলি মাথা ঢেউ,
অন্ধকারে অন্ধ নয় কেউ।
৫.
এতক্ষণ অগ্রগতির কথা বলিলাম। এইবার, আবারও শব্দদূষণের কথা বলিব। রবীন্দ্রনাথ যে কলকাতার পাট চুকাইয়া শতাধিক মাইল দূরের শান্তিনিকেতনে পলাইয়া গিয়াছিলেন, তাহা কেন? -ইহার হাজারটা কারণ থাকিতে পারে। তবে, অন্যতম কারণ শব্দদূষণ কিনা তাহা লইয়া গবেষণা চলিতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিয়াছেন- 'কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?' ঠাকুর, আমি দুঃখিত; জঙ্গল পশ্চিমপট্টিতে থাকিয়াও এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারিলাম না।
৬.
অস্বীকার করিব না। একটা সময় আমারও ছিল। পঞ্চদশীর পায়ের শব্দে বুক ধুকপুক করিয়া উঠিত। সিঁড়িতে পাদুকার শব্দ শুনিলে মনে হইত, সেই বুঝি আসিতেছে। সেই (১৯৬৯) কতকাল ধরিয়া সে আসিতেছে, তাহার আগমনধ্বনি ফুরাইতেছে না। আমারও, প্রতীক্ষার কম্পন থামিতেছে না। হয়তো আর কখনও থামিবে না। কেননা, সে আর বাঁচিয়া নাইা

মন্তব্য করুন