ছেলের কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠল শেফালী। জ্বরে কপাল পুড়ে যাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে কাঁসার বাটিতে জল নিয়ে এলো। পাতলা পুরোনো কাপড় ভিজিয়ে ছেলের মাথায় জলপট্টি দিতে শুরু করল শেফালী।
অবিনাশ মায়ের কোলে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। গত তিন দিন ধরে অবিনাশের জ্বর। শেফালী গায়ের ওপর কাঁথাটা টেনে দিয়ে বলল, জ্বর বাড়ছে আমারে কইবি না? আমি তো কামে আছিলাম রে বাবা। মেঘের গতি ভালা না। বড় তুফান আইতে পারে যেকুনু সুময়।
অবিনাশ কোনো কথা না বলে আরও জড়সড়ো হয়ে গেল। খুবই চুপচাপ, শান্ত, স্থির। এরকম উথালপাথাল জ্বরের মধ্যেও মাকে সে এতটুকু বিরক্ত করে না।
অবিনাশের বয়স সাত বছর। ক্লাস টু-তে পড়ে। শেফালির স্বপ্ন ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবে। অবিনাশের বাবা কুনুই লালও চায় ছেলে লেখাপড়া শিখুক। সে চায় না অবিনাশ তার পেশায় আসুক। কনুই লালের কয়েক পুরুষ জেলে। কাজেই খুব কাছে থেকে দেখেছে এই জীবনকে। বংশপরম্পরায় শুধু মানুষের পরিবর্তন ঘটেছে, ভাগ্যের কোনো বদল হয়নি। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মহাজন, ট্রলার মালিক ও আড়তদারদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়। অথচ নিজেদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। জেলে পরিবারে পুত্রসন্তানের শৈশবে তার হাতে বই তুলে না দিয়ে জাল ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মন থেকে এ পেশা মেনে নিতে পারেনি কুনুই লাল। তার বাবা জোর করে তার হাতে জাল তুলে দিয়ে বলেছিল, বংশের কামরে ইজ্জত দিতে হয়। জাউলার পোলা তো জাউলাই হইব। অন্য কাজ তারে মানায় না।
কুনুই লাল বাবার মুখের ওপর কথা বলতে পারেনি। একটু বড় হয়ে সে সিদ্ধান্ত নেয় নিজের সন্তানদের এ পেশায় আনবে না। তাদের পড়ালেখা শেখাবে, যেন অন্য কোনো পেশা বেছে নিতে পারে। অল্প বয়সে তার বাবার মৃত্যু হয়। সে বিয়ে করে শেফালীকে। শেফালী পর পর দুইবার মৃত সন্তান জন্ম দেয়। ভেঙে পড়ে কুনুই লাল। তৃতীয়বার ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। মন্দিরে পূজা দিতে গেলে পুরোহিত ছেলের নাম রাখে অবিনাশ। কুনুই লাল এ নামের অর্থ জানতে চাইলে পুরোহিত বলেন, অক্ষয়, অমর, যার কোনো বিনাশ নাই।
আধা ঘণ্টা একটানা জলপট্টি দেওয়ার পরও অবিনাশের জ্বর কমার কোনো লক্ষণ নেই। শেফালী চিন্তিত হয়ে পড়ে। গামলায় কাপড় ভিজিয়ে ছেলের সারা শরীর মুছতে থাকে। অবিনাশ হাত দিয়ে মাকে বাধা দেয়। অস্ম্ফুট স্বরে বলে, মা, শীত লাগে।
ছেলেকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না শেফালী। সাগরে ঝড়ের বিপদ সংকেত ঘোষণা করায় দুপুরের পর থেকে জেলেপাড়ার প্রায় সকলে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। অসুস্থ অবিনাশকে নিয়ে সেখানে যেতে চায়নি শেফালী। জেলেপাড়া যেন এক বিরানভূমি। উপকূল এলাকায় এ আর নতুন কী! তাদের জীবনের স্পন্দন নির্ভর করে সাগরের গতিপ্রকৃতির ওপর।
অবিনাশের চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে শেফালী। এক দৌড়ে পাশের ঘরের তপতীকে ডেকে আনে। তপতী সাত মাসের পোয়াতি। তপতীর স্বামীও কুনুই লালের সঙ্গে গাঙে গেছে মাছ ধরতে। সাইক্লোন শেল্টারে এ রকম সময়ে মানুষ গিজগিজ করতে থাকে। পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত থাকে না। তপতী তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ ঘরেই থেকে গেছে।
তপতী ঘরে ঢুকে অবিনাশের কপালে হাত রেখে চিৎকার করে উঠল, দিদি, কপাল তো পুইড়া যাইতাছে! মাথায় পানি ঢালন লাগব। আমি অবিনাশরে দেখতাছি। তুমি জল ভইরা আনো।
শেফালী পিতলের কলস নিয়ে জল আনতে বেরিয়ে যায়।
আকাশে কালো মেঘ ঘন হয়ে আসছে। সেইসঙ্গে দমকা হাওয়া। গতকাল রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। অবিনাশ বাবার খোঁজ করলে শেফালী বলে, তোমার বাবায় তো গাঙ্গে গেছে মাছ ধরতে। তুমি না ইলিশ মাছের ডিমের সালুন দিয়া ভাত খাইতে চাইছ? ভোরবেলা দেখবা বড় একটা ইলিশ নিয়া তোমার বাবা চইলা আইব।
ছেলের আবদার মেটাতে কুনুই লাল মাছ ধরতে গেছে। শেফালী তাকে নিষেধ করেছিল। সাগরে তিন নম্বর বিপদ সংকেত। তার ওপর ছেলের জ্বর। কিন্তু কুনুই লাল বউয়ের কথা শোনেনি। ট্রলার মালিকেরও চাপ ছিল। এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। বিপদ সংকেত আরও বাড়লে কয়েকদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তখন মাছের দামও বাড়বে। কাজেই এখন ইলিশ ধরে যত মজুদ করা যায় ততই লাভ। দুর্যোগের মধ্যে কাজে গেলে বাড়তি কিছু পয়সাও মেলে। তাই জেলেপাড়ার প্রায় সকলেই মাছ ধরতে গেছে। কুনুইয়ের শরীরটা ভালো না। সে দোটানায় ছিল যাবে কি না। এর মধ্যে ছেলের আবদার-ইলিশের ডিম খাবে। অবিনাশ ইলিশ খায় না। কিন্তু ইলিশের ডিম ওর ভারি পছন্দ। কুনুই যাওয়ার সময় ছেলেকে আদর করে বলেছে, আজ সব থেইকা বড় ডিমঅলা ইলিশ তোমার জন্য আনমু।
বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে। সেইসঙ্গে মেঘের গর্জন। যে-কোনো মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে। ফুলে উঠবে সাগর। কুনুই লালের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে শেফালীর। এদিকে অবিনাশের জ্বর কমার কোনো লক্ষণ নেই। সেই দুপুর থেকে কোনো কিছু মুখে দেওয়াতে পারেনি শেফালী। দু'বার জোর করে বার্লি মুখে দিয়েছে, দু'বারই বমি করেছে অবিনাশ। শেফালী কী করবে বুঝতে পারে না। অবিনাশ জ্বরের ঘোরে বাবাকে ডাকে। শেফালী বলে, তোমার বাবায় তো মাছ ধরতে গেছে। অবিনাশ মাকে বলে, আমি ডিমের সালুন খামু না মা। বাবারে ফিরা আইতে কও।
ছেলের ভাবগতি শেফালীর ভালো লাগে না। কবিরাজ মশাইয়ের দাওয়াই কোনো কাজে লাগছে না। ভালো ওষুধ লাগবে। শেফালী সিদ্ধান্ত নেয়- গঞ্জের বাজারে একজন ডাক্তার বসে, তাঁর কাছ থেকে ওষুধ আনবে সে।
তপতীকে অবিনাশের কাছে রেখে শেফালী বাজারের দিকে রওনা দেয়। যাওয়ার আগে ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করে। অবিনাশ মৃদুস্বরে বলে, মা, তুমি যাইও না। আমি ভালা হইয়া যামু। বাবা আসুক। বাবায় ওষুদ আনবো।
শেফালী অবিনাশকে বুঝিয়ে বলে, যামু আর আমুরে বাজান। তোমার পিসিরে রাইখা গেলাম।
মাটির শানকির মধ্য থেকে মুষ্টির চাল বিক্রি করা টাকাগুলো বের করে শাড়ির আঁচলে বেঁধে বেরিয়ে পড়ে শেফালী। ভাঙা একটা ছাতা নিয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে থাকে। সন্ধ্যা পার হয়েছে অনেক আগেই। চারদিক আঁধার হয়ে আছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে ঝকঝকে হয়ে উঠছে। গঞ্জের বাজার দুই কিলোমিটার। সড়কে লোকজন নাই বললেই চলে। তুফান আসবে বলে সন্ধ্যার আগেই সবাই ঘরে ঢুকে গেছে। সুনসান নীরবতা। দূরে কোথাও খেঁকশিয়ালের ডাক শোনা যায়। রাস্তায় কয়েকটা নেড়ি কুকুর ঘোরাঘুরি করছে। ওরাও বোধহয় দিশাহীন হয়ে পড়েছে। রাজ্যের দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে হাঁটছে শেফালী। কুনুই লালের ওপর রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। কতবার না করেছিল যেতে! একে তো ঝড়বৃষ্টি, বাতাসের ভাবগতিক ভালো না। তার ওপর ছেলের এই অবস্থা! মানুষটা কোনোদিনও কথা শুনল না শেফালীর।
শেফালী যখন গঞ্জের বাজারে পৌঁছাল রাত তখন কত কে জানে! সমস্ত বিদ্যুৎবাতি বন্ধ। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শেফালী পাগলের মতো বাজারের একমাথা থেকে আরেক মাথায় দৌড়াচ্ছে। নাহ, কোনো দোকান খোলা নাই। ডাক্তার যে ফার্মেসিতে বসে সেটা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু সেটাও বন্ধ। অনেক আগেই দোকানিরা ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছে।
শেফালীর ধারণা ভেতরে কেউ থাকতে পারে। সে ক্রমাগত দোকানের ঝাঁপের মধ্যে দুই হাত দিয়ে সজোরে বাড়ি মারছে। শেফালী যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। খালি হাতে সে ফিরে যাবে না। অবিনাশের কিছু হলে...। ধামধুম শব্দ পেয়ে বাজারের চৌকিদার এসে প্রচণ্ড গালমন্দ করল। বলল, ঐ পাগলি যা ভাগ। রাতদুপুরে পাগলামি বাড়ছে।
শেফালী চিৎকার করে কাঁদছে। আমার পোলাডা মইরা যাইতেছে গো! আমি ওষুদ না নিয়া যামু না।
আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শুরু হয়েছে দমকা হাওয়া।

বিফল মনোরথ শেফালী বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। দ্রুত তাকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। অবিনাশের কী অবস্থা কে জানে? এর মধ্যে ঝোড়ো বাতাসের গতি এত বাড়ছে যে মাথার ছাতা একপর্যায়ে উড়িয়ে নিয়ে গেল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। শরীরের কাপড় ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। হঠাৎ করেই অঝোর ধারে বৃষ্টি শুরু হলো। শেফালীর সারা শরীর ভিজে একাকার। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মাঝে মধ্যে কাছে কোথাও বাজ পড়ার আওয়াজ হচ্ছে। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে অবিনাশ এবং ওর বাবা কুনুই লালের জন্য। এরকমই এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে শেফালীর শ্বশুরমশাই হরিপদ লাল মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে গত হয়।
নানা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে শেফালীর মাথায়। স্কুলঘরের কাছে চলে এসেছে সে। তুফানের গতি এতটাই বেশি যে, শেফালীর মনে হলো, গত বছর যেভাবে তাদের ঘরের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঠিক সেভাবে তাকেও উড়িয়ে নেবে। তার এই ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই তুফানের চেয়েও দ্বিগুণ গতিতে পেছন থেকে কেউ একজন জাপটে ধরল তাকে। প্রচণ্ড ভয়ে 'অবিনাশ' বলে চিৎকার করল শেফালী। কিন্তু সে আওয়াজ বের হওয়ার আগেই কালো কাপড়ে চোখমুখ ঢাকা একজন এগিয়ে এসে মুখ চেপে ধরল তার। আরেকজন কাপড় দিয়ে তার মুখ বেঁধে ফেলল। তারপর টানতে টানতে স্কুলঘরের মধ্যে নিয়ে গেল তাকে। শেফালী শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। হায়েনাগুলো একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ক্লান্ত শরীরের ওপর। বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড়ের মাতামাতি একটুও কমেনি। টিনের চালে বৃষ্টি আর তুফানের শব্দে শেফালীর অস্ম্ফুট কান্না আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার। এরপর আর কিছু মনে নেই তার।


ভোরের নরম আলোয় শেফালী নিজেকে আবিস্কার করল স্কুলঘরের মেঝেতে। ঘেন্নায় নিজের শরীর গুলিয়ে উঠল। শাড়িতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ নিয়ে উঠে বসল। শরীরে কোনো শক্তি নেই। চকিতে সে সংবিত ফিরে পেল। কাল রাতের ঘটনা মনে পড়ছে। তার অবিনাশ কোথায়? অবিনাশের কথা মনে পড়তেই কোনো এক ঐশ্বরিক শক্তি যেন এসে ভর করল তার শরীরে। ঝড়ের বেগে উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলো। রাস্তায় কোথাও গাছের ডাল পড়ে আছে। কারও ঘরের চালা নেই। কোথাও দুটি কবুতর মরে পড়ে আছে। চারদিকে সব যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। চেনা সবকিছুই অচেনা লাগছে। এক প্যাঁচে পরা শাড়ির লম্বা আঁচল রাস্তার কাদামাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে সে খেয়াল তার নেই। শেফালী কোনো রকমে নিজের অপবিত্র শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলোকে হিংস্র পশুর মতো লাগছে। ভয়ে জড়সড়ো হয়ে ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা থেকে নেমে জমির আইল ধরে হাঁটা শুরু করল। এর মধ্যে কয়েকবার হুমড়ি খেয়েও পড়ল সে। আবার উঠে দাঁড়াল।
অবিনাশ, বাপজান আমার- বলে গোঙাতে গোঙাতে নিজ বাড়ির আঙিনায় এসে হতবিহ্বল হয়ে গেল শেফালী। আমগাছের বিশাল এক ডাল ঘরের চালায় পড়ে আছে। গোয়ালঘরের ছনের চাল খুলে পড়ে ঘরটা একদিকে কাত হয়ে আছে। উঠোনভর্তি মানুষ। এত মানুষ কেন? তাকে দেখে রঞ্জনা মাসি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, ওই মাগি, বেরাইম্মা পোলাডারে হালাইয়া রাইখা ওষুদ আনবার কথা কইয়া সারা রাইত কার লগে ফুর্তি কইরা আইলি?
এসব কথার কিছুই শেফালীর কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গিয়ে যা দেখল তা শেফালীর ভাবনাতে ছিল না। হিংস্র বাঘের মতো তপতীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। তুই আমার অবিনাশরে কী করলি? কথা কস না কেন? ঐ খানকি কথা ক?
এরপর অবিনাশের স্পন্দনহীন শীতল শরীরটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বিকট এক চিৎকার দিয়ে মূর্ছা গেল শেফালী।


ঘরের দাওয়ায় খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে শেফালী। মানুষের ভিড় কমে গেছে। সুপ্রা, কল্পনা, তপতী ও রঞ্জনাসহ কয়েকজন তাকে ঘিরে বসে আছে কুনুই লালসহ পাড়ার জেলেদের ফেরার অপেক্ষায়। পেয়ারা গাছে দুটি কাক বসে আছে। কিছুক্ষণ আগে ডিম ফুটে বের হওয়া মুরগির বাচ্চাগুলো চিঁ চিঁ আওয়াজ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আকাশে কয়েকটা চিল ওড়াউড়ি করছে।
রঘুনাথ ও খগেন মাঝি শেফালীর বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়াল। দুজনের ভেজা শরীরে কাদামাটি মাখানো। চোখেমুখে আতঙ্ক ও ক্লান্তির ছাপ। তারা বুঝতে পারছে না ঝড়-জলের এক রাত শেফালীর জীবনকে কতটা তছনছ করে দিয়েছে!
খগেনের হাতে বড় একটা ইলিশ মাছ। রঘুনাথ শেফালীর দিকে এগিয়ে এসে জানাল, তুফানে তাদের ট্রলারসহ কয়েকটি জেলে নৌকা ডুবে যায়। তারা দুজন কোনোরকমে সাঁতরে ফিরে এসেছে। কুনুই লালসহ অনেক মাঝি এখনও নিখোঁজ।
ট্রলারডুবির সময় কুনুই লাল বলছিল, আমার বাজান ইলিশের ডিমের সালুন খাইতে চাইছে গো। তুমরা যে-ই পাড়ায় আগে ফিরবা আড়ত থেইকা বড় একটা ইলিশ আমার বাড়িত দিয়া আসবা। আড়তদাররে বলবা আমার হিসাব থেইক্কা মাছের মূল্য কাইটা রাখতে। এইটা আমার দাবি তোমরার কাছে।
পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকা শেফালী একদৃষ্টিতে ইলিশ মাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্যদের মুখও থমথমে বিষণ্ণ।
খগেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হইছে গো তোমাগো? কথা কও না কেন তুমরা?
খগেনের কথার কেউ কোনো উত্তর দিল না। পেয়ারা গাছে বসে থাকা কাক দুটো কা কা শব্দ করে উড়ে গেল।

মন্তব্য করুন